। ৯ ।
(বিঃদ্রঃ - এটা চন্দ্রিল সমালোচনা,
চন্দ্রিল আহা কিংবা চন্দ্রিল রিভিউ নয় । চন্দ্রিলকথা বলা যেতে পারে বড়জোর । ব্যাস)
চন্দ্রিল ভট্টাচার্য মানে কিন্তু ইউটিউবের কিছু
সার্চড ভিডিও নয়- এটা প্রথম কথা । চার্লি চ্যাপলিনের ‘দ্য গ্রেট ডিকটেটর’ এর অনবদ্য
বক্তৃতার কথা নিশ্চয় সকলের মনে আছে । কিন্তু চন্দ্রিল সেরকমও কিছু নন । কেননা
চন্দ্রিল সিনেমায় সংলাপ বলেন না । তিনি রাজনৈতিক বক্তাও নন, মঞ্চে দাঁড়িয়ে ‘বন্ধুগণ’
বলে শুরুও করেন না । আবার তিনি সন্দীপ মহেশ্বরীও নন । অথচ, এখনকার বহু বাঙালি চন্দ্রিলের
উচ্চারণে, চ্যাপলিনকে পান, রাজনীতি পান, সন্দীপ মহেশ্বরীকেও পান । ব্যক্তিগত
স্বীকারোক্তিতে বলি, চন্দ্রিলের মত সুবক্তা প্রায় আর কেউই নেই । অন্তত আজ । তাঁর
বলার ধরণই জনমনে তাক লাগিয়ে দেয় । তিনি বলে চলেন দ্রুতলয়ে, বাঙালির প্রথাবদ্ধ
মিউ-মিউ ভাবেও নয় আবার ঝগড়ার তান্ডবের মতও নয় । তিনি মাত্রাবোধেও টনটনে, আবার
ছন্দোবোধেও অপরাজিত। তিনি বেছে নেন এমন কিছু শব্দ-বাক্য-রূপক-ব্যঙ্গ-শ্লেষ-প্রতিবাদ,
যা সাধারণের রোজনামচায় বহুল কিন্তু ছদ্ম-চর্চিত ।
বাবার ওপরে কথা না বলা – বাঙালির সুসন্তান হবার
প্রধান মাপকাঠি । অথচ, যুগে যুগে বাপের অবাধ্যগুলোই যুগ পালটে দিয়েছে । তা রামমোহন
হোক, বিদ্যাসাগর কিংবা সুভাষচন্দ্র । চন্দ্রিল এরকম কিছু নন । তিনি তাহলে আধুনিক
রঞ্জিত মল্লিক । রাজনৈতিক-সামাজিক অন্যায় অসততায় বিরক্ত, ভিড় বাসের
ঠেলাঠেলিতে-ঘামে বিপর্যস্ত, মেজাজচড়া বাঙালি আড্ডায় – তা সাহিত্য আড্ডা হোক বা
চায়ের দোকানের – পাত্তা না পাওয়া, পরাজিত কিছু মানুষ ঠিক যে কথাগুলো বলতে চায়
কিন্তু নিরুপায় জ্ঞানের চর্চাহীনতায়, সীমাবদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গিতে, ব্যর্থ
উপায়-শব্দ-অবকাশ অন্বেষণে । চন্দ্রিল উচ্চারণ করেন ঠিক সেইগুলি । সেই ভাবেই । এটাই
তবে চন্দ্রিল তাহলে। জনগণের ভাষা । না ! তা তো নয় । তিনি তো গণমতে আস্থার বিপরীতে
কথা বলেন, তিনি তো দেখিয়ে দেন জনগণের মধ্যে থাকা লুপহোলস । তাহলে ? আসলে তাঁর
জবানিতে থাকে, আমিও চোর তুমিও চোর কিন্তু তুমি ধরা পড়লে আমার যে আনন্দ হয়, সেরকম
আনন্দ উদযাপনের আয়োজন । তাই তিনি প্রার্থিত বক্তা । তবুও বলি, চন্দ্রিল কিন্তু ভেতরে
ভেতরে জনগণের রসিক সুবক্তা নন ।
![]() |
| ছবি- ইন্টারনেট থেকে নিয়েছি |
চন্দ্রিল কবি । অন্তর্মুখী কবি এবং নরেন্দ্রপুরীয় শিক্ষায় শিক্ষিত ও আচরণবোধের অব্যতিক্রমি দৃষ্টান্ত । আমার মনে হয়, এটাই তাঁর আসল পরিচয় । চলমান
জীবনের ওপরে থাকা - হেলিকপ্টারের মত, এরোপ্লেনের মত নয় - অত্যন্ত নিবিড় ও সন্ধানি
পর্যবেক্ষক । চন্দ্রিলের সাথে আমার প্রথম পরিচয় অবশ্যই গানের কথা দিয়ে । পরে, আমি চন্দ্রিলের
দুটো বই কিনেছি, আজ অব্দি । এক, উগো বুগো চৌকো চুগো । দুই, দু ছক্কা পাঁচ । বাকি
কিছু কিছু দেখেছি, যা দেখেছি তার মধ্যে থেকে কিছু কিছু পড়েছি । সম্পূর্ণ পড়েছি
শুধু, দু ছক্কা পাঁচ । উগো বুগো চৌকো চুগো – আমি সব পড়তে পারিনি। সেক্স ক্রমে
আসিতেছে ও ট্যালেন্ট দেখেছি । বক্তিমেগুলো শুনেছি । বারবার শুনেছি, রবীন্দ্রনাথ
শিরোনামের ইন্টারভিউ । ফলে, এর ভিত্তিতে, না চন্দ্রিল সমালোচনা করা যায়, না
চন্দ্রিল আহা বলা যায় আর চন্দ্রিল রিভিউ করার ইছে আমার নেই ।
তাহলে এটা কী ! গল্প আছে বস । আমার আদি বাড়ি
বর্ধমান । কর্মসূত্রে এখন কলকাতা শহরে ফ্ল্যাট । ফলে, আমার যা বইপত্তর সবই
বর্ধমানের বাড়িতে । সেসব বই আমি কোনোদিন আনতে পারব না এই শহরে । আসলে, মামার
বাড়িতে আমার বেড়ে ওঠা । এখন ওই বাড়িতে শুধু দিদা-দাদু । একা । আমার দিদার কাছে
আমার সারা সপ্তাহের অস্তিত্ব শুধুই আমার ঘর আর বইপত্রগুলো । ফলে কলকাতায় আমি নতুন
করে বইপত্র কিনতে শুরু করি । তাই, এ সংগ্রহে এই মুহূর্তে আমার সবচেয়ে প্রিয়
বইগুলোর প্রায় কিছুই নেই । সব নতুন । না পড়া । সুতরাং, কিছু না পেয়ে চন্দ্রিলের দু
ছক্কা পাঁচ পড়ছিলাম । আজ শেষ হল । ফলে এটা হল, শুধুই চন্দ্রিল কথা । ব্যাস ।
দু ছক্কা পাঁচ আমি কিনেছিলাম স্রেফ উৎসর্গপত্রে
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের নাম দেখে । দেখতে চেয়েছিলাম, কোন খোয়াবের দুনিয়ায় নিয়ে যান চন্দ্রিল ! পরিচয়পত্রে চন্দ্রিলের বিষয়ে যেগুলো লেখা, তা প্রথাগত জন্মসাল-হ্যানা বইয়ের
ত্যানা পুরস্কার ইত্যাদির চেয়ে ঢের ভাল । কবি-লেখকের পরিচয় তাঁর কাব্যদুনিয়ার
মুন্সিয়ানার বাহারি বহরে । এখানে তার ব্যতিক্রম হয়নি, বরং পালন হয়েছে । প্রবন্ধ
আমি খুব বেছে পড়ি । আজেবাজে কিনা বোঝার জন্য প্রথমে র্যান্ডম স্যম্পেল তুলি । টিপেটাপে, ঘুরিয়ে-ঘারিয়ে, দলাদলি পাকিয়ে দেখে নিই
। তারপর কমপ্লিট এনুমারেসন । নইলে অন্য বই । ওপরের চকচকিয়ানায় কিছু সময় পয়সা নষ্ট হয়
বৈকি।
![]() |
| ছবি- ব্যক্তিগত খ্যাচাক |
‘স্বাধীনতাহীনতা কে ছাড়িতে চায়’ – উমহু । বেঁচে
গেল ২০০ টাকা । তারপর ‘কষে গাও গীত’ । ‘বিছে হত্যার সন্ধ্যে’ । ‘প্রেমিকা হইতে সাবধান’ । ‘ভিনঝাঁকের কই’। ’জবরখাকির
দেশে’। অ্যান্ড সো অন । পড়িনি কেবল, ‘কোমরব্যাথার ইন্টারভিউ’ । কী জানি ওটা টানতে
পারিনি । প্রথম পাতা ব্যাস । তা যাই হোক ।
এ এক নতুন দুনিয়া । সত্যকার আধুনিক দুনিয়ায় বাংলা
গদ্যের ও কবির পৃথিবীর এক আশ্চর্য ছটা । কমলকুমার মজুমদারের ‘বঙ্গীয় শিল্পধারা’
শিরোনামে একটা প্রবন্ধ পড়েছিলাম । ওই প্রবন্ধ আমি জীবনে ভুলব না,
“হয় কী, একটি ত্রিকোন যখন কেবলই সাদা
কাগজের স্থান অধিকার করিয়া থাকে, তখন উহা তাহার নিজত্বের ভিতরেই থাকে; আমরা
বেশিক্ষণ উহার দিকে চাহিতে পারি না, সঠিক কালক্ষেপের সহজ বাস্তবতা উহার মধ্যে
কতটুকু; ওই বাস্তবতা অত্যন্ত নির্লিপ্ত, কোনও কিছুর নামমাত্র চিহ্ন সেখানে কই, যে
আলো আর তাহার সম্বন্ধের – সমস্ত জগতের নামরূপ অন্তত বহন করিয়া আনে। এবং যে কোনও
নির্দিষ্ট লোকের বাস্তবতার সহিত সহজে মিলিয়া যাইতে পারে ।”
এ যেন ঠিক তাই । চন্দ্রিল অনেকদিন পরে একজন, যিনি
কমলকুমারের পরে আমার পাঠবোধকে চ্যালেঞ্জ করে বাজিমাত করে দিলেন । এর আগে শঙ্খ
ঘোষের কবিতাকথার গদ্যগুলো আমাকে শৃঙ্গজয়ের স্বাদ দিয়েছিল । কিন্তু চন্দ্রিল
একেবারে আলাদা । কমলকুমারের পরে এরকম ভাষাশৈলী আর কল্প ও দৃশ্যলোকের শার্লকীয়
বিদগ্ধরূপ আমি কারো দেখিনি । লোকে বলবেন, পড়নি তাই জানো না, অনেকে আছেন । তাদের জন্য
বলি, যখন পড়ব, জানব তখন চন্দ্রিলকে না হয় কয়েকধাপ নামিয়ে দেব । কিন্তু এখনও অব্দি,
চন্দ্রিল । আর এর সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ হল, চন্দ্রিল থেকে ‘কোট’ করা যায় না ।
চন্দ্রিল সম্পূর্ণ পড়তে হয় ।
আজ চন্দ্রিলের দু ছক্কা পাঁচের চালে সব গুটি ঘরে
ফিরে গেছে তাঁর । বাড়ুজ্জ্যে গোহারা । এটা স্পষ্ট, হয়তো চন্দ্রিলকে বক্তা হিসেবে
রাখলে টিআরপি বাড়ে অথবা লোক হয় । ভিডিও সাবস্ক্রাইবার কিংবা নম্বর অফ ভিউজ বাড়তে
থাকে । দু ছক্কা পাঁচেও চন্দ্রিলের বক্তব্যঠাঁট অটুট । পড়লেই বোঝা যায় চন্দ্রিল
বলছেন । কিন্তু আসলে চন্দ্রিল লিখছেন এখানে। সেরকমই, চন্দ্রিলের আসলে বাস কবিতায় ।
কবির ভাবলোকে । আর উনি যে কবি, তা কবিতা পড়েই নয়, গদ্য পড়লেও বোঝা যায় । ওগুলো
আসলে কবিতা, লোকে বলে বারোয়ারি গদ্য ।


No comments:
Post a Comment
I am waiting for your valuable comment. Please comment. Thank you..