কোনান
ডয়েলের “হাউন্ড অফ দ্য ব্যাস্কারভিলস’’ গল্পের গ্রীম্পেন মায়ারের কথা নিশ্চয়
আপনাদের মনে আছে । মনে নেই ! গ্রীম্পেন মায়ার হল সুন্দর ঘাস দিয়ে ঢাকা চারণভূমি
কিন্তু ঐ সৌন্দর্যের তলায় আছে অতল পাঁকের সমাবেশ । কেউ যদি প্রলুব্ধ হয়ে ঐ পথে যায়
তবে সেখানে ডুবে মরা ছাড়া আর কোনও গতি থাকবে না ।
 |
| Source : Internet |
আগামিকাল
দোল উৎসব । কিন্তু দেখতে পাচ্ছি তার উত্তেজনা গতকাল থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছে । বিশেষ
করে ইউনিভার্সিটি কিম্বা কলেজগুলোতে । আমরাই বা বাদ যাই কেন ? মফস্বল হলে কি হবে
আমাদের ডিপার্টমেন্টের মেয়েরা আবির কিনে এনে সে উৎসবের শুরুয়াৎ করে দিয়েছে । তা
কালকে তারা আবির টাবির নিয়ে আমার পিছনে ধাওয়া করলে আমি দৌড় দিই । আচ্ছা, বর্ধমান
বিশ্ববিদ্যালয়ের গোলাপবাগ ক্যাম্পাস সম্বন্ধে কি আপনার কিছু জানা আছে । না থাকলে
বলি এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হল এটি চারদিক দিয়ে একটি ক্যানাল বা পরিখা দিয়ে ঘেরা
এলাকা । তা গত কয়েকমাসে ঐ ক্যানালের সংস্কারের
ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে । ফলে ঐ ক্যানাল থেকে প্রচুর পাঁক তুলে পাশে জমা করে
রাখা হয়েছে । কিছু মাস কেটে যাবার দরুন ঐ ১০-১৫ ফুট গভীর পাঁকের ওপরের অংশ শক্ত
হয়ে সাধারণ মাটির মতোই দেখতে হয়েছে, কিন্তু নীচে তা নরম । আমার বন্ধুরা আমার পিছনে
ধাওয়া করলে আমি আপাতভাবে মনে হওয়া ঐ শক্ত মাটির ওপর দৌড়তে থাকি । কিন্তু কিছুক্ষনের
মধ্যেই গ্রীম্পেন মায়ার আমার শরীরের অর্ধাংশ গ্রাস করে ফেলে । আমি যত নড়াচড়া করি
তত একটু একটু করে ঢুকে যেতে থাকি । পাঁক ধীরে ধীরে আমার থাই পেরিয়ে কোমরের দিকে
উঠতে থেকে । আমি ভয় পাই । আমার মনে পড়ে যে ছেলেবেলায় জেনেছিলাম পাঁকের ওপর নড়াচড়া
করতে নেই বরং শুয়ে পড়ে ওজনটাকে ছড়িয়ে দিতে হয় ও ধীরে ধীরে পা বের করে এনে হামা
দিয়ে বেরিয়ে আসতে হয় । কিন্তু, সেখানে আমি যখন এই উপায় নিতে গেলাম দেখলাম যে এমন
বেকায়দায় আমি পড়েছি যে ঐ উপায় আমি নিতে গেলে বিপদ বাড়বে । আমার বন্ধুরা তখনও বুঝতে
পারেনি আমি পাঁকের স্তূপে পড়েছি । সে এদিকে এগুতে এলে আমি ওকে ঝাঁঝিয়ে উঠে বলি
দূরে যা আর কাওকে দড়ি কিম্বা লাঠি নিয়ে আসতে বল । সে এদিক ওদিক দেখে কিন্তু হতভম্ব
হয়ে যায় । সেখানে কেউ ছিল না। কিছু পরে
সেখানে কিছু লোক পেরতে থাকে । কিন্তু তারা আমাকে দেখেও পেরিয়ে যায় । কিছুজন থামলে
আমি লক্ষ করি যে ওখানে সকলে আমাকে ঐভাবে থাকতে দেখে পুলক পাচ্ছে কিন্তু বিপদটাকে
বুঝতে পারছে না । আমি অনন্যোপায় হয়ে একবার চেঁচায় আর বলি এদিকে এসে আমায় বের করুন
। কিন্তু সকলের মনেই ভয় ছিল আর কেইবা নিজেকে ঐ পাঁকের থাবায় নিয়ে গিয়ে বিপদে ফেলতে
ইচ্ছে করবে । কিন্তু ওদের মধ্যেই একজনকে দেখে আমার মনে হয়েছিল উনি আসতে চায়ছেন
কিন্তু ভয়ও পাচ্ছেন । আমার কাছে তখন উপায় ছিল দুটো । হয় অপেক্ষা করা যতক্ষন না
সম্পূর্ণ ডুবে যাই নয়তো ঐ ভদ্রলোকটিকে যেভাবেই হোক উদ্দীপ্ত করে এদিকে নিয়ে এসে
নিজেকে রক্ষা করা । আমি দ্বিতীয়টা করলাম । ছেলেবেলায় Man vs Wild দেখার সুফল মিলল । আমি মনে
মনে বলেছিলাম এরকমভাবে অনেকে পড়েছেন ও অনেকে বেঁচেছেন । সুতরাং, আমার নতুন কিছু
হয়নি । আমি ওনাকে ডিরেকসন দিলাম কিভাবে আসতে হবে ও কোন দিক দিয়ে আসতে হবে । তিনি
সেভাবে এগিয়ে এসে আমায় হাত ধরে তুলে আনলেন শক্ত মাটিতে । পাঁক আমায় গিলতে পারল না
। কিন্তু সত্যি কি তাই !
এখন
রাত্রি । গতকালের ‘দৈনিক স্টেটসম্যান’ এর প্রথম পাতার খবর অভিজিৎ রায়ের খুনের
ঘটনায় তাঁর মেয়ে তৃষা আহমেদ একটি চিঠি লিখেছেন , সেটি পড়ছি । গত কয়েকদিনে অভিজিৎ
রায় নিয়ে ফেসবুক ও খবরের কাগজগুলোতে খুব হইচই হয়েছে । কিন্তু এ ঘটনা আমার মধ্যে
নতুন কোনও প্রতিক্রিয়া তুলতে পারেনি । কারণ ইতিহাসের কাছে এধরনের মৃত্যু নতুন ঘটনা
নয় । তবে এখন এই নিউজ পড়তে পড়তে দেখলাম তাঁর মেয়ে মার্কিন যুক্তরাস্ট্রের ছাত্রী ।
আমার কয়েক বছর আগের স্মৃতি মনে পড়ল । আমি ফাইল বের করলাম । এবং দেখলাম সেখানে সব
লেখাই অভিজিৎ রায় এর । বলে রাখি, ইনিই সেই মানুষ যিনি একসময় অজ্ঞানের ও ধর্মের
পাঁকে জর্জরিত আমাকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন । তিনিই প্রথম যিনি ঈশ্বর সম্বন্ধে আমার
সামনে প্রশ্ন খাড়া করেছিলেন । তখন কোনও বিখ্যাত দার্শনিকের নাম অব্দি আমি জানতাম
না । কে ভলতেয়ার কে রাসেল কে মার্ক্স কে নিতসে কে সার্ত্র আমি জানতাম না । সেই মূঢ়তার কবল থেকে আমার প্রথম
রক্ষাকর্তা তিনি । আর তাঁকে মরতে হল এইভাবে । এখন এটা আমার মনে যে অবস্থার সৃষ্টি
করেছে তার নাম আমার জানা নেই । আমি ভাবতেও পারিনি এই অভিজিৎ রায় তিনিই ।
বছর
কয়েক আগে আমি নীরদবাবুর লেখা “আত্মঘাতী রবীন্দ্রনাথ” বইখানি পড়েছিলাম । সেই
গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি বাঙালি সমাজ ও জীবনকে সকল বাঙালির ‘ক্ষুধিত পঙ্ক’ বলে
সিদ্ধান্ত করেছিলেন । তিনি আরও বলেছিলেন যে যারা ঐ পাঁকে জন্মেছে তারাও নিজেদের ঐ
পাঁকের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করতে পারেনি । কেন বলেছিলেন আজ আমি বুঝতে পারি । আর যারা
ওই পাঁক থেকে আমাদের রক্ষা করতে পারে তারা প্রান দেন অভিজিৎ রায়ের মত, কি আশা বাকি
থাকে তখন ? আমাদের চারদিকে এখন এই সর্বগ্রাসী পাঁক ভয়াবহ আকারে বিস্তৃত হয়েছে । আমি
বুঝতে পারি যে, সেসব পাঁকে আমি ডুবে আছি । আমি বাঁচিনি । কে হাত দেবে, কে বাঁচাবে
আমায় ? প্লেটোর সক্রেটিস ছিলেন, স্যামুয়েলের
জন্য বসওয়েলের ছিলেন, কিন্তু আমার কে আছে ? আছে, নিশ্চয় আছে । যদি এই পৃথিবী পালিত
মায়ের মতোই পালিত পিতার অস্তিত্ব মেনে নেয় তবে আমার পালিত পিতা হিসেবে আমি বেছে
নেব নীরদচন্দ্র চৌধুরিকে । আমি জানি হাত তিনি বাড়াবেন কিন্তু আমি বেঁচে উঠতে পারব
কিনা সেটা আমার ক্ষমতার ওপরেই নির্ভর করবে । মরার আগে বাঁচার জন্য শেষ লড়াই আমি
করবই ।
সবশেষে এই অতল পাঁকে নিমজ্জমান সমগ্র
মানব প্রজাতির উদ্দেশ্যে বৃন্দাবন দাসের চৈতন্য ভাগবত থেকে কয়েকটা পঙতি বলব,
কেমতে এই সব জীব পাইবে উদ্ধার / বিষয় সুখেতে সব
মজিল সংসার ।।