“এ বাল্মীকির দেশে,
হা ধিক ! ফেরঙ্গবেশে –
কে তোরা বেড়াস সব উল্কিমুখী আয়া ?”
আজকালকার প্রায় অনেক নারীবাদীদের অনেক লেখাপত্তর পড়ছি আর
ওপরের কবিতাটা মনে পড়ছে । তাতে যা মনে
হচ্ছে এ কোথায় এসে পড়লাম, চৌরাশিয়ার পর এবার মশকের সানাই শুনতে হবে নাকি ! এতদিন
ধরে কোন মন্তব্য করিনি, কারণ এই নয় যে বলার কিছু ছিল না, তবে একটা কবিতা আছে না,
জানেন বোধহয়, “নীচ যদি উচ্চভাষে/ সুবুদ্ধি উড়ায়ে হাসে” – এই দশা ছিল । সে অহং আজ
টুটেছে, নিজেকে আর সুবুদ্ধিগোত্রস্থ বলে মনে করতে পারছি না । তাই তাদের, অর্থাৎ
অধুনা বাঙালি নারীবাদীদের উদ্দেশ্যে কিছু বলতে চাই । আমার কথা যে এরা শুনবেন না,
তা জানি । কাগুজে বাঘ বলে কথা, গরর গরর তো করবেই, তবু বলি ।
আমি অরণ্য ভালবাসি, ঘুরে
বেড়াই । আর সেই সুবাদে অনেক আদিবাসী লোকজনের সাথে মেশার
সুযোগ আমার
হয়েছে । আমরা একসঙ্গে বসে মহুয়া খেয়েছি আবার অনেক সমস্যা নিয়ে কথাও বলেছি । সেখানে
দেখেছি নারী আর পুরুষ বলে তেমন গোত্রান্তর নেই । অর্থাৎ বুদ্ধিজীবীদের অতিপ্রিয়
শব্দ শোষণ বলে বস্তুটির তেমন উপদ্রব নেই । আমি দেখেছি কীভাবে ওদের মধ্যে প্রেম
বিনিময় হয় । আমি দেখেছি ওদের বৈবাহিক জীবন । দেখেছি ওদের কর্মজীবন । সেখানে বরং
একথা বললে বেশি ভাল হবে যে, নারীরা পুরুষদের শাসনে রাখে । এ ব্যাপার আমার শিক্ষিত
সমাজে আমি ঐ পর্যায়ে দেখি না । তবে বাঙালি বউয়ের মুখের ঝাল কেমন হয় সে ব্যাপারে
আমি অজ্ঞ নই । আমাদের নিজের বাড়ি থেকে পাড়া-প্রতিবেশী সকলের মধ্যেই এ ব্যাপার আমরা
জানি । আর এখন খবরের কাগজ থেকে শুরু করে বিভিন্ন অফিস কাছারিতে যেখানে উচ্চপদে
আসীন নারীরা রয়েছেন সেখান থেকে সর্বাধিক হ্যারাস হবার অভিজ্ঞতা, দুই মিলিয়ে বলছি,
প্রথমত, নারীদের মনে নারীদের বিরুদ্ধে যে হিংস্র মনোভাব রয়েছে তা আমি অন্য কারো
ক্ষেত্রে দেখিনি । দ্বিতীয়ত, আমাদের সমাজে জাত বড়লোক আর ভুঁইফোঁড় বড়লোকের একটা
কন্সেপ্ট আছে , এই অফিসের উচ্চপদাসীন নারীমূর্তিরা প্রায় দ্বিতীয় গোত্রের মধ্যে
পড়েন ।
তাহলে এবার প্রশ্ন আসে যে,
বঙ্গসমাজে খাতার পাতা ছাড়া প্রচারিত নারীবাদের অস্তিত্ব ঠিক কোথায় ? অর্থাৎ, পুরুষ
যে সর্বত্র যেখানে সুযোগ আছে সেখানে নারী পেলেই ওৎ পেতে বসে আছে, পেলেই ঝাঁপাবে ,
এ এল কোত্থেকে ।
![]() |
| করবিস ইমেজেস |
বাঙালিদের মধ্যে যেভাবে
অতর্কিতে ‘চীনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যানের’ বেনোজল হু হু করে এসেছিল, বাঙালি
মধ্যে নারীবাদীরাও সেভাবেই এসেছে । অর্থাৎ, বঙ্গসমাজে সে গুঁতো এসেছিল প্রথম
ডেমোক্রিটাসের কাছ থেকে, দ্বিতীয় ব্যোঁভেয়ার কাছ থেকে – একথা তাঁরা গ্রহন করেছেন । আর এদের মধ্যে নব্যা যে নারীবাদীর নাম জনপ্রচলিত তিনি
তসলিমা নাসরিন । আমি তাঁর লেখার অসাধারণ ভক্ত না হলেও তাঁর জীবনচারণের মধ্যে যে
ব্যক্তিত্ব ও দৃঢ়তা আছে তার প্রবলতম ভক্ত । আমার মনে হয়েছে তাঁর যত না প্রতিবাদ
পুরুষতন্ত্রের প্রতি, তার চেয়ে ঢের প্রতিবাদ ইসলামী গোঁড়ামির প্রতি । তিনি একজন
ডাক্তার এবং লেখিকা । অর্থাৎ তাঁর গুণ বহুমুখী । কিন্তু তিনি ইসলামী গোঁড়ামির
বিরুদ্ধে লড়তে নেমে পুরুষকে মাধ্যম করেছেন এবং তার মধ্যে দিয়ে নারীবাদকে সর্বমুখীন
করে তুলেছেন । তিনি অন্য মাধ্যমেও এসব সন্ত্রাসের প্রতিবাদ করতে পারতেন কিন্তু
দুর্ঘটনাক্রমে(accidentally) তিনি পুরুষতন্ত্রকে বেছেছেন, যাকে ডাঃ জনসন বলেছিলেন, “The true
genius is a mind of large general powers, accidentally determined to some
particular direction.” না এখনি তাঁকে genius এর
তকমা দিচ্ছি না কেননা আমি এখনও জিনিয়াস বলতে রবীন্দ্রনাথ, প্রফুল্লচন্দ্র, এম এন
রায় এদের বুঝি । তা বেশ । এ নিয়ে আমার কিছু বিতর্ক নেই । ইসলামী গোঁড়াপন্থিদের
উপদ্রবে যেমনভাবে সারা পৃথিবী অতিষ্ট, তসলিমার কলমে অন্তত একটা তীব্র প্রতিবাদ
হচ্ছে । কিন্তু, তসলিমার প্রতিবাদের জায়গাটা না বুঝে যেসব নব্যারা আজকাল নারীবাদী
হচ্ছেন তাদের একটা ব্যাপার ভেবে দেখতে বলি, তসলিমাই স্বীকার করেছেন যে লেনিন হলেন
সেই মানুষ যিনি নারীকে শোষণমুক্ত একটা সমাজের অংশীদার করেছিলেন । কেন, কীভাবে ও
কোন অর্থসামাজিক ব্যবস্থায় তা সম্ভব হয়েছিল বা হতে পারে তা কি এরা জানেন ?
লেখাপত্তর পড়ে মনে হয় জানেন না । তাই ডিস্টর্টিজমে গন্তব্যরতাদের জন্যে তসলিমার কি
একথা আরও বেশী করে প্রচার করাও দ্বায়িত্ব নয় যে, সমস্যাটা পুরুষের মধ্যে নয় সমস্যাটা
সমগ্র সমাজের সংস্কৃতিগত পশ্চাদবর্তীতায় । জনসাধারণের জন্য একটা উদাহরণ দিই, আমরা
তো একথা বিনা তর্কে স্বীকার করি (অতিনব্য বাঙালি তার্কিক ও নৈয়ায়িকদের কাছে আমি
ক্ষীন ও অপারগ) যে, পতিতা বলে যে সমাজ আমাদের মধ্যে রয়েছে তা সবথেকে শোষিত ও
নিপীড়িত নারীশ্রেণি । তা ধরি যে এদেশের যত নারীবাদী আছেন তাঁরা ববকার্ট চুল কেটে, বিয়ের পর স্বামীর সারনেম ছেঁটে ও উগ্র
সাজে সময় ব্যয় করার পরে যে সময় পেলেন তাতে একসাথে নেমে পড়লেন এদের এই বৃত্তি থেকে
অররাত পুরুষতন্ত্রের লালসার ষড়যন্ত্রের শিকার নারীসমাজকে উদ্ধার করে, সমাজের মূলস্রোত
নামে যে ধারণা আছে তাতে ফিরিয়ে আনার প্রবল প্রচেষ্টায় । এতে না হয় লম্বা চুল রাখা,
বিচিত্র দাড়িবাজ আর কোটি কোটি কবিতালেখক ও কবিপত্রের সম্পাদক পুরুষেরাও নানা
সাতমহলা থেকে বেরিয়ে তাদের মা-মাসি-কাকি ও জ্যাঠিদের কথা না শুনে বাস্তবের এই
ডোবাখানাতে যোগ দিল । তাতে প্রথম যে শত্রুর মুখোমুখি আমরা হব তা হল, দেহব্যবসায়
থাকা নানা দালাল গুন্ডাদের এবং নারীপাচারচক্রী ক্রিমিনালদের, যাদের হাত আইনের
হাতের থেকেও দূরে বিস্তৃত । আর বাদবাকি যা বাঁশ থাকল তা কোনও সরকারই দিতে কসুর
করবে না । ইদানীং, মোদীজির সরকার পর্ণো দেখা নিষিদ্ধ করার প্রতি আগ্রহ দেখালেও
পতিতা উদ্ধারে আপাতত মনোনিবেশ করার সময় পাননি । হয়ত সম্প্রতি বার্লিন সংস্থার
দেওয়া দুর্নীতিগ্রস্থ দেশের যে তালিকা আছে তার শীর্ষে যারা সেই দেশভ্রমনে বেরবেন । অন্তত প্রবণতা তো তাই দেখাচ্ছে, ভাইয়ো অউর বেহেনো পুরা ভারত কো সাফা কর দো । সুতরাং, যে
ধাক্কা আমরা খাব পতিতা উদ্ধারে নেমে তা থেকে বোঝা যাচ্ছে যে সমস্যাটা পুরুষে নয়
সমস্যাটা সমাজ ব্যবস্থায় । কি উদ্দেশ্যে প্রগতিশীল মনোবৃত্তিকে প্রচার করা হচ্ছে
না, বরং টিভি সিরিয়াল তথা যে কোন মাধ্যমে প্রাচীন গোঁড়াবাদকেই বেশি করে জিইয়ে রাখা
হচ্ছে সেটা কি ভুলে গেলে হবে । বুঝতে হবে, এই সমাজে প্রত্যেকে শোষিত এবং শোষণ করার
মানসিকতাকেই নৈতিকতা বলে মেনে মানসিকভাবে সংগঠিত । ফলে ক্ষমতাবান নারী, নারী ও
পুরুষকে শোষণ করছে, ক্ষমতাহীন হলে নির্বিশেষে শোষিত হচ্ছে । আর পুরুষের ক্ষেত্রেও
তাই । আমি উত্তরপ্রদেশের ক্ষেত্রে দেখেছি যে, সেখানে ছেলের ডিগ্রির ওপর ভিত্তি করে
কন্যাপণের পরিমাণ ঠিক হয়, আবার কয়েক কিলোমিটারের মধ্যের দিল্লি শহরে দেখেছি যে
মেয়েরা যা ক্ষমতা রাখে তা যে কোন পুরুষকেই যখন তখন ফাঁসানোর পক্ষে যথেষ্ট । আবার
এই দিল্লিতেই তো দামিনীর ঘটনাও ঘটেছে । গ্যাংটকের মেয়েদের যে সব অধিকার আছে তা
ভাবলে মনে হয় কেন সেখানে নারী হয়ে জন্মালাম না । আর নব্যা নারীবাদীরা যে সব যে যে
অভিযোগ তুলছেন তার ভিত্তি খুব দূর্বল । তাঁদের বলি যে এদেশের দলিতরাও উচ্চশ্রেণীর
নারী ও পুরুষ উভয় কর্তৃক একইভাবে শোষিত হয়েছেন । তাই ব্যাপারটা পুরুষ – নারীর নয়,
ব্যপারটা ক্ষমতাবান ও ক্ষমতাহীনের । আর এর জন্য সমাজের সংস্কৃতিগত অবস্থানটাই দায়ি
যা আবার মূলগতভাবে অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল । পুরুষ ও নারীর অনুপাত এদেশে ১ এর
বেশি তাই একটা দিক চোখে বেশি করে পড়ছে, অন্যদিকটা নয় । তার ওপর ভিত্তি করে
স্বাধীনতা পরবর্তী কনসেপ্ট নারীবাদীরা কি সত্যিই প্রয়োজনীয় কাজের কাজ কিছু করছেন ?
এখানে তাঁদের নারী নারী বলে চেঁচানোর কোনও প্রাসঙ্গিকতা পাওয়া যাচ্ছে কি ? তাই যদি
কলম ধরতেই হয় তবে সমাজব্যবস্থাটার বিরুদ্ধে ধরুন । সে ক্ষমতা আপনাদের আছে । তারও
আগে নিজের ঘরের মেয়েদের আগে মানুষ করে তুলুন, তারপর পরের ছেলেকে অভিযুক্ত করবেন ।
এই মেয়েদের চরিত্রবলে প্রথমে বলীয়ান করুন, শিক্ষায় অগ্রগামী করুন, ব্যক্তিত্বে
মহীয়সী করুন – দেখবেন বাধাটা পুরুষের থেকে নয় নারীপুরুষ নির্বিশেষে সমগ্র সমাজ
থেকে পাবেন । আর মনে রাখবেন পুরুষই কিন্তু নারীকে সুন্দর করেছে, আবার সেই তুলে
দিয়েছে অস্ত্র, ভবানী পাঠকই তো প্রফুল্লকে দেবী বানিয়েছিলেন, মনে নেই । ভেনাস, মোনালিসা, বনলতা, নীরা, সরোজিনী, কল্পনা
এরা কাদের সৃষ্টি ? নারীরা চিরকাল পুরুষের হাত ধরেই উঠেছেন । আচ্ছা কোন
পুরুষচরিত্রকে বিখ্যাত করেছেন কোন নারী, বলতে পারেন কি ? আর যদি না পারেন তবে
সমাজসেবী মানবতাবাদী নারীবাদী এসব তকমা সেঁটে যে কাজ করছেন তা কি নিবীর্যের
নিষ্কাম হয়ে বীর্যবানদের প্রতি ক্ষোভের মত শোনাচ্ছে না !
যা হোক, আর ও কচকচির মধ্যে না
গিয়ে আমি এখন সামান্যতম কথায় প্রথমে যখন এদেশে ওলস্টোনক্রাফটের ঢেউ এসে পৌছয় নি সে
সময়ের আমাদের সমাজ জীবনে নারীদের অবস্থানের পরিচয় দিয়ে শেষ করব ।
আমরা জানি যে, সমাজ যে রকম হয়
তার সাহিত্যও সেরকম হয় । তাই প্রাচীন সমাজ থেকে প্রথম উদাহরন হিসেবে আনব
ভারতচন্দ্রকে যিনি শিব ও পার্বতির দাম্পত্য জীবনের মধ্যে তৎকালীন নারীপুরুষের
সমাজজীবনের পরিচয় দিয়েছেন । এখানে শিব ও পার্বতির বিয়ে হয়ে গেছে । পার্বতি শিবের
দৈন্য দশাতে আর মানিয়ে নিতে পারছেন না অথচ শিব উদাসীন এবং নিজের দৈন্যের জন্য
পার্বতীকেই দোষ দিচ্ছেন, তখন পার্বতী (নারীচরিত্র) বলছেন,
‘গিয়াছিলে বুড়াটি যখন বর হয়ে ।
গিয়াছিলে মোর তরে কত ধন লয়ে ।।
বুড়া গরু লড়া দাঁত ভাঙ্গা গাছ গাড়ু ।
ঝুলি কাঁথা বাঘছাল সাপ সিদ্ধি লাড়ু ।।’
হিন্দু বউয়ের তিরস্কার যে মনুমতে ঘোর পাপ সে কথা তো তিনি
জানতেন এবং তবুও ভারতচন্দ্র পুরুষ শিবের কাছে নারী পার্বতী কে ক্ষমা তো চাওয়ালেনই
না বরং বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন,
‘কহে সখী জায়া শুন গো অভয়া
একি কর ঠাকুরালি
ক্রোধে ভর করি যাবে
বাপ-ঘর
খেয়াতি হবে কাঙ্গালি’
ভারতচন্দ্র নারিচরিত্রের এ কিসের পরিচয় দিলেন আমাদের
নারীবাদীরা কি বলতে পারেন ? এবার আসি পরেরটায় । শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে রাধার গালি দেবার
কথা কি এই সব ইউরামেরিকান বাঙালি নারীবাদীরা ভুলে গেলেন । বেশ মনে করিয়ে দিই
পুরুষের প্রতি নারীর প্রেম নিবেদন বিষয়ক কয়েক ছত্র তুলে, সন্দেহ হয় আজকের বাঙালিনী
জিনস পড়ুয়ারাও এ ক্ষমতা রাখেন কিনা,
বকুল গাছের তলায় একটা রূপবান যুবককে দেখে যুবতীরা
বলছে,
“চলিতে না পারে দেখাইয়া
ঠারে
এ বলে উহারে দেখলো সই
মদন জ্বালায় মরম
গলায়
বকুল তলায় বসিয়া ঐ”
তা মনের ইচ্ছা কি ? বলছে,
“আহা মরে যাই লইয়া
বালাই
কুলে দিয়ে ছাই ভজি ইহারে
যোগিনী হইয়া ইহারে
লইয়া
যাই পলাইয়া সাগর পারে”
পারবেন আজকের কোনও মেয়ে এভাবে আদমটিজিং করতে । এর চেয়ে
সৌন্দর্যমাখা দৃশ্যের পরিচয় আর কোথাও আছে নাকি, মনে রাখবেন এর জের রবিবাবু অব্দি
কাটাতে পারেন নি । এ তো গেল আমাদের দেশে নারীচরিত্রের আদিরূপ । এবার খুব সংক্ষেপে
বলব । আসব রেনেসাঁর পরের কথায় অর্থাৎ, বঙ্কিমচন্দ্রের নভেলে । বাংলা সাহিত্যের
প্রথম উপন্যাস ‘দুর্গেশনন্দিনী’ তে আয়েষা চরিত্র, ‘কপালকুন্ডলা’তে কপালকুন্ডলার ও
লুৎফউন্নিসা, ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ এ ভ্রমর ও রোহিনী, ‘দেবী চৌধুরানি’ তে প্রফুল্ল
এসব চরিত্র যেভাবে নারীর মর্যাদাকে উচ্চাসনে বসিয়েছে আজকে আমরা সেসব ভুলি কি করে
। আমি আজ অব্দি ভ্রমরের মত নারীচরিত্রের
রূপায়ন বাংলা সাহিত্যে পড়িনি । এবার বলি রবিবাবুর কথা । বলব কি ? না থাক এ
ব্যাপারটা আমি না হয় বাদই দিলাম । এ অনেক বলতে হবে, রবিবাবুকে নিয়ে দায়সারা কাজ
করব না । শরৎচন্দ্রের “শ্রীকান্ত” মনে
পড়ে, রাজলক্ষী কেন অমর, “শেষ প্রশ্ন” এর কমলকে মনে পড়ে । সে চরিত্র কি
পুরুষতন্ত্রের । বিভূতিবাবুর অতসী, কুসুম এরা কারা ? জীবনানন্দের বনলতা সেন,
কোত্থেকে আসে ? আরও উদাহরণ দিতে পারি, ব্যাখ্যা করতে পারি যেখান থেকে আমাদের দেশের
স্বাধীনতার আগের সামাজিক অবস্থানে নারীর স্থান ধরা পড়ে । কিন্তু থামলাম । এদের ভুলে যাবেন না নব্যারা । এই আমাদের
বঙ্গসমাজ । এরজন্য বিদেশি নকল জিনিস আমদানির দরকার নেই । এখান থেকেও যদি কিছু না
বোঝেন তবে বলি, হিজড়েদের একটা কথা আছে জানেন তো, কাপড় তুলে দেখাব *** । আমি বলি
বাধ্য করবেন না, কাপড় খুলে নিতেও পারি ।
অর্থাৎ, আমাদের দেশে ১৯৪৭ অব্দি নারীপুরুষের মধ্যে অম্লমধুর
উভয় সম্পর্কই ছিল । সেসময় যে নারীদের
প্রতি যে নিষ্ঠুর আচরণ ছিল না তা নয় তবে তা দলিত সম্প্রদায়ের সঙ্গে তুলনীয়,
পুরুষতন্ত্রের সঙ্গে নয় । আর সে সময় রামমোহন-বিদ্যাসাগর তো লড়েছিলেন ছিলেন নারীদের
সঙ্গে হওয়া অন্যায়ের প্রতিবিধান করতেন । মনে করে দেখুন কজন নারী সেসময় তাঁদের পাশে ছিল । বিধবার বে
দেওয়া বিদ্যেসাগরের মৃত্যু পূর্ববর্তী জীবনের ইতিহাস পড়লে আজও আমি কাঁদি আর ভাবি
কাদের জন্য তিনি খামোকা এসব করলেন । সে লড়াইয়ের দলিল আকারে কম নয় হে । সে লড়াই দেশের প্রয়োজনে দেশীয়ভাবে হয়েছিল । প্রশ্ন করি, এরা
না থাকলে আজকের নব্যারা কোথায় থাকতেন ? এরা কি ভুলে গেলেন সরলা দেবীর কথা,
সরোজিনীর কথা, কল্পনা দত্তের কথা ? এঁদের সকলকে কিন্তু লড়তে হয়েছিল সমাজের বিরুদ্ধেই
যেখানে নারীপুরুষ উভয়েই ছিলেন বাঁশের শূল হাতে ধরে, পান থেকে চুন খসলেই ঢুকে যাবে । আর ৪৭’এর পরে পূর্বসূরির সেই ধারা ভুলে আজকের নারীবাদীরা কার
বিরুদ্ধে লড়ছে, পুরুষের বিরুদ্ধে । ছিঃ ! ভাবলেও লজ্জা লাগে আমাদের মেয়েদের কি
অধঃপতন হল । তবে যদি তারা আসল সমস্যা না বুঝে এই ভাবই মনস্থ করেন তবে জানাই, তাদের
হাতের ঘাসের শূল, তা পুরুষের ** ঢুকবে না, কিছুতেই কিছুর পরিবর্তন তাতে হবে
না, তা লাল কালি নীল কালি যাতেই ডোবাও না
কেন ।

No comments:
Post a Comment
I am waiting for your valuable comment. Please comment. Thank you..