Monday, 23 June 2014

তোমাকে নিয়ে কৌতূহল বাড়তে বাড়তে শহীদ মিনার



সুনন্দা রহমান এই ছিল তোমার নাম যদিও তখনও তোমার বিয়ে হয়নি । আমি যেদিন বাড়ি থেকে পালিয়েছিলাম আর আমার বন্ধুরা আমারই ফোনের সমস্ত পয়সা শেষ করে আমাকে খুঁজেছিল সেদিন আমি খুঁজে পেয়েছিলাম তোমাকে । একটা ভিড় বাসে গায়ে ঘামের বাজে গন্ধ নিয়ে তুমি দাঁড়িয়েছিলে আমার গা ঘেঁষাঘেঁষি করে । আমি তখন স্রেফ ভেবেছিলাম তোমার হাতের স্পর্শ নয় বুকের স্পর্শের কথা । শহীদমিনারের রহস্য কাটাতেই হবে এমন একটা জেদ চেপে গেছিল । ভিড় বাসে তোমার ময়লা চুড়িদার রুক্ষ মাথা শরীরের খারাপ গন্ধ আর হাতে থাকা ছেঁড়া থলি অথচ ফর্সা রঙ নিখুঁত তুলির চোখ !!

পিছুটান আমার ছিল না তাই পিছু নিতে অসুবিধাও নেই । বাস থেকে আচমকা নেমে তুমি যেখানে আমায় নামালে সেখানে হা হা করা অন্ধকার । অথচ তোমাকে ছাড়া কোনও অন্ধকার আমি দেখতে পাইনি । অদ্ভুত সে রাস্তা । গ্রামের রাস্তা বললে ঠিক বলা হয় না আর শহরের তো নয়ই । একটা বিশাল বটগাছের পাশ দিয়ে তুমি পিছনে না ফিরেই চলে যাচ্ছিলে আর আমি তোমার পিছু পিছু । পাশ দিয়ে শ্মশানযাত্রীর দল খই ছুঁড়তে ছুঁড়তে ফিসফিস করে কথা বলতে বলতে একহাঁটু কাদা নিয়ে আমাকে চারপাশ থেকে অতিক্রম করে যাচ্ছিল । কাজল মাখা চোখ নিয়ে মড়াগুলো একবার বাঁ কনুইয়ের ওপর ভর দিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে নিল আমাকে । একটা লন্ঠন হাতে নিয়ে একজন বয়স্ক মহিলা আমাকে বলল , দাদুভাই নীলকণ্ঠ পাখি এখন আর খুঁজলেও পাওয়া যায় না ।  অথচ আমি তখন ভাবছিলাম এবার থেকে ব্যায়াম করব , বিশেষ করে তোমার সামনে খালি গা হয়ে । মনে আছে সুদেব আমায় বলেছিল , ভিখিরির আবার ভিক্ষেতে লজ্জা কিসের ? 

তারপর হঠাৎ দেখি দুপাশে দোকান নেই মানুষ নেই কিন্তু একটা সুর আছে একটা নেশা আছে । আচ্ছা বলতে পারবে সে কোথাকার সুর কোথাকার নেশা ? তোমার বুকের না আমার বুকের ? তারপর আমি যখন উত্তর খুঁজতে গেছি অন্ধকারে মড়ার দলের পিছু পিছু ততক্ষনে তুমি ভ্যানিস !

আমি চিৎকার করেছি ... চিৎকার ! চারপাশে তখন গ্রামে আসা অমিতাভ বচ্চন দেখা ভিড় । সময় লেগেছিল ১৮ সেকেন্ড । আমি চোখ বুজেছিলাম আর খুলেছিলাম । বাসের কন্ডাক্টর আমাকে নাড়িয়ে দিয়ে বলে গেল বসে পড়ুন ফাঁকা হচ্ছে । 
ফাঁকা হয়ে গেল । 

সুনন্দা রহমান এই দিয়েছিলাম তোমার নাম । তখনও তোমার বিয়ে হয়নি । অথচ দেখো আজও তোমাকে নিয়ে কৌতূহল ভিড় বাসে আমার শরীরে শহীদমিনার বানিয়ে দিয়ে যায় ।

Saturday, 21 June 2014

পরাগনামা একটি অনুভূতির কথা ...... ২০ শে জুন



বর্ষা চলে এল । আমার শহর এখনও শহর হয়ে ওঠেনি – এটা মফস্বল । সাইকেল আমার খুব প্রিয় - এখানে যাতায়াতের জন্য সাইকেল যথেষ্ট । তবুও বেড়ে চলা সভ্যতার সঙ্গে তাল মেলাতে এখানকার মানুষ মোটর সাইকেল কিংবা চারচাকার হাত ধরছে , তবুও এখনও সাইকেল প্রত্যেক বাড়িতে রয়েছে । আমাদের ঘুম মোবাইলের এলার্ম টোনে ভাঙে একথা মিথ্যে নয় তবুও ঘুম ভাঙতেই সেই কলকাত্তাইয়া ব্যস্ততা এখানে নেই । সারাদিন রিমঝিম বৃষ্টি দেখার সময় আমাদের আছে । এখানে গোলাপবাগ নামে একটা জায়গা আছে , বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐএলাকার মধ্যে দিয়ে বৃষ্টির সময় দুধারে বিশাল গাছের সারির মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে যখন পাতাঝরা জল কাঁধে ঠোঁটে এসে স্পর্শ দেয় তখন ভেতরের বয়ে বেড়ানো একাকীত্ব আর থাকে না । তখন আমরা যেন একই অস্তিত্ব হয়ে উঠি । এ আমার অনুভূতি । 

আজ এই সারাদিনব্যাপি বৃষ্টিদিনে কতবার যে “এখানে বৃষ্টি পড়ে বারোমাস ” উচ্চারন করেছি ইয়ত্তা নেই । সবেমাত্র আরেকবার উচ্চারন শেষ করব হুশ করে লোডশেডিং হয়ে গেল । কিন্তু হঠা একথা বলে কি থেমে যাওয়া যায় নাকি ? না যায় না । আমরা এখনও কলকাতা হয়ে উঠিনি , তাই এখনও হেরিকেনের হলদে আলোয় আর কেরোসিনের গন্ধে বসে আমরা উচ্চারন শুরু করতে পারি । হয়তো এ কোনও কাজের কথা নয় কিন্তু তবুও যারা এই গন্ধ পায়নি তাদের জন্য করুনা হয় । 

আজ সকাল থেকে পরীক্ষা শেষের ছুটি কাটাচ্ছি । যদিও পরীক্ষা সামনেই । বিকেলে ভরা বৃষ্টিতে চুবুচুবু হয়ে ভিজে গিয়েছিলাম রবীন্দ্রভবনে – নাটক দেখতে । যাবার পথে সারা রাস্তা আমার কাছে প্রানবন্ত সুবাসের মত ঠেকেছিল । আচ্ছা বসন্তের কোকিলের কথা তো আমরা সব্বাই জানি কিন্তু বর্ষার কোকিল ! হয় হয় সব হয় যখন প্রকৃতি তার সব রূপ উজার করে হাজির হয় তখন সবুজালি বৃক্ষরাজির মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে ভেজা কোকিলও এসে গান শোনায় । এ এমন এক হৃদয়ভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ যেখানে কোনও কৃত্রিমতা নেই ।
সারাদিন ধরে ছবি আঁকতে খুব ইচ্ছে হয়েছে , ভেবেছি ধূলো পড়া তুলি আর রঙ বের করে বসি চাটাইয়ের ওপর কিন্তু না , তা হয়ে ওঠেনি । খালি মনে হয়েছে মনের মধ্যে যে অপার আনন্দ আজ বাসা বেঁধেছে কি করে কোন রঙে তাকে ধরব । ইস যদি আমি শিল্পী হতাম তাহলে আজ জমিয়ে একখান আঁকা যেত । 

আমার এই বৃষ্টি ভেজা গাছেদের সারির মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে খুব মনে হয় যেন শান্তিনিকেতনে এসেছি । দারুন লাগে যখন আমার মনের মাধুরীতে চারিদিকটা বদলাতে বদলাতে ধীরে ধীরে শান্তিনিকেতন হয়ে ওঠে । সত্যি বলছি দারুন লাগে । শান্তিনিকেতন কি আমাদের কাছে ? রবীন্দ্রনাথ নাকি অন্যকিছু ! আমার কাছে শান্তিনিকেতন একটা কনসেপ্ট । সেটা যেখানে খুশি তৈরী করে নেওয়া যায় । তাই সে যখন অকপট চঞ্চল হয়ে ওঠে তখন এক অনুভূতি দৌড়ে বেড়ায় চারপাশে ঠিক যেমন তানপুরায় কেউ একটা তার টেনে মোক্ষম সুরে ছেড়ে দেবার পর ধ্বনির রেশ বহুক্ষন আমাদের মুগ্ধ করে রাখে , সেরকম । দিন যত যাচ্ছে আবেগ কমছে একটু একটু করে । বুঝতে পারছি যন্ত্রসভ্যতার শিকার হচ্ছি কিন্তু যতদিন না প্রতিষেধকের সন্ধান মিলছে ততদিন ঠেকানো যাবে না – প্রবেশ করতেই হবে । 

ইদানীং আমরা সকলে চাইছি এটা শহর হয়ে উঠুক , সুযোগ সুবিধে বাড়ুক কিন্তু শহর হয়ে ওঠার মানে কি ? কলকাতা ? ছিঃ ! আমি ঘৃণা করি ও শহর কে । বিষ যেন একটা । সব মানুষগুলোকে যন্ত্র করে ফেলছে । জঞ্জাল ছাড়া ওটা কিছুই নয় আর । এরচেয়ে এখানে বেশ আছি । নাই বা থাকল সুযোগ নাই বা থাকল সুবিধে কিন্তু সারাদিনের হৈ হৈ আর শব্দদানবের চিকার তো নেই , আছে তীব্র শান্তি । কলকাতার মানুষরা তোমরা এখানে এস না , ভিড় জমানোর জন্য অন্য জায়গা আছে সেখানে যান । এখানকার মানুষগুলো নাহয় আর কিছুদিন গাঁইয়া মানুষ হয়েই রইল । ক্ষতি কি ? ক্ষতি তো নেই । লাভের হিসেব করতে গিয়ে যদি ক্ষতির হিসেব করতে ভুলে যাই তবে তো সেই বড় ক্ষতি । তারচেয়ে অল্পের সুখে মত্ত থেকে যে সুখ তা নিয়েই থাকা যাক । 

তবে হ্যাঁ আজ একটা ব্যাপারে মন খারাপ হয়েছে একথাও মিথ্যে নয় । কৃষ্ণসায়রে প্রেমিক-প্রেমিকা যুগলের হাতেগোনা সংখ্যা দেখে । ভরা গ্রীষ্মে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফেরার পথে দেখছি উঁকি মেরে ঐ ঘেমো অস্বস্তিতেও এরা প্রেম করেছে কিন্তু আজ এই বাদল দিনে গহন বিকেলে কেউ  ভিজল না , ঠোঁটের কোন ভেজাল না – বুকের স্পর্শ নিল না ... ধ্যুর । এই আবছায়া আবেশে প্রেম করার স্বস্তি ফুটবল বিশ্বকাপের চেয়েও বেশী ।

এসময় একটা কবিতা লিখে ফেললে দারুন হতে পারত কিন্তু আমি তো কবিও নই যে ও কম্মটি করে ফেলব বল্লেই করে ফেললাম , সত্যি বলছি মেঘহরিনীদের আমি দেখতে পাইনা , আমি কেবল ভিজতে পারি আর ভিজে জুবুজুবু হয়ে আবার ভিজতে পারি । 

হেরিকেন এখনও জ্বলছে হলুদ আলোয় । বাইরে বৃষ্টির শব্দ । কেউ যেন কাশতে কাশতে পেরিয়ে গেল গলি । এখন নির্জন – চুপ । এই নীরবতা এই নিবিড়তা এখন আমার শরীরে প্রবেশ করেছে । এত সুখ যে কতকাল পাইনি ! আ হা ...

শুধু আজকে তুমি নেই বলে দুঃখ করতেও যে ইচ্ছে করছে না । তবে থাকলে বুঝতে ভালবাসা আর বৃষ্টি দুয়ের মধ্যে কি উষ্ণতা আছে ।