Saturday, 25 June 2022

ডিভোর্স একটি পজিটিভ বিষয়কেও তুলে ধরে


 

মেঘনাদ ভট্টাচার্যের পরিচালিত নাটক ‘আত্মজন’ দেখে খুবই হতাশ হলাম। কিছুটা বিরক্তও। বর্তমান, প্রতিদিন ইত্যাদি নানান কাগজে চমৎকার রিভিউ পড়েছিলাম। প্রত্যাশা ছিল ভীষণ। কিন্তু হায়!

‘মূল্যবোধের সঙ্গে বাস্তবের সংঘাত’ – শুনতে মন্দ লাগে না কিন্তু প্রশ্ন জাগে কোন্‌ মূল্যবোধের সঙ্গে বাস্তবের সংঘাতের কথা বলা হচ্ছে? নাটকে মূলত দুটি কাহিনি আছে। একটি মধ্যবিত্তের আরেকটি দরিদ্র পরিবারের। মধ্যবিত্তের বাড়ির মূল চরিত্র বসন্ত যে অতীব পিতৃভক্তির কারণে বউয়ের কাছে ডিভোর্সের কেস খেয়েছে। আর দরিদ্র পরিবারের সরমা যে স্বনির্ভর হওয়ার পরেও মদ্যপ স্বামীর নানান অত্যাচার সহ্য করেও সংসারে থেকে যেতে চায়। বসন্তের অসুস্থ পিতা অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শরৎ মুখার্জি বারেবারে উচ্চারণ করে একটি বিশেষ ডায়ালগ – স্কুলে কুড়িজন মাস্টার, সবার মত আলাদা তাঁদের নিয়ে যদি আমি চলতে পারি, আমার বাবা কলোনির সবার সঙ্গে যদি মিলেমিশে থাকতে পারে তোমরা পারো না কেন? এই ডায়ালগের দ্বারা তিনি যৌথতার কথা বলতে চান এবং তারই উচ্চকিত আর্তনাদ শোনা যায় নাটকের শেষে এই বলে যে, ফিরিয়ে দাও সেসব দিন, ফিরিয়ে দাও সেসব মানুষ।

আর এইখানেই খটকাটা এসে লাগে। তবে কি শরৎ মাস্টার কোনোভাবে স্বনির্ভর সরমার দিনের-পর-দিন মার খেয়ে স্বামীর মদের পয়সা জুগিয়ে হলেও সংসারে থেকে যাওয়ার বিষয়টিকে জাস্টিফাই করছেন নাকি আবারও স্বনির্ভর রিনা (বসন্তের স্ত্রী) যে তাঁর স্বামীর বদমেজাজ, অসুস্থ পিতার প্রতি কর্তব্যপালনে পিটপিটানি রকমের অতিসচেতনতা ও আত্মকেন্দ্রিকতাকে ত্যাগ করে নিজের জীবন নিজের শর্তে কাটানোর অভিলাষ রাখছে সেটাকে কটাক্ষ করছেন – আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয়। যদি তিনি তাইই করে থাকেন এবং সেটাকে মূল্যবোধ ও নৈতিক যৌথতা বলে দাবি করেন তবে আমার ব্যাপারটা গ্রহণে আপত্তি আছে।

সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে মূল্যবোধও বদলে যায়। সমাজপ্রগতির সেটাই শর্ত। সেটাই হল কনজারভেটিভ ও লিবারালের দ্বন্দ্ব। এখনও যদি কেউ ‘সংসার সুখের হয় রমনীর গুণে, রমণী সুন্দর হয় সতীত্ব রক্ষণে’, ‘লজ্জা নারীর ভূষণ, ‘বুক ফাটবে কিন্তু মুখ ফুটতে নেই’ কিংবা ‘পুরুষ রাগলে হয় বাদশা, নারী রাগলে হয় বেশ্যা’ ইত্যাদি কথাগুলিকে মূল্যবোধ বলে চালাতে চান তবে সেটা নিশ্চয় সমাজের পক্ষে শুভ নয়। অথবা, এখনও যদি কেউ বিয়ে করতে যাওয়ার আগে ‘দাসী আনতে যাচ্ছি’ উচ্চারণ করে তবে সেটাও কি শোভনীয়? মনে হয় না। কেননা সে-সব দিনের এ-সব মূল্যবোধ আজকে আর চলে না। আর এই কারণেই ‘আত্মজন’ যখন অ্যাডজাস্ট করে হলেও একসঙ্গে থাকার প্রতি পক্ষপাতিত্ব দেখায় তখন তা আমাদের চোখে লাগে।

ডিভোর্স নিয়ে সমাজের একটা অংশের অত্যন্ত এঁদো ধারণা বদ্ধমূল আছে। তারা মনে করে যে ডিভোর্সের প্রবণতা সমাজকে অনৈতিক, দায়িত্বজ্ঞানহীন ও মূল্যবোধহীন করে তুলবে। এটা অত্যন্ত্র গোঁড়া মত। একথা সত্য যে অন্যান্য দেশের তুলনায় ভারতে ডিভোর্স রেট কম। কিন্তু সময়ানুক্রমিক বিচার করা হলে দেখা যায় যে, ১৯৮৮ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে এ-দেশে ডিভোর্স রেট অনেক বেড়েছে, ডবলের ডবল। কেবলমাত্র ২০১১ সালের সেনসাসের তথ্যকেই যদি সামনে রাখা যায় তবে অবস্থাটা স্পষ্টতর হয়। মহারাষ্ট্র, গুজরাট, পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরপ্রদেশ ও অন্ধ্রপ্রদেশ হল প্রথম পাঁচ রাজ্য যেখানে ডিভোর্স অত্যন্ত বেশি। কিন্তু এটা যতটা না নেগেটিভ খবর তার থেকে অনেক বেশি হল পজিটিভ খবর। কেন, একে একে বলা যাক।

তথ্যকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়,

  • ·         অল্প বয়সে যারা বিয়ে করে তাদের মধ্যে ডিভোর্স হয় সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে মহিলারা যারা অল্প বয়সেই বিয়ে করেছেন তারা পুরুষের থেকে বেশি ডিভোর্স-প্রবণ।
  • ·         কর্মরত ও স্বনির্ভর মহিলারা ডিভোর্স-প্রবণ।
  • ·         মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারগুলিতে যেখানে আর্থ-সামাজিক অবস্থানে মেয়েরা এগিয়ে যেতে পেরেছে সেখানে ডিভোর্সের প্রবণতা বেড়েছে। বিশেষ করে নগর, মহানগরগুলিতে বসবাসকারী মহিলাদের ক্ষেত্রে এটা বিশেষ দ্রষ্টব্য।
  • ·         শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্যারামিটার। দেখা যাচ্ছে যে, অন্তত যারা কলেজ-শিক্ষায় শিক্ষিত তাদের মধ্যে ডিভোর্সের পরিমাণ বেশি। এখানেও উঠে আসে মহিলাদের কথাই। শিক্ষিত মহিলারা এই ব্যাপারে উদ্যোগী হয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে।

ডিভোর্সের কারণ হিসাবে পাওয়া যায়,

  • ·       গৃহবিবাদ ও সহিংসতা
  • ·         পুরুষতান্ত্রিক নিষ্ঠুরতা
  • ·         স্বামীর মদ্যপান
  • ·         সামঞ্জস্যের সমস্যা (বিশেষ করে যৌথ পরিবারে)
  • ·         ক্রমবর্ধমান ব্যক্তিবাদ
  • ·         বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক
  • ·         পণ

উপরের কথাগুলি বলা হল অনিশ থাদাথিল ও সুজাতা শ্রীরামের একটি গবেষণাপত্রকে ভিত্তি করে। সুতরাং, তথ্য ও তত্ত্বের দিক থেকে ত্রুটি কিছু নেই। এখন প্রশ্ন, পুরানো মূল্যবোধ ও নৈতিকতাকে রক্ষা করে যৌথতাকে টিকিয়ে রাখতে নারীদের তবে কী করা উচিত – তারা কি,

  • ·         অল্প বয়সের ভুল বুঝতে পেরেও পুরোজীবনটাকে উৎসর্গ করবে সংসারের পায়ে নাকি
  • ·         কাজকর্ম ও রোজগার করা ছেড়ে দিয়ে স্বামীর ও স্বামীর পরিবারের পদসেবা করবে নাকি
  • ·         গরীবের মতো গ্রামে পড়ে থাকবে নাকি
  • ·         শিক্ষার অধিকার জলাঞ্জলি দিয়ে মূর্খ সেজে থাকবে নাকি
  • ·         গৃহবিবাদ ও সহিংসতা, পুরুষতান্ত্রিক নিষ্ঠুরতা, স্বামীর মদ্যপান, সামঞ্জস্যের সমস্যা (বিশেষ করে যৌথ পরিবারে), ক্রমবর্ধমান ব্যক্তিবাদ, বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক ও পণ ইত্যাদিকে অবস্থাকে মেনে নেবে ?

একটু লক্ষ্য করলেই বোঝা যায় যে, বর্ধিত ডিভোর্স যা সাধারণত মেয়েদের তরফ থেকে আসছে তা আদতে মেয়েদের সক্ষমতা অর্থাৎ উইমেন এমপাওয়ারমেন্টের ধারণাকে মজবুত করছে। মেয়েরা আর নিজেদের কারও দাসী হিসাবে রাখতে চাইছে না। স্বামীর পরিবারের সেবা করার জন্য মেয়ের জন্ম হয়নি (স্বামীটি কি মেয়ের বাড়ির লোককে একইভাবে সেবা করবে, চাকরি ছাড়বে সন্তান মানুষ করার জন্য ইত্যাদি প্রশ্ন তো থাকেই) । তাই বলে সেবা-শুশ্রূষাকে অবহেলার কথা কে কইচে? ব্যক্তিজীবন, দাম্পত্য ও পরিবারের প্রতি কর্তব্য এই ত্রয়ীকে যারা সমভাবে সমসুরে বন্টন করতে পারে না সেখানে ডিভোর্স অনৈতিক ও মূল্যবোধহীন হতে পারে না। আর যদি ‘আত্মজন’ এটাকে অনুধাবন করতে না পারে তবে এই নাটক ক্লিশে, মেলোড্রামাটিক ও অনগ্রসরমন্যতার প্রতীক হয়ে থেকে যায়। পরিচালকের দক্ষতা অনবদ্য হলেও বক্তব্যের আবেদন বাস্তবের অবস্থার সঙ্গে এক অসেতুসাধ্য দূরত্বে পৌঁছে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে সংঘাতে জড়ায় বৈকি। এটা অন্তত ‘সায়ক’-এর মত দলের কাছে অনভিপ্রেত। নাটকটি যেন একুশ শতকের চেহারার বিপরীতে যাত্রা করে এক অনড়ত্বের অবস্থানকেই স্পষ্ট করে – এটা আমাদের শুধু ভাবায় না, বেদনাহতও করে। এইখানেই মনে পড়ে বিভাস চক্রবর্তীর নাটক ‘ছোট ছোট বাড়ি’-র কথা। সেই অনবদ্য অনুভূতির কথা অন্যত্র আলোচনা করা যাবে। আজ থাক্‌।


Follow me: Ardhendu Banerjee Official


কবিতার ক্লাস ও কিছু স্মৃতি

 

তখন আমার কতইবা বয়স হবে – সতেরো বা আঠারো। ওই বয়সে বেশিরভাগ বাঙালি যুবক-যুবতীই দুটো জিনিসের খপ্পরে পড়ে – এক, বঙ্গীয় আগমার্কা কমিউনিজম আর দুই, কবিতা। এ-যেন শিবরাম চক্রবর্তীর ‘ঈশ্বর, পৃথিবী আর ভালোবাসা’-এর মতোই আরও দুই মারাত্মক ব্যাধি যা “তেমন করে ধরতে পারলে (..) কাউকে ছাড়ে না, রেহাই দেয় না সহজে, আজীবন ভোগায়, আপাদমস্তক গ্রাস করে বসে”। তাই, “কৈশোরেই কারো যদি এসবের টিকা নেয়া হয়ে যায় - খানিক খানিক স্বাদ পায় সেতো জন্মের মতই বেঁচে গেল বেচারা!” আর তা না-হলে, “জীবনের মতন ছাড়ান নেই”।

আমি সৌভাগ্যবান যে এই দুয়েরই হাত থেকে কোনো এক পুণ্যফলে রক্ষা পেয়েছি। মনে পড়ে সেবার এক কবিতা উৎসবে কবি দেখার জন্য গিয়েছিলাম। তার আগে কি কবি কি লেখক কাউকেই কোনোদিন সামনে থেকে দেখিনি। শুধুমাত্র বই-পত্রিকার পাতাতেই যতটুকু পরিচয় হবার তা হয়েছিল। তাছাড়া সে-বয়সে আমিও তো লুকিয়ে-চুরিয়ে কবিতার মতো সাজানো কিছু লাইন লিখতুম, মনে-মনে একটা ব্যাপারও যে হত না তা নয়। তাই একটা উচ্চ-ধারণা সঙ্গে নিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলুম যথাস্থানে যথাসময়ে। সকাল দশটা থেকে সে-অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল, শুনেছিলাম তা নাকি চলেছিল বিকাল ছ-টা অব্দি। কে জানত তখন যে এটাই আমার জীবনের মহাটিকাকরণের বিশেষ দিনে পরিণত হবে। বললে বিশ্বাস করবেন না, বাপরে-বাপ, কবি তো নয়, সে-এক কবির চিড়িয়াখানা দেখে এলুম। আড়াইশো কবির প্রায় সকলেই মাইক হাতে “আমি আমার স্বরচিত একখানি কবিতা পড়ছি” বলে যা শোনাল ভদ্রতার খাতিরে ছ-টা অব্দি বসে থাকলে কান থেকে রক্তপাত হয়ে শ্রবণশক্তিহীন হয়ে যাওয়া আর কেউ ঠেকাতে পারত না। পিকনিকের মাংসের অর্ডার এলে যেমন দোকানদার কসাইয়ের হাতে পরপর মুরগি সাপ্লাই করতে থাকে, আর মুরগিগুলো জবাই হয়ে যাওয়া পূর্ববর্তীদের অবস্থা দেখে ঝটাপটি লাগায়, কিন্তু কেউই পালিয়ে আসতে পারে না। আমার অবস্থাও অনুরূপ হয়েছিল। কোনোক্রমে দোকানদারের হাতে যাওয়ার আগেভাগেই তাই আমি দে-ছুট বলে বাপের নামখানি বাঁচিয়েছিলাম। আর সে-পথ মাড়াইনি। আজও না। খুব সযত্নে এড়িয়ে চলি সে-মহল।

তবে তখনও বঙ্গীয় আগমার্কা কমিউনিজমের হাত থেকে রক্ষা পাইনি। সেটা পেয়েছিলুম আরও কয়েকবছর পরে। অনেক ঘাটের জল খেয়ে তারপরে। সে-কথা এখানে বলার নয়। সুযোগ হলে পরে বলব। তবে যেটা বলতে পারি আমি স্বার্থপর ছিলুম না। নিজেই কেবল পালিয়ে বেঁচেছিলাম তা নয়। প্রথম প্রথম চেষ্টা করেছিলাম যারা এখন (মুরগির) ছানা দশায় আছে, তাদের রক্ষা করতে। দু-একজনকে বাঁচাতেও পেরেছিলাম। তারা এখনও গুরুদক্ষিণাবাবদ কখনও-সখনও দেখা হলেই রোস্ট করা চিকেন আর ঠাণ্ডা বিয়ার খাইয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। আর বেশিরভাগকেই যাদের প্রথমে মনে হয়েছিল বেঁচে গিয়েছে, পরে দেখেছি সম্পূর্ণ রক্ষা করা যায়নি। জবাই হতে না-পারার খেদ-ক্রন্দন এখনও তাদের বুকে হা-হা করে যেন। তা কী করেছিলাম আমি, এইবারে সেটা বলি।

পরিচিত তিনটি বড় দোকানের মালিকের থেকে বিজ্ঞাপণ তুলেছিলাম ৯০০ টাকা। সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিলাম নিজের জমানো কিছু। প্রথম সংখ্যা ‘বিবক্ষিত’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল। সালটা ২০১২। ট্যাবলয়েড, চারপাতা। ২০০ কপি। তখন আমার হাতে ছিল নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ‘কবিতার ক্লাস’ বইটি। এত সহজ বই আমি আর পড়িনি। মনে করি যারাই ‘কবিতা’ নামক রোগে গ্রস্ত, আরোগ্যের ইচ্ছাও সবিশেষ নেই কিন্তু মোটের ওপর জীবনের বেশিরভাগটাই একটা শান্ত-নিবিড় সুখের মধ্যেই কাটাতে চায়, অর্থাৎ বলি হলেও যেন অ্যানাসথেসিয়ার ডোজ নিয়ে হয় এমন প্রার্থনা করে, তাদের সকলেরই প্রাথমিকভাবে অন্তত এই বইটি পড়া দরকার। নইলে রক্তও বেরুবে, যন্ত্রণাও হবে। কেউ রক্ষা করতে পারবে না। সে-বয়সে নিজেকে মসিহা হিসাবে ধরে নিয়ে সটান ফোন করেছিলাম নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীকে। তিনি তখন ব্যস্ত তাঁর আত্মজীবনী লেখার কাজে। তাঁকে খোলসা করে উদ্দেশ্যটার কথা কইলুম। বললুম একটা লেখা যদি তিনি দিতে পারেন তবে খুব উপকার হয়। অব্যর্থ বটিকা পাওয়া যায়। তিনি প্রথমে খুব করে হাসলেন। বললেন, অনেকদিন পরে এইরকম ফোন তিনি পেলেন। তিনি ভারি খুশি হয়েছেন। বেশ কিছুক্ষণ কথা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, এমনিতে তাঁর যা বয়স ও সে-বয়সের নানান অত্যাচার তাঁকে সহ্য করতে হয়, সঙ্গে আবার আছে আত্মজীবনী লেখার কাজটাও, এই মুহূর্তে নতুন করে লেখা দেওয়ার ধকল সইতে পারবেন না। তবে তিনি একটা উপায় বলে দিলেন। তাঁর বই থেকে ও অন্যান্য নানান জায়গা থেকে কীভাবে সম্পাদনা করলে আমার কাঙ্ক্ষিত লেখাটি পাওয়া যাবে। আমি ভারি খুশি হয়েছিলাম এবং তাঁরই বাতলে দেওয়া রাস্তা অনুসরণ করেছিলাম। এইভাবে তিনটি সংখ্যায় তাঁর লেখা সম্পাদিত পুনর্মুদ্রণে ভাগে-ভাগে প্রকাশিত হয়েছিল। শেষবারের বেলা তাঁর সঙ্গে আরেকবার ফোনালাপ হয়েছিল। সেই শেষ। আর হয়নি।

সে-সময় আমাদের মফঃস্বলে চিন্তাশীল প্রবন্ধের কাগজ প্রকাশিত হত না। যা হত সবই প্রায় ‘পারস্পরিক পিঠ চাপড়ানি’ সমিতির সদস্য ও তল্পিবাহকদের দ্বারা প্রকাশিত ‘স্কুল ম্যাগাজিন’ গোত্রের কিছু কবিতার কাগজ। সেখানে কিছু গদ্য-প্রবন্ধ থাকত ঠিকই কিন্তু সে-সবের মান কহতব্য কিছু নয়। এখনও যদিও সেই ধারাই মূল। তবে কিছু পরিবর্তন অবশ্যই হয়েছে। এবং বলা ভালো তা পজিটিভ দিকেই। এখন কিছু অনবদ্য কাজের দেখা সহজেই মেলে। আগে গরু খোঁজার মতো করে খুঁজলেও যা মিলত না।

আজ বহুদিন পরে এখানে এসে পুরানো আলমারি-তাক ঝাড়াঝাড়িতে বইটা বেরিয়ে পড়ল। কিছু ধুলো ঝরে পড়ল, কিছু স্মৃতিও। কত কথাই না মনে এল, কত বন্ধুজন, কত শত্রুরাও। তবে আজও আমি কবিদের ধারপাশ মাড়াই না। আর কবিতা সেও পড়ি না। কেননা জঞ্জালের পাহাড় সরিয়ে পুষ্প উদ্ধারের জন্য বেহিসাবি সময় আর মহানুভব ইচ্ছা কোনোটাই আমার নেই। মনে পড়ে ‘বিবক্ষিত’ ২০১৭ সালের সংখ্যার জন্য কবিতা বিষয়ে একটি লেখা চেয়ে ফোন করেছিলাম অচিন রায়কে। তিনি সরাসরি অস্বীকার করে বলেছিলেন একই কথা যে, এ-বিষয়ে সময় নষ্ট তিনি করবেন না। তিনি অন্য বিষয়ে লেখা দিয়েছিলেন। কয়েকমাস আগেও কথা হল, তাঁর অভিমত আজও বদলায়নি। আমারও নয়। সুধীন্দ্রনাথ দত্তও ১৯৩০ সালে তাঁর ‘কাব্যের মুক্তি’ প্রবন্ধে একই কথা লিখেছিলেন। তাছাড়া আট বছর আগেই যখন ডানা জোইয়ার ‘ক্যান পোয়েট্রি ম্যাটার’ বক্তৃতাটির বাংলা অনুবাদ পেয়েছিলাম আর ‘কবিতা ও পাঠক : একটি মৃতপ্রায় মাধ্যমের আখ্যান’ নামক প্রবন্ধ লিখিয়েছিলাম সৈয়দ কওসর জামাল সাহেবকে দিয়ে – তখন থেকেই জানতাম যে কবিতা ইতিমধ্যেই একটি মৃত মাধ্যমে পরিণত হয়েছেতবে চারপাশে কবিতার নামে যে মহোৎসব চলছিল-চলছে-চলবে, তা তার শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের বিলাসিতা ছাড়া আর কিছুই নয়। সুনীলীয় যুগের ইলিউসনে কাতর বাঙালি নব্যকবিকূলের (দু-একজন ব্যতিক্রমকে উদাহরণের অন্তর্গত না করাই শ্রেয়) যে-আবেগ চারপাশে ঘন হয়ে দেখা যাচ্ছে তা শেষযাত্রায় হরিনামসংকীর্তনের আসরে থাকা চোখ-বন্ধ মাথা-দোলানো ভিড়ের ঘোরমাত্র। এর ভবিষ্যৎ কব্জি ডুবিয়ে খাওয়ার হাঘরেপনাতেই শেষ হবে। ভাস্কর চক্রবর্তীর অমোঘ লাইন তাই মনে পড়ে,

“এলো মাতব্বর, এলো মূর্তিমান ভণ্ড, মাথামোটা –

গোঁফে দুধ,

লিখে দিল দু-কলম : কাহাকে কবিতা বলে এবং বলে না –

মঞ্চজুড়ে দাপাদাপি, অন্ধজিভ-ভাষা নেই, ভালোবাসা নেই –

আছে এক সাধের আহ্লাদ, দাও

শেষ করে দাও –

-শেষ? আহা, মাথার জটিল রক্তস্রোত, শেষ হবে কবে?

শেষ হতে হতে তবু হাসি নিয়ে, হে সুন্দর, জেগে উঠি আমি –

পড়ো-কি পড়ো-না লেখা জানিনা, জেনেছি মাত্র এই

সকলেই কবি আজ – শুধু কেউ কেউ নয় কবি।”

 

কিন্তু আজও কি এই বই পড়ে কেউ বাঁচার চেষ্টা করবে – সত্যই জানি না।

 Follow me : Ardhendu Banerjee Official


আরও বইকথা

Source Internet

গতকাল "সোনার বই"-এর কথা লিখেছিলাম এই গ্রুপে। ইট্রুস্কান সভ্যতার অত্যাশ্চর্য সব রহস্যময়তা নিয়ে ছিল সেই কাহিনি। অনেক পাঠকের ভালো লেগেছে জেনে আনন্দিতও হয়েছি। তাই আজ আরেকরকম বইয়ের কথা জানাচ্ছি। খুব বিশদে আজ আলোচনা করছি না। পরে অবশ্যই লিখব। আজ শুধু খবরটুকু দিচ্ছি।

আসলে বই ছাড়া বয়ে যায় না সময় ও সভ্যতা। বইই ধরে রাখে স্মৃৃতি ও শ্রুতির আলেখ্যটিকে। যেভাবেই হোক সেটাকে পাঠ করতেই হবে। কথাতেই আছে, নান্য পন্থা বিদ্যতে অয়নায়। বাংলার সমাজে মাইকেলের হাত ধরে পাঠকের যে নতুন যাত্রা শুরু হয়েছিল, তাকেই বিবর্ধিত করেছিলেন বঙ্কিম। সেই ধারাই তো চলছে আজও।পাঠের বিবর্তনই তো গড়েছে/গড়বে সভ্যতার সৌধ। আর তাতে বাঙালির যোগদান ঠিক কতখানি - এটির অনুসন্ধানই ছিল আমার প্রথম বই "পাঠতন্ত্র"-এর উদ্দিষ্ট। যতটুকু পেরেছি করেছি। চেষ্টা থাকবে আরও গভীর অন্বেষণের।

আপাতত আজকে একটি অন্য রকমের বইয়ের ছবি দিই। এটিকে 1590 CE তে তৈরি করা হয়েছিল। এখন রাখা আছে জার্মানির ফোর্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে।

 

Follow me : Ardhendu Banerjee Official


বইয়ের অন্য দাস্তাঁ

 

Source Internet

বই নয়, আজ একটি বইয়ের ‘কভার’ নিয়ে দু-চার কথা লিখব। আসলে মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কারের আগে বেশিরভাগ বইই ছিল হস্তনির্মিত। তাই আজকের দিনে ‘কভার’ বা প্রচ্ছদ বলতে যা বোঝায় তার থেকে অনেকখানি আলাদা ছিল তখনকার ব্যাপারটা। শিল্পসমৃদ্ধতার দিক থেকেও সেগুলির ছিল বিশেষ আকর্ষণ। মধ্যযুগের কথাকেই যদি বিচার করা হয় তাহলেই আমরা দেখতে পাই এক অন্য দাস্তাঁ। পার্চমেন্টের জন্য পশুচর্মের ব্যবহার ছিল এর প্রধানতম দিক। এছাড়া বহু পরিশ্রমে সৃষ্টি করা চিত্র, খোদাই, অলংকারের ব্যবহার ইত্যাদি একে মানবসভ্যতার পাঠের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করেছে।  

বিশেষ করে বাইজানটাইন আইভরির বা হস্তিদন্তের কারুকার্যগুলি মনকে যেন এক অদ্ভুত উত্তেজনায় টেনে নিয়ে যায়। এরকমই একটা ‘কভারের’ সন্ধান মেলে ১৯১৭ সাল নাগাদ। তখন তার বয়স প্রায় সহস্র বছর। নিচে তার কয়েকটা ছবি দিলাম। ছবিতে ক্রুশবিদ্ধকরণের দৃশ্যের খোদাই করা কাজ দেখা যাচ্ছে। ভার্জিন ও জনের (জন দ্য ইভাঞ্জেলিস্ট) চিত্রও দু-পাশে খোদিত হয়েছে যাঁরা জিশুর আত্মত্যাগের স্বীকৃতির কথা ঘোষণা করছেন। জিশু তখন মুদ্রিত নেত্র, অর্থাৎ মৃত। তাঁর মাথার দু-পাশে দুই দেবদূতের আবক্ষ মূর্তিও দেখতে পাওয়া যাচ্ছে যারা চন্দ্র ও সূর্যের কিরণের প্রতীক হিসাবে বিদ্যমান।

Source Internet


এটি নির্মিত হয়েছিল কনস্ট্যানটিনোপলে। উচ্চতা ২৬ সেন্টিমিটার, আর আইভরি মূর্তির দৈর্ঘ্য ১৩ সেন্টিমিটারের কিছু বেশি। কাঠের ভিত্তিভূমিতে রূপোর গিল্টি করা, হাতির দাঁতের মূর্তি ও চারপাশে নীলকান্তমণি, কাচ এবং স্ফটিকের উজ্জ্বল উপস্থিতি এই গসপেলের এই কভারটিকে অনন্যতা দান করেছিল। পরবর্তীকালে যদিও এটাকে সান্তা ক্রুজ়ের বেনেডিক্টাইন মঠে নিয়ে আসা হয়েছিল। এই মঠ সম্বন্ধে কথিত আছে যে, এটা নাকি রানি ফেলিসিয়ার দ্বারা নির্মিত। কে এই রানি? আরাগন ও নাভাররের রাজা পঞ্চম সাঞ্চোর পত্নী। তখনই সম্ভবত এটিকে বইয়ের কভার হিসাবে ব্যবহার করার জন্য আরেকটি ভিত্তির ওপরে দাঁড় করানো হয়েছিল।

একটি ‘কভার’ যে কতকিছুর ইতিহাসকে বয়ে নিয়ে যায় তার ইয়ত্তা নেই। মনে পড়ে, আমার প্রথম বই ‘পাঠতন্ত্র’-এর কভার করেছিলেন বিখ্যাত শিল্পী সনাতন দিন্দা। তাঁকে ছাড়া বইটি কিছুতেই সম্পূর্ণ হতে পারত না। তাঁর প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই। বইয়ের বিষয়বস্তু শুনে তিনি আমার এক কথাতেই রাজি হয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু এই প্রচ্ছদ আঁকা তাঁর পক্ষে সহজ হয়নি। কেননা সে-সময়ে তাঁর জীবন খুব টালমাটাল হয়েছিল। আমরা চারিদিকে কত কথাই তো শুনি, বেশিরভাগকেই পাত্তা দিই না। কিন্তু শিল্পীর জীবনের ঘটনাগুলিকে এভাবে হারিয়ে যেতে দেওয়া হয়তো ঠিক নয়। আপনাদের মনে থাকবে, গতবছরের মাঝামাঝি, ওই পুজোর আগে-আগে, সনাতন দিন্দার একটি ছবি নিয়ে খুব রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক বিতর্ক হয়েছিল। সে-মাত্রা এতটাই ছাড়িয়েছিল যে জীবনের হুমকি পাওয়া থেকে শুরু করে অকথ্য গালিগালাজ সহ নানান অত্যাচার তাঁর উপরে নেমে এসেছিল। সে এক তীব্র মানসিক চাপ ও যন্ত্রণায় তিনি সে-সব দিন কাটিয়েছেন। খুবই কম শিল্পীই তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করেছিলেন সে-দিন। এটা আমাদের শুধু বিস্মিত করেছিল তাইই নয়, যন্ত্রণাবিদ্ধও কম করেনি। সেই সময়েও সনাতন দিন্দা আমার মতো অনামা অখ্যাত একজন শখের লেখকের বইয়ের প্রচ্ছদটি করে দিয়েছিলেন। ‘পাঠতন্ত্র’-এর প্রচ্ছদের ইতিহাসের সঙ্গে তাঁর জীবনের সেইসব দিনগুলিও জুড়ে গিয়েছে। আজও যখনই এই প্রচ্ছদ দেখি, মনে পড়ে আমাদের দেশের এই সময়ের সাম্প্রদায়িকতার ভয়াবহ কাহিনিটিও। সত্যই এ এক অদ্ভুত সময়। কিন্তু এইখানেই আরেকটি বিস্ময় লুকিয়ে আছে।

Source Internet


আসলে পাঠের ইতিহাসের রোমাঞ্চকর কাহিনি শুধু বইই নয় তার প্রচ্ছদও বহন করে। তাই শেষ করি আরেকটি দিক উদ্ভাসিত করে। নিচের ছবিটিকে আরও ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, জিশুর বাঁ-পাশে একটি নীলকান্তমণি জ্বলজ্বল করছে। আর ওই নীলকান্তমণিটির গাত্রে আল্লাহ্‌র নিরানব্বইটি নামের চারটি খোদিত আছে। কী অভুত বিস্ময়ের ব্যাপার, তাই না!


Follow me: Ardhendu Banerjee Official


Sunday, 15 May 2022

এক টুকরো অ-ভারতবর্ষ

“অলীক প্রেমকথা” নাটকের একটি দৃশ্য

 

“অলীক প্রেমকথা”-এর সফল মঞ্চায়ন হল গতকাল। নাটকটি লিখেছেন পুষ্পল মুখোপাধ্যায় আর ময়ূখ দত্তের পরিচালনায় মঞ্চস্থ করেছে “বহুস্বর”। নাটকটির সময় ১ ঘন্টা ৪০ মিনিট। এই ১০০ মিনিটে দাপুটে ১০০ রান করেছে বলেই অন্তত আমার অভিমত। “অলীক প্রেমকথা” এক হিন্দু-মুসলমানের প্রেমের কাহিনি। কিন্তু নাট্যকার এটাকে দেখতে চেয়েছেন কেবলমাত্র এক যুবক-যুবতীর ভালোবাসা হিসাবেই, অর্থাৎ, এখানে প্রেমটাই হল শেষ কথা। হিন্দু কি মুসলমান অথবা জৈন না পার্শী সে-সব ধর্তব্যের বিষয় নয়, মোদ্দা বিষয় অন্যান্য পরিচয়ের উর্ধে উঠে দু-জন মানুষ একে-অপরকে ভালোবাসে, ব্যাস। একইসঙ্গে পারিপার্শ্বিক ঘটনাক্রমে নাট্যকার একটি ছোট্ট গ্রামের ক্যানভাসে বর্তমানের গোটা ভারতবর্ষের চিত্রটিকে আঁকতে চেয়েছেন। সে-চিত্র অবশ্যই রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা-দুরাবস্থার কথা বলে। সেখানে এনআরসি থেকে লাভ জিহাদ, গো-মাতা থেকে রাম মন্দির, বিফ থেকে গরুপাচার, দাঙ্গা থেকে খুন ইত্যাদি সবই আছে।

নাটকের শুরুতেই দেখা যায় প্রাচীন জমিদারের বংশোদ্ভূত এক নব্য-রক্ষণশীল চরিত্রকে যে গেরুয়াতন্ত্রকে ঢাল করে সমাজের শাসক হয়ে ওঠার প্রত্যাশী। আর দেখা যায় তার একজন শাগরেদকে যার নাম রতন। জমিদারের রক্ত ধমনিতে যখন টগবগ করে ফোটে, তখন কণ্ঠ যে-সমস্ত হুকুম জারি করে, সে-সবকিছুকে ঠিকঠাকভাবে কার্যকর করে রতন। রবীন্দ্রনাথের ‘দুই বিঘা জমি’-এর সেই লাইনটির – “বাবু যত বলে পারিষদ-দলে বলে তার শতগুণ” - মতোই এখানেও রতন কিছুটা বেশিই সক্রিয় ও উদ্যোগী। সেই-ই গ্রামের সমস্ত কিছুতে নজরদারি চালানোর কাজটি করে। কে কাকে মাছ দিল, কে কাকে কী বলে সম্বোধন করল, কে কার হাত ধরল, কার কাছে কী কাগজ আছে বা নেই, কে কীসের মাংস খাচ্ছে ইত্যাদি সবদিকে নজর রাখা ও ইয়ার্কির ছলে ব্যাগড়া দেওয়াই রতনের কাজ। এরাই হল নাটকের মূল অ্যান্টাগনিস্ট বা দ্বিষৎ চরিত্র। পক্ষান্তরে নাটকটির প্রোটাগনিস্ট হল এক যুবক ও যুবতী। যুবতীটি এক হিন্দু ব্রাহ্মণ পুরোহিতের আর যুবকটি মুসলমান বাড়ির সন্তান। ময়না কলেজে পড়ে আর সাগির ডাক্তার। দুজনেই অরুণ-জয় প্রমুখের কবিতা পড়ে। একজন স্বপ্ন দেখে গ্রামে স্কুল খোলার, আরেকজন দেখে গরীবের সেবা করার জন্য দাতব্য হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করার। অর্থাৎ বলাই যায় যে, নবজাগরণের প্রভাবে যেমন বাংলার সমাজে এক প্রগতিশীল সংখ্যালঘুর সৃষ্টি হয়েছিল, অথবা, বামপন্থার প্রভাব যেমন এক অন্য প্রগতিমার্গের জন্ম দিয়েছিল, এরা দু-জন সেইসব প্রগতিশীল মানসিকতারই নব্য-প্রতিনিধি। এই দু-জনেরই প্রেম হয়। দু-জনেই আনন্দিত, দু-জনেই ভীত। ময়না স্বপ্ন দেখে যে, তাদের প্রেমের কথা জানতে পেরে বাবা তাকে বলি দিচ্ছে, ভয়ে আঁতকে ওঠে সে। সাগিরও স্বপ্ন দেখে। সে কিন্তু আব্বা-আম্মি কাউকে দেখে না, সে দেখে হিন্দু সমাজের রে-রে করে তেড়ে আসার স্বপ্ন, সেও স্তব্ধবাক হয়। নানান ঘটনার মধ্য দিয়ে নাটক এইভাবেই এগোতে থাকে যবনিকা পতনের দিকে। অন্তিমে আমরা দেখি যে, ময়নার বাবার আর্তিতে সাড়া দিয়ে জমিদারির প্রতিভূ চরিত্রটির দাঙ্গা লাগানোর ও গণপিটুনি দিয়ে সাগিরকে হত্যা করার পরিকল্পনার ব্যর্থ হয়ে যাওয়া। প্রশ্ন ওঠে, কীভাবে ব্যর্থ হয়? কেন হয়? গোটা গ্রামের মনস্তত্বই কি তবে পাল্টে গেল? কে পাল্টাল? প্রশ্নগুলির উত্তর মেলে শেষে, সেটার জন্য নাটকটিকে দেখতে হবে। এক টান-টান উত্তেজনা আর তীব্র প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে নব্য-রক্ষণশীল ও নব্য-প্রগতিশীলের দ্বন্দ্বমুখর নাটকটি শেষ হয়। দর্শক হিসাবে আমরা মুগ্ধ হই, কেননা যেমন নাটকের সঙ্গীতাবহ তেমনই আলোকসজ্জা আর তেমনই অভিনয়। সব মিলিয়ে পরিচালকের চমৎকার উপস্থাপনা নাট্যকারের কলমটিকে যেন বাগ্ময় করে তোলে এক-লহমায়।

কিন্তু এইখানে কয়েকটা খটকাও আমাদের মনে এসে ধাক্কা দেয়। আমি মূলত দুটির কথা বলব। লেখক হিন্দু-মুসলমান কেন্দ্রিক যে রাজনীতিটিকে দেখাতে চেয়েছে তা নতুন নয়। তা ভারতবর্ষের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোত সংশ্লিষ্ট। কিন্তু আবার সেই পুরানো ঘটনাকে নতুন করে দেখানোর উদ্দেশ্য কী? আসলে বিগত কয়েক বছরে এই রাজনীতি দেশের বুকে এক আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। অজস্র হত্যা ধর্ষণ ও নানান প্রকারের বিধিব্যবস্থা ভারতবর্ষের শান্তিকে বিঘ্নিত করেছে। লেখক স্বভাবিকভাবে তারই বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে চেয়েছেন। আমরাও তাইই চাই। কিন্তু লেখক কয়েনের উলটো দিকটা দেখেননি, দেখাননি। আমরা সেটাও দেখতে চাই। ইতিহাস বলে, হিন্দুরাই দীর্ঘকাল মুসলমানের শাসনে বসবাস করেছিল। মুসলমানরা করেনি। আমরা পৃথ্বীরাজ চৌহানকে বিস্মৃত হতে পারি না। বঙ্কিমচন্দ্রকেও কি পারি? মনে রাখা দরকার যে, আজও এদেশে হিন্দুদের ওপরে মুসলমানের অত্যাচারের ঘটনার তথ্যভাণ্ডার নেহাত মামুলি নয়। এছাড়া হিন্দুর ও মুসলমানের নিজেদের ভেতরেই উচ্চবর্ণ-নিম্নবর্ণের অত্যাচারও কম নয়। লেখক সেগুলিকে আপাতত দেখতে বা দেখাতে চাননি। ভারতবর্ষের বেশিরভাগ লেখকই সেটা দেখতে বা দেখাতে চান না। কেন, জানি না। হয়তো সেক্যুলারিজমের ভারতীয় সংস্করণেই তাঁরা বিশ্বাসী। তবে এইখানেই আমার একটি প্রশ্ন থাকে যে, আমরা কোন পক্ষ নেব – মুসলমানের বিরুদ্ধে হিন্দুর কিংবা হিন্দুর বিরুদ্ধে মুসলমানের নাকি অত্যাচারীর বিরুদ্ধে অত্যাচারিতের? এখানে অনেকে সংখ্যার কথা বলবেন। দেখাতে চাইবেন, মুসলমানের বিরুদ্ধে হিন্দুর আক্রমণের সংখ্যাধীক্যকে। কিন্তু আমার বক্তব্য, যতদিন আমরা এই সংখ্যাকে নিয়ে মাতামাতি করব ততদিন এই জাতপাত-ধর্মের দ্বন্দ্ব কাটবে না। আমাদের এইবারে পুরানো কাসুন্দি ছেড়ে নতুন কিছু ঘাটতে হবে। মানুষের বিরুদ্ধে যেখানেই অন্য মানুষকে অত্যাচারীর ভূমিকায় দেখব তারই প্রতিবাদ জানাতে হবে। আছিলা অথবা পরিচয় দেখলে হবে না আর। একখানি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথাই তাহলে বলি।

বছর কয়েক আগে তিন বন্ধু - একজন ডাক্তার একজন গবেষক একজন ইঞ্জিনিয়ার - মিলে নিজেদের পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছিল। আচমকা আরেকটা ছেলে প্রায় টলতে-টলতে এসে পাশে দাঁড়িয়ে ঠায় ওদের মাপতে লাগল। অনেকক্ষণ এরকম দেখে ইঞ্জিনিয়ার বলল কী ব্যাপার কিছু বলবে? সে বলল, পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে আড্ডা কেন? ইঞ্জিনিয়ার চমকে গিয়ে বলল, মানে! সেই ছেলেটা টলতে-টলতে এইবারে কাছে এসে ধমক দিয়ে বলল, চল ভাগ এখুনি। ডাক্তার আর গবেষক বলল, এসো ভাই তুমি, তুমি স্বাভাবিক নেই। রেগে গেল সে। আমি যাব না তোরা যাবি দেখাব! ইঞ্জিনিয়ারের খুব কাছে চলে আসাতে হাল্কা করে ঠেলে সরিয়ে দিল। তাতেই সে চিৎকার করে বলল দেখবি, আমার গায়ে হাত। ফোন বের করল। ডাকল কাউকে। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে গোটা সাতেক লোক আসল, এসেই কোনো কথা নেই, ইঞ্জিনিয়ারকে সপাটে চড়। ঝামেলা বাধল খুব। আরও লোক আসছে বলে জানা গেল। লোক এল, ভয় দেখাল, চলে গেল। বিকেল হতে দেখা গেল, হাতে উইকেট ব্যাট নিয়ে, অন্তত জনা পঞ্চাশেক মারমুখী লোক আবার এল। গবেষকের বাড়ি ছিল সামনেই। তাকে বের করে এনে ক্লাবে নিয়ে যেত চাইল। ইঞ্জিনিয়ারকেও হাঁক পাড়ল। অবস্থা এই মারে কি সেই মারে! বলল, লোক দেখেছিস তো সবাই মিলে ক্যালালে গণপিটুনির কেস হবে, পুলিশ কিস্যু করতে পারবে না। ইঞ্জিনিয়ার-গবেষক ভয় পেয়ে গেল। এমতাবস্থায় নানান রফার পরে জানা গেল, তিনজনের বাড়ি থেকে বেশ কিছু টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, কেননা টাল-মাতাল ছেলেটি নাকি খুব আহত হয়েছে। যাই হোক এরপরে টাকা-পয়সা দিয়ে ব্যাপারটা মিটল। এইখানে বলে রাখা দরকার যে, এদের সকলের অন্য আরেকটি পরিচয়ও আছে। ডাক্তার-গবেষক-ইঞ্জিনিয়ার হল ধর্মে হিন্দু, আর টাল-মাতালসহ জনা পঞ্চাশেক হল মুসলমান। গোটা হিন্দু পাড়ার লোক এই ঘটনা দেখেছে।

ভাবুন তো যদি কেউ একবার বলত, হিন্দু পাড়ায় মুসলমানরা আক্রমণ করেছে - কী কী হতে পারত! এরকম ঘটনা ওই-এই-সেই পাড়ায় আকচার ঘটে। আবার একইসঙ্গে উল্টোটাও। তখন তিনজন বা একজন হয়ে যায় মুসলমান আর বাকিরা হিন্দু। আসলে ঘটনাটা কে কীভাবে দেখছে সেটা মোদ্দা কথা। ওই তিনজন দেখেছে অন্যভাবে। ওরা বলেছিল, একদল বেকার নেশাগ্রস্ত যুবক অর্থ আদায়ের জন্য ফন্দি এঁটেছিল, কেননা তখন কোনো উৎসব ছিল না যে চাঁদা তোলা যেত। তাই এই ব্যবস্থা। কিন্তু এই তিনজন যদি সেই চড় মারা হাতের লোকটাকে কিংবা যে লোকটা ক্লাবে নিয়ে যাবে বলে ঘর থেকে টেনে-হিঁচড়ে বের করেছিল অথবা যে ৩০বছরের যুবার পায়ে ধরে কেঁদেছিল ওদের মা’রা, সেই লোকগুলোকে শাস্তি দিতে চেয়ে স্রেফ "জয় শ্রী রাম" বলে চেঁচিয়ে ওঠে, তাদের কি দোষারোপ করতে কেউ পারবে?  বলতে কি পারবে, শিক্ষিত অশিক্ষিতের দ্বন্দ্বকথা! কেননা মাকে যারা পদদলিত করে কাঁদায় তাদের শাস্তি দিতে চাওয়া ছেলের কোনো ধর্ম হয় না শিক্ষার স্তর হয় না, যেটা হয় সেটা হল স্রেফ আবেগ। সুতরাং আমাদের প্রতিবাদ করতে হবে সবটার বিরুদ্ধেই, একপেশে কথা দেশে বিভাজনের রেখাটিকে আরও মোটা করে তুলবে বই মুছে দেবে না। নাটকে তাই আমরা সামগ্রিক চিত্রটিকেই দেখতে চাই।

এছাড়া আছে আরও একটি খটকা। সেটা হল সাগিরের বাড়ির লোকের কোনো মনোভাব দেখতে না পাওয়া। তার বোন আশমা অবশ্য ব্যাপারটাকে মেনে নিয়েছে বলেই দেখা গেল কিন্তু আমরা জানি যে শরিয়তি আইনে মুসলমান যদি অন্য ধর্মে বিয়ে করে তবে প্রথমে ইসলাম গ্রহণ করতে হয়, নইলে বিয়ে জায়েজ হয় না। ময়না কি তাতে রাজি ছিল? সেই উত্তর সম্ভবত না। ফলে এমনটা নয় যে, মুসলমান বাড়ি খুব সহজেই একজন হিন্দু মেয়েকে বৌমা হিসাবে মেনে নেবে, সেখানেও যথেষ্ট আপত্তি বাড়ির তরফে দেখা যায়, সে-কথা এখানে বলা হয়নি। তাই সাগিরের স্বপ্নে আম্মা-আব্বা কিংবা মৌলবি নয়, মারমুখী হিন্দু সমাজ উঠে আসে। ফলে ব্যাপারটা এমন হয়েছে যেন, মুসলমানরা খুব রাজি যে তাদের ছেলেরা হিন্দুর মেয়েকে বিয়ে করছে এই আনন্দে। তা কিন্তু মোটেই নয়। আবার হিন্দুর মেয়ে যদি শিখ-খ্রীস্টান-জৈন ইত্যাদি ধর্মের কাউকে বিয়ে করত তাহলে কতটা হুলুস্থূল বাধত সে-চিত্রও এখানে অধরা। সেটা থাকলে বোঝা যেত, অন্য ধর্মের প্রতি হিন্দুর মনোভাবটিকে। তুলনা করা যেত মুসলমানের ছোঁয়াচ বাঁচানোর স্তরের পরিমানের সঙ্গে। কিন্তু সেটা আমরা পাইনি। সব মিলিয়ে হিন্দুর তরফে মুসলমানের প্রতি বিতৃষ্ণা আর মুসলমানের তরফে হিন্দুর প্রতি বিদ্বেষ – এই উভয় চিত্রকে একই ফ্রেমে সার্বিকভাবে না দেখলে একটা একপেশে মনোভাব সৃষ্টি হয়। আমরা জানি যে, এক নাটকে সব কিছু দেখানো যায় না। কিন্তু তাই বলে সেই একই থোড়-বড়ি-খাড়া পক্ষপাতদুষ্ট চিত্র দেখানোও কি ঠিক? আমাদের প্রত্যাশিত প্রতিবাদটি তো হল, বিতৃষ্ণা ও বিদ্বেষগুলিকে মান্যতা দেওয়ার রাজনৈতিক প্রয়াসটির বিরুদ্ধে। সেটাকেই যদি সবলভাবে না দেখা যায় তবে নাটকটিকে কিছুটা দুর্বল ভাবতেই হয়।

লেখক যে-রাজনীতির কথা বলেছেন তা আরও তীক্ষ্মভাবে বলা যেত। নব্যরক্ষণশীল বনাম নব্যপ্রগতিশীলের দ্বন্দ্বময়তাকে আরেকটু অন্য আঙ্গিকে দেখা যেত। এখানে আমরা একটু হতাশ হই। কেননা রাজনৈতিক নাটক হতে-হতে যেন নাটকটি সেই ওল্ড ওয়াইন প্রেজেন্টেড ইন আ নিউ বটল উইথ আ মেলোড্রামাটিক ক্লিশে স্টাইল হয়েই থেকে গিয়েছে বলে আমার ধারণা। এর বক্তব্য আরও স্বচ্ছ ও গভীর হতে পারত। নতুন সত্য উদ্ঘাটন করতে পারত। তবে এও স্বীকার করতেই হবে যে, নাটকের টান এই হালকা চালটিকে সহজে বুঝতে দেয় না। এক অসামান্য গতি নাটককে ধরে রাখে। এই খোলসটাই হল নাটকের নিউ বটল, মূল আকর্ষণ।

যাই হোক, নাট্যকার অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে নিজের প্রতিবাদটি জানিয়েছেন। দেশজুড়ে যে-ভয়ের আবহ তৈরি করা হয়েছে তার প্রভাব যে একটা ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীতেও কীভাবে এসে লেগেছে সেটাকে নিখুঁতভাবে দেখিয়েছেন। এমনকি এর থেকে মুক্তির পথও বাতলেছেন। তিনি ভালোবাসার ভোজ খাইয়েছেন। ভুলে যেতে বলেছেন, জাত-ধর্মের বেড়াজালগুলিকে। কবে সেটা পারা যাবে জানি না, তবে পারতেই হবে। তিনি গান গেয়েছেন,

প্রাণের সঙ্গে প্রাণের মিলন

মন মিলেছে মনে

কী এসে-যায়

হিন্দু মুসলমানে?

 

আমরা সকলেই চাই এই গানই হয়ে উঠুক সকল দেশবাসীর অন্তরের গান। যে-ভারতবর্ষ ‘মিলে সুর মেরা তুমহারা, তো সুর বনে হামারা’ গেয়েছিল, বিগত কয়েক বছরে যেন সেই সুরটাকেই কিছুটা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। তৈরি করার চেষ্টা হয়েছে এক অ-ভারতবর্ষকে। লেখক সেই অ-ভারতবর্ষের বিরুদ্ধেই রচনা করেছেন এই নাটকটিকে। আর কিছু না হোক, এই নাটক যে মিলনের সুরকেই প্রচার ও প্রসার করবে তা অনস্বীকার্য। আমি আন্তরিকভাবে এই নাটকের সাফল্য কামনা করি। শুভেচ্ছা জানাই সকলকে। 


Friday, 18 March 2022

আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে , তবুও অবগুণ্ঠিত কুণ্ঠিত জীবন

ছবির তথ্য নিচে দিয়েছি

 

সকাল-সকাল মানবেন্দ্রবাবুর অসম্ভব সুন্দর একটি লেখা আর পুরানো বন্ধুদের পাঠানো একটা ছবি মোবাইল খুলতেই নোটিফিকেশনের টুং আওয়াজে ঢুকে পড়ল মনের ভেতরে। প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই আজ থেকে পাঁচ-ছয় বছর আগের এক স্মৃতিযাপনের দরজায় গিয়ে আমি টোকা মারলুম। অ্যালবামের পাতার সঙ্গেই দৌড়তে থাকল নানান অনুভূতির টগবগে ঘোড়াগুলি।

তখন আমি মুম্বই শহরে থাকি। রেসিডেন্সিয়াল ইন্সটিটিউটে আমার প্রথাগত ছাত্রজীবনের শেষতম অংশটি কাটাচ্ছি। আর মাত্র কয়েকটা দিন পরেই আমরা সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাব এদিক-ওদিক – কেউ কেউ ভারতেরই নানান অংশে আবার কেউ কেউ চলে যাবে বিদেশে। আমি পড়াশুনোর ডিস্ট্রিক্ট লেভেল, স্টেট লেভেল ও ন্যাশনাল লেভেল খেলে, ব্যাক টু স্টেট লেভেলে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছি। আসলে ইন্টারন্যাশলান লেভেলে খেলার কথা ভাবিনি, ভাবি না। আমি আদতে ঘরকুনো মানুষ। তাই ঘরেই ফিরব মনোস্থির করেছি। তাই অ্যাপ্লাই না করেও যেটা পেয়েছিলাম, সেটাকেও অ্যাকসেপ্ট করিনি। সে যাই হোক, আমার কথা থাক। বরং আমাদের কথা বলি।

‘আমাদের কথা’ – আহা শব্দবন্ধটার উচ্চারণ শুনতে বড্ড ভালো লাগে। এই ‘আমাদের’ শব্দটার অভ্যন্তরে একদিকে আছে এক বিশাল ঔদার্য আবার একইসঙ্গে আছে মামুলি সংকীর্ণতাও। কিন্তু আমার ব্যবহৃত ‘আমাদের’ শব্দটা বাংলার আমরা-ওরার সংস্কৃতি মতো কিংবা শুধুমাত্র বাঙালি জাতির ঘেরাটোপে আবদ্ধ নয়। আমার কাছে ‘আমাদের’ কথাটার কোনো সীমা নেই। অসীম বিশ্বের সমগ্র রূপকল্পের ছিটেফোঁটাও এই ‘আমাদের’ই অন্তর্ভুক্ত। আমরা যারা মুম্বইতে পড়াশুনো করতে গিয়েছিলাম, সেখানে ‘আমাদের’ কথাটি উচ্চারিত হত ভারতের প্রত্যেকটি রাজ্যের কোনায়-কোনায় অবস্থিত সবকটি ধর্ম-জাতি-বর্ণ-সংস্কৃতি-চেতনা-বোধের মিশেলে। একটা ছোট্ট ‘গণতান্ত্রিক ভারত’ সেখানে নির্মিত হয়েছিল। আমরা তখন আর কেউই উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, গুজরাট, আসাম, মনিপুর, নাগাল্যান্ড, পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, জম্মু, কেরালা, অন্ধ্রপ্রদেশ, গোয়া, কর্ণাটক কিচ্ছুটি নই, ভারতের অখণ্ডতার প্রতিভূ হয়েই আমরা প্রত্যেকেই ‘আমাদের’ সকলের বন্ধু হয়ে গিয়েছিলাম, আজও তাইই আছি।

প্রত্যেকের হাসি-কান্না, ক্ষোভ-সুখ, প্রত্যাশা-প্রাপ্তি, দাবিদাওয়ার ন্যায্যতা-অন্যায্যতা ইত্যাদি সবই তখন ব্যক্তিগত স্তর পেরিয়ে যৌথতার শরীরে লীন হয়ে গিয়েছে। ‘আমাদের’ যেমন আমিষ ছিল তেমনই ছিল নিরামিষ, যেমন ছিল দুর্গাপুজো, তেমনই ছিল ঈদ, ওনাম কিংবা ক্রিস্টমাস, যেমন ছিল বামপন্থা তেমনই ছিল শিবসেনা, বজরং দল, কংগ্রেস – ‘আমাদের’ একমাত্র যা ছিল না তা হল ভেদাভেদ। আমরা পাশাপাশি অথবা একই থালায় হিন্দু-মুসলমান আমিষ-নিরামিষ দিব্য আড্ডা দিতে দিতে খেতে পেরেছি। এমনকি আমাদের লিঙ্গবৈষম্যও ছিল না। ছেলে-মেয়েদের হস্টেলও ছিল একইসঙ্গে, একই বিল্ডিং-এ। একের অন্যের ঘরে যেতে কোনোদিন বাধো-বাধোও ঠেকেনি। কেউই কোনোদিন ভাবেনি এটা ‘আমাদের’ ঘর নয়। রুম নম্বর ৪৪১-এ তো এমন একটা দিনও যায়নি যেদিন তিনজনের ঘরে কেবল তিনজনই থাকতে পেরেছে। রোজই অন্তত সাত থেকে দশজন এসে পড়ে থেকেছে ব্রেকফাস্ট থেকে পরেরদিনের ব্রেকফাস্ট অব্দি – ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে। পড়াশুনো করেছে, আড্ডা দিয়েছে, হাহাহিহি করেছে নাচানাচি করেছে – কোনোদিন কেউই ভাবেনি, এবার যাই, ওরা কী মনে করবে! কেনইবা ভাববে, এই সবই তো আমাদেরই, এখানে ওরা বলে যে কেউই নেই, ছিলও না।

এখন রঙের উৎসব। বসন্তের রঙে চারিদিক রেঙে উঠেছে। অথচ আমারই বহু বাঙালি বন্ধুজনেদের পোস্টে-স্টেটাসে দেখছি হোলি ও দোলের কিংবা হিন্দুস্তানি ও বাঙালির সম্পর্কে রগচটা হিংস্র মনোভাব। এগুলি মনকে পীড়া কি দেয় না? অবশ্যই দেয়। একইসঙ্গে অনেক বন্ধু আমাকে দোষারোপ করেছে, অভিযোগ জানিয়েছে যে, আমি কেন কোনোদিন বাঙালির পক্ষে কিছু লিখি না! কী করে লিখি বন্ধু, আমি যে অন্য সংস্কৃতি যাপন করেছি, সেখানে যে কেবলই সৌভ্রাতৃত্ব শিখেছি – কী করে পারি এখন পক্ষ-বিপক্ষের খেলা খেলতে? তারা সকলেই যে আমারই, আমিও যে তাদেরই। তোমরা হোলি/দোলের কথা বলছ – তাহলে আমি একটা গল্প শোনায় তোমাদের।

সেবার আগেরদিন রাত্রি থেকে হস্টেলে উত্তেজনার গুঞ্জন চলছে। রাত্রে কেউই প্রায় ঘুমাচ্ছে না। পুরানো জামাকাপড় বের করে রাখছে। কাল যে রঙের উৎসব হবে – আর সেখানে সেগুলিকে ছিঁড়েও ফেলা হবে – সেটারই তোড়জোর। শুধু কী তাই? পেস্তা, কাজু, কিসমিস, আখরোট, বাদাম আনা হয়ে গিয়েছে ভুরিভুরি। কাল সকালে আসবে দুধ। কম করে ৪০০ জনের খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন সেরে রেখেছে মেস-কমিটি। স্পেশাল লাঞ্চ – স্পেশাল ডিনার, আর তার আগে প্যাকেটে করে এসেছে মহাদেবের আশীর্বাদ। দুধ বাদাম পেস্তা সবকিছু মিলিয়ে মিশিয়ে তৈরি হবে মহা-প্রসাদ। হস্টেলের ওয়ার্ডেন জলের নলগুলিকে পাইপগুলিকে দেখে রেখেছেন, যাতে কোনোকিছুরই অভাব না হয়। অভাব হলে শিক্ষক-শিক্ষিকারা ব্যাঁকা চোখে তাকিয়ে যাবে যে – ওঁরাও তো একই ক্যাম্পাসে থাকেন – কালকে আমাদের সঙ্গে জয়েনও করবেন। ঢোলের সঙ্গে থালা-বাসনও রেডি। নগর-সংকীর্তন নয়, ইন্সটিটিউট-সংকীর্তনের দল বেরুবে – গানা হবে, বাজনা হবে, রঙ হবে, ভাঙ হবে, নাচ হবে, আলিঙ্গন হবে।

সকাল বেলায় আমি হস্টেলের ঘর থেকে স্পিকারে ফুল ভলুমে জোরে জোরে রবীন্দ্রসঙ্গীত চালিয়ে দিলাম। চারপাশ থেকে দরজায় টোকা পড়তে শুরু হল – ‘বাহার আও জি, কিতনা দের করোগে ভাইয়্যা’। সবাই মিলে নিচে যাওয়ার পালা। ছয়তলায় থাকি আমরা। নিচে ততক্ষণে দু-তলা তিনতলা চলে গিয়েছে। শুভম আর পীয়ূষ রেডি হল। রবীন্দ্রসঙ্গীত বন্ধ করলাম। উত্তরপ্রদেশ আর বিহার শুরু করল তাদের লোকসঙ্গীত বাজানো। সিনিয়র এসে বলল, ‘মিউজিক বন্ধ করো, গানা হাম গায়েঙ্গে, বাজা তুম বাজাও, জলদি নিচে চলো’। আমি বললাম, আমি নেই। আমার সব সহ্য হয় – ভাঙ ব্যাপারটা আমি নিতে পারি না। কিন্তু কে কার কথা শোনে তখন, একটাই কথা, ‘নিচে চলো’। তারপরে যা-যা হল আর যেভাবে হল তার কথা না বলাই ভাল। বরং তার অন্তিম দৃশ্যের একটি ছবি দেওয়া যাক। তাহলেই বোঝানো যথেষ্ট হবে যে কী হয়েছিল। তাতেই শেষ নয়, পীয়ূষ ঘরে ফিরে দু-ঘন্টা বাথরুমে সাওয়ার চালিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল কিন্তু জল গায়ে লাগাল না। জেমস, আধাঘন্টা ধরে দুটো সিঁড়ি উঠছে তো উঠছেই। শ্রেয়া লটকেছে। শুভম হাসছে তো হাসছেই। আমি থাবড়া মারছি, বিদিতা লাপাতা। এইসব যে কতক্ষণ চলেছিল আর কেউ না জানুক আমি জানি। আর সেদিন বুঝেছিলাম, নেশুড়েদের দলে ভিড়ে আসল কাজটি না করলে যত জ্বালা সব তাকেই সইতে হয়। কিন্তু আমাদের অভিযোগের কিছু ছিল না। যা ছিল তা সবই বিনোদনের।

সেসব দিন কেটে গিয়েছে। আজও ইচ্ছা হয় সেখানে ফিরে যেতে। এখানে, চৈত্র মাস সবে শুরু হয়েছে। আর তাতেই গরমের দাপটে প্রাণ ক্রমশ শুকিয়ে যাওয়ার জোগাড়। চীন-আমেরিকায় নাকি আবার লকডাউনের তোড়জোর আরম্ভ হয়েছে বলে খবর। জলবায়ু পাল্টে যেতে-যেতে এখন যে মানবসভ্যতাকেই গিলে খেতে আসছে সে-দিকে হুঁশ এখনও ফেরেনি বেশিরভাগের। অন্যদিকে ইউক্রেন-রাশিয়া সংঘাতে রক্তাক্ত লাশগুলি, পুড়ে খাক হয়ে যাওয়া বাড়ি-ঘরগুলির ছবি মনকে ভারাক্রান্ত করে দিচ্ছে রোজ। সম্প্রতি ‘দ্য কাশ্মীর ফাইলস’ চলচ্চিত্রের প্রভাবে দেশের অভ্যন্তরেও খানিক ধর্মীয় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া আছে দলীয় রাজনীতির শিকারে খুন-ধর্ষণের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনার শিরোনামগুলিও। বাঙালি বন্ধুরা এরই মধ্যে হোলি বনাম দোল তর্জা শুরু করেছে। সব মিলিয়ে অসংখ্য বিভেদের জালে আমরা জড়িয়ে পড়ছি, পড়েছি। কিন্তু আমি যে কী করি বুঝতে পারছি না। কী করে নিই পক্ষ-বিপক্ষের অবস্থান – তাও জানি না। তার চেয়ে বরং, সেই অমোঘ বাণীটিকেই স্মরণ করি, “আজি  বসন্ত জাগ্রত দ্বারে / তব অবগুণ্ঠিত কুণ্ঠিত জীবনে / কোরো না বিড়ম্বিত তারে / আজি খুলিয়ো হৃদয়দল খুলিয়ো /  আজি ভুলিয়ো আপনপর ভুলিয়ো”। 


ছবিতে দাঁড়িয়ে বাঁ-দিক থেকে -

সোফিয়া (আসাম), শালিনী (পশ্চিমবঙ্গ), কৌস্তভ (পশ্চিমবঙ্গ), মোগ (ত্রিপুরা), অজয় (উত্তরপ্রদেশ), সুমিত (বিহার), প্রিয়াঙ্কা (উত্তরপ্রদেশ), শ্রেয়া (উত্তরপ্রদেশ), বিদিতা (পশ্চিমবঙ্গ)

ছবিতে বসে বাঁ-দিক থেকে -

দেবেন্দ্র (মধ্যপ্রদেশ), পীয়ূষ (উত্তরপ্রদেশ), শেখর (উত্তরপ্রদেশ), শুভম (উত্তরপ্রদেশ)

পুনশ্চঃ আরও ছবি আছে, কিন্তু সেগুলি দেওয়া যাবে না।

Tuesday, 25 January 2022

The Ministry of Truth and ‘Tek Fog’ App

Soukumarjyo

 

We are about to witness an incredible coincidence. The historic moment of the 2024 Lok Sabha election marks the 75th anniversary of the publication of George Orwell's ‘Nineteen Eighty-Four’. The famous book is not unknown to anyone today. On the contrary, almost all conscious citizens have now come to realize from their everyday experience what ‘The Ministry of Truth’ really is! Coincidentally, in 2019, Dorian Lynskey wrote a book, ‘The Ministry of Truth: A Biography of George Orwell's 1984’ in which he traveled back in time and showed how the idea of ​​such a ministry was instilled in Orwell's mind.

In 2022, it is as if we are standing in front of such a virtual ministry whose job is to constantly trade lies and in various ways propagate lies among the people. This January, The Wire, after a two-year investigation, revealed that Tek Fog, a secret app run by the BJP, was used for exactly that purpose. This secret app can create and delete numerous Twitter-Facebook accounts by one click. Not only that but also with this app, any topic can be trended by lots of tweets, everything from harassing opposition ideologues to death threats can be offered and also hijacking unused Whatsapp accounts to automate hate is possible. This app is like a Brahmastra for spreading violence and provocative work. And once the desired work is done, all the accounts can be deleted so that no trace of any misconduct remains. Derek O'Brien has been vocal about this.

By epoch-making modernity we have to understand this current situation. Because we have entered the 21st century’s technology-dependent cyber world, where the game of stripping the truth is being organized on the battlefield of digital politics, not geopolitics. Here, just as history is affecting fiction, so is fiction becoming history. The real challenge here is to keep your eyes and ears open to protect the power to think freely. It should be remembered that the world has been ruled by different types of politics in different countries for ages and in all the regimes, only the life of the common man has been ruined due to the ideological turmoil of the rulers. Man has witnessed how systematically honesty, decency, fairness, memory, history, clarity, privacy, discretion and feelings of love have been destroyed from his life and how political opportunism has changed morality, unity, language and truth in favor of its own interests. He has survived the days of utopia, super-state, dictatorship, imprisonment, propaganda, abuses of technology, military power, media language, culture-class-gender based inequality and the dark clouds of dystopia. Spent cursed nights of panic. Fought for liberation, freedom and democracy which is still going on.

In that order, another history has started in India since 2014. Just as many have found similarities with Orwellian dystopia with this, so too have many found the scent of utopia. There are people living here believing in different ideologies like socialist, conservative, anarchist, liberal etc. and everyone is explaining the phenomenon of ‘Tek Fog’ in their own way. But will we ordinary people be included in any group to understand this issue? Maybe not. That’s why when it comes to ‘The Wire’ revealing the ‘Tek Fog’, the public need to cross check it. Many liberal and leftist intellectuals will speak in favor of this veil, but that does not mean that there is no ambiguity, no doubt in question.

Yes, all the conscious citizens know that there can be such an app and the BJP has all the intention, need, money and people to make it. But despite all this, is it possible to be so sure about the existence of ‘Tek Fog’? Though there is a possibility that the BJP may be involved in such a conspiracy, as far as the ‘Tek Fog’ leak is concerned, no one should be so thought-paralyzed by accepting ‘The Wire’s claimed existence of the app without verification. It should be remembered that anyone can have the potential to commit crime, but he/she cannot be found guilty until proven guilty. There is no denying that such an app can exist. But did ‘The Wire’ present any solid evidence as to whether it actually existed? Probably not. They have provided some screenshots sent by their source and claim this only on the basis of 32 accounts and 100 trending topics. There is no question about the sincerity of their intentions but there are some doubts and questions regarding their demands which have been raised by Samarth Bansal.

According to the claim, if, not leaving a trace means deleting all the accounts or using a private network, then there arises two doubts – firstly, if an app can breach the security system of world’s giant technologists for myriad of accounts with a single click, then it is the time to appreciate that India has been crowned the digital emperor and second, the use of API for private apps comes into play when it comes to the involvement of organizations like ‘Sharechat’. ‘The Wire’ claimed that users of ‘Tek Fog’ app have stored a huge database of people from various fields. They also blame 18% of propaganda-tweets on the ‘Tek Fog’ app. But the question is, on the basis of only 32 accounts and 100 trending topics, how can the demand for the existence of thousands or millions of accounts be reached? Also if the total number is not known, it is doubtful that how and on what basis this percentage is being calculated. Whether ‘Tek Fog’ is an app or an idea or a concept is not clear. They say it is a matter of MetaWorld, and its users may have different versions. ‘The Wire’ has left a terrible fog here. Leaving aside all that, if we assume that the claims of ‘The Wire’ are all true, then also one last doubt remains. If they are asked if they have seen all these activities with their own eyes or have used the app to verify the truth? We don't get any definite answer. They just say that a disgruntled BJP IT cell worker who was involved in these activities told ‘The Wire’ about these issues and that’s it.

The point now is that there may be a BJP-backed ‘Tek Fog’ but we need to be a little more certain about whether it exists at all. Right now, The Wire's claim cannot be accepted without question. But if their claim is further substantiated by strong potential evidence, it goes without saying that India has entered an era of terrible darkness. People need to be aware. Because where reality changes into digital satire, prediction, caution, political ideology, science fiction, dreaming, espionage thriller, psychological horror, nightmares, postmodern existentialism with a single click, it is like entering a tunnel of insurmountable suffering. When the only thing that keeps popping up in everyone's ears is the saying, ‘No one is free in this world, no one is safe. It's impossible to be honest and survive at the same time', then whatever the inclination of the mind is, everything must be judged under the light of doubt. Otherwise, to get rid of one tunnel, one has to remain dependent on the other tunnel, the light will never be touched.


References: 

  1. https://thewire.in/tekfog/en/1.html
  2. https://thewire.in/tekfog/en/2.html
  3. https://thewire.in/tekfog/en/3.html
  4. https://en.wikipedia.org/wiki/Tek_Fog
  5. https://www.samarthbansal.com/the-wires-tek-fog-investigation-futile-search-for-evidence/
  6. Others.