। ১০ ।
কদিন ধরেই ভাবছিলাম, ব্লগ কেন লিখি, কি দরকার ?
না না অরওয়েলের ‘Why I write’ এর মত কিছু নয় । আবার নীরদবাবুর, সিংহ যেমন শিকার না করে বাঁচে না,
তেমনই যিনি লেখক তিনি না লিখলে বাঁচবেন না – এমনও কিছু নয় । আজ তাই খানিক স্মৃতিচারণের
গৌড়চন্দ্রিকা, ব্যাস তারপরেই জবাবদিহি ।
আমার মনে নেই বুদ্ধদেব বসুই একথা বলেছিলেন কিনা,
ভুল হতে পারে, তবে যতদূর স্মৃতি হাতড়াতে পারি, বোধহয় তিনিই বলেছিলেন, লেখার
ব্যাপারে যা খুশি লেখা যায়- অনেক সময় তা হয়তো দারুণরকমের চমৎকারও হয়- কিন্তু তাই
বলেই সব চমৎকার লেখাই ছাপার যোগ্য হয় না । কোনটা ছাপার যোগ্য আর কোনটা নয়, সেটাই
লেখকের মূল শিক্ষার বিষয় । এই কথাটা আমাকে খুব নাড়া দিয়েছিল । আজও এর প্রভাব আমার
কাটেনি ।
২০১২ সাল থেকে মোটামুটি বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় আমি
লেখালেখি শুরু করেছিলাম । তখন কত আর বয়স – উনিশ-কুড়ি । সে সময় এককমাত্রা’র তৎকালীন
সম্পাদক অনিন্দ্য ভট্টাচার্য আমার একটা লেখা নিয়ে আমাকে এতবার কাটাছেঁড়া করিয়েছিলেন
যে বুদ্ধদেব বসুর ওই কথাগুলোর মানে আমি টের পাই । অনিন্দ্যদার কাছে চিরঋনী । এরকমভাবে
অনেকের কাছেই আমি ভীষণ ঋণী । যেমন শ্যামলকান্তি দাশ । কবিসম্মেলনের সম্পাদক । তখন
আমি আমার নামের বানান লিখতাম, ‘অর্দ্ধেন্দু ব্যানার্জ্জী’ । উনি বললেন, “তুমি
আধুনিক বানানবিধি কেন মানো না, নামের বানানেই তো ভুল । এগুলো শিখতে হবে তো, এও তো
লেখার অঙ্গ” । কঙ্কর কাকু, কঙ্কর সিংহ । ওনার বাড়িতে গেলে উনি যে শুধু যত্ন নিয়ে
রকমারি পদ খাইয়েছেন, তাইই নয়, আমার হাতে তুলে দিয়েছেন এমন কিছু বইপত্র যা আজও আমার
নবিশিয়ানাকে তরতাজা রেখেছে । ‘বিবক্ষিত’র জন্য লেখা চাইতে ফোন করেছিলাম সুনীল
গঙ্গোপাধ্যায়কে । সে সম্বন্ধে আমার যা পাওনা, তা একটা দশ-বারো মিনিটের ফোন কল ।
সেখানে একজন বিশবর্ষীয় অপরিচিত যুবককে উনি যেভাবে পুজোর পরে নিজের বাড়িতে আসার
জন্য আমন্ত্রণ জানালেন, তা আমাকে শিখিয়েছিল ঔদার্যের পাঠ । কিন্তু সে পুজো কাটেনি
আর । অনুবাদ পত্রিকার বিতস্তাদি আর সাগরদার দৌলতে শুরু হল বিদেশী গল্প-উপন্যাসের
অন্যপাঠ । আনন্দের জন্য পড়া এক ব্যাপার ছিল আর এখন অনুবাদের জন্য আরেক । কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেন ল্যঙ্গুয়েজ ডিপার্টমেন্টের তৎকালীন হেড অর্চন সরকার
দিয়েছিলেন আরও কিছু অজানা রেফারেন্সের সংগ্রহ । পুষ্পল মুখোপাধ্যায় আমার কাকু । শম্ভুনাথ
বন্দ্যোপাধ্যায়ও । এই লোকগুলোর নাম আমি কৃতজ্ঞতার তালিকায় তুললে, লোকগুলো ত্যাগ
দেবে । তাই বাদ দিলাম । এরপর বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিয়ান কাঞ্চন
কামিল্যার অবাধ প্রশ্রয়ে এল নীরদচন্দ্র চৌধুরীর বিপুল লেখামালা । এরপরেও লেখালেখি
করব – এমন স্পৃহা ততদিনে আমার আর নেই । এত মানুষ এত কিছু লিখেছেন, এই তো যথেষ্ট ।
নতুন কিছু বলার তো নেই আমার । নতুন কিছু বলতে গেলে তো আরও জানতে হবে । সব পড়তে হবে
আগে । বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে রাখা ১৯৩০ সাল থেকে শুরু টাইমস
লিটেরারি সাপ্লিমেন্টের বিপুল সংগ্রহ আর কলকাতার ন্যাশনাল লাইব্রেরির খেই হারানো
পৃথিবীতে, আমি ভেবেছিলাম আত্মহত্যা করব । এত বই, এত লেখা - চোখে দেখলাম আছে,
কিন্তু মানুষের ছোট্ট জীবনকালে কেমন করে সম্ভব চেখে দেখা- এর চেয়ে মরে যাওয়া ভাল ।
আমার এক বন্ধু বলল, মরে যাওয়া তো সহজ, পড়ে যাওয়াই কঠিন । মরার আগে কতদিন পড়তে
পারিস, সেটাই দ্যাখ । সেটাই বেঁচে থাকা । ফলে, আজও আমি পড়ছি, ব্যাস এইমাত্র । এর
বেশি কিছু দাবি আমার নেই ।
পত্রপত্রিকায় লেখা ২০১৫ সালের পরে আর কোনোদিন
পাঠাইনি । কয়েকজন লোক যাদের না বলা যায় না, ভয়ংকর জোর করলে হয়তো একটা বা দুটো
দিয়েছি । নিজে থেকে একটাও না । ২০১৪ থেকে বিবক্ষিততেও লিখিনি, শুধু সম্পাদকীয় ছাড়া
। ব্লগের আর্কাইভ লিস্টে টাইমলাইন আছে, সেখানেও একই প্রমাণ দেখতে পাওয়া যাবে । কিন্তু
সমকালীন দেশ-কাল-সময় বিষয়ে সকলের যেমন একটা প্রতিক্রিয়া (মতামত নয়) থাকে, আমারও
আছে । ফলে, ২০১৩ সালে আমি যখন ব্লগ লেখা শুরু করি, তখন যে বিষয়টা আমি বিশ্বাস করতাম
তা হল, চারপাশের ঘটনার প্রতিক্রিয়াগুলো আর নিজের মনের কিছু কথা, এই থাকবে ব্লগে । ইতিহাসের
কালানুক্রমিক সাক্ষ্য হিসেবে । তাও, সবিস্তারে নয় । কেননা, হাজার শব্দের বেশি লিখে
নিজের অযোগ্যতার আত্মঘাতী প্রমাণ রেখে দিতে আর যে কজন বন্ধু অবশিষ্ট, তাদের
বিরক্তির কারণ হতে চাইনা । আর যে লেখাগুলো ছাপার যোগ্যতার বিচারে আমার নির্ধারিত
স্কেলে পাশ দেবে সেগুলো পত্রিকায় পাঠাব, বাকি সব ব্লগে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া
হিসেবে থেকে যাবে। কিছুটা স্মৃতি হিসেবেও যাতে অনেক পরে আত্মবিচার ও আত্ম অনুধাবন
সম্ভব হয়, ব্যাস । আর কালি-কাগজে ছাপানো-প্রকাশিত লেখা ছাড়া আমি কোনও লেখাকেই
লেখকের পরিচয় বলে ধরিনি, ধরি না । আজও তাই । তাই ব্লগের লেখাগুলো সবই একজন সাধারণ
নাগরিকের প্রতিক্রিয়ামাত্র । লেখক বা লেখার বিচারে এগুলোর কোনও মূল্য নেই । ফলে
মরণের পরে অমর হবার যে ভয়াবহ ফাঁদ – তাতে আমি নেই । এই হল আত্মকৈফিয়ত ।
যাই হোক অনেক হল, আর না । এবার চন্দ্রিল প্রসঙ্গে
শ্রুত্যানদ ডাকুয়ার উত্থাপিত প্রশ্নের (ফেসবুকের প্রাসঙ্গিক পোস্টের কমেন্ট সেকশনে
আছে, লিংক নিচে দিলাম) জবাবদিহি । ‘চন্দ্রিল’ – প্রসঙ্গে যে লেখাটা লিখেছিলাম তার অন্তিমে
লিখেছিলাম, ‘এটা চন্দ্রিল সমালোচনা, চন্দ্রিল আহা কিংবা চন্দ্রিল রিভিউ
নয় । চন্দ্রিলকথা বলা যেতে পারে বড়জোর ।’ ফলে, লেখাটা বক্তা চন্দ্রিল, গদ্য লেখক চন্দ্রিল,
কবি চন্দ্রিল ও ইত্যবসরে পরিস্ফুট ব্যক্তি চন্দ্রিল সকলকে নিয়েই । ‘ছোট করে ছেড়ে দিলেই
কি চলে’ – চলে কেননা এটাই আমার ব্লগে লেখার মূল কৈফিয়ত । বড় করে
লিখতে হলে আরও গবেষণা করে, দীর্ঘ অধ্যাবসায়ের পরে লিখতে হবে, আর সে লেখা কাগজের
জন্য, ব্লগের জন্য নয় । তাই তা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ামাত্র হলে হবে না ।
চন্দ্রিল একটা ইন্টারভিউতে বলেছিলেন, ‘গানগুলো
তাঁরা কেবলমাত্র আনন্দের জন্যই লিখেছিলেন । তাতে সমাজকে দেওয়ার মত তাঁদের কিচ্ছু
নেই । যা লিখে আনন্দ পেয়েছেন তাই লিখেছন । সমাজ যদি কিছু খুঁজে পায়, পাবে, তাতে
আপত্তিও কিছু নেই।’ ফলে, গানগুলোর মধ্যে যে ‘প্রেম নিয়ে ব্যঙ্গ আর ব্যঙ্গের আড়ালে একটা
করুণ-মধুর প্রত্যাশা’ আছে বলে মনে করা হচ্ছে, তা নিয়ে সন্ধিগ্ধ তদারকি
করার প্রয়োজন বোধ করি না, বরং উপভোগকেই প্রধান করে নিয়েছি । যিনি নিজেই বিচারের
আশা করেন না, তাঁর জন্য খামোকা পরিশ্রমের দরকার কী !
এবার আসা যাক, নীরদচন্দ্র চৌধুরীর সঙ্গে তুলনা
প্রসঙ্গ । এ তুলনা প্রাথমিকভাবে আমার মনেও এসেছিল । কিন্তু, যতটুকু আমি চন্দ্রিল
পড়েছি ও শুনেছি, এখনই এই তুলনা আমি করতে পারিনি । কেননা পাঠককে চমকে দেওয়া আর
রকমারি রেফারেন্সের ব্যবহার – এটা কিন্তু নীরদচন্দ্র নন । সমাজকে পাটে পাটে ভেঙে ইতিহাসবীক্ষার ও ব্যাখার ব্যতিক্রমি নিদর্শন । সর্বোপরি নীরদচন্দ্র হলেন লেখক – শত
দৈন্য ও দুর্দশাতেও অপরাজিত, সমঝোতাহীন, জেদি, চরম আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন ও তীব্র আক্রমণাত্মক-প্রতিক্রিয়াশীল
– তা যতই শাসক-প্রশাসককে চটিয়ে দিক- এমন একজন লেখক । যাঁর অস্তিত্ব শুধুই লেখাতেই
। সেই তাঁর স্বধর্ম । আত্মপ্রতিষ্ঠার জন্য, সংসার চালনোর জন্য বা অন্য কোনও কারণেই
তিনি পরধর্ম নেননি । তাঁকে অবহেলা করা যায়, উপেক্ষা নয় । তিনি অনেকের অনুপ্রেরণাও
। আপনার কাছ থেকে জেনেছি, আনন্দবাজারের সদা-সন্তুষ্ট লেখকগোষ্টির বাইরে
নীরদচন্দ্রই এমন লোক যিনি বে-আইনি কাজের জন্য আনন্দবাজারের থেকে পাঁচ হাজার টাকা
আদায় করেছিলেন । এ আর কার পক্ষে সম্ভব ? সুতরাং,
যেমনই হোক স্বধর্মেই তিনি মরেছেন ।
![]() |
| ছবিঃ প্রতিকি |
কিন্তু, চন্দ্রিল গীতিকার, চিত্রপরিচালক, কবি,
রসিক সুবক্তা, রিয়েলিটি শো-এর বিচারক ও খবরের কাগজের সুচতুর সাবধানি কলাম লেখক । তিনি
যা উচ্চারণ করেন তা কেবলই খাঁচাবন্দী পাখির মালিকের প্রতি ক্ষোভের উচ্চারণের মতো ।
কী যে তাঁর স্বধর্ম তা জানি না । বোধহয় ধর্মের তোয়াক্কা তিনি করেন না । কারও
অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠার তো নয়ই । ফলে, চাকরি চলে যাওয়া – রাষ্ট্রের ক্রোধে জর্জরিত –
চতুর্পাশের লোকেজনের খোঁচায় বিদ্ধ – দেশত্যাগী – দৈন্যক্লান্ত - এমন লেখকজীবন তাঁর
নয় । নাই হতে পারে । অর্থ-প্রতিপত্তি-এয়ারকন্ডিশন জীবন- তাতে দোষের কিছু নেই । বরং,
বর্তমান যুগধর্মে যথার্থই নয়, শ্রেয়ও । কিন্তু আবার, সেজন্যই তিনি নীরদচন্দ্রের
সঙ্গে তুলনীয় নন । ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে তুলনীয় নন । শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে
তুলনীয় নন । গুলজারের সঙ্গে তুলনীয় নন । ডিলানের সঙ্গে তুলনীয় নন । লুথার কিং- এর
সঙ্গে তুলনীয় নন । চন্দ্রিল শুধু চন্দ্রিলই । এসব তুলনার দায়ও তাঁর নেই, তিনি
চন্দ্রিলত্বেই খুশি ।
আপনি লিখেছেন, “তাঁকে চিরে চিরে দেখালে সম-সময়ের কার্বন কনা তাঁর ধমনিকে সংক্রমণ করেনি সে কথা হয়তো জোর দিয়ে বলা যেত
না... তবু ডুবতে ডুবতে একটু অক্সিজেনের জন্য হাঁসফাঁস করেছিল
কেউ সে কথা চন্দ্রিলের নাড়ির লাবডুবে লেখা আছে বই কি... তাঁর
সমস্ত যাপনে সেই আর্তনাদটুকুও যে আমাদের সময়ে অনেক ।” একদমই তাই । আমাদের প্রাপ্তি
শুধু তাঁর সেই আর্তনাদটুকুই – সিংহনিনাদের আবরণে ।
ফেসবুকের লিংক ঃ https://www.facebook.com/ardhendu.o.banerjee/posts/3858929517513553?comment_id=3863642633708908¬if_id=1587666052260677¬if_t=feed_comment&ref=notif

No comments:
Post a Comment
I am waiting for your valuable comment. Please comment. Thank you..