Wednesday, 22 April 2020

শিরোনামহীন প্রলাপগুলো, চন্দ্রিল ভট্টাচার্যের চাল- দু ছক্কা পাঁচ ও কয়েকটি কথা



(বিঃদ্রঃ - এটা চন্দ্রিল সমালোচনা, চন্দ্রিল আহা কিংবা চন্দ্রিল রিভিউ নয় । চন্দ্রিলকথা বলা যেতে পারে বড়জোর । ব্যাস)

চন্দ্রিল ভট্টাচার্য মানে কিন্তু ইউটিউবের কিছু সার্চড ভিডিও নয়- এটা প্রথম কথা । চার্লি চ্যাপলিনের ‘দ্য গ্রেট ডিকটেটর’ এর অনবদ্য বক্তৃতার কথা নিশ্চয় সকলের মনে আছে । কিন্তু চন্দ্রিল সেরকমও কিছু নন । কেননা চন্দ্রিল সিনেমায় সংলাপ বলেন না । তিনি রাজনৈতিক বক্তাও নন, মঞ্চে দাঁড়িয়ে ‘বন্ধুগণ’ বলে শুরুও করেন না । আবার তিনি সন্দীপ মহেশ্বরীও নন । অথচ, এখনকার বহু বাঙালি চন্দ্রিলের উচ্চারণে, চ্যাপলিনকে পান, রাজনীতি পান, সন্দীপ মহেশ্বরীকেও পান । ব্যক্তিগত স্বীকারোক্তিতে বলি, চন্দ্রিলের মত সুবক্তা প্রায় আর কেউই নেই । অন্তত আজ । তাঁর বলার ধরণই জনমনে তাক লাগিয়ে দেয় । তিনি বলে চলেন দ্রুতলয়ে, বাঙালির প্রথাবদ্ধ মিউ-মিউ ভাবেও নয় আবার ঝগড়ার তান্ডবের মতও নয় । তিনি মাত্রাবোধেও টনটনে, আবার ছন্দোবোধেও অপরাজিত। তিনি বেছে নেন এমন কিছু শব্দ-বাক্য-রূপক-ব্যঙ্গ-শ্লেষ-প্রতিবাদ, যা সাধারণের রোজনামচায় বহুল কিন্তু ছদ্ম-চর্চিত ।

বাবার ওপরে কথা না বলা – বাঙালির সুসন্তান হবার প্রধান মাপকাঠি । অথচ, যুগে যুগে বাপের অবাধ্যগুলোই যুগ পালটে দিয়েছে । তা রামমোহন হোক, বিদ্যাসাগর কিংবা সুভাষচন্দ্র । চন্দ্রিল এরকম কিছু নন । তিনি তাহলে আধুনিক রঞ্জিত মল্লিক । রাজনৈতিক-সামাজিক অন্যায় অসততায় বিরক্ত, ভিড় বাসের ঠেলাঠেলিতে-ঘামে বিপর্যস্ত, মেজাজচড়া বাঙালি আড্ডায় – তা সাহিত্য আড্ডা হোক বা চায়ের দোকানের – পাত্তা না পাওয়া, পরাজিত কিছু মানুষ ঠিক যে কথাগুলো বলতে চায় কিন্তু নিরুপায় জ্ঞানের চর্চাহীনতায়, সীমাবদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গিতে, ব্যর্থ উপায়-শব্দ-অবকাশ অন্বেষণে । চন্দ্রিল উচ্চারণ করেন ঠিক সেইগুলি । সেই ভাবেই । এটাই তবে চন্দ্রিল তাহলে। জনগণের ভাষা । না ! তা তো নয় । তিনি তো গণমতে আস্থার বিপরীতে কথা বলেন, তিনি তো দেখিয়ে দেন জনগণের মধ্যে থাকা লুপহোলস । তাহলে ? আসলে তাঁর জবানিতে থাকে, আমিও চোর তুমিও চোর কিন্তু তুমি ধরা পড়লে আমার যে আনন্দ হয়, সেরকম আনন্দ উদযাপনের আয়োজন । তাই তিনি প্রার্থিত বক্তা । তবুও বলি, চন্দ্রিল কিন্তু ভেতরে ভেতরে জনগণের রসিক সুবক্তা নন ।

ছবি- ইন্টারনেট থেকে নিয়েছি



চন্দ্রিল কবি । অন্তর্মুখী কবি এবং নরেন্দ্রপুরীয় শিক্ষায় শিক্ষিত ও আচরণবোধের অব্যতিক্রমি দৃষ্টান্ত । আমার মনে হয়, এটাই তাঁর আসল পরিচয় । চলমান জীবনের ওপরে থাকা - হেলিকপ্টারের মত, এরোপ্লেনের মত নয় - অত্যন্ত নিবিড় ও সন্ধানি পর্যবেক্ষক । চন্দ্রিলের সাথে আমার প্রথম পরিচয় অবশ্যই গানের কথা দিয়ে । পরে, আমি চন্দ্রিলের দুটো বই কিনেছি, আজ অব্দি । এক, উগো বুগো চৌকো চুগো । দুই, দু ছক্কা পাঁচ । বাকি কিছু কিছু দেখেছি, যা দেখেছি তার মধ্যে থেকে কিছু কিছু পড়েছি । সম্পূর্ণ পড়েছি শুধু, দু ছক্কা পাঁচ । উগো বুগো চৌকো চুগো – আমি সব পড়তে পারিনি। সেক্স ক্রমে আসিতেছে ও ট্যালেন্ট দেখেছি । বক্তিমেগুলো শুনেছি । বারবার শুনেছি, রবীন্দ্রনাথ শিরোনামের ইন্টারভিউ । ফলে, এর ভিত্তিতে, না চন্দ্রিল সমালোচনা করা যায়, না চন্দ্রিল আহা বলা যায় আর চন্দ্রিল রিভিউ করার ইছে আমার নেই । 

তাহলে এটা কী ! গল্প আছে বস । আমার আদি বাড়ি বর্ধমান । কর্মসূত্রে এখন কলকাতা শহরে ফ্ল্যাট । ফলে, আমার যা বইপত্তর সবই বর্ধমানের বাড়িতে । সেসব বই আমি কোনোদিন আনতে পারব না এই শহরে । আসলে, মামার বাড়িতে আমার বেড়ে ওঠা । এখন ওই বাড়িতে শুধু দিদা-দাদু । একা । আমার দিদার কাছে আমার সারা সপ্তাহের অস্তিত্ব শুধুই আমার ঘর আর বইপত্রগুলো । ফলে কলকাতায় আমি নতুন করে বইপত্র কিনতে শুরু করি । তাই, এ সংগ্রহে এই মুহূর্তে আমার সবচেয়ে প্রিয় বইগুলোর প্রায় কিছুই নেই । সব নতুন । না পড়া । সুতরাং, কিছু না পেয়ে চন্দ্রিলের দু ছক্কা পাঁচ পড়ছিলাম । আজ শেষ হল । ফলে এটা হল, শুধুই চন্দ্রিল কথা । ব্যাস ।

দু ছক্কা পাঁচ আমি কিনেছিলাম স্রেফ উৎসর্গপত্রে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের নাম দেখে । দেখতে চেয়েছিলাম, কোন খোয়াবের দুনিয়ায় নিয়ে যান চন্দ্রিল ! পরিচয়পত্রে চন্দ্রিলের বিষয়ে যেগুলো লেখা, তা প্রথাগত জন্মসাল-হ্যানা বইয়ের ত্যানা পুরস্কার ইত্যাদির চেয়ে ঢের ভাল । কবি-লেখকের পরিচয় তাঁর কাব্যদুনিয়ার মুন্সিয়ানার বাহারি বহরে । এখানে তার ব্যতিক্রম হয়নি, বরং পালন হয়েছে । প্রবন্ধ আমি খুব বেছে পড়ি । আজেবাজে কিনা বোঝার জন্য প্রথমে র‍্যান্ডম স্যম্পেল তুলি ।  টিপেটাপে, ঘুরিয়ে-ঘারিয়ে, দলাদলি পাকিয়ে দেখে নিই । তারপর কমপ্লিট এনুমারেসন । নইলে অন্য বই । ওপরের চকচকিয়ানায় কিছু সময় পয়সা নষ্ট হয় বৈকি।

ছবি- ব্যক্তিগত খ্যাচাক


‘স্বাধীনতাহীনতা কে ছাড়িতে চায়’ – উমহু । বেঁচে গেল ২০০ টাকা । তারপর ‘কষে গাও গীত’ । ‘বিছে হত্যার সন্ধ্যে’ ।  ‘প্রেমিকা হইতে সাবধান’ । ‘ভিনঝাঁকের কই’। ’জবরখাকির দেশে’। অ্যান্ড সো অন । পড়িনি কেবল, ‘কোমরব্যাথার ইন্টারভিউ’ । কী জানি ওটা টানতে পারিনি । প্রথম পাতা ব্যাস । তা যাই হোক ।

এ এক নতুন দুনিয়া । সত্যকার আধুনিক দুনিয়ায় বাংলা গদ্যের ও কবির পৃথিবীর এক আশ্চর্য ছটা । কমলকুমার মজুমদারের ‘বঙ্গীয় শিল্পধারা’ শিরোনামে একটা প্রবন্ধ পড়েছিলাম । ওই প্রবন্ধ আমি জীবনে ভুলব না,

“হয় কী, একটি ত্রিকোন যখন কেবলই সাদা কাগজের স্থান অধিকার করিয়া থাকে, তখন উহা তাহার নিজত্বের ভিতরেই থাকে; আমরা বেশিক্ষণ উহার দিকে চাহিতে পারি না, সঠিক কালক্ষেপের সহজ বাস্তবতা উহার মধ্যে কতটুকু; ওই বাস্তবতা অত্যন্ত নির্লিপ্ত, কোনও কিছুর নামমাত্র চিহ্ন সেখানে কই, যে আলো আর তাহার সম্বন্ধের – সমস্ত জগতের নামরূপ অন্তত বহন করিয়া আনে। এবং যে কোনও নির্দিষ্ট লোকের বাস্তবতার সহিত সহজে মিলিয়া যাইতে পারে ।”

এ যেন ঠিক তাই । চন্দ্রিল অনেকদিন পরে একজন, যিনি কমলকুমারের পরে আমার পাঠবোধকে চ্যালেঞ্জ করে বাজিমাত করে দিলেন । এর আগে শঙ্খ ঘোষের কবিতাকথার গদ্যগুলো আমাকে শৃঙ্গজয়ের স্বাদ দিয়েছিল । কিন্তু চন্দ্রিল একেবারে আলাদা । কমলকুমারের পরে এরকম ভাষাশৈলী আর কল্প ও দৃশ্যলোকের শার্লকীয় বিদগ্ধরূপ আমি কারো দেখিনি । লোকে বলবেন, পড়নি তাই জানো না, অনেকে আছেন । তাদের জন্য বলি, যখন পড়ব, জানব তখন চন্দ্রিলকে না হয় কয়েকধাপ নামিয়ে দেব । কিন্তু এখনও অব্দি, চন্দ্রিল । আর এর সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ হল, চন্দ্রিল থেকে ‘কোট’ করা যায় না । চন্দ্রিল সম্পূর্ণ পড়তে হয় ।

আজ চন্দ্রিলের দু ছক্কা পাঁচের চালে সব গুটি ঘরে ফিরে গেছে তাঁর । বাড়ুজ্জ্যে গোহারা । এটা স্পষ্ট, হয়তো চন্দ্রিলকে বক্তা হিসেবে রাখলে টিআরপি বাড়ে অথবা লোক হয় । ভিডিও সাবস্ক্রাইবার কিংবা নম্বর অফ ভিউজ বাড়তে থাকে । দু ছক্কা পাঁচেও চন্দ্রিলের বক্তব্যঠাঁট অটুট । পড়লেই বোঝা যায় চন্দ্রিল বলছেন । কিন্তু আসলে চন্দ্রিল লিখছেন এখানে। সেরকমই, চন্দ্রিলের আসলে বাস কবিতায় । কবির ভাবলোকে । আর উনি যে কবি, তা কবিতা পড়েই নয়, গদ্য পড়লেও বোঝা যায় । ওগুলো আসলে কবিতা, লোকে বলে বারোয়ারি গদ্য । 



No comments:

Post a Comment

I am waiting for your valuable comment. Please comment. Thank you..