১
“আমি চঞ্চল হে আমি সুদূরের পিয়াসী”- এমন অমোঘ উচ্চারণ আমার
জন্য খাটে কিনা তা বোঝার বা বলার সময় এখনও আসেনি । আমার জীবনের প্রথম চব্বিশ বছরে
এই প্রথম আমি বাড়ির বাইরে এলাম, তাও একটানা একবছরের(কম করে) জন্য । তাই এখন
শুধুমাত্র সদ্য হাঁটতে শেখা দামাল ছেলের মত করে সব কিছু নেড়েচেড়ে মুখের ভেতর পুরে
চেখে ছুঁড়ে ফেলে ভেঙে-গড়ে নেবার সময় । সুতরাং রয়ে সয়ে ধীরে সুস্থে ওসব গম্ভীর
ব্যাপার নিয়ে ভাবা যাবে। আপাতত এই নতুন শহরের সমস্ত দিনরাত্রিগুলির কথা রোজযাপনের
গল্পগুলি আমি বলতে চাই । স্মৃতি বড় বিষম বস্তু, কবে কখন যে বেইমানি করবে বলা যায়
না । নীরদ চৌধুরীর কথা আলাদা । আমরা তো আর সে বস্তু নই । তাই এভাবে রেখে দেওয়া
জরুরী । তবে সেই ভেবেই শুরু হোক ...
- ১০ই জুলাই, ২০১৬
বহুদিন হল ব্লগে লিছু লিখিনি । অন্য কোনখানেও লিখিনি । আমি
পত্রপত্রিকার কথা বলছি না । বলছি নিজের জন্য লেখার কথা। যে লেখাগুলোর কোনও মানে
থাকে না কোনও গঠন থাকে না । এককথায় কোনও ছিরিছাঁদ নেই । তবুও সেগুলো মনের মধ্যে
থেকে ডুকরে ওঠা কান্নাগুলোর গায়ে হাত বুলিয়ে দেয়, উত্তাল আনন্দের ঢেউয়ে মাঝিহারা
নৌকার মত পাগলপারা হয়ে ভাসিয়ে দেয়, রাগ-অভিমান-অভিযোগ-প্রতিবাদ-দেখনদারি—গুমরনো-অনুতাপ-প্রত্যাশা-ব্যর্থতা-সাফল্য-ইচ্ছে-অনিচ্ছে-প্রেম-অপ্রেম
সমস্তকিছুকে নিজের শরীরে ধরে রাখে । আমি সেই লেখাগুলোর কথা বলছি । সে লেখাও লেখা
হয়নি আমার বহুদিন । হয়তো
এখানে মানে মুম্বইতে আসার প্রস্তুতি এর একটা কারণ । কিন্তু এবার আর কোনও জো চলে না
। সুতরাং সেরকমই একটা কিছু হলেও হওয়াটা দরকার...
মে মাসের ১৮ তারিখে মুম্বই শহরে আমি প্রথম এসেছিলাম ।
এসেছিলাম পরীক্ষা দিতে । এসেছিলাম ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর পপুলেশন
সায়েন্সেস-এ মাস্টার অফ পপুলেশন স্টাডিজে পড়ার ইচ্ছে নিয়ে । অনুংসা, সৌরভ আর
তন্ময়ের সঙ্গে আমিও ভিড়ে গেছিলাম । এই তিনজন আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু । অনু
আমার বড়গিন্নি, সৌরভ সুকু আর তনা গুরুদেব । আমরা পনেরজন ছিলাম স্ট্যাটিস্টিক্স
ডিপার্টমেন্টে । তবে কিনা বাঙালি তো আমরা। তাই গ্রুপবাজিটা না থাকলে ঠিক জমে না ।
প্রতিপক্ষ নয় তবুও দুটো গ্রুপ হয়ে গেছিল । একদিকে আমরা বারোজন অন্যদিকে তিনজন । আমাদের
বারোজনের মধ্যে এই দুবছরে যে জম্পেস একটা ব্যাপার তৈরি হয়েছিল সেটা এককথায় অনবদ্য
। সে মায়া আজও তো কাটেনি, আর কাটবে বলেও মনে হয় না এ জীবনে । সে যাই হোক, ২০১৫
সালে পাশ করার পর আবার একসাথে পড়ার থাকার লোভটা সামলানো সহজ ছিল না । তাও মুম্বই
শহরে । আর সে কঠিন কাজে পরাভব স্বীকার
করতেও হল । চলে এলাম মুম্বই ।
এখানে আসার আগের দুদিনের কথা না বললেই নয় । আমার ট্রেন ছিল মঙ্গলবার
অর্থাৎ ১৭ই মে । আমি কলকাতা চলে গেছিলাম রবিবার রাত্রে । কেন ? আমার “জিগরা”
কিম্বা ন্যাকামো মেরে ডাকা “ভাই”য়ের সাথে থাকব বলে । পরেরদিনের-১৬ই মে-প্ল্যানটা
ছিল এরকম । প্রথমে শিঞ্জিনীর(কে ইনি ? সে পরিচয় সারাজীবন ধরে দিলেও দেওয়া যাবে না
! ) সঙ্গে দেখা করে পাস্তা খাওয়া, তাপ্পর নন্দনে সিনেমা, তাপ্পর আবার নন্দনেই
সিনেমা, এরপর দৌড়ে ইডেন গার্ডেন কলকাতা নাইট রাইডার্স ভার্সেস রয়্যাল চ্যালেঞ্জারস
ব্যাঙ্গালোর । এসব করে পরেরদিন সকাল
৮টা ২০তে দুরন্ত । বলে রাখি সবকিছু প্ল্যানমাফিক হয়েছিল ।
প্রথম যেদিন এসেছিলাম মুম্বইয়ে সেদিনের একটা ঘটনাই আজন্ম
মনে থাকবে, বাকিগুলো ইতিউতি ছড়িয়ে থাকলে ক্ষতি নেই । এ শহর ওয়েলকাম করেছিল
পকেটমারি দিয়ে । ছত্রপতি শিবাজি স্টেশন থেকে মূলত চারটে রুটের লোকাল ট্রেন ছাড়ে ।
ওয়েস্টার্ন, সেন্ট্রাল, হারবার এবং থানে । এছাড়া পুনে যাবার ট্রেন আছে । আমার
গন্তব্য হারবার রুটে গোভান্ডি। চেম্বুরের পরের স্টেশন আর মানখুর্দের আগের । তবে
সেন্ট্রাল হয়েও এখানে আসা যায়, কুর্লাতে একবার চেঞ্জ করতে হয় । এই সেন্ট্রালের
রুটটাই ভাল । হাওড়া-বর্ধমানের মধ্যে যেমন সুপার নামের গ্যালপিন ট্রেনের ব্যবস্থা
আছে তেমনই এখানে আছে ফাস্ট ট্রেন । পার্থক্য এটাই যে সারাদিনে ওখানে মাত্র চারটে
(কর্ডে দুটো আর মেনে দুটো) চলে আর এখানে চার মিনিট অন্তর চলে । এই ফাস্ট ট্রেনের
ভিড় অনেকটা কম হয়, নইলে হারবার রুটে যা ভিড় হয় তা বনগাঁকে হ্যাঁটা করে হার মানায় ।
তখন কি আর এতকিছু জানতাম ! জেনেছি তো এখন । ফলে চেপেছিলাম হারবার রুটে সিএসটির ১নং
প্ল্যাটফর্ম থেকে । এখানকার প্ল্যাটফর্মগুলোর ব্যাপারও অন্যরকম । এখানে ট্রেনের
দুপাশেই প্ল্যাটফর্ম থাকে, যাতে সদাব্যস্ত লোকজন সমস্যায় বিব্রত না হয় ।
মাথায় ব্যাগ তুলতে হয়েছিল, তাতেও বেরোনো যায় না । এমন দুরাবস্থা । সেই নিঃশ্বাস বন্ধ করা ভিড়ে একজন শুভার্থীর ডানহাতের দুটো আঙুল আমার জিন্সের পকেট থেকে সুচারুভাবে আমার মোবাইল ফোন বের করে নিয়েছিল । সেই ফোনেই থাকে সমস্ত ডকুমেন্ট । ট্রেন দাঁড়ায় বিশ-পঁচিশ সেকেন্ড । সুতরাং ঐ ভিড়ে কিছু করার কথা ভাবা বা ফেরত পাবার আশা করা মূর্খের কাছেও অকল্পনীয় । তবুও একবার চেষ্টা করে দেখলাম । ব্যগটাকে তন্ময়ের কাছে ফেলে দিয়ে ট্রেনে উঠে চেঁচালাম-আমি ত ঐ হাতটুকু দেখেছিলাম সেই জোরেই- মেরা ফোন ওয়াপস কর দে ওরনা নিকালকে পিটেঙ্গে । মুম্বই কেন সদয় হল জানি না, ট্রেন ছাড়ার সেকেন্ড পাঁচ আগে আমি যেই নামলাম হতাশ হয়ে, একজন ফোনটাকে সামনে ধরে বলল, ইয়ে লিজিয়ে গির গয়া থা । খাঁচার অচিন পাখি ফিরে এল যেন । এরপর থাকে পকেটে হাত দিয়ে চলার রীতি শুরু করেছিলাম ।
মাথায় ব্যাগ তুলতে হয়েছিল, তাতেও বেরোনো যায় না । এমন দুরাবস্থা । সেই নিঃশ্বাস বন্ধ করা ভিড়ে একজন শুভার্থীর ডানহাতের দুটো আঙুল আমার জিন্সের পকেট থেকে সুচারুভাবে আমার মোবাইল ফোন বের করে নিয়েছিল । সেই ফোনেই থাকে সমস্ত ডকুমেন্ট । ট্রেন দাঁড়ায় বিশ-পঁচিশ সেকেন্ড । সুতরাং ঐ ভিড়ে কিছু করার কথা ভাবা বা ফেরত পাবার আশা করা মূর্খের কাছেও অকল্পনীয় । তবুও একবার চেষ্টা করে দেখলাম । ব্যগটাকে তন্ময়ের কাছে ফেলে দিয়ে ট্রেনে উঠে চেঁচালাম-আমি ত ঐ হাতটুকু দেখেছিলাম সেই জোরেই- মেরা ফোন ওয়াপস কর দে ওরনা নিকালকে পিটেঙ্গে । মুম্বই কেন সদয় হল জানি না, ট্রেন ছাড়ার সেকেন্ড পাঁচ আগে আমি যেই নামলাম হতাশ হয়ে, একজন ফোনটাকে সামনে ধরে বলল, ইয়ে লিজিয়ে গির গয়া থা । খাঁচার অচিন পাখি ফিরে এল যেন । এরপর থাকে পকেটে হাত দিয়ে চলার রীতি শুরু করেছিলাম ।
তা এভাবেই এখানে এসে পৌঁছনো গেল । অনু কাকিমার সঙ্গে দাদার
সঙ্গে শত ঝামেলা করেও আমাদের সাথে হস্টেলে থাকতে পারেনি । সে দুঃখে নাকি সারাদিন
মেয়ে কিছু খায়নি । বেশ করেছে । রোগা হবে। সৌরভ আমাদের আগের ট্রেনে এসেছিল, আর এসে
আমাদের জন্য একই ঘরে থাকার বন্দোবস্ত করেছিল । সে আবার কোথা থেকে এক আসিফ ভাইকে জোগাড় করে বলছে,
চল দেখা করে আসি । আচ্ছা ট্রেনে এসব হবার পর কি আর মুম্বইয়ে ভাইয়ের সাথে দেখা করা
যায় । কি বলেন !
পরীক্ষা হল । ইন্টারভিউ হল । ২০শে মে আমরা সরকারি টাকার
ব্যবস্থা করে নিলাম যাতায়াতের খরচ বাবদ, তারপর বেরলাম মুম্বই ঘুরতে । প্রথমে গেলাম
গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া যেটা কিনা ১৯১১ সালে রাজা পঞ্চম জর্জের আগমনহেতু বানানো শুরু
হয়েছিল । এই কাজ শেষ হতে সময় লেগেছিল ২৩ বছর, অর্থাৎ ১৯২৪ সাল অব্দি । পাশাপাশি
আছে তাজ হোটেল । দেখলেই সকালবেলার স্টার আনন্দর পর্দায় ২৬ তারিখের দৃশ্য মনে আসে । সিএসটিতে তো একটা স্মৃতিফলক
বানিয়ে দায় সেরেছে, এখনও সিকিউরিটির তেমন ব্যবস্থা নেই । আমরা তো পুরো চক্কর মেরেও
একটা টিটির দেখা পাইনি । তাজের সামনে বিশাল সমুদ্র আর অনেক লঞ্চ জাহাজের লাইন ।
এসব ধরেই এলিফ্যান্টা গুহায় যাওয়া যায় । কিন্তু এদিন আমদের যাবার সময় হয়নি । ওটা সারাদিনের মামলা । এরপর
আমরা গেছিলাম মেরিন ড্রাইভ । সমুদ্রের জল মোটামুটি নোংরাই বলা চলে । তবু পাথরের
বিরাট বিরাট চাঁই টপকে নেমে গেলাম জলে । কিছুক্ষন লাফালাফি তারপর হাজি আলির দর্গা
। এখানকার জায়গাটাও সুস্থ থাকার পক্ষে প্রতিকূল । ধর্মব্যবসার বাহুল্যের জন্য নয়
পরিচ্ছন্নতার জন্য । তবে ভেতরে কয়েকজন কাওয়ালী গায়কের দল আছে । এটা বেশ উপভোগ করার
মত । এসব করে ঐ দিনেই আমরা গোভান্ডি ফিরে গেলাম আর স্নান করে ঐ রাতেই সিএসটি এসি
ডর্মেটরি । পরদিন সকাল ৬টায় গীতাঞ্জলী । আই আই পি এস (ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট
ফর পপুলেশন সায়েন্সেস) থেকে বেরোবার সময় ভেবেছিলাম আর কি আসা যাবে, মনে হয়েছিল না
হয়তো । আর এখানে আসার ইচ্ছের অনেক কারণ আছে, সেগুলো এখানে বলার ব্যাপার নয়, অন্য
প্রসঙ্গ, তাই পরেই বলা যাবে । শেষমেশ হাওড়াতে পৌঁছলাম পরদিন দুপুর ১২টা সাড়ে ১২টা
নাগাদ । তারপর অপেক্ষা দিন দশেকের । ফাইনাল
রেজাল্টের । ২৯ তারিখ নাগাদ দুপুরে খেতে বসেছি । অর্ণব, অনু ও শেষে সৌরভ জানাল
শুধুমাত্র আমার নাম লিস্টে আছে । আমার হাত কেঁপেছিল । ভাত মুখে ওঠেনি । ওরা
ভেবেছিল আমি শুধু খুশিই হয়েছিলাম, কিন্তু কষ্টও যে কম হয়নি সেটা সে সময়ে বোঝার কথা
ওদের নয় । ১১ই জুলাই জয়েনিং ডেট । তার আগে ১০ই জুনের মধ্যে কনফার্মেশন দিতে হবে,
২৪শে জুনের মধ্যে ফিজ । আর এখানে জয়েন করার পর থেকে ভারত সরকার প্রতিমাসে ফেলোশিপ
দেবে । আমি কনফার্মেশন দিয়েছিলাম ৮ তারিখ নাগাদ আর ফিজ জমা ১৭ই মে । এই
স্বপ্নপূরণের সুযোগেও এতটা সময় লাগে । লাগে কেননা সেখানে অনেক যন্ত্রনাও থাকে ।
চব্বিশ বছরের অভ্যেস কাটানোর মানসিক প্রস্তুতি লাগে । রোজদিনের দেখতে পাওয়া
মুখগুলোর থেকে দূরে যাবার দুশ্চিন্তা থাকে । এখানেই বোধহয় বাঙালি অন্যান্যদের চেয়ে
নিন্দিত হয় । তবে আমার মনে হয় এ নিন্দা আজীবন থাকা ভালই । তাই বলে ঘরে বসে থাকার
কথা কোনও কাজের কথা নয় । নিন্দার মধ্যেই জয়ের লড়াই করাটাই বেঁচে থাকা ।
খবর এল ২৭শে মে ইন্টারভিউ । কীসের ? পিএসসি’র সরকারি স্কুলে
মাস্টারির চাকরির । যা হোক সেটাও দেওয়া হল । এর অপেক্ষা করেছি একবছর । স্ট্যাটের
ছাত্র হিসেবে আমি তো খারাপ ছাত্র ছিলাম । আজও আছি, হয়তো থাকবও । এ কথা আমার গর্বের
নয়, লজ্জারই । তবু সেটা সত্যি । স্বীকার তাই করতেই হবে । ফলত প্রস্তুতি লেগেছিল ।
নভেম্বরের শেষে শুরু করেছিলাম পড়াশুনো । সেই জোরেই জানুযারিতে আচমকা আসা সুযোগে
পেয়েছিলাম দুর্গাপুরের আগের স্টেশন রাজবাঁধে রাহুল ফাউন্ডেসনে ম্যানেজমেন্ট কলেজে
অঙ্ক আর পরিসংখ্যান গণিতবিদ্যা পড়ানোর চাকরি । সাকুল্যে সাড়ে তিনমাস । তবুও সেটা
অনেক অনেক অনেক কাজে লেগেছিল । পরীক্ষকদের সামনে হাঁ করে ক্যাবলা সেজে থাকতে হত না
এরপর থেকে ।
এরপর এল ৮ই জুলাই । এদিনও জীবনের প্রথম একটা অভিজ্ঞতা
হয়েছিল । প্লেনে চড়ার । খুব মানে খুউউউবই এক্সাইটেড ছিলাম । আমাদের দেশে ফ্লাইট
মানে একটা আলাদা স্ট্যাটাস, কেবলমাত্র পরিবহনের মাধ্যম নয় । আর আমার কাছে আকাশে
ওড়ার হাতছানি । কত বড় হয় প্লেন, প্রথম কাছ থেকে দেখার সুযোগ । এতদিন তো কেবল একটা
আওয়াজ আর দূরে মেঘের মধ্যে খুঁজতে থাকা দুটো চোখের বাইরে কিছু জানতাম না । এখনও
ভাবছি বলে বেশ ভাল লাগছে । এক লহমায় উড়ে চলে এলাম নতুন শহরে । মুম্বই এয়ারপোর্টে
আমার জন্য অপেক্ষায় ছিল চিন্ময় । চিন্ময় আমার কলেজের-বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু । ও
এখানে বার্ক নামের একটা কোম্পানিতে চাকরি করে । এসেছে একবছর আগেই । ফলে আমায়
ভালবেসে একদিনের ছুটি নিয়ে চলে এসেছিল । বেরিয়ে এসে চেনা মুখ দেখলে মনটা নিশ্চিন্ত
হয় । চিনু থাকে আমার থেকে চারটে স্টেশন দূরে । যাতায়াতের সময় ঐ আধাঘন্টা হবে । আর
দুই বন্ধুও আছে এখানে । দুজনেই স্কুলের বন্ধু । একজন প্রথমে যাদবপুর, তারপর আই আই
এম আর এখন মুম্বইয়ে কর্মরত । অন্যজন টি আই এফ আর –এ ফিজিক্সের রিসার্চার । ওদের
সাথে এখনও দেখা হয়নি । পরের সপ্তাহে হয়ে যাবে আশা করি ।
উবের চেপে হোস্টেল । কাগজপত্রের কাজ সেরে চিনুকে আমার সাথে
রাত্রিটুকু থাকার ব্যবস্থা করে ফেলা গেল । তারপর খেয়েদেয়ে দেদার ঘুম । এখানে
সন্ধ্যে নামে রাত্রি ৮টায় । আমরা সাড়ে ছটা নাগাদ বেরলাম কুর্লাতে ফিনিক্স মল ঘোরার
জন্য । কিন্তু সে বন্ধ । কি জানি কি হয়েছিল, পুলিশে ছয়লাপ চতুর্দিকে । জ্যামের
ঠেলায় কোনও অটো ট্যাক্সি কিছুই যেতে চায় না । শেষে একজনকে পাকরাও করে একটা স্টেশন
বিদ্যাবিহার হয়ে ঘুরপথে ফিরলাম । হোস্টেলে মেনুতে চিকেন ছিল । কিন্তু হায়! দেরিতে
আসার কারণে তা আর পাওয়া গেল না । পনীর দিয়ে কাজ চালালাম । রাত্রে বুদ্ধ ইন আ
ট্রাফিক জ্যাম । অন্তিমে নিদ্রা ।
গতকাল অর্থাৎ ৯ই জুলাই আমদের প্ল্যান হল মাথেরান যাবার ।
কিন্তু বাধ সাধল ট্রেন । আবহাওয়ার কারণে চলাচল বন্ধ । তাছাড়া রাজু মানে রাজেন্দ্র
মানে আমার আরেক জিগরা কা টুকরা সে ফোন করে বলল যে অগস্টে তিনি আসবেন । ফলে মাথেরান
তোলা রইল । আমরা গেলাম ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ বাস্তু সংগ্রহালয় মানে মিউজিওয়মে । এত বড় ইতিহাসের ভান্ডার আমি জীবনে দেখিনি । কি
নেই সেখানে । দু-চার কথা না বলে শান্তি হয় না । সারাদিন যখন কাটালাম ওখানে কিছু না
বললে অপরাধ হবে । তাই না !
- ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ বাস্তু সংগ্রহালয়
প্রিন্স ওয়েলস যিনি পরে রাজা পঞ্চম জর্জ নামে পরিচিত
হয়েছিলেন, ১১ই নভেম্বর ১৯০৫ সালে এই মিউজিওমের কাজ শুরু করেছিলেন । তাঁর নামেই
মিউজিওমের নাম হয়েছিল প্রিন্স অফ ওয়েলস মিউজিওম অফ ওয়েস্টার্ন ইন্ডিয়া । তা তখন
নাকি প্রতিযোগিতা করে এই মিউজিওমের নকশা বাছা হয়েছিল । জর্জ অয়িটিট ১৯০৯ সালে এই
প্রতিযোগিতায় জিতেছিলেন এবং ইন্ডো-স্যারাসেনিক স্টাইলে এই বিরাট মহল খাড়া করেছিলেন
। স্যারাসেন হল সিনাইয়ের যাযাবর জাতির লোকজন । এরা মূলত আরবের কাছাকাছি এলাকায়
রোমের যে অঞ্চলগুলো ছিল সেখানে থাকত । ফলে দুইয়ের প্রভাবই এদের ওপর ছিল । ফলে মিশে
শিল্পের সূত্রপাত সেখান থেকেই যার নাম স্যারাসেনিক স্টাইল । ১৯১৪ সালে এই মহল
তৈরির কাজ শেষ হয় কিন্তু এটা খুলতে সময় লাগল আরও আট বছর অর্থাৎ ১৯২২ অব্দি । বম্বে
যেমন পরে মুম্বই হয়েছে তেমনি এরও নাম বদলে গিয়ে হয়েছে ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ
বাস্তু সংগ্রহালয় ।
এখানে ভারতীয় ক্ষুদ্রশিল্পের বিরাট ভান্ডার মজুত আছে । এইসব
কিছু জোগাড় হয়েছিল শেঠ পুরুষোত্তম মাভজির বদান্যতায় । এমনকি পাকিস্তানের মিরপুরখাস
এলাকার বুদ্ধগুহার শিল্পসামগ্রীও এখানে সংগ্রহ করা হয়েছে । রতন টাটা আর দোরাব টাটা
তো প্রচুর জিনিসপত্র এখানে দিয়ে দিয়েছে । এদের নামেই দুটো ইউরোপীয় গ্যালারির নামকরণ করা আছে । মূলত
চারটে ভাগে মিউজিওমটাকে ভাগ করা যায় । একতলা, দুতলা, তিনতলা আর বিশেষ অংশ । একতলার
মধ্যভাগে আছে একটা মূর্তি । আর এখানে প্রাচীন ভারতীয় টেরাকোটা, ব্রোঞ্জের
শিল্পসামগ্রী, দূর-পশ্চিমের শিল্প ইত্যাদি দিয়ে ঠাসা রয়েছে ।এর গম্বুজগুলো
গুজরাটি-রাজস্থানি স্টাইলে তৈরি । অপরের দিকে তাকালে যে অংশ দেখা যায় সেটা
বিজাপুরের গোল গম্বুজের পরে ও আদলে তৈরি ।
দুতলায় বিভিন্ন ধর্মীয় লিপির সংগ্রহালয় আছে । মানে ঐ
তালপাতায় লেখাপত্র ইত্যাদি । আর আছে বিভিন্ন সময়ের সামাজিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার
অনেক নিদর্শন । সেখান থেকে অনেক কিছুর সম্পর্কে ধারণা তৈরি হয় । তিনতলায় চিন জাপান
ও ইউরোপের প্রচুর মানে প্রচুর শিল্পের সমারোহ আছে । সেসব দেখলে তাক লেগে যাবার মত
ব্যাপার । আমার তো মাথা ঘুরে গেছিল । যুদ্ধের উপকরণের যা সংগ্রহ আছে সেটাই যেন
একটা যুদ্ধ লাগিয়ে শেষ করার জন্য যথেষ্ঠ ।
এছাড়া আছে কৃষ্ণের নানা উপগাথার প্রতিকৃতি । নীচে এলে একটা
ক্যাফেটেরিয়া আছে, সেটা দেখতে ও বসার জন্য দারুণ । তবে কিনা খাবার-দাবার অন্তত
বাঙালিদের পোষাবে না ।
সুতরাং, এসব দেখতে দেখতেই সারাদিন কেটে গেল । বেরিয়ে এসে
মনের মধ্যে পুরনো অনেক পোকার প্রাণোদ্ধার করা গেল । এর পর সবাই যেখানে যায় আমরাও
গেলাম । আবারও গেলাম । গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া । কিছুক্ষন বসে, ঝিরিঝিরি বৃষ্টি উপভোগ
করে ফিরতা পথ ধরলাম ।
নতুন জীবনের শুরুয়াত এরপর । ঘরে তখন একা । চিন্ময় নেই ।
ভাবছি নিজের সঙ্গে থাকার ব্যাপারটা ঠিক কেমন ? বড় অদ্ভুত এসময় । পিছনের দিকে
তাকালে অনেক হাত জাপটে ধরে কাঁদতে থাকে, সামনের দিকে তাকালে একটা সাদা আলোয় চোখ
ধাঁধিয়ে যায় । বোধয় প্রত্যাশার আলো । সেখানে কি ব্যর্থতার অন্ধকারের গোপন অভিসন্ধি
আছে । থাকতেই পারে । আর তার মধ্যেই আমাদের এইসব ঝুলে থাকাথাকি । অদ্ভুত লাগবে না
তো কি ?
প্রস্তুতির প্রথম ধাপ । নিজের কাজ নিজেরই করে নেওয়ার অভ্যেস
তৈরি করা । চল মন নিজ নিকেতন ।
বিবেকানন্দের কণ্ঠে এ গান কেমন লেগেছিল জানি না তবে নিকেতন না থাকলে মনের ঠাঁই
কোথায় সে আমি জানি না । কিম্বা হয়তো জানি । নইলে কি আর সাধে ডুবে থাকা ভেসে থাকার
মধ্যবর্তী বিচরনে থাকি ।
- ১১ই জুলাই, ২০১৬
(আপডেট দিচ্ছি আজ, ১১ই জুলাই ২০১৭ তে যে, দীর্ঘ একবছর ধরে এত অনুভূতি এত স্মৃতি জমা হয়েছে, সেসব মনের গহীনে রয়েছে সযত্নে । শুধু জীবনের টানাপোড়েনের সামনে হার মেনে আর সেসব প্রকাশ করার তাগিদ পাচ্ছি না। তাই চলল না আর...)




















