Sunday, 26 April 2020

শিরোনামহীন প্রলাপগুলো, লকডাউনে বাঙালি পোতিভার ওভারডোজ ও তা না না না


১১

কাঁহাতক বল দেখি, কাঁহাতক ! এরপর তো বাঁচাও রগুবীর কিংবা নিরুপায়, দেকচেন কান্ডিটা, ওটা নিরূপা রয় হবে, উফঃ, হ্যাঁ তা যা বলছিলুম, এরপর তো বাঁচাও রগুবীর কিংবা নিরূপা রয়ের মত আলুথালু বসনে ঠাউর দালানে কোমাগত মাথা কুটতে হবে, চাদ্দিক ঝড়-বাদলায় ভেসে যাবে, অনর্গল ঘন্টা বাজবে মন্দির কাঁপিয়ে, তবেই বোধয় একখান উপায় হবে এই করোনা নামক নতুন পেরেম চোপারিয়ার । ‘অমিতাচ্চন’ উঠবেন, কপালে রক্তের পলেস্তারা খসবে একটুকুন, ঢুলুঢুলু চোখ, কম্পিত অধর থেকে বেরিয়ে আসবে দুর্নিবার গজ্জন, তারপরে কয়েকটা ঢিসুম, কয়েকটা ঢাসুম, করোনার মাসুম টাক ফেটে তরমুজ, তবেই মুক্তি । নয়তো কি ! এভাবে চলে । বলি কদ্দিন, অ্যাঁ, কদ্দিন এরকম এপাশ উল্টে – ওপাশ উল্টে – উবু হয়ে – জাঙের মশা মেরে - থুতনিতে ভাবালু তিলের রংবদল খেলা দেখে - পেছন চুলকে, বলি আর কদ্দিন চলবে । কে, কে বটে ? পাশ থেকে কে হাসল যেন, বলি কে তুই ? আহা! বঙ্গালি ল্যাদ হায় ! মানতা হ্যায়, সহি হ্যায় । লেকিন ইতনা তো নাহি সয়তা বাপু ।

এরপর তো গুগলের সার্ভার বসে যাবে, ও বড়দা । আমার-আপনার নয় স্বয়ং পিচাইদার চাকরি নিয়ে টানাটানি, তকন । আবার জ্ঞানের দ্রোপদীয় বস্ত্রহরণ করে, আরে না রে ভাই, ইকোনমিক ডিপ্রেসন নয়, এ যে ফাটা কলসী ফুটো হাঁড়ি, রাগ করে বউ বাপের বাড়ি - বাঙালি পোতিভার ওভারডোজে গুগুলাকাশে কালোমেঘের পাহাড়, তারে তারে টানাটানি-ঘষাঘষি-কানাকানি-ফাঁসাফাঁসি-কবতে-লেখালেখি-আঁকাছবি-গান-রান্নাবান্না-তেলচিটে কড়ার পেছন ধুতে ধুতে কাহিল কপালঘামের সুনামি- উফ এক নিঃশেষে বলে যাওয়া চাট্টিখানি কথা-  সব গিয়ে আছাড় দেবে যে দাদা, সেইটে কি ভেবে দেকা হয়েচে !  নাকি কেবল পাশের বাড়ির ছাদে কাপড় মেলা আর শুকনো কাপড়ের আড়ালে ভিজিয়ে ফেলা নুলো চকচক আর মসমস, দ্রুত নাড়ি, আর সর্বশেষ অধ্যায়ে বাথরুমে আহ ওহ আহা । ব্যাস । তারপর ইয়া গচ্ছ গুহা গচ্ছ উহা পাচ্ছ কী হারাচ্ছ, সেইটেও যেন দেকে রাখা হয় মশাই !

ছবিঃ ইন্টারনেট থেকে ctrl c + ctrl v


একমাস হয়েছে কি হয়নি তোমরা কিনা টাচস্কিনে ফোঁসকা ফেলে দিলে । ব্যাটাকে টিপেটাপে ব্যাটার মান ইজ্জতের সাড়ে বত্রিশভাজা  । ওই যে কি নাম যেন, হ্যাঁ মার্কামারা জুকারবাগ, ওই ছোড়াকে পাকড়াও । আমগাছে আম নেই জামগাছে জাম- ওই বেটা বলে কিনা জিওর কি এমন দাম ! নাহ, তবে বলে লাভ নেই । ভয়েস চেঞ্জ হয়ে গেলে তখন আরেক বিপদ । ন্যারেশনের লোক পাওয়া যাবে না । এই বাজারে যদি হাত পাও ভাঙে, তবুও মাল্টি অর্গ্যান ফেলিওর লিখে টাঁসিয়ে দেবে । ব্যাটাগুলো যা খচে আছে না, কি আর বলব । তাও বলি । জেনেছি ফাঁকফোকরে । আরেহ! বাপ মা জানত না, পতিবেশি খচ্চর কীকরে জানবে, পেটে পেটে অ্যাতদ্দুর । যে কিনা ঢেঁড়স চিনত না সে বানাচ্চে তন্দুর ঢেঁড়স । যে কিনা স্কুলে মুকুন্দ মাস্টার শান্তিনিকেতনি চলন বলনে বাংলা পড়াত বলে তার নামে ছড়া কাটত তালতোবড়া বেগুনপোড়া, হাড় হাভাতে ঘাটের মড়া- সেও কিনা ইয়া ঢাউস ঢাউস কবিতা লিকচে- লাইকের বন্যা বইয়ে দিচ্চে । যে কিনা গান বলতে বোঝে অজ্ঞান, সেও গেয়ে দিলে রবীন্দোসঙ্গীত । এসব কি হত, লকডাউন না হলে । এই অ্যা-অ্যা অ্যাত্তো সিজনিশক্তির বাহারি পোকাশজ্যোতির আহারি শোভা । লকডাউনে আমাদের প্রাপ্তি শুধুই পোতিভার ঢল, করে টলো-মল, ওই দেখো আমাশা নয়, অন্যটা অন্যটা।

আমি শুদু ভাবচি, যে ব্যাটাগুলো কিস্যু পারে না । ওগুলো কী করছে ? না, ওদের জন্য হতাশা, ইনফিরিওরিটি কম্পপ্লেক্স নয়- ওদের জন্য আছে সেরা কাজ- নেটফ্লিক্স-অ্যামাজনের ঝিঙ্কু । মনের সুখে সিগারেট ফোঁকে – হাতের ছাল ওঠায়, বাকি সময় বাকিদের পোতিভা দেখে ট্যারটেরিয়ে হাসে- মন খুলে খিস্তায় । মন দেয় ডিজিটাল পর্দায় । আর প্রার্থনা করে, ইতনা সুখ সহে জায়ে বাস, ইতনি সি হ্যায় আরজু, লকডাউন থেকে যাক এ জীবন খাস, সাব্বাস সাব্বাস !  

(হঠাৎ মেঘগর্জন, কন্ঠস্বর...)

তা বলি তুমি এটা কী করছ ! পোতিভের শো কেসিং নয় বলচ । খালি অন্যের বিকিকিনি দেখলে চোখে ন্যাবা জাগে, জয় বাংলা । তা পাগলা, ঝ্যাঁটা বোঝ – জুতো । বেশ বেশ, বেন্দাবন দেখেছ নিশ্চয় । দেখা হবে নাকি ! দেব নাকি একটা ফুঁঃ, হিং টিং ছট... পুরো চিতায় তুলে পিতার নাম ভুলিয়ে দেব ।

অগত্যা, আর কী, হরি তুমি রেখো ...

Friday, 24 April 2020

শিরোনামহীন প্রলাপগুলো, চন্দ্রিল প্রসঙ্গে একটি জবাবদিহি, কিছুটা আত্মবীক্ষা ও কয়েকটি কৃতজ্ঞতা স্বীকার


১০


কদিন ধরেই ভাবছিলাম, ব্লগ কেন লিখি, কি দরকার ? না না অরওয়েলের  ‘Why I write’ এর মত কিছু নয় । আবার নীরদবাবুর, সিংহ যেমন শিকার না করে বাঁচে না, তেমনই যিনি লেখক তিনি না লিখলে বাঁচবেন না – এমনও কিছু নয় । আজ তাই খানিক স্মৃতিচারণের গৌড়চন্দ্রিকা, ব্যাস তারপরেই জবাবদিহি ।  

আমার মনে নেই বুদ্ধদেব বসুই একথা বলেছিলেন কিনা, ভুল হতে পারে, তবে যতদূর স্মৃতি হাতড়াতে পারি, বোধহয় তিনিই বলেছিলেন, লেখার ব্যাপারে যা খুশি লেখা যায়- অনেক সময় তা হয়তো দারুণরকমের চমৎকারও হয়- কিন্তু তাই বলেই সব চমৎকার লেখাই ছাপার যোগ্য হয় না । কোনটা ছাপার যোগ্য আর কোনটা নয়, সেটাই লেখকের মূল শিক্ষার বিষয় । এই কথাটা আমাকে খুব নাড়া দিয়েছিল । আজও এর প্রভাব আমার কাটেনি ।

২০১২ সাল থেকে মোটামুটি বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় আমি লেখালেখি শুরু করেছিলাম । তখন কত আর বয়স – উনিশ-কুড়ি । সে সময় এককমাত্রা’র তৎকালীন সম্পাদক অনিন্দ্য ভট্টাচার্য আমার একটা লেখা নিয়ে আমাকে এতবার কাটাছেঁড়া করিয়েছিলেন যে বুদ্ধদেব বসুর ওই কথাগুলোর মানে আমি টের পাই । অনিন্দ্যদার কাছে চিরঋনী । এরকমভাবে অনেকের কাছেই আমি ভীষণ ঋণী । যেমন শ্যামলকান্তি দাশ । কবিসম্মেলনের সম্পাদক । তখন আমি আমার নামের বানান লিখতাম, ‘অর্দ্ধেন্দু ব্যানার্জ্জী’ । উনি বললেন, “তুমি আধুনিক বানানবিধি কেন মানো না, নামের বানানেই তো ভুল । এগুলো শিখতে হবে তো, এও তো লেখার অঙ্গ” । কঙ্কর কাকু, কঙ্কর সিংহ । ওনার বাড়িতে গেলে উনি যে শুধু যত্ন নিয়ে রকমারি পদ খাইয়েছেন, তাইই নয়, আমার হাতে তুলে দিয়েছেন এমন কিছু বইপত্র যা আজও আমার নবিশিয়ানাকে তরতাজা রেখেছে । ‘বিবক্ষিত’র জন্য লেখা চাইতে ফোন করেছিলাম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে । সে সম্বন্ধে আমার যা পাওনা, তা একটা দশ-বারো মিনিটের ফোন কল । সেখানে একজন বিশবর্ষীয় অপরিচিত যুবককে উনি যেভাবে পুজোর পরে নিজের বাড়িতে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানালেন, তা আমাকে শিখিয়েছিল ঔদার্যের পাঠ । কিন্তু সে পুজো কাটেনি আর । অনুবাদ পত্রিকার বিতস্তাদি আর সাগরদার দৌলতে শুরু হল বিদেশী গল্প-উপন্যাসের অন্যপাঠ । আনন্দের জন্য পড়া এক ব্যাপার ছিল আর এখন অনুবাদের জন্য আরেক । কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেন ল্যঙ্গুয়েজ ডিপার্টমেন্টের তৎকালীন হেড অর্চন সরকার দিয়েছিলেন আরও কিছু অজানা রেফারেন্সের সংগ্রহ । পুষ্পল মুখোপাধ্যায় আমার কাকু । শম্ভুনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ও । এই লোকগুলোর নাম আমি কৃতজ্ঞতার তালিকায় তুললে, লোকগুলো ত্যাগ দেবে । তাই বাদ দিলাম । এরপর বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিয়ান কাঞ্চন কামিল্যার অবাধ প্রশ্রয়ে এল নীরদচন্দ্র চৌধুরীর বিপুল লেখামালা । এরপরেও লেখালেখি করব – এমন স্পৃহা ততদিনে আমার আর নেই । এত মানুষ এত কিছু লিখেছেন, এই তো যথেষ্ট । নতুন কিছু বলার তো নেই আমার । নতুন কিছু বলতে গেলে তো আরও জানতে হবে । সব পড়তে হবে আগে । বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে রাখা ১৯৩০ সাল থেকে শুরু টাইমস লিটেরারি সাপ্লিমেন্টের বিপুল সংগ্রহ আর কলকাতার ন্যাশনাল লাইব্রেরির খেই হারানো পৃথিবীতে, আমি ভেবেছিলাম আত্মহত্যা করব । এত বই, এত লেখা - চোখে দেখলাম আছে, কিন্তু মানুষের ছোট্ট জীবনকালে কেমন করে সম্ভব চেখে দেখা- এর চেয়ে মরে যাওয়া ভাল । আমার এক বন্ধু বলল, মরে যাওয়া তো সহজ, পড়ে যাওয়াই কঠিন । মরার আগে কতদিন পড়তে পারিস, সেটাই দ্যাখ । সেটাই বেঁচে থাকা । ফলে, আজও আমি পড়ছি, ব্যাস এইমাত্র । এর বেশি কিছু দাবি আমার নেই ।  

পত্রপত্রিকায় লেখা ২০১৫ সালের পরে আর কোনোদিন পাঠাইনি । কয়েকজন লোক যাদের না বলা যায় না, ভয়ংকর জোর করলে হয়তো একটা বা দুটো দিয়েছি । নিজে থেকে একটাও না । ২০১৪ থেকে বিবক্ষিততেও লিখিনি, শুধু সম্পাদকীয় ছাড়া । ব্লগের আর্কাইভ লিস্টে টাইমলাইন আছে, সেখানেও একই প্রমাণ দেখতে পাওয়া যাবে । কিন্তু সমকালীন দেশ-কাল-সময় বিষয়ে সকলের যেমন একটা প্রতিক্রিয়া (মতামত নয়) থাকে, আমারও আছে । ফলে, ২০১৩ সালে আমি যখন ব্লগ লেখা শুরু করি, তখন যে বিষয়টা আমি বিশ্বাস করতাম তা হল, চারপাশের ঘটনার প্রতিক্রিয়াগুলো আর নিজের মনের কিছু কথা, এই থাকবে ব্লগে । ইতিহাসের কালানুক্রমিক সাক্ষ্য হিসেবে । তাও, সবিস্তারে নয় । কেননা, হাজার শব্দের বেশি লিখে নিজের অযোগ্যতার আত্মঘাতী প্রমাণ রেখে দিতে আর যে কজন বন্ধু অবশিষ্ট, তাদের বিরক্তির কারণ হতে চাইনা । আর যে লেখাগুলো ছাপার যোগ্যতার বিচারে আমার নির্ধারিত স্কেলে পাশ দেবে সেগুলো পত্রিকায় পাঠাব, বাকি সব ব্লগে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে থেকে যাবে। কিছুটা স্মৃতি হিসেবেও যাতে অনেক পরে আত্মবিচার ও আত্ম অনুধাবন সম্ভব হয়, ব্যাস । আর কালি-কাগজে ছাপানো-প্রকাশিত লেখা ছাড়া আমি কোনও লেখাকেই লেখকের পরিচয় বলে ধরিনি, ধরি না । আজও তাই । তাই ব্লগের লেখাগুলো সবই একজন সাধারণ নাগরিকের প্রতিক্রিয়ামাত্র । লেখক বা লেখার বিচারে এগুলোর কোনও মূল্য নেই । ফলে মরণের পরে অমর হবার যে ভয়াবহ ফাঁদ – তাতে আমি নেই । এই হল আত্মকৈফিয়ত ।

যাই হোক অনেক হল, আর না । এবার চন্দ্রিল প্রসঙ্গে শ্রুত্যানদ ডাকুয়ার উত্থাপিত প্রশ্নের (ফেসবুকের প্রাসঙ্গিক পোস্টের কমেন্ট সেকশনে আছে, লিংক নিচে দিলাম) জবাবদিহি । ‘চন্দ্রিল’ – প্রসঙ্গে যে লেখাটা লিখেছিলাম তার অন্তিমে লিখেছিলাম, ‘এটা চন্দ্রিল সমালোচনা, চন্দ্রিল আহা কিংবা চন্দ্রিল রিভিউ নয় । চন্দ্রিলকথা বলা যেতে পারে বড়জোর ।’ ফলে, লেখাটা বক্তা চন্দ্রিল, গদ্য লেখক চন্দ্রিল, কবি চন্দ্রিল ও ইত্যবসরে পরিস্ফুট ব্যক্তি চন্দ্রিল সকলকে নিয়েই । ‘ছোট করে ছেড়ে দিলেই কি চলে’ – চলে কেননা এটাই আমার ব্লগে লেখার মূল কৈফিয়ত । বড় করে লিখতে হলে আরও গবেষণা করে, দীর্ঘ অধ্যাবসায়ের পরে লিখতে হবে, আর সে লেখা কাগজের জন্য, ব্লগের জন্য নয় । তাই তা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ামাত্র হলে হবে না ।

চন্দ্রিল একটা ইন্টারভিউতে বলেছিলেন, ‘গানগুলো তাঁরা কেবলমাত্র আনন্দের জন্যই লিখেছিলেন । তাতে সমাজকে দেওয়ার মত তাঁদের কিচ্ছু নেই । যা লিখে আনন্দ পেয়েছেন তাই লিখেছন । সমাজ যদি কিছু খুঁজে পায়, পাবে, তাতে আপত্তিও কিছু নেই।’ ফলে, গানগুলোর মধ্যে যে ‘প্রেম নিয়ে ব্যঙ্গ আর ব্যঙ্গের আড়ালে একটা করুণ-মধুর প্রত্যাশা’ আছে বলে মনে করা হচ্ছে, তা নিয়ে সন্ধিগ্ধ তদারকি করার প্রয়োজন বোধ করি না, বরং উপভোগকেই প্রধান করে নিয়েছি । যিনি নিজেই বিচারের আশা করেন না, তাঁর জন্য খামোকা পরিশ্রমের দরকার কী !

এবার আসা যাক, নীরদচন্দ্র চৌধুরীর সঙ্গে তুলনা প্রসঙ্গ । এ তুলনা প্রাথমিকভাবে আমার মনেও এসেছিল । কিন্তু, যতটুকু আমি চন্দ্রিল পড়েছি ও শুনেছি, এখনই এই তুলনা আমি করতে পারিনি । কেননা পাঠককে চমকে দেওয়া আর রকমারি রেফারেন্সের ব্যবহার – এটা কিন্তু নীরদচন্দ্র নন । সমাজকে পাটে পাটে ভেঙে ইতিহাসবীক্ষার ও ব্যাখার ব্যতিক্রমি নিদর্শন । সর্বোপরি নীরদচন্দ্র হলেন লেখক – শত দৈন্য ও দুর্দশাতেও অপরাজিত, সমঝোতাহীন, জেদি, চরম আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন ও তীব্র আক্রমণাত্মক-প্রতিক্রিয়াশীল – তা যতই শাসক-প্রশাসককে চটিয়ে দিক- এমন একজন লেখক । যাঁর অস্তিত্ব শুধুই লেখাতেই । সেই তাঁর স্বধর্ম । আত্মপ্রতিষ্ঠার জন্য, সংসার চালনোর জন্য বা অন্য কোনও কারণেই তিনি পরধর্ম নেননি । তাঁকে অবহেলা করা যায়, উপেক্ষা নয় । তিনি অনেকের অনুপ্রেরণাও । আপনার কাছ থেকে জেনেছি, আনন্দবাজারের সদা-সন্তুষ্ট লেখকগোষ্টির বাইরে নীরদচন্দ্রই এমন লোক যিনি বে-আইনি কাজের জন্য আনন্দবাজারের থেকে পাঁচ হাজার টাকা আদায় করেছিলেন । এ আর কার পক্ষে সম্ভব ?  সুতরাং, যেমনই হোক স্বধর্মেই তিনি মরেছেন ।

ছবিঃ প্রতিকি

কিন্তু, চন্দ্রিল গীতিকার, চিত্রপরিচালক, কবি, রসিক সুবক্তা, রিয়েলিটি শো-এর বিচারক ও খবরের কাগজের সুচতুর সাবধানি কলাম লেখক । তিনি যা উচ্চারণ করেন তা কেবলই খাঁচাবন্দী পাখির মালিকের প্রতি ক্ষোভের উচ্চারণের মতো । কী যে তাঁর স্বধর্ম তা জানি না । বোধহয় ধর্মের তোয়াক্কা তিনি করেন না । কারও অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠার তো নয়ই । ফলে, চাকরি চলে যাওয়া – রাষ্ট্রের ক্রোধে জর্জরিত – চতুর্পাশের লোকেজনের খোঁচায় বিদ্ধ – দেশত্যাগী – দৈন্যক্লান্ত - এমন লেখকজীবন তাঁর নয় । নাই হতে পারে । অর্থ-প্রতিপত্তি-এয়ারকন্ডিশন জীবন- তাতে দোষের কিছু নেই । বরং, বর্তমান যুগধর্মে যথার্থই নয়, শ্রেয়ও । কিন্তু আবার, সেজন্যই তিনি নীরদচন্দ্রের সঙ্গে তুলনীয় নন । ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে তুলনীয় নন । শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে তুলনীয় নন । গুলজারের সঙ্গে তুলনীয় নন । ডিলানের সঙ্গে তুলনীয় নন । লুথার কিং- এর সঙ্গে তুলনীয় নন । চন্দ্রিল শুধু চন্দ্রিলই । এসব তুলনার দায়ও তাঁর নেই, তিনি চন্দ্রিলত্বেই খুশি ।

আপনি লিখেছেন, “তাঁকে চিরে চিরে দেখালে সম-সময়ের কার্বন কনা তাঁর ধমনিকে সংক্রমণ করেনি সে কথা হয়তো জোর দিয়ে বলা যেত না... তবু ডুবতে ডুবতে একটু অক্সিজেনের জন্য হাঁসফাঁস করেছিল কেউ সে কথা চন্দ্রিলের নাড়ির লাবডুবে লেখা আছে বই কি... তাঁর সমস্ত যাপনে সেই আর্তনাদটুকুও যে আমাদের সময়ে অনেক ।” একদমই তাই । আমাদের প্রাপ্তি শুধু তাঁর সেই আর্তনাদটুকুই – সিংহনিনাদের আবরণে ।

অথ চন্দ্রিলকথাও তাইই । 

ফেসবুকের লিংক ঃ https://www.facebook.com/ardhendu.o.banerjee/posts/3858929517513553?comment_id=3863642633708908&notif_id=1587666052260677&notif_t=feed_comment&ref=notif

Wednesday, 22 April 2020

শিরোনামহীন প্রলাপগুলো, চন্দ্রিল ভট্টাচার্যের চাল- দু ছক্কা পাঁচ ও কয়েকটি কথা



(বিঃদ্রঃ - এটা চন্দ্রিল সমালোচনা, চন্দ্রিল আহা কিংবা চন্দ্রিল রিভিউ নয় । চন্দ্রিলকথা বলা যেতে পারে বড়জোর । ব্যাস)

চন্দ্রিল ভট্টাচার্য মানে কিন্তু ইউটিউবের কিছু সার্চড ভিডিও নয়- এটা প্রথম কথা । চার্লি চ্যাপলিনের ‘দ্য গ্রেট ডিকটেটর’ এর অনবদ্য বক্তৃতার কথা নিশ্চয় সকলের মনে আছে । কিন্তু চন্দ্রিল সেরকমও কিছু নন । কেননা চন্দ্রিল সিনেমায় সংলাপ বলেন না । তিনি রাজনৈতিক বক্তাও নন, মঞ্চে দাঁড়িয়ে ‘বন্ধুগণ’ বলে শুরুও করেন না । আবার তিনি সন্দীপ মহেশ্বরীও নন । অথচ, এখনকার বহু বাঙালি চন্দ্রিলের উচ্চারণে, চ্যাপলিনকে পান, রাজনীতি পান, সন্দীপ মহেশ্বরীকেও পান । ব্যক্তিগত স্বীকারোক্তিতে বলি, চন্দ্রিলের মত সুবক্তা প্রায় আর কেউই নেই । অন্তত আজ । তাঁর বলার ধরণই জনমনে তাক লাগিয়ে দেয় । তিনি বলে চলেন দ্রুতলয়ে, বাঙালির প্রথাবদ্ধ মিউ-মিউ ভাবেও নয় আবার ঝগড়ার তান্ডবের মতও নয় । তিনি মাত্রাবোধেও টনটনে, আবার ছন্দোবোধেও অপরাজিত। তিনি বেছে নেন এমন কিছু শব্দ-বাক্য-রূপক-ব্যঙ্গ-শ্লেষ-প্রতিবাদ, যা সাধারণের রোজনামচায় বহুল কিন্তু ছদ্ম-চর্চিত ।

বাবার ওপরে কথা না বলা – বাঙালির সুসন্তান হবার প্রধান মাপকাঠি । অথচ, যুগে যুগে বাপের অবাধ্যগুলোই যুগ পালটে দিয়েছে । তা রামমোহন হোক, বিদ্যাসাগর কিংবা সুভাষচন্দ্র । চন্দ্রিল এরকম কিছু নন । তিনি তাহলে আধুনিক রঞ্জিত মল্লিক । রাজনৈতিক-সামাজিক অন্যায় অসততায় বিরক্ত, ভিড় বাসের ঠেলাঠেলিতে-ঘামে বিপর্যস্ত, মেজাজচড়া বাঙালি আড্ডায় – তা সাহিত্য আড্ডা হোক বা চায়ের দোকানের – পাত্তা না পাওয়া, পরাজিত কিছু মানুষ ঠিক যে কথাগুলো বলতে চায় কিন্তু নিরুপায় জ্ঞানের চর্চাহীনতায়, সীমাবদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গিতে, ব্যর্থ উপায়-শব্দ-অবকাশ অন্বেষণে । চন্দ্রিল উচ্চারণ করেন ঠিক সেইগুলি । সেই ভাবেই । এটাই তবে চন্দ্রিল তাহলে। জনগণের ভাষা । না ! তা তো নয় । তিনি তো গণমতে আস্থার বিপরীতে কথা বলেন, তিনি তো দেখিয়ে দেন জনগণের মধ্যে থাকা লুপহোলস । তাহলে ? আসলে তাঁর জবানিতে থাকে, আমিও চোর তুমিও চোর কিন্তু তুমি ধরা পড়লে আমার যে আনন্দ হয়, সেরকম আনন্দ উদযাপনের আয়োজন । তাই তিনি প্রার্থিত বক্তা । তবুও বলি, চন্দ্রিল কিন্তু ভেতরে ভেতরে জনগণের রসিক সুবক্তা নন ।

ছবি- ইন্টারনেট থেকে নিয়েছি



চন্দ্রিল কবি । অন্তর্মুখী কবি এবং নরেন্দ্রপুরীয় শিক্ষায় শিক্ষিত ও আচরণবোধের অব্যতিক্রমি দৃষ্টান্ত । আমার মনে হয়, এটাই তাঁর আসল পরিচয় । চলমান জীবনের ওপরে থাকা - হেলিকপ্টারের মত, এরোপ্লেনের মত নয় - অত্যন্ত নিবিড় ও সন্ধানি পর্যবেক্ষক । চন্দ্রিলের সাথে আমার প্রথম পরিচয় অবশ্যই গানের কথা দিয়ে । পরে, আমি চন্দ্রিলের দুটো বই কিনেছি, আজ অব্দি । এক, উগো বুগো চৌকো চুগো । দুই, দু ছক্কা পাঁচ । বাকি কিছু কিছু দেখেছি, যা দেখেছি তার মধ্যে থেকে কিছু কিছু পড়েছি । সম্পূর্ণ পড়েছি শুধু, দু ছক্কা পাঁচ । উগো বুগো চৌকো চুগো – আমি সব পড়তে পারিনি। সেক্স ক্রমে আসিতেছে ও ট্যালেন্ট দেখেছি । বক্তিমেগুলো শুনেছি । বারবার শুনেছি, রবীন্দ্রনাথ শিরোনামের ইন্টারভিউ । ফলে, এর ভিত্তিতে, না চন্দ্রিল সমালোচনা করা যায়, না চন্দ্রিল আহা বলা যায় আর চন্দ্রিল রিভিউ করার ইছে আমার নেই । 

তাহলে এটা কী ! গল্প আছে বস । আমার আদি বাড়ি বর্ধমান । কর্মসূত্রে এখন কলকাতা শহরে ফ্ল্যাট । ফলে, আমার যা বইপত্তর সবই বর্ধমানের বাড়িতে । সেসব বই আমি কোনোদিন আনতে পারব না এই শহরে । আসলে, মামার বাড়িতে আমার বেড়ে ওঠা । এখন ওই বাড়িতে শুধু দিদা-দাদু । একা । আমার দিদার কাছে আমার সারা সপ্তাহের অস্তিত্ব শুধুই আমার ঘর আর বইপত্রগুলো । ফলে কলকাতায় আমি নতুন করে বইপত্র কিনতে শুরু করি । তাই, এ সংগ্রহে এই মুহূর্তে আমার সবচেয়ে প্রিয় বইগুলোর প্রায় কিছুই নেই । সব নতুন । না পড়া । সুতরাং, কিছু না পেয়ে চন্দ্রিলের দু ছক্কা পাঁচ পড়ছিলাম । আজ শেষ হল । ফলে এটা হল, শুধুই চন্দ্রিল কথা । ব্যাস ।

দু ছক্কা পাঁচ আমি কিনেছিলাম স্রেফ উৎসর্গপত্রে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের নাম দেখে । দেখতে চেয়েছিলাম, কোন খোয়াবের দুনিয়ায় নিয়ে যান চন্দ্রিল ! পরিচয়পত্রে চন্দ্রিলের বিষয়ে যেগুলো লেখা, তা প্রথাগত জন্মসাল-হ্যানা বইয়ের ত্যানা পুরস্কার ইত্যাদির চেয়ে ঢের ভাল । কবি-লেখকের পরিচয় তাঁর কাব্যদুনিয়ার মুন্সিয়ানার বাহারি বহরে । এখানে তার ব্যতিক্রম হয়নি, বরং পালন হয়েছে । প্রবন্ধ আমি খুব বেছে পড়ি । আজেবাজে কিনা বোঝার জন্য প্রথমে র‍্যান্ডম স্যম্পেল তুলি ।  টিপেটাপে, ঘুরিয়ে-ঘারিয়ে, দলাদলি পাকিয়ে দেখে নিই । তারপর কমপ্লিট এনুমারেসন । নইলে অন্য বই । ওপরের চকচকিয়ানায় কিছু সময় পয়সা নষ্ট হয় বৈকি।

ছবি- ব্যক্তিগত খ্যাচাক


‘স্বাধীনতাহীনতা কে ছাড়িতে চায়’ – উমহু । বেঁচে গেল ২০০ টাকা । তারপর ‘কষে গাও গীত’ । ‘বিছে হত্যার সন্ধ্যে’ ।  ‘প্রেমিকা হইতে সাবধান’ । ‘ভিনঝাঁকের কই’। ’জবরখাকির দেশে’। অ্যান্ড সো অন । পড়িনি কেবল, ‘কোমরব্যাথার ইন্টারভিউ’ । কী জানি ওটা টানতে পারিনি । প্রথম পাতা ব্যাস । তা যাই হোক ।

এ এক নতুন দুনিয়া । সত্যকার আধুনিক দুনিয়ায় বাংলা গদ্যের ও কবির পৃথিবীর এক আশ্চর্য ছটা । কমলকুমার মজুমদারের ‘বঙ্গীয় শিল্পধারা’ শিরোনামে একটা প্রবন্ধ পড়েছিলাম । ওই প্রবন্ধ আমি জীবনে ভুলব না,

“হয় কী, একটি ত্রিকোন যখন কেবলই সাদা কাগজের স্থান অধিকার করিয়া থাকে, তখন উহা তাহার নিজত্বের ভিতরেই থাকে; আমরা বেশিক্ষণ উহার দিকে চাহিতে পারি না, সঠিক কালক্ষেপের সহজ বাস্তবতা উহার মধ্যে কতটুকু; ওই বাস্তবতা অত্যন্ত নির্লিপ্ত, কোনও কিছুর নামমাত্র চিহ্ন সেখানে কই, যে আলো আর তাহার সম্বন্ধের – সমস্ত জগতের নামরূপ অন্তত বহন করিয়া আনে। এবং যে কোনও নির্দিষ্ট লোকের বাস্তবতার সহিত সহজে মিলিয়া যাইতে পারে ।”

এ যেন ঠিক তাই । চন্দ্রিল অনেকদিন পরে একজন, যিনি কমলকুমারের পরে আমার পাঠবোধকে চ্যালেঞ্জ করে বাজিমাত করে দিলেন । এর আগে শঙ্খ ঘোষের কবিতাকথার গদ্যগুলো আমাকে শৃঙ্গজয়ের স্বাদ দিয়েছিল । কিন্তু চন্দ্রিল একেবারে আলাদা । কমলকুমারের পরে এরকম ভাষাশৈলী আর কল্প ও দৃশ্যলোকের শার্লকীয় বিদগ্ধরূপ আমি কারো দেখিনি । লোকে বলবেন, পড়নি তাই জানো না, অনেকে আছেন । তাদের জন্য বলি, যখন পড়ব, জানব তখন চন্দ্রিলকে না হয় কয়েকধাপ নামিয়ে দেব । কিন্তু এখনও অব্দি, চন্দ্রিল । আর এর সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ হল, চন্দ্রিল থেকে ‘কোট’ করা যায় না । চন্দ্রিল সম্পূর্ণ পড়তে হয় ।

আজ চন্দ্রিলের দু ছক্কা পাঁচের চালে সব গুটি ঘরে ফিরে গেছে তাঁর । বাড়ুজ্জ্যে গোহারা । এটা স্পষ্ট, হয়তো চন্দ্রিলকে বক্তা হিসেবে রাখলে টিআরপি বাড়ে অথবা লোক হয় । ভিডিও সাবস্ক্রাইবার কিংবা নম্বর অফ ভিউজ বাড়তে থাকে । দু ছক্কা পাঁচেও চন্দ্রিলের বক্তব্যঠাঁট অটুট । পড়লেই বোঝা যায় চন্দ্রিল বলছেন । কিন্তু আসলে চন্দ্রিল লিখছেন এখানে। সেরকমই, চন্দ্রিলের আসলে বাস কবিতায় । কবির ভাবলোকে । আর উনি যে কবি, তা কবিতা পড়েই নয়, গদ্য পড়লেও বোঝা যায় । ওগুলো আসলে কবিতা, লোকে বলে বারোয়ারি গদ্য । 



Monday, 20 April 2020

শিরোনামহীন প্রলাপগুলো, কবিদের জন্য সাতটি অমরাবতী, সাতটি তারার তিমিরও – কিছু সমালোচনা কিছু জবাব



Behold! You grasp the Science of the Pole,
Earth's wondrous Mass, how pois'd the mighty Whole,
Jove's Reckoning, the Laws, when first he made
All Things' Beginnings, by his Will obey'd,
Those the Creator as the World's Foundations laid.

১৬৮৬ সালউল্কার মত নয়, সূর্যের মতই আবির্ভাব তাঁর । নিউটন । বই “ফিলসফিয়া ন্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম্যাথামেটিকা” – পৃথিবী বদলে গেল । সেই বইয়ের মুখবন্ধে লেখা ওপরের কবিতাটি । এডমুন্ড হ্যালির লেখা । মূল যদিও লাতিন ভাষায়, আমাদের জন্য আছে অট্টো স্টেইনমায়ারের ইংরাজিতে অনুবাদ  হ্যালির নাম ধূমকেতুর সঙ্গে যুক্ত, যেমন নিউটনের সাথে আপেলেরহ্যালি সাহেব কবিতা লিখেছিলেন তাইই নয়, অনেকেই জানেন না, এডমুন্ড হ্যালি লাইফ টেবিলেরও উদ্গাতা । সুতরাং, আমার আগের লেখা, ‘বিজ্ঞানীর প্রতি মনোযোগী হও সমাজ, ওঁচাটে কবির প্রতি নয়’- তা দ্বন্দ্বমূলক আখ্যান নয়, বরং প্রেমের কটাক্ষমাত্র । সুতরাং, এ আলোচনা খানিকটা গম্ভীর, খানিকটা রসিকতা ও বাকিটা আদরের মত নরম ।

Preface of the Book 


কবিতা মানুষের আগুন আবিষ্কারের মতই অপরিহার্য । ‘একই অঙ্গে এত রূপ দেখিনি তো আগে...’মানুষ বরাবরই বিষয় নির্ভর । আর মানুষের বিষয় হল প্রকৃতি । আবার প্রকৃতির অমোঘ সত্ত্বায় লীন- বস্তুগত সত্য এবং ভাবগত সত্য । বস্তুগত সত্যে আছে, কার্যকারণ সূত্র, ভর, আয়তন, অবস্থান, শক্তি ইত্যাদি । আর ভাবগত সত্যে আছে, আবেগ, প্রেম, নান্দনিকতা, অভিমান, ভ্রূকুটি, প্রতিবাদ ইত্যাদি ।  বিজ্ঞান ও কবিতা দুটো পৃথক রাস্তায় হেঁটে চলে এবং ছুঁতে চায় সেই নির্বিবাদি সত্যের ভিতরে যে সত্য আছে, তার কুন্ডলিনী শক্তির আঙুল – ‘বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি’র উত্তরণে, সে মিলে যায়, মিশে যায়, লীন হয় একই উপাখ্যানে – মানবসভ্যতা ও আবিষ্কার

আমাদের কবিতা কখনো ব্যবহারের রূপ, কখনো নান্দনিক বোধ, আবার কখনোবা সুন্দর ও প্রেমের প্রতিমূর্তি । কবিতা মূর্ত ও বিমূর্ততার অনাবিল প্রেমের গাথা- যে প্রেমে মিলনও নেই বিচ্ছেদও নেই – আছে রাধাকৃষ্ণের মগ্ন উপাসনা ।  কবিতা মানুষের কথা বলার ভাষা । তবে তা সাবলীল কথা বলার ধরণ নয় । মাত্রা, মিল, অনুপ্রাস, সমদীর্ঘ শব্দের দ্বারা রচনা করা অক্ষরমালার সমন্বয় – শ্বাসাঘাতের তারতম্যে স্বরসংগতির বিবিধ উচ্চারণ এবং পুনরাবৃত্তি, রূপক ও বিরোধালংকারে সজ্জিত আচারধর্ম । মানুষ যত বেশি আলাদাভাবে নিজের ভাব প্রকাশে আগ্রহী হয়েছে, সে ততবেশি এইসব ব্যতিক্রমি বলার ধরণকে নামাঙ্কিত করেছে কবিতা বলে । লিপি আবিষ্কারের আগে যে অমার্জিত সঙ্গীত প্রচলিত ছিল ছন্দোবদ্ধতায় ও মাত্রাবদ্ধতায়- তা অর্থহীন অঙ্গভঙ্গি বা লাফানো হোক, শীৎকার হোক কিংবা লাঠি-পাথরের কৃত্রিম কোলাহল হোক – সেই হেঁইসামালো হেঁই হল কবিতার আদিম উৎস । তা আগুনের থেকে কম কি সে ! সেই হল বর্ণমালাহীন মানুষের সুন্দরের প্রথম উপাসনা ।

ছবিঃ ক্ষীরোদ বিহারী ঘোষ


আগুন যেমন বিবর্তিত হয়ে হিরোসিমা-নাগাসাকি হয়েছে, তেমনই কবিতা বিবর্তিত হয়ে ফেসবুক হয়েছে । বিবর্তনের আরেকটা বৈশিষ্ট্য হল সংখ্যাবৃদ্ধি ও আদল পরিবর্তন । তাইতো আখ্যান, মহাকাব্য, নাট্যকাব্য, পদাবলী, বিদ্রূপাত্মক কাব্য, গীতিকাব্য, শোককাব্য, পদ্য ও অন্তিমে গদ্য হয়েছে আজ । একইভাবে অক্ষরবৃত্ত, স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত, অমিত্রাক্ষর, অন্ত্যমিল, চতুর্দশপদী, পয়ার, লিমেরিক হয়ে আজকের অনুকবিতাও এসেছে । এইভাবেই ছন্দযুক্ত প্রাসাদের দালান থেকে মুক্তছন্দের ফ্ল্যাটিয় ব্যলকনিতে আমরা এসেছি । আরাগঁ বলেছিলেন, কবিতার ইতিহাস আদপে তার টেকনিকের ইতিহাস । বিষ্ণু দেও একই কথার অনুসারী । আমিও ।

কিন্তু, একে বাচালতার ইতিহাস বললে যা হবে, তাতে নিউটোনিয়ান বিজ্ঞানবোধ থেকে আইনস্টাইনীয় বিজ্ঞানবোধে উত্তরণের মধ্যে যে ফারাক তাকেও একই অভিযোগে দুষ্ট হয়তে হবে ।  কবিতা হল প্রকৃতির সাথে মানুষের সভ্যতার সংগ্রাম, আর বিজ্ঞান হল প্রকৃতির সাথে মানুষের বিরোধিতার-বৈরিতার সংগ্রাম । মানুষ বিজ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে প্রকৃতির বিরুদ্ধে হেঁটেছে- সে খনিজ উত্তোলন করেছে, আকাশে উড়েছে, গাছ কেটেছে, প্রানীহত্যা করে বিলাসদ্রব্য বানিয়েছে । আর কবিতা সুন্দরের হাত ধরেছে, বলেছে,

সে এত সুন্দর, তাই তার পাশে বসি
রূপের বিভায় আমি সেরে নিই লঘু আচমন
রূপের ভিতর থেকে উঠে আসে বুকভরা ঘুম
আমি তার চোখ থেকে তুলে নিই
মিহিন ফুলের পাপড়ি।

গন্ধ শুঁকি, পুনরায় ঘুম থেকে জাগি
উজ্জল দাঁতের আলো রক্তিম ওষ্ঠকে বহু দূরে নিয়ে যায়
রূপের সুদূরতম দেশে চলে যাবে এই ভয়ে
আমি দ্রুত সিঁড়ি গিয়ে নেমে…
সে এত সুন্দর তাই তার পাশে এশে বসি।

প্রকৃতির অলঙ্কার সে রেখেছে অনন্ত সীমানা জুড়ে জুড়ে
তাই প্রকৃতির কাছে অন্ধ হলে যাবো
সুমেরু পর্বতে আমি মাথা রাখি
সমুদ্রের ঢেউ লাগে হাতের আঙুলে
উরুর ভিতরে অগ্নি…এত মোহময়
অরণ্যের গন্ধমাখা ….
-       সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

ধ্বংসের ও সৃষ্টির রূপবিনিময় – এই হল প্রকৃতির নিয়ম । কিন্তু মানবসভ্যতা এর ব্যতিক্রম হতে চায় । আর সেই ব্যতিক্রমের সহায় বিজ্ঞান । করোনার বিরুদ্ধেও তাইই । প্রকৃতিকে হারিয়ে দেবার লড়াই । মানুষের ক্ষমতার শত আস্ফালন, মহাকাশে গ্রহের সন্ধানে তপস্যা, সেও আজ পরাজিত একটি ভাইরাসের কাছে- একথা অভীক বলেছিল, হেসেছিল আরও বেশি । প্রকৃতির আচমনে দেখা যাক আমরা কোথায় যাই ! তবে এও ঠিক, প্রকৃতিই কিন্তু নিযুত নিযুত প্রানীর মধ্যে কেবল মানুষকে দিয়েছে, প্রকৃতি বিরুদ্ধে এই বিপ্লবের ভার । কবিতাও তাই । প্রকৃতির যত ‘কথা আছে’ যত ‘গান আছে’ যত ‘প্রাণ আছে’ তার, সব কিছুকে প্রকাশ করার ভার – আমাদের কবিতার । তাই ব্যতিক্রমের আশীর্বাদও এই প্রকৃতিরই । শুধু, ঝর্ণার মত বহমানতার দায় যার, সে কবিতার, দ্রুতলয়ে পড়লেই তা বুকে ঝর্ণার স্পন্দন তুলবে,

সারঙ্গ, যদি ঝর্না ফোটাই তুমি আসবে কি তুমি আসবে কি
সন্তর্পণ পল্লব দোলে এত অজস্র বন্ধু হাওয়া
গাছের শিরায় ফেটেছে নূপুর অমন নৃপুর জলে ভাসবে কি।
পাহাড়খণ্ড পাহাড়খণ্ড ওর নৃত্যের দোষ নিয়ে না হে।

অলস-অলস ভালোবাসা তুমি নদীপথ আঁকো নখে-নখে, তীরে
দাড়িয়ে পড়েছে শাদা গাছগুলি, উপঢৌকন সবুজ জড়োয়া
দেখছো না কেন দুলছো না কেন তবু যে পুলিন জল মেশে ধীরে
কোথায় মেশে না? পাহাড়খণ্ড ওর কোনদিন দোষ নিয়ে না হে!

তৃষ্ণা জড়ায় পাকে-পাকে আহা সারঙ্গ এস ঝর্নাপ্রান্তে
মাইল-মাইল ধূলাবালি ওড়ে অচ্ছায় ধত গাছের পাহারা
মুছে যাবে তার নৃপুরে, নৃত্যে, শুধু জল টানে পিপাসু ভ্রান্তে
ও ঝর্না ওগো ঝর্না তাহাকে ভালোবাসবে কি ভালোবাসবে কি।
-       শক্তি চট্টোপাধ্যায়

সুতরাং, আমার বিরোধ না বিজ্ঞানের প্রতি না কবিতার প্রতি । আমার বিরোধ পৃথকীকরণের এই তামাম প্রচেষ্টার প্রতি। আমি তো, কবিতা ও বিজ্ঞান মিলে এই রহস্যময়ের যে রহস্য-উদযাপন করে, সেখানে থাকতে চাই । জিরোতে চাই দুদন্ড । কেননা দুটোই যে একই মায়ের সন্তান । এতে স্বাতন্ত্রলাভের ইচ্ছের দরুণ আলাদা হেঁসেল হবার জো আছে, কিন্তু রক্তের টান উপেক্ষা করার নয় ।  যে মানুষের অন্তরে যে ধ্বনি তোলপাড় করবে সেই তার প্রাণের ঠাকুর – বিজ্ঞান অথবা কবিতা ।  

লোকে বলে, কবিতার প্রাচুর্য ব্যাপক । কবিদেরও । বেশিরভাগই খারাপ । কিন্তু সে বিচারের দায় আমার নয় । কারও নয় । কে ঠিক করবে কোনটা খারাপ কোনটা ভাল । বিজ্ঞানেও তো তাই । কত রিসার্চার, কত পেপার তাঁদের । সবই কি তুখোড় আবিষ্কার, দুনিয়া বদলে দেয় ? সেখানে, কে ঠিক করবে, এয়ার-কন্ডিশনার ভাল না সিএফসি, এরোপ্লেন ভালো না কার্বন এমিশন, পরমাণু বিভাজন ভাল নাকি এ কে ৪৭ !  তার চেয়ে সত্য-সুন্দরের তপস্যায় মগ্ন হওয়াই শ্রেয় । জি এইচ হার্ডি, তাঁর ‘আ ম্যাথেমেটিসিয়ানস অ্যাপোলজিতে’ লিখেছিলেন,

Beauty is the first test: there is no permanent place in the world for ugly mathematics.

কবিতাও তাই । অসুন্দর কবিতা হারিয়ে যাবেই একদিন । আমরা বরং সারস্বত-শাস্বতীকেই আঁকড়ে ধরব,

একদা এমনই বাদলশেষের রাতে
মনে হয় যেন শত জনমের আগে-
সে এসে, সহসা হাত রেখেছিল হাতে,
চেয়েছিল মুখে সহজিয়া অনুরাগে।
সে-দিনও এমনই ফসলবিলাসী হাওয়া
মেতেছিল তার চিকুরের পাকা ধানে;
অনাদি যুগের যত চাওয়া, যত পাওয়া
খুঁজেছিল তার আনত দিঠির মানে।
একটি কথার দ্বিধাথরথর চূড়ে
ভর করেছিল সাতটি অমরাবতী;
একটি নিমেষ দাঁড়াল সরণী জুড়ে,
থামিল কালের চিরচঞ্চল গতি;
একটি পণের অমিত প্রগল্ভতা
মর্ত্যে আনিল ধ্রুবতারকারে ধ’রে;
একটি স্মৃতির মানুষী দুর্বলতা
প্রলয়েরে পথ ছেড়ে দিল অকাতরে।।
-       সুধীন্দ্রনাথ দত্ত
তা কবিতার হাত ধরে হোক, বা বিজ্ঞানের,

Newton unlocking Truth's close-fasten'd Chest,
Newton dear to the Muse, in whose pure Breast
Phoebus is present, and whose Mind inspires
With all of his divine, prophetic Fires.
Sing him, ye Muses, for Right can approve,
No Mortal nearer touch the Gods above.
-       Edmund Halley

পুনশ্চঃ - আমি বাংলা সাহিত্যের একাডেমিও মানুষ নই, আর সাহিত্যের ইতিহাস রচনা করতেও বসিনি । শুধু যেভাবে বিজ্ঞান ও কবিতা আমার কাছে ধরা দিয়েছে, সে কথাটুকুই বলার চেষ্টা করেছি । সুতরাং, ভুল-ত্রুটি হলে হয়েছে । আস্তে-ধীরে একদিন ঠিক হবে, নয়তো ভুল নিয়েই মরে যাব । আর কি ! তবে সমালোচনা বদলে যদি ক্রোধের ইঁট ধেয়ে আসে, তবে পাটকেলের সন্ধানও আমার জানা । ছেলেবেলায় ‘মারকুটে ছেলে’ বলতে কম লোক বাড়িতে আসেনি ।

(এই ব্লগে সমস্ত লেখাগুলির মতামত লেখকের ব্যক্তিগত, চিত্রশিল্পীদের এ ব্যাপারে কোনও দায় নেই ।)

Tuesday, 14 April 2020

শিরোনামহীন প্রলাপগুলো, বিজ্ঞানির প্রতি মনোযোগি হও সমাজ, ওঁচাটে কবির প্রতি নয় ...


আজি হতে শতবর্ষ পরে. কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি. কৌতূহলভরে”- কেউ না, এমনকি কবি নামক হাড়-হাভাতেও নয় । কিন্তু প্রথম প্লেগ থেকে শুরু করে আজকের করোনা অব্দি(অনেকগুলো শতবর্ষের পরেও), মানুষ এপিডেমিওলজিকাল স্টাডি করছে অনবরত, যাতে মানবসভ্যতা রক্ষা পায় । কবিতা পড়ে মানবসভ্যতা বাঁচবে না । তাই আজও ডালটন, অ্যাভোগাড্রো, ডারউইন পড়ছি, কবিতা নয় ।

কবি অত্যন্ত বকওয়াস জাত – বোধহয় – বেজাত । যুগে যুগে বাচালতা ছাড়া সমাজে কোনও অবদানই এদের নেই । বিনোদন একটি অত্যাশ্চর্য পরমাদ- মানছি – কিন্তু যে সময়ে এসে আমরা পৌঁছেছি সেখানে এসব পরমাদের আবদার অত্যন্ত বালখিল্যতা । স্রেফ কথার টেকনিকালিটির পরিবর্তন করে – যাকে এরা কাব্যের ফর্ম বলে – এই প্রগলভতা চালিয়ে যাচ্ছে । আর বলিহারি সরকার, স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে কাব্যের ভাষা, তার ইতিহাস, তার ফর্মের কচকচানি পড়াতে গিয়ে কোটি টাকা অপচয় করছে । কোনও যথার্থতা নেই এই অপব্যায়ের । কবিতা নিয়ে রিসার্চ, তাতে আবার ফেলোশিপ । মরা গাধার জন্য ভেন্টিলেটর ছাড়া এ আর কিস্যু নয় ।

এ কথা আজ স্পষ্ট, যে, সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট – কথার বিপরীতে গিয়ে এই কবি নামধারি বদখৎ গোষ্ঠীকে টিকিয়ে রাখা হয়েছে – আমাদের সমাজে । যাদের বিজ্ঞান পড়ার যোগ্যতা নেই, যারা সত্যের সন্ধানে পঙ্গু, যারা আবাল্য ক্যাবলা, মানে হাঁদা-গোবিন্দ-গঙ্গারামের চেয়েও অধঃপতিত তারাই এসব আজেবাজে জিনিসে মহাপন্ডিত । আর দয়ার-সরকার এইসব সাবজেক্টের পেছনে পয়সা ঢালছে ।  সুকুমার সেনের বই ছাড়া যাদের পাশ দেওয়া হয় না, তারাও জেনে রাখুক, যে সুকুমার সেন অব্দি গণিত বিষয়ে পড়াশুনা করেছেন । আর এই গণিতই তাঁর মেধা-মনন-যুক্তিবোধের ভিত্তিপ্রস্তর রচনা করেছে । দুনিয়ার তাবৎ শ্রেষ্ঠ কবি-শিল্পী-সাহিত্যিক সকলেই বিজ্ঞান পড়েছেন খুঁটিয়ে । অথচ, ফেসবুকিয় কবিদের ছেড়ে দিলাম, যারা বর্তমানের অ্যাকাডেমিও ও নন-অ্যাকাডেমিও কীর্তিমান কবি, কাব্যপতিতার রসে টইটম্বুর যাদের হৃদমাঝার, তারা গণিত শুনলেই ভিজে বেড়াল । অর্থাৎ, না মেধা, না মনন, না যুক্তিবোধ – তবুও এদের সমাজে পুষতে হবে । 

কয়েকজন ফিলোজফারের নাম বলতে বললে কার কার নাম আসবে, প্লেটো, সক্রেটিস, অ্যারিস্টটল এঁদের, অথবা ডেকার্তে, স্পিনোজা, ভলতেয়র, লিবনিজ, নিউটন এঁদের অথবা রাসেল, আইনস্টাইন, বোর, ম্যক্সওয়েল, রাদারফোর্ড এঁদের অথবা আজকের দিনে চমস্কি, পোলিয়ানি, ব্রেইথয়েট, চক্রবর্তী, রজেনবার্গ, দুঁপ্র এঁদের । মনে রাখতে হবে এঁরা সকলেই বিজ্ঞানের একেকটি স্তম্ভ ।  আর আমাদের দেশে ফিলজফি পড়ে কারা, যারা কোথাও চান্স পাবার মত মার্কস জোটাতে পারেনি, তাদের ঠাঁই ফিলোসফি, সোশ্যাল সায়েন্স, মাস কমিউনিকেসন, কম্পারেটিভ লিটেরেচার, উইমেন্স স্টাডিজ, লিঙ্গুয়েস্টিক, কালচারাল স্টাডি ইত্যাদি সব চোখে ধুলো দেওয়া বিষয়ে । সোশ্যাল সায়েন্স যদি সায়েন্স হয়, তবে ম্যাথ, ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, ইকোনমিক্স, এগ্রিকালচার, বায়লজি এগুলো তো ঝালমুড়িওয়ালা । একবার এক বন্ধুর থেকে একজন উইমেন্স স্টাডিজে পিএইচডিরতার, বোরো রমনিদের জীবনযাত্রা বিষয়ে গবেষণা প্রসঙ্গে, র‍্যানডম স্যাম্পেল তোলার মজাদার কাহিনি শুনেছিলাম । সে নাকি চোখ বন্ধ করে কতকগুলো নাম্বার আওড়াতো, সেগুলোই নাকি তাঁর র‍্যান্ডম নাম্বার । সেও আজ পশ্চিমবঙ্গের এক শ্রেষ্টতম বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টরেট অধ্যাপিকা । সত্যি আমরা স্ট্যাটিস্টিকসের লোকজন কষ্ট করে স্যাম্পল সার্ভে মেথডোলজি কেন যে পড়ি ? এরকম বহু সত্য গল্প বলতে পারি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেও।

বাস্তবে সোসাইটিতে কোনও সায়েন্স নেই, থাকলে লকডাউনের সময়ে বাঙালি বাজারে গিয়ে কাব্য করে কানকো তুলে ‘বাঙ্গালিত্ব’ রক্ষা করতে ভিড় জমাতো না । আমার চেনা অনেক বন্ধু আছে যারা অঙ্কে, ফিজিক্সে আর সবচেয়ে বেশি আছে ইঞ্জিনিয়ারিং-এ পড়ে কবি হয়ে গেছে আর ব্যাঙ্কের চাকরির পরীক্ষা অথবা কেরানিগিরির প্রস্তুতি নিচ্ছে এর কারণ এই যে, যতটুক ঘিলু থাকলে বিজ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত হওয়া যায়, তা এদের নেই, তাই কাব্যপিড়িতির জন্য নয়, ফোকটে বিখ্যাত হবার লালসায় এসে এ তল্লাটে জুটেছে । এরা আবার এটুকুও বোঝে না, কবিতা অব্দি একটা চর্চার বিষয়, চর্যার অন্তর্ভুক্ত , ঠিক যেমন সিক্সপ্যাক । তাতে পরিশ্রম আছে, তাতে ডেডিকেশন আছে, তাতে টেনাসিটি আছে তাতে ধৈর্য আছে । লেগেপড়ে থাকলে তবেই একদিন হনু আঁতেল হওয়া যাবে । আর তারপর আঁতেল হয়ে কি ছিঁড়বে আর কি বাঁধবে, করোনার মত কোনও ভাইরাস এলে আনন্দ খুলে ডাক্তারের মুখাপেক্ষি- কি করব কি করব না, বিজ্ঞানিদের পায়ে গড়াগড়ি – ওষুধ আর কদ্দিন, ইকোনমিস্টদের দোরে হত্যে- দাদা এরপর খাবার-চাকরির নিদান দ্যান । তারপরে আবার সব ঠিক হলে আনন্দ পর্দায় শুভ্র সাহিত্যবর্ম পরিধান করিয়া ইন্টেলেকচুয়াল আসিবেন । তখন কে ডাক্তার, কে বিজ্ঞানি, কে ইকোনমিস্ট !!!   

ছবি ঃ ক্ষীরোদবিহারি ঘোষ (আমার বাউলদাদু)

সত্যি বলেন, এই করোনা মোকাবিলায় কোন কাজে লাগবে তারা ? যুগে যুগে, মোমবাতি আবিষ্কার থেকে আলপিন, চাকা থেকে এরোপ্লেন, ঠোঙা থেকে বোমা, পোস্ট অফিসের ধারণা থেকে ইন্টারনেটের ধারণা, শল্য থেকে কেমো অব্দি সবই করেছে বিজ্ঞান । আর বলে রাখি, এই বিজ্ঞানিরাই চাঁদে পৌঁছেছে, বখাটে কবিগুলো দূর থেকে দাঁড়িয়ে কাব্যি করছে, কেননা সেখানে পৌঁছনোর জন্য, চাঁদের মাটিকে স্পর্শ করে শরীরে রোমাঞ্চ তোলার জন্য যে যোগ্যতার দরকার তা এদের নেই, কোনদিনও তা হবে না ।  এরা কি করেছে মোমবাতির আলো নিয়ে বাকতেল্লা, চাকা নিয়ে কাব্যগ্রন্থ, বোমা নিয়ে গান, ইন্টারনেট নিয়ে ছ্যাবলামো, শল্য নিয়ে বাৎসল্য আর সর্বোপরি হাজার হাজার গাছের প্রাণ নিয়েছে । এ দুনিয়ায় যত কবতের বই, যত গপ্পের বই, যত পাকাপনার বই বের হয়, তার চেয়ে ঢের কম বের হয় বিজ্ঞানের বই । আর বিজ্ঞানিরা সেই ভার কমিয়ে এখন ডিজিটাল মাধ্যমের আবিষ্কার করেছে যাতে কাগজের প্রয়োজনে বৃক্ষের ধ্বংস না হয় । কারণ কবিতার চেয়ে শ্বাস ঢের দরকারি ।

অথচ ক’জন বিজ্ঞানির নাম জানেন আপনি ? আনন্দ পর্দায় কজন দেখেছেন তাঁদের ? ক’জন করোনার আগে নেচার, ল্যান্সেট, অ্যানালস ইত্যাদির নাম গুগলে টাইপ করেছেন ? ভেবে দেখুন, পৃথিবীর অসুখ যতবার সেরেছে, যতবার মানুষ খুঁজেছে প্রযুক্তির সুবিধা, যতবার মানুষ এগিয়েছে পরমাণুর পরের সত্যে ততবারই আমরা পেয়েছি দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিদীপ্ত কিছু মুখ – তারা বিজ্ঞানি ।  পৃথিবী আবার সুস্থ হলে, কাদের মর্যাদা দেবেন আপনি, আনন্দ পর্দায় কাদের যুক্তি করবেন গ্রহণ, কাদের বসাবেন শাসনের আসনে – যারা বিজ্ঞানের সেবা করে তাঁদের নাকি শব্দের খেলায় মাতিয়ে রেখে ছেলেভুলানো খেলা করে যাঁরা আপনাদের সাথে তাঁদের ।

Thursday, 9 April 2020

শিরোনামহীন প্রলাপগুলো, নীরদচন্দ্র চৌধুরী 'অজনপ্রিয়' কেন ?


কতটা পথ পেরোলে তবে পথিক বলা যায়
কতটা পথ পেরোলে পাখি জিরোবে তার ডানা
কতটা অপচয়ের পর মানুষ চেনা যায়
প্রশ্নগুলো সহজ, আর উত্তরও তো জানা।।
                                            - কবীর সুমন

জনপ্রিয়তার বহর মানে সংখ্যা, আর তার গভীরতা মানে উৎকর্ষ । তাই, কতজনের কাছে প্রিয় হলে তবে জনপ্রিয় বলা যাবে, সেটা যতটা গুরুত্বপূর্ণ ততটাই প্রয়োজনীয় এটাও জানা যে সেই জনতার উৎকর্ষ কতটা ! আসলে এই মন জানেই না, কোনজন তার অন্তরতমকে স্পর্শ করে বসে আছে । যাকে যে জন সাড়া দেবেন, তিনিই তার দেবতা, তিনিই তার প্রেম ।  তাইতো গেয়ে উঠি, মনের ভেতরে যখন, ‘এক জনায় সুর তোলে এক তারে/ ও মন, আরেক জন মন্দিরাতে তাল তোলে/ও আবার বেসুরো সুর ধরে দেখো/কোন জনা, কোন জনা/ তোমার ঘরে বসত করে কয় জনা/ মন জানো না, মন জানো না’ । না এ মন সত্যই জানে না ।

কিন্তু কে বলল, নীরদচন্দ্র অজনপ্রিয় ?  ১৮৯৭ সালে যে লোকটা জন্মেছিল, সারাজীবনে পয়সাকড়ি কিছু করতে পারেনি, মায় দেখতেও আহামরি নয়, তবুও সেই লোকটাকে নিয়ে ২০২০ সালে ফেসবুকে পেজ আছে, তাতে প্রায় রোজই পোস্ট হয় কিছু না কিছু । ইউটিউবে ভিডিও আছে, দেখার লোকের অভাব নেই । ২০১৭ সালে একটা উদ্ভট লোক ‘অগ্রন্থিত প্রবন্ধ নীরদচন্দ্র চৌধুরী’ সম্পাদনা করে প্রকাশ করে। ‘মিত্র ও ঘোষের’ মতো ব্যবসায়িক প্রকাশক এখনও বই প্রকাশ করছে নানা ঢঙে । বাজারি কাগজ আনন্দবাজার ও এই সময় অব্দি নিবন্ধ ছাপে আজও । এবং সর্বোপরি এই বান্দা যখন গ্রাজুয়েসনের ফার্স্ট ইয়ারে, তাও বিজ্ঞান অনার্সে, মানে বয়স সবে ১৮, সে লোকটার বইপত্র পাগলের মত গিলতে শুরু করে । এরপরেও কে বলে, এই লোকটা অজনপ্রিয়, কার সাহস শুনি ?


হ্যাঁ একখান কথা থাকতে পারে বটে । ছেলেবেলায় পাড়াতে বাঁদরখেলা দেখাতে এলে যেমন লোকের ভিড় জুটে যেত, কিম্বা আমাদের পাড়ার বুকুর বাবা, এককালের নকসাল, যখন বলে পিলপিল করে লোক বেরিয়ে এসে একদিন বিপ্লব করবে, তখন আবেগটাকে সম্মান জানালেও, কান্ডজ্ঞানকে খিল্লিই করা হয় ।  দেশের স্বাধীনতাতে পিলপিল করে লোক বের হয়নি, দেশের ভাগ-বাঁটোয়ারাতে পিলপিল করে লোক এসে মানববন্ধন তৈরি করেনি, দেশের মহামারিতে পিলপিল করে সহনাগরিক মরে গেলেও পিলপিল করে লোক এসে অন্ন তুলে দেয়নি । তা নীরদচন্দর তো না বাঁদর খেলা দেখিয়েছে না কালোবাজারিতে মদত দিয়েছে । লোকটা নির্ভেজাল বৌদ্ধিক চর্চা ও চর্যায় নিজেকে সারাজীবন পুড়িয়ে খাঁক করেছে শুধু । তাই পিলপিল করে লোক নীরদচর্চা করবে এমন তো হয়ই না । এটা কারো ক্ষেত্রেই হয় না, সে যতই মুরুব্বিই হোক, হয় না, যদি না সিলেবাসে থাকে । 

জল দিঘিতেও জমে, বর্ষায় রাস্তাতেও জমে । দিঘির জল গভীর তাতে সামান্য লোকেই বিহ্বল হয়, রাস্তার জলে প্রায় সব লোকেই বিরক্ত হয় । দিঘির জলে বহু লোক ডুবেও মরে, তাই ভয়ও পায়, রাস্তার জলে পাড়ার বখাটে ছেলে ছোকরারা কাদা ছোড়াছুঁড়ি করে । এই হিসেবে তো রাস্তার জল জনপ্রিয়, দিঘির নয় । ব্যাপারটা কি ঠিক হল !

জ্ঞান চর্চার বিষয় । ফেসবুকে কবিতা লিখে ফেলার, ছাপিয়ে ফেলার, কিংবা টিকটকে ভিডিও করার প্রবণতার মত এটা সর্বজনে ছড়িয়ে পড়তে পারে না । কিন্তু, নীরদচর্চার ক্ষেত্রে মূল প্রশ্নটা হল, কেন বাঙালি বুদ্ধিজীবী মহল নীরদচর্চাকে অবহেলা করেছে ? তাই বুদ্ধিজীবী মহলের বৌদ্ধিক-চরিত্র-চর্চায় যেতে হবে । ‘কি ছিল, কি হল’ ! গ্রীম্পেন মায়ার ।

আর এই প্রশ্নের উত্তর আমি নই, দেবেন নীরদচন্দ্র নিজেই । ১৯৬৭ সালে নীরদ সি. চৌধুরির একটা বই প্রকাশিত হয়, The Intellectual In India । আমি শুধু সেই বই থেকে কয়েকটি পাতার ছবি তুলে দেব । আমার মনে হয়, সেই যথেষ্ট হবে, এই ফেসবুকিও আলোচনার পক্ষে, লিংক দিলাম,  



এমনিতেই কমেন্টের জন্য এই আলোচনা যথেষ্ট বড় হল । ডাকুয়া সাহেবের ডাকে সাড়া না দিয়ে থাকি কেমন করে, তাই অকিঞ্চিতকরের এই প্রয়াস । আপনাকে ভালোবাসা ।

নিচের সবকটি ছবিই, The Intellectual In India, বই থেকে নেওয়া হয়েছে । 


1
2
3

5







4













6

7

8

















9



10
















11

12

13

14

15

16