![]() |
| Figure Source - Internet |
অনেকদিন আগের কথা, অনেকদিন আগের মত কথা, হোক না, হলেই বা, সত্যি তো নিশ্চয়, তাই আজকের মত মনে হয় । আমার এক বন্ধু । আমরা স্কুলে পড়তাম কিন্তু বন্ধু ছিলাম না, ছিলাম মুখচেনা সহপাঠী । সে প্রেসিডেন্সি তে ভর্তি হল, আমি বিবেকানন্দ কলেজে । আমরা বন্ধু হলাম তবুও । সে রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোত যুক্ত, আমি বিযুক্ত কিন্তু মন্ত্রমুগ্ধ । কিন্তু আমি অরাজনৈতিক নই । সে আমায় বলেছিল, ‘ভিখিরি দেখলে তুই পয়সা দিস কেন রে ? দিবি না ।’ আমি বলেছিলাম, ‘চোখের সামনে দেখছি যে মানুষটা খেতে পাচ্ছে না, লোকের কাছে ঘুরতেও পারছে না, ক্ষমতা নেই । মুখ ঘুরিয়ে চলে যাব । আমি পারব না ।’ ও বলল, ‘ বেশ দিস কিন্তু দেবার আগে শুধু নিজেকে জিজ্ঞেস করে দেখিস যে তুই কি ওর কিম্বা ওর মত অনেকের সত্যি কোনও উপকার করতে পারলি ।’ আমি বললাম, ‘কি বলছিস তুই এসব, পারলাম না । একটা লোককে খাওয়ালাম, খাবার সময় ওর চোখের জল আমায় যে তৃপ্তি দিল, সেটা কি ফালতু নাকি ।’ ও বলেছিল, ‘ কালকে ওর কি হবে? কিম্বা যাদের আজকের দিনটা ওর কালকের মত, তাদের কি হবে ?’ আমি বলেছিলাম, ‘তো কি বলিস, মুখ ঘুরিয়ে চলে এসে ঘরে ঘুমাতে ।’ ও বলল, ‘না ! নিজেকে প্রশ্ন করে দেখ, ওরা ভিখিরি কেন, কোথা থেকে দলে দলে লোক এসে জোটে ফুটপাথে, স্টেশনে, কে বা কারা দায়ী ওদের ভিখিরি হবার জন্য, তাদের বিরুদ্ধে লড়, তাদের শেষ করলেই ওরা মুক্তি পাবে ।’ তারপর থেকে আমি নিজের মত করে তাদের বিরুদ্ধে লড়তে শুরু করেছিলাম । কাল শঙ্খবাবুর একটা পুরনো বই বের করে পড়ছিলাম । উনি লিখেছেন, ‘পথের ধারে ভিখিরি বালক যখন হাত পেতে দাঁড়ায়, তখন তাকে দিতে ইচ্ছে হয় কিছু, এই আমাদের দয়ালুতার এক মুদ্রা, এই আমাদের দুর্বলতা – কিন্তু সেই দেবার মুহূর্তে আমি জানি এর দ্বারা ঐ বালকের কিছুমাত্র কাজে লাগি না আমি, বরং বাঁচিয়ে রাখি একটা সামাজিক অন্যায় । তাহলে কি করব ? যেমন অনেকে বলে থাকেন, সরে এসো, এই অসংগতিকে প্রশ্রয় দিও না – তেমনি করে সরে আসব ? আমি কি জানি না যে এই উপদেশ বস্তুত এক আত্মত্রাণের ইচ্ছে মাত্র ? না দিয়েই কি আমি সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধতা করতে পারছি কিছু ? তাই দেওয়া-না-দেওয়ার জটিল মন নিয়ে চলতে হয় আমাদের, করুণা আর পরিহাস একই সঙ্গে জমে ওঠে মনের মধ্যে, এই বিরোধী বৃত্তির মধ্য থেকেই আমাদের জানতে হয় সত্য ।’ উনি এভাবেই বলেছেন সত্যকে দেখতে, একপাশ থেকে নয়, সম্পূর্ণভাবে । নইলে তা অর্ধসত্যের মত ভয়াবহ হয়ে ওঠে । কিন্তু এই দুপাশ থেকে দেখেও কি আমরা বুঝতে পারলাম, সত্য কি ? কি সত্য ? তাই একটা কৈফিয়তের মত আরেকটা বিভ্রান্তির মত, শোনালে শোনাক, দেখালে দেখাক, বোঝালে বোঝাক, তবু তা কিছু তো বটে – মিথ্যার মত সত্য কিম্বা সত্যর মত মিথ্যা ।
