‘ক্ষুধিত
পাষাণ’ সম্বন্ধে করিম খাঁ বলেছিল, ‘ যাহারা ত্রিরাত্রি ঐ প্রাসাদে বাস করিয়াছে
তাহাদের মধ্যে কেবলমাত্র মেহের আলি পাগল হইয়া বাহির হইয়া আসিয়াছে, এ পর্যন্ত আর
কেহ তাহার গ্রাস এড়াইতে পারে নাই’ । পশ্চিমবঙ্গের ছাত্ররাজনীতির ধারাও ঐ প্রকার ।
নকশাল আন্দোলনের সময় থেকে আজ অব্দি যত ভাল ভাল ছাত্রছাত্রী যাদের বুকে এখনও আবেগ ও
উদ্যমের ভরপুর খনি বর্তমান আছে তারা প্রত্যেকেই ঐ ক্ষুধিত পাষাণের নির্মম গ্রাসে
প্রান বিসর্জন দিয়েছে ও দিচ্ছে । আর আমি নিজে
যখন আগুনের টানে পতঙ্গের আত্মাহুতি লক্ষ্য করছি এবং অনুভব করছি যে এই আত্মদহনের
কোনও সুফল নেই, তখন মনে মধ্যে একরাশ যন্ত্রনার সঞ্চার হচ্ছে বৈ কি ।
ঘটনাটা কি ?
বর্ধমান
বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় বছরের বি.এ., বি.এস.সি., বি.কম. এর ফলাফল সংক্রান্ত
ত্রুটির শিকার হয়েছেন বহু ছাত্রছাত্রী – এই খবর চতুর্দিকে প্রচারিত হবার সঙ্গে
সঙ্গে রাজবাটী চত্বরে ছাত্রছাত্রীদের জমায়েতের মাধ্যমে ব্যপক প্রতিবাদের সঞ্চার
হয়েছিল এবং তারা ভিসি’র সঙ্গে দেখা করে ডেপুটিশন জমা দিয়ে এই ঘটনার দ্রুত
নিষ্পত্তি চেয়েছিলেন । কিন্তু প্রতিক্রিয়ায় ভিসি দেখা না করে বিশ্ববিদ্যালয়
কর্তৃপক্ষ মারফত পুলিশি লাঠি ও রাজনৈতিক মদতপুষ্ট সমাজসেবীদের দ্বারা
ছাত্রছাত্রীদের ওপর বর্বরচিত ব্যবহার ও হামলা চালিয়েছিলেন । এখন
প্রতিক্রিয়াও যেহেতু একপ্রকার ক্রিয়া সেহেতু তারও প্রতিক্রিয়া হবার কথা । সেই মতো এই
আক্রমনের বিরুদ্ধে - এবার আর শুধু বর্ধমানের ছাত্রছাত্রীরা নয়, যাদবপুর,
প্রেসীডেন্সী প্রভৃতি নানা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরাও যুক্ত হয়ে-
ছাত্র-আন্দোলন সংগঠিত করেন । এর
মধ্যিখানে ভিসি একটি নির্দিষ্ট সময় চেয়েছিলেন ফলাফলের সমস্ত ত্রুটি সংশোধন করার
জন্য কিন্তু তিনি তাঁর প্রতিশ্রুতি রাখতে পারেননি । এই ঘটনার জেরে মানকরের একজন
ছাত্রী পৌলমি আত্মহত্যা করেছেন । আর ভিসি ছাত্রছাত্রী ও সংবাদমাধ্যম সকলের থেকে
নিজেকে অন্তরালে রেখে দিয়ে ছাত্রছাত্রীদের সারাবছরের পরিশ্রমের প্রত্যাশাকে
অনিশ্চয়তার পথে ঠেলে দিয়েছেন । এখন যাদবপুর , প্রেসিডেন্সীর ও বর্ধমানের
ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের দাবি জানাতে গেলে তারা পুলিশ কর্তৃক গ্রেপ্তার হয় এবং তাদের
বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয় । সুতরাং, যেখানে জীবনকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া হয়েছে
সেখানে এর জন্য যারা দায়ী অর্থাৎ প্রধান দায়ী ভিসি’র পদত্যাগ যে দাবির মধ্যে
অন্তর্ভূক্ত হবে এ বলাইবাহুল্য । ফলে সেই আন্দোলন এখনও চলছে এবং তাতে যুক্ত হয়েছে
এই নতুন দাবিও ।
আন্দোলনের
দাবি ও রূপ
এখানে যেদিন
ফলাফল প্রকাশিত হয় সেদিন যে প্রতিবাদ দেখা গিয়েছিল তাকে স্বতস্ফুর্ত প্রতিবাদ বলা
যায় যার দাবি ছিল ত্রুটিমুক্ত ফলাফলের দ্রুত প্রকাশ । কিন্তু
ভিসি তথা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যে দমননীতির প্রয়োগ সেদিন করেছিলেন তা যে একজন
শিক্ষকের ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ন্যায় ও নৈতিকতার মধ্যে পড়ে না একথা তাঁরা বোঝেননি
। গতবছরে আমরা সকলেই যাদবপুরের ভিসি’র অমানবিক আচরনের সাক্ষী হয়েছিলাম । এখন
আবারও সেই একই ব্যবহার দেখা গেল । সুতরাং, যাদবপুরের যে সব আক্রান্ত ছাত্রছাত্রীরা
অনশনে অনড় থেকে আমাদের মুখ্যমন্ত্রীকে হস্তক্ষেপে বাধ্য করলেন ও ভিসি’র অমানবিকতার
জবাবে তাঁকে পদত্যাগ করতে হল তারা কিছুতেই বর্ধমানের ভিসি’র এই আচরন মানতে পারেন
না । কেননা প্রতিষ্ঠান যাই হোক এদের সকলের পরিচয় এরা ছাত্র । তাই যখন বর্ধমানের
ছাত্রছাত্রীদের পাশে এরা এসে দাঁড়ালেন তখন বর্ধমান এদের গ্রহন করলেন আন্তরিকতার
সঙ্গে কেননা এদের এব্যাপারে পূর্ব অভিজ্ঞতা ও মানসিক নির্দেশতন্ত্র থাকায় তা যে বর্ধমানের
ছাত্রছাত্রীদের দাবির সপক্ষে অত্যন্ত উপযোগী হবে একথা অনস্বীকার্য । এখন এরা সকলে
মিলে মিছিল করে প্রতিবাদের কণ্ঠে কণ্ঠ মেলালে পুলিশ কর্তৃক প্রথমে বাধাপ্রাপ্ত হয়
ও পরে এদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু হয় । ফলে এখন একটা নতুন দাবি যুক্ত হয়, তা হল,
ভিসি’র পদত্যাগ । কিন্তু মতামতের ভিন্নতা কোথায় নেই ? সেই অনুযায়ী দাবি এক হলেও পন্থা ভিন্ন হওয়ায় এই
আন্দোলনে মূলত তিনটি প্রধান নেতৃত্বের জন্ম হয় । এক,
এস.এফ.আই. এর নেতৃত্বে “হোক আলোড়ন”, দুই, তৃণমূলের নেতৃত্বে ছাত্রপরিষদ ও অন্তিমে,
সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের অর্থাৎ যারা কোনও রাজনৈতিক দলের ছাতার নীচে নেই, তাদের “হোক
প্রতিবাদ” ।
আন্দোলনে এস
.এফ. আই. এর ভূমিকা
আমরা সকলেই
জানি যে বর্ধমানে সি.পি.এম. এর দীর্ঘ দিনের রাজত্ব ছিল । আর বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়
ছিল দলের ক্যাডারদের ভাত কাপড় জোগাড়ের প্রতিষ্ঠান । কিন্তু, তৃণমূল আসার ফলে সে কর্তৃত্বের
হস্তান্তর হয়েছে । ফলে যারা পূর্ব রাজত্বে দাপিয়ে বেড়াতেন তাদের ডানা কাটা গেছে ।
ফলে ভিসি’র এই অকর্মণ্যতার সুযোগে আর ছাত্রছাত্রীদের এই ন্যায্য দাবির সমর্থনে যদি
রাজ্যরাজনীতির বাজারে একটু জায়গা পাওয়া যায় সেই উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছে মঞ্চ “হোক
আলোড়ন”। একে বলা যেতে পারে ডাইনসরের লুপ্ত
হবার পথে আত্মরক্ষার অন্তিম প্রচেষ্টা । ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্দরে যারা
উচ্চপদাসীন এবং সিপিএম এর আজীবন সদস্য তাঁরা ভিসি’র বিরুদ্ধ নানা বক্তব্যের
মাধ্যমে ও বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের সুউচ্চ ঐতিহ্যের কথা বলে দলে ভেড়াতে চাইছেন এই
বৃহৎ ছাত্রদলকে । কিন্তু
পক্ষান্তরে এরা বাজি রেখেছেন ত্রুটিযুক্ত ফলাফলের শিকার ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ । এরা
গন কনভেনশন করছেন ও পার্টিসদস্যদের ভিড় দেখিয়ে আন্দোলনের রাশ নিজেদের হাতে আনার
জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন । কিন্তু যদি তাদের প্রতিবাদ আন্তরিক হত তাহলে যে সকল দাবির
জন্য এই আন্দোলন তাকে জোরদার করতে কেন নিজেরা পদত্যাগের মাধ্যমে অকর্মণ্য ভিসি’র বিরুদ্ধে
প্রতিবাদ জানানোর তাগিদটুকু অনুভব করছেন না যাতে ছাত্রছাত্রীরা বলভরসা পেতে পারে। কেন
থেকে যাচ্ছেন এই সব কমরেডরা একজন রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষক দূর্নীতি কবলিত ভিসি’র কর্তৃত্বের
তলায় ?
তৃণমূল
যে ক্ষমতার
হস্তান্তরের মাধ্যমে এখন এঁরা সর্বময় শাসক হয়েছেন সেই রাজত্ব রক্ষার মরিয়া লড়াইয়ে
এরাও নেমেছেন । আর বাজি রেখেছেন সেই ত্রুটিযুক্ত ফলাফলের শিকার ছাত্রদের ভবিষ্যৎ ।
ফলে প্রতিশ্রুতি যেমন দিচ্ছেন তেমনই পুলিশ থেকে গুন্ডা কারও অপব্যবহার করতে এঁরা
পিছু হঠছেন না । কোর্টে কেস অব্দি দিয়ে দিচ্ছেন । এদেরও
উদ্দেশ্য সেই এক - যাতে আন্দোলনের রাশ এদের হাতে থাকে এবং তা যেন ভয়াবহ আকার না
নিতে পারে ।
হোক প্রতিবাদির দল
এবার যাদের
কথা লিখব তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষমতাযুদ্ধে লিপ্ততার কোনও সম্পর্ক নেই । যা আছে
তা হল আবেগের, মোহের ও গোঁয়ার্তুমির । আবেগের কেন
? কারণ আবেগ ছাড়া কোনও কাজ করা অসম্ভব । এরা নিজেদের কেরিয়ার বাজি রেখেও বর্ধমানের
ছাত্রছাত্রীদের পাশে দাঁড়িয়েছে এবং সাধারণ বুদ্ধির আওতায় যা পড়ে না সেখানে দাঁড়িয়ে
মার খাওয়া থেকে শুরু করে পুলিশি মামলা সংক্রান্ত কোর্টের শত ঝামেলাতেও নিজেদের
পিছু হঠাতে রাজি নয় । এই গ্রীষ্মের প্রখর রৌদ্রে মাঝদুপুরে এরা কলকাতা, দুর্গাপুর
প্রভৃতি নানা জায়গা থেকে জড়ো হয়ে জিটি রোডের মিছিলে কন্ঠ মিলিয়েছে “হোক হোক হোক
প্রতিবাদ” বলে । এই নিস্বার্থ কাজ কি আবেগ ছাড়া সম্ভব ? সম্ভব নয় । এবার কথা হল
নিস্বার্থ হলে আবার মোহ কীসের ? মোহ হল ক্ষুধিত পাষানের । নক্সাল আমলে যেমন চিন
থেকে বিপ্লব ধার করে আনা হত এখনও তার আমদানি অব্যাহত । তবে তা আর চিন থেকে আসে না
। আসে ব্রাজিল থেকে, আসে রূপি কৌর এর কাছ থেকে, আসে আমেরিকার বিপথগামিতার উদাহরণ থেকে
। নক্সাল আমলে শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের যে নেশা যেমন এদের ভুল পথে চালিত করেছিল এবং
জেহাদীদের যেমনভাবে ইসলামী সংগঠনগুলো জন্নত ও হুর-পরীদের স্বপ্ন দেখায় তেমনভাবে
কমিউনিজম এদের দেখিয়েছিল লেনিন, মাও হবার স্বপ্ন আর এরা গিয়ে দাঁড়িয়েছিল মিছিলের
সামনে হাতে বন্দুক নিয়ে, আজকের দিনে তেমনিভাবেই সামাজিক দায় দায়িত্বহীন ভোগবাদ
সর্বস্ব সমাজ গঠনের নেশা এদের ভুল পথে চালিত করছে আর একইভাবে মিডিয়া ও
মুনাফাবাজদের চক্রান্ত এদের মরীচিকা দেখাচ্ছে গেভেরা, রুশদি হয়ে ওঠার । এবং
একইভাবে তত্ত্বের ভ্রান্তত্বাত্ত্বিকতা নিয়ে এরা একবার রাস্তায় রাস্তায় চুমু
খাচ্ছে, একবার মেয়েদের মাসিকের কথা ন্যাপকিনে লিখে বিশ্ববিদ্যালয় ভরিয়ে ফেলছে,
একবার ব্রাজিলের ফুটবল বিশ্বকাপকে থালায় সাজিয়ে খাদ্য চাই বলে মিছিল করছে যাতে
অন্তত একবার এবিপি কিম্বা চব্বিশ ঘন্টায় মুখ দেখিয়ে ভবিষ্যতে বুদ্ধিজীবী সাজার পথ
পুষ্পশোভিত করা যায় । একে মোহ ছাড়া আর কি বলা যায় ? এবার আসব গোঁয়ার্তুমির কথায় ? আমি
আগেই বলেছি যে আবেগ ছাড়া কোনও কাজ করা যায় না এবং একথাও সত্য যে মোহ বা প্রাপ্তির
যোগ না থাকলে সে আবেগও থাকে না । কিন্তু আবেগ কোনমতেই বুদ্ধিমত্তা হতে পারে না । ফলে
সে বুদ্ধিহীন আবেগ কোনও কাজের সফলতাও আনে না কেননা সে যে মোহের বশে উদ্যমী হয়েছে
সে বুঝতেই পারে না যে এ আবেগ ও মোহ বিপরীতধর্মী । ফলে সে দিশাহারা হয় । এক্ষেত্রেও
ব্যতিক্রম হয়নি । তাই এরা যেমন প্রাপ্তির সন্ধান পাচ্ছে না কিন্তু আবেগের বশে
পিছুও হঠতে পারছে না , ফলে এদের মধ্যে জন্ম নিয়েছে গোঁয়ার্তুমি । সুতরাং, এখন এরা
সেই প্রাসাদে প্রবেশ করছে ও করবেই ।
এবার আসি
বর্ধমান প্রসঙ্গে এদের ভূমিকা । প্রমান হাতে নিয়ে বলছি, ওখানে যে কজন মিছিলের মুখ
হয়েছেন তাঁদের কারও রেজাল্টে গড়বড় নেই আর
এদের মধ্যে কেউই যাদবপুরের আন্দোলনে চেঁচামেচি করা ছাড়া অন্য কোনও ভূমিকা নেয়নি। ওরা
স্লোগান করছে আজাদি আজাদি করে । আমি তো বুঝছি না এর সাথে আজাদির আবার কি সম্পর্ক ।
আর ওদের এই স্লোগান আমি কামদুনির মিছিল থেকে শুনে আসছি । এর বাইরে এদের কোনও অবদান
এ সমাজে নেই । অগাধ পয়সায়ালা বাপের বয়ে যাওয়া অবাধ্য বীরপুঙ্গব এরা । যেখানে যা
হবে সেখানে গিয়ে হাততালি দেওয়া আর চেঁচানো – ব্যস এই কাজ । এদেরও একটা সংগঠন আছে ।
আর এঁরা সেই সংগঠনে এবার বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হনুমান জোগাড়ের খেলায় মেতেছে । এই
সব বিপ্লবী ব্যাঙাচিরা ভবিষ্যতে লেজহীন ধর্মীয় ব্যাঙের মত ঘগড় ঘ করবে । সুতরাং
যারা এখানকার ছাত্রছাত্রী যাদের রেজাল্টে সত্যিই গন্ডগোল হয়েছে তাদের যে এ মিছিলে
কোনও লাভ নেই অর্থাৎ চেঁচামেচিই সার দাবিদাওয়া কিছুই পূরণ করানোর ক্ষমতা ‘হোক
প্রতিবাদের’ নেই , তা সকলেই বুঝে গেছে । সেজন্যই বর্ধমানের প্রকৃতভাবে ভিক্টিমাইজড
কোনও ছাত্রছাত্রী এতে অংশগ্রহন করছে না । যদি কেউ দাবি করেন যে কে বলল করছে না,
তাদের আমি বলব বর্ধমানের যে ৮০,০০০ ছাত্রছাত্রীর রেজাল্টে ভুলের দাবি তোমাদের তরফে
করা হয়েছে তাদের মাত্র ১% বা ৮০০জন ছাত্রছাত্রীও মিছিলে নেই কেন ?
তাহলে
সুবিচার আসবে কেমনে ?
প্রথম
প্রশ্ন যেটা উঠে আসে তা হল, উপরিউক্ত “বহু ছাত্রছাত্রী” কথাটা শুনলে ভয় করে ঠিকই
কিন্তু যেহেতু এটি একটি তথ্য, তাই জানতেই হয় সঠিক কতজন ছাত্রছাত্রীর ভাগ্যে এই
দুর্ভোগ লেখা হয়েছে ? ভিসি বলেছেন ৬২৪ জন আর ছাত্রছাত্রীরা বলছেন ৮০,০০০ । এই দুটি
বিবৃতির পরিসর যে বৃহৎ এলাকায় সামাপতিত হয়েছে তাতে সত্যিটা কি তা বোঝা দুষ্কর
কিন্তু বেশ কিছু সংখ্যক ছাত্রছাত্রীর যে রেজাল্ট ভুল হয়েছে তা নিশ্চিত । দ্বিতীয়ত,
এ ভুলের ঠিক কবে হবে আর রেজাল্টে এত ভুল কেন হল ? উত্তর চাইলে ভিসি কেন ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে
কিম্বা মিডিয়ার সঙ্গে দেখা করতে চাইছেন না ? আবার এই দেখা করতে না চাওয়া এবং
পুলিশি লাঠির সাহায্য চাওয়া কি বিশেষ ধরণের সন্দেহকে বাড়িয়ে দিচ্ছে না ? আর যদি
সেই সন্দেহের উত্তেজনায় মেতে ছাত্রছাত্রীরা ভিসি এর পদত্যাগ দাবির আন্দোলনে মেতে
ওঠে তবে তা অন্যায় নাহলেও ফলাফলের যে গণ্ডগোল তার কোনও সুরাহা করতে সক্ষম ? আর যদি
তা সক্ষম না হয় তবে কি এই আন্দোলন দিশাহীনতার শিকার নয় ? তাহলে কি আন্দোলন বন্ধ
করে দেওয়া দরকার ? যদি আন্দোলন বন্ধ করে দেওয়া হয় তাহলেও কি ফলাফলের সুরাহা হবে ?
উপরের সমস্ত
প্রশ্নের যা যা উত্তর হয় তা কেবলমাত্র বিভ্রান্তির জন্ম দিতে পারে । তাই প্রথমত
এবং প্রধানত আমাদের সকলের যা দাবি তাকে যদি পরিণতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয় তবে
জানতে হবে সঠিক কতজনের ফলাফলে ত্রুটি হয়েছে ? কিভাবে জানা যাবে ? যারা সত্যি করে
ছাত্রছাত্রীদের মঙ্গল চান তারা ‘হোক প্রতিবাদ’ বলে না চেঁচিয়ে ফেসবুকে একটি পেজ বা
গ্রুপ করে ও ট্রেনের কামরায় লিফলেট না বিলিয়ে কলেজে কলেজে প্রচার করুন একটি আবেদন
যাতে ভিক্টিমাইজড ছাত্রছাত্রীরা প্রত্যেকে নিজের মার্কশিটের দুটি করে জেরক্স করে ও
একটিকে ভিসির দপ্তরে একটি আবেদন পত্র সহ পাঠায় । আর
দ্বিতীয় জেরক্সটিকে রাজনৈতিক মতামতের বাইরে এসে যে সংগঠন সম্পূর্ণ ছাত্রছাত্রীদের
নেতৃত্বে কাজ করছে তাদের মাধ্যমে সংগ্রহ করা ও মিডিয়ার মাধ্যমে প্রকাশ করা । যদি
সেইরকম কোনও সংগঠন না থাকে তবে প্রত্যেক ছাত্রছাত্রীর ব্যক্তিগত উদ্যোগে সেগুলোকে
মিডিয়ার দপ্তরে পাঠানোর ব্যবস্থা করাই উচিত । কারণ যার
মাথা ফেটেছে তাকেই ওষুধ লাগাতে হবে । এই কাজের সুফল এই যে সারা পশ্চিমবঙ্গের মানুষ
জানতে পারবে সঠিক কত সংখ্যক রেজাল্টে এই দুর্নিতির হয়েছে আর ভিসিও চাপে পড়ে বাধ্য
হবেন ফলাফলের ত্রুটিমুক্ত প্রকাশে নয়ত জবাব্দিহি করতে। কিন্তু
যদি দেখা যায় এতেও কাজ হল না তখন ? তখন অন্তিম ও অবশিষ্ট একমাত্র সাংবিধানিক
অধিকারের প্রয়োগের রাস্তা ধরতে হবে যা শেষ হয় আদালতের দরজায় । এতেও যদি কাজ না হয়
তখন গন বা ছাত্র আন্দোলনের প্রয়োজন অবশ্যম্ভাবী । আর তখনই বোধয় এটি প্রকৃত আন্দোলন
হয়ে উঠবে । আর নিজেই তার অধিকার আদায় করতে সক্ষম হবে কেননা তখন তা আর উদ্দেশ্যহীনভাবে
আবেগ মোহ ও গোঁয়ার্তুমির ফলে সংগঠিত হবে না , হবে স্বতস্ফুর্তভাবে ।
বি: দ্র: - লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল "সংবাদ" ২৬শে এপ্রিল ২০১৫ । প্রকাশিত অংশে অজানা কারণে "তৃণমূল" অংশটি বাদ পড়েছিল, এখানে সেই অজানা কারণ না থাকায় সম্পূর্ণ প্রবন্ধ দেওয়া হল ।
