Tuesday, 14 April 2020

শিরোনামহীন প্রলাপগুলো, বিজ্ঞানির প্রতি মনোযোগি হও সমাজ, ওঁচাটে কবির প্রতি নয় ...


আজি হতে শতবর্ষ পরে. কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি. কৌতূহলভরে”- কেউ না, এমনকি কবি নামক হাড়-হাভাতেও নয় । কিন্তু প্রথম প্লেগ থেকে শুরু করে আজকের করোনা অব্দি(অনেকগুলো শতবর্ষের পরেও), মানুষ এপিডেমিওলজিকাল স্টাডি করছে অনবরত, যাতে মানবসভ্যতা রক্ষা পায় । কবিতা পড়ে মানবসভ্যতা বাঁচবে না । তাই আজও ডালটন, অ্যাভোগাড্রো, ডারউইন পড়ছি, কবিতা নয় ।

কবি অত্যন্ত বকওয়াস জাত – বোধহয় – বেজাত । যুগে যুগে বাচালতা ছাড়া সমাজে কোনও অবদানই এদের নেই । বিনোদন একটি অত্যাশ্চর্য পরমাদ- মানছি – কিন্তু যে সময়ে এসে আমরা পৌঁছেছি সেখানে এসব পরমাদের আবদার অত্যন্ত বালখিল্যতা । স্রেফ কথার টেকনিকালিটির পরিবর্তন করে – যাকে এরা কাব্যের ফর্ম বলে – এই প্রগলভতা চালিয়ে যাচ্ছে । আর বলিহারি সরকার, স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে কাব্যের ভাষা, তার ইতিহাস, তার ফর্মের কচকচানি পড়াতে গিয়ে কোটি টাকা অপচয় করছে । কোনও যথার্থতা নেই এই অপব্যায়ের । কবিতা নিয়ে রিসার্চ, তাতে আবার ফেলোশিপ । মরা গাধার জন্য ভেন্টিলেটর ছাড়া এ আর কিস্যু নয় ।

এ কথা আজ স্পষ্ট, যে, সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট – কথার বিপরীতে গিয়ে এই কবি নামধারি বদখৎ গোষ্ঠীকে টিকিয়ে রাখা হয়েছে – আমাদের সমাজে । যাদের বিজ্ঞান পড়ার যোগ্যতা নেই, যারা সত্যের সন্ধানে পঙ্গু, যারা আবাল্য ক্যাবলা, মানে হাঁদা-গোবিন্দ-গঙ্গারামের চেয়েও অধঃপতিত তারাই এসব আজেবাজে জিনিসে মহাপন্ডিত । আর দয়ার-সরকার এইসব সাবজেক্টের পেছনে পয়সা ঢালছে ।  সুকুমার সেনের বই ছাড়া যাদের পাশ দেওয়া হয় না, তারাও জেনে রাখুক, যে সুকুমার সেন অব্দি গণিত বিষয়ে পড়াশুনা করেছেন । আর এই গণিতই তাঁর মেধা-মনন-যুক্তিবোধের ভিত্তিপ্রস্তর রচনা করেছে । দুনিয়ার তাবৎ শ্রেষ্ঠ কবি-শিল্পী-সাহিত্যিক সকলেই বিজ্ঞান পড়েছেন খুঁটিয়ে । অথচ, ফেসবুকিয় কবিদের ছেড়ে দিলাম, যারা বর্তমানের অ্যাকাডেমিও ও নন-অ্যাকাডেমিও কীর্তিমান কবি, কাব্যপতিতার রসে টইটম্বুর যাদের হৃদমাঝার, তারা গণিত শুনলেই ভিজে বেড়াল । অর্থাৎ, না মেধা, না মনন, না যুক্তিবোধ – তবুও এদের সমাজে পুষতে হবে । 

কয়েকজন ফিলোজফারের নাম বলতে বললে কার কার নাম আসবে, প্লেটো, সক্রেটিস, অ্যারিস্টটল এঁদের, অথবা ডেকার্তে, স্পিনোজা, ভলতেয়র, লিবনিজ, নিউটন এঁদের অথবা রাসেল, আইনস্টাইন, বোর, ম্যক্সওয়েল, রাদারফোর্ড এঁদের অথবা আজকের দিনে চমস্কি, পোলিয়ানি, ব্রেইথয়েট, চক্রবর্তী, রজেনবার্গ, দুঁপ্র এঁদের । মনে রাখতে হবে এঁরা সকলেই বিজ্ঞানের একেকটি স্তম্ভ ।  আর আমাদের দেশে ফিলজফি পড়ে কারা, যারা কোথাও চান্স পাবার মত মার্কস জোটাতে পারেনি, তাদের ঠাঁই ফিলোসফি, সোশ্যাল সায়েন্স, মাস কমিউনিকেসন, কম্পারেটিভ লিটেরেচার, উইমেন্স স্টাডিজ, লিঙ্গুয়েস্টিক, কালচারাল স্টাডি ইত্যাদি সব চোখে ধুলো দেওয়া বিষয়ে । সোশ্যাল সায়েন্স যদি সায়েন্স হয়, তবে ম্যাথ, ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, ইকোনমিক্স, এগ্রিকালচার, বায়লজি এগুলো তো ঝালমুড়িওয়ালা । একবার এক বন্ধুর থেকে একজন উইমেন্স স্টাডিজে পিএইচডিরতার, বোরো রমনিদের জীবনযাত্রা বিষয়ে গবেষণা প্রসঙ্গে, র‍্যানডম স্যাম্পেল তোলার মজাদার কাহিনি শুনেছিলাম । সে নাকি চোখ বন্ধ করে কতকগুলো নাম্বার আওড়াতো, সেগুলোই নাকি তাঁর র‍্যান্ডম নাম্বার । সেও আজ পশ্চিমবঙ্গের এক শ্রেষ্টতম বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টরেট অধ্যাপিকা । সত্যি আমরা স্ট্যাটিস্টিকসের লোকজন কষ্ট করে স্যাম্পল সার্ভে মেথডোলজি কেন যে পড়ি ? এরকম বহু সত্য গল্প বলতে পারি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেও।

বাস্তবে সোসাইটিতে কোনও সায়েন্স নেই, থাকলে লকডাউনের সময়ে বাঙালি বাজারে গিয়ে কাব্য করে কানকো তুলে ‘বাঙ্গালিত্ব’ রক্ষা করতে ভিড় জমাতো না । আমার চেনা অনেক বন্ধু আছে যারা অঙ্কে, ফিজিক্সে আর সবচেয়ে বেশি আছে ইঞ্জিনিয়ারিং-এ পড়ে কবি হয়ে গেছে আর ব্যাঙ্কের চাকরির পরীক্ষা অথবা কেরানিগিরির প্রস্তুতি নিচ্ছে এর কারণ এই যে, যতটুক ঘিলু থাকলে বিজ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত হওয়া যায়, তা এদের নেই, তাই কাব্যপিড়িতির জন্য নয়, ফোকটে বিখ্যাত হবার লালসায় এসে এ তল্লাটে জুটেছে । এরা আবার এটুকুও বোঝে না, কবিতা অব্দি একটা চর্চার বিষয়, চর্যার অন্তর্ভুক্ত , ঠিক যেমন সিক্সপ্যাক । তাতে পরিশ্রম আছে, তাতে ডেডিকেশন আছে, তাতে টেনাসিটি আছে তাতে ধৈর্য আছে । লেগেপড়ে থাকলে তবেই একদিন হনু আঁতেল হওয়া যাবে । আর তারপর আঁতেল হয়ে কি ছিঁড়বে আর কি বাঁধবে, করোনার মত কোনও ভাইরাস এলে আনন্দ খুলে ডাক্তারের মুখাপেক্ষি- কি করব কি করব না, বিজ্ঞানিদের পায়ে গড়াগড়ি – ওষুধ আর কদ্দিন, ইকোনমিস্টদের দোরে হত্যে- দাদা এরপর খাবার-চাকরির নিদান দ্যান । তারপরে আবার সব ঠিক হলে আনন্দ পর্দায় শুভ্র সাহিত্যবর্ম পরিধান করিয়া ইন্টেলেকচুয়াল আসিবেন । তখন কে ডাক্তার, কে বিজ্ঞানি, কে ইকোনমিস্ট !!!   

ছবি ঃ ক্ষীরোদবিহারি ঘোষ (আমার বাউলদাদু)

সত্যি বলেন, এই করোনা মোকাবিলায় কোন কাজে লাগবে তারা ? যুগে যুগে, মোমবাতি আবিষ্কার থেকে আলপিন, চাকা থেকে এরোপ্লেন, ঠোঙা থেকে বোমা, পোস্ট অফিসের ধারণা থেকে ইন্টারনেটের ধারণা, শল্য থেকে কেমো অব্দি সবই করেছে বিজ্ঞান । আর বলে রাখি, এই বিজ্ঞানিরাই চাঁদে পৌঁছেছে, বখাটে কবিগুলো দূর থেকে দাঁড়িয়ে কাব্যি করছে, কেননা সেখানে পৌঁছনোর জন্য, চাঁদের মাটিকে স্পর্শ করে শরীরে রোমাঞ্চ তোলার জন্য যে যোগ্যতার দরকার তা এদের নেই, কোনদিনও তা হবে না ।  এরা কি করেছে মোমবাতির আলো নিয়ে বাকতেল্লা, চাকা নিয়ে কাব্যগ্রন্থ, বোমা নিয়ে গান, ইন্টারনেট নিয়ে ছ্যাবলামো, শল্য নিয়ে বাৎসল্য আর সর্বোপরি হাজার হাজার গাছের প্রাণ নিয়েছে । এ দুনিয়ায় যত কবতের বই, যত গপ্পের বই, যত পাকাপনার বই বের হয়, তার চেয়ে ঢের কম বের হয় বিজ্ঞানের বই । আর বিজ্ঞানিরা সেই ভার কমিয়ে এখন ডিজিটাল মাধ্যমের আবিষ্কার করেছে যাতে কাগজের প্রয়োজনে বৃক্ষের ধ্বংস না হয় । কারণ কবিতার চেয়ে শ্বাস ঢের দরকারি ।

অথচ ক’জন বিজ্ঞানির নাম জানেন আপনি ? আনন্দ পর্দায় কজন দেখেছেন তাঁদের ? ক’জন করোনার আগে নেচার, ল্যান্সেট, অ্যানালস ইত্যাদির নাম গুগলে টাইপ করেছেন ? ভেবে দেখুন, পৃথিবীর অসুখ যতবার সেরেছে, যতবার মানুষ খুঁজেছে প্রযুক্তির সুবিধা, যতবার মানুষ এগিয়েছে পরমাণুর পরের সত্যে ততবারই আমরা পেয়েছি দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিদীপ্ত কিছু মুখ – তারা বিজ্ঞানি ।  পৃথিবী আবার সুস্থ হলে, কাদের মর্যাদা দেবেন আপনি, আনন্দ পর্দায় কাদের যুক্তি করবেন গ্রহণ, কাদের বসাবেন শাসনের আসনে – যারা বিজ্ঞানের সেবা করে তাঁদের নাকি শব্দের খেলায় মাতিয়ে রেখে ছেলেভুলানো খেলা করে যাঁরা আপনাদের সাথে তাঁদের ।

No comments:

Post a Comment

I am waiting for your valuable comment. Please comment. Thank you..