Monday, 20 April 2020

শিরোনামহীন প্রলাপগুলো, কবিদের জন্য সাতটি অমরাবতী, সাতটি তারার তিমিরও – কিছু সমালোচনা কিছু জবাব



Behold! You grasp the Science of the Pole,
Earth's wondrous Mass, how pois'd the mighty Whole,
Jove's Reckoning, the Laws, when first he made
All Things' Beginnings, by his Will obey'd,
Those the Creator as the World's Foundations laid.

১৬৮৬ সালউল্কার মত নয়, সূর্যের মতই আবির্ভাব তাঁর । নিউটন । বই “ফিলসফিয়া ন্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম্যাথামেটিকা” – পৃথিবী বদলে গেল । সেই বইয়ের মুখবন্ধে লেখা ওপরের কবিতাটি । এডমুন্ড হ্যালির লেখা । মূল যদিও লাতিন ভাষায়, আমাদের জন্য আছে অট্টো স্টেইনমায়ারের ইংরাজিতে অনুবাদ  হ্যালির নাম ধূমকেতুর সঙ্গে যুক্ত, যেমন নিউটনের সাথে আপেলেরহ্যালি সাহেব কবিতা লিখেছিলেন তাইই নয়, অনেকেই জানেন না, এডমুন্ড হ্যালি লাইফ টেবিলেরও উদ্গাতা । সুতরাং, আমার আগের লেখা, ‘বিজ্ঞানীর প্রতি মনোযোগী হও সমাজ, ওঁচাটে কবির প্রতি নয়’- তা দ্বন্দ্বমূলক আখ্যান নয়, বরং প্রেমের কটাক্ষমাত্র । সুতরাং, এ আলোচনা খানিকটা গম্ভীর, খানিকটা রসিকতা ও বাকিটা আদরের মত নরম ।

Preface of the Book 


কবিতা মানুষের আগুন আবিষ্কারের মতই অপরিহার্য । ‘একই অঙ্গে এত রূপ দেখিনি তো আগে...’মানুষ বরাবরই বিষয় নির্ভর । আর মানুষের বিষয় হল প্রকৃতি । আবার প্রকৃতির অমোঘ সত্ত্বায় লীন- বস্তুগত সত্য এবং ভাবগত সত্য । বস্তুগত সত্যে আছে, কার্যকারণ সূত্র, ভর, আয়তন, অবস্থান, শক্তি ইত্যাদি । আর ভাবগত সত্যে আছে, আবেগ, প্রেম, নান্দনিকতা, অভিমান, ভ্রূকুটি, প্রতিবাদ ইত্যাদি ।  বিজ্ঞান ও কবিতা দুটো পৃথক রাস্তায় হেঁটে চলে এবং ছুঁতে চায় সেই নির্বিবাদি সত্যের ভিতরে যে সত্য আছে, তার কুন্ডলিনী শক্তির আঙুল – ‘বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি’র উত্তরণে, সে মিলে যায়, মিশে যায়, লীন হয় একই উপাখ্যানে – মানবসভ্যতা ও আবিষ্কার

আমাদের কবিতা কখনো ব্যবহারের রূপ, কখনো নান্দনিক বোধ, আবার কখনোবা সুন্দর ও প্রেমের প্রতিমূর্তি । কবিতা মূর্ত ও বিমূর্ততার অনাবিল প্রেমের গাথা- যে প্রেমে মিলনও নেই বিচ্ছেদও নেই – আছে রাধাকৃষ্ণের মগ্ন উপাসনা ।  কবিতা মানুষের কথা বলার ভাষা । তবে তা সাবলীল কথা বলার ধরণ নয় । মাত্রা, মিল, অনুপ্রাস, সমদীর্ঘ শব্দের দ্বারা রচনা করা অক্ষরমালার সমন্বয় – শ্বাসাঘাতের তারতম্যে স্বরসংগতির বিবিধ উচ্চারণ এবং পুনরাবৃত্তি, রূপক ও বিরোধালংকারে সজ্জিত আচারধর্ম । মানুষ যত বেশি আলাদাভাবে নিজের ভাব প্রকাশে আগ্রহী হয়েছে, সে ততবেশি এইসব ব্যতিক্রমি বলার ধরণকে নামাঙ্কিত করেছে কবিতা বলে । লিপি আবিষ্কারের আগে যে অমার্জিত সঙ্গীত প্রচলিত ছিল ছন্দোবদ্ধতায় ও মাত্রাবদ্ধতায়- তা অর্থহীন অঙ্গভঙ্গি বা লাফানো হোক, শীৎকার হোক কিংবা লাঠি-পাথরের কৃত্রিম কোলাহল হোক – সেই হেঁইসামালো হেঁই হল কবিতার আদিম উৎস । তা আগুনের থেকে কম কি সে ! সেই হল বর্ণমালাহীন মানুষের সুন্দরের প্রথম উপাসনা ।

ছবিঃ ক্ষীরোদ বিহারী ঘোষ


আগুন যেমন বিবর্তিত হয়ে হিরোসিমা-নাগাসাকি হয়েছে, তেমনই কবিতা বিবর্তিত হয়ে ফেসবুক হয়েছে । বিবর্তনের আরেকটা বৈশিষ্ট্য হল সংখ্যাবৃদ্ধি ও আদল পরিবর্তন । তাইতো আখ্যান, মহাকাব্য, নাট্যকাব্য, পদাবলী, বিদ্রূপাত্মক কাব্য, গীতিকাব্য, শোককাব্য, পদ্য ও অন্তিমে গদ্য হয়েছে আজ । একইভাবে অক্ষরবৃত্ত, স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত, অমিত্রাক্ষর, অন্ত্যমিল, চতুর্দশপদী, পয়ার, লিমেরিক হয়ে আজকের অনুকবিতাও এসেছে । এইভাবেই ছন্দযুক্ত প্রাসাদের দালান থেকে মুক্তছন্দের ফ্ল্যাটিয় ব্যলকনিতে আমরা এসেছি । আরাগঁ বলেছিলেন, কবিতার ইতিহাস আদপে তার টেকনিকের ইতিহাস । বিষ্ণু দেও একই কথার অনুসারী । আমিও ।

কিন্তু, একে বাচালতার ইতিহাস বললে যা হবে, তাতে নিউটোনিয়ান বিজ্ঞানবোধ থেকে আইনস্টাইনীয় বিজ্ঞানবোধে উত্তরণের মধ্যে যে ফারাক তাকেও একই অভিযোগে দুষ্ট হয়তে হবে ।  কবিতা হল প্রকৃতির সাথে মানুষের সভ্যতার সংগ্রাম, আর বিজ্ঞান হল প্রকৃতির সাথে মানুষের বিরোধিতার-বৈরিতার সংগ্রাম । মানুষ বিজ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে প্রকৃতির বিরুদ্ধে হেঁটেছে- সে খনিজ উত্তোলন করেছে, আকাশে উড়েছে, গাছ কেটেছে, প্রানীহত্যা করে বিলাসদ্রব্য বানিয়েছে । আর কবিতা সুন্দরের হাত ধরেছে, বলেছে,

সে এত সুন্দর, তাই তার পাশে বসি
রূপের বিভায় আমি সেরে নিই লঘু আচমন
রূপের ভিতর থেকে উঠে আসে বুকভরা ঘুম
আমি তার চোখ থেকে তুলে নিই
মিহিন ফুলের পাপড়ি।

গন্ধ শুঁকি, পুনরায় ঘুম থেকে জাগি
উজ্জল দাঁতের আলো রক্তিম ওষ্ঠকে বহু দূরে নিয়ে যায়
রূপের সুদূরতম দেশে চলে যাবে এই ভয়ে
আমি দ্রুত সিঁড়ি গিয়ে নেমে…
সে এত সুন্দর তাই তার পাশে এশে বসি।

প্রকৃতির অলঙ্কার সে রেখেছে অনন্ত সীমানা জুড়ে জুড়ে
তাই প্রকৃতির কাছে অন্ধ হলে যাবো
সুমেরু পর্বতে আমি মাথা রাখি
সমুদ্রের ঢেউ লাগে হাতের আঙুলে
উরুর ভিতরে অগ্নি…এত মোহময়
অরণ্যের গন্ধমাখা ….
-       সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

ধ্বংসের ও সৃষ্টির রূপবিনিময় – এই হল প্রকৃতির নিয়ম । কিন্তু মানবসভ্যতা এর ব্যতিক্রম হতে চায় । আর সেই ব্যতিক্রমের সহায় বিজ্ঞান । করোনার বিরুদ্ধেও তাইই । প্রকৃতিকে হারিয়ে দেবার লড়াই । মানুষের ক্ষমতার শত আস্ফালন, মহাকাশে গ্রহের সন্ধানে তপস্যা, সেও আজ পরাজিত একটি ভাইরাসের কাছে- একথা অভীক বলেছিল, হেসেছিল আরও বেশি । প্রকৃতির আচমনে দেখা যাক আমরা কোথায় যাই ! তবে এও ঠিক, প্রকৃতিই কিন্তু নিযুত নিযুত প্রানীর মধ্যে কেবল মানুষকে দিয়েছে, প্রকৃতি বিরুদ্ধে এই বিপ্লবের ভার । কবিতাও তাই । প্রকৃতির যত ‘কথা আছে’ যত ‘গান আছে’ যত ‘প্রাণ আছে’ তার, সব কিছুকে প্রকাশ করার ভার – আমাদের কবিতার । তাই ব্যতিক্রমের আশীর্বাদও এই প্রকৃতিরই । শুধু, ঝর্ণার মত বহমানতার দায় যার, সে কবিতার, দ্রুতলয়ে পড়লেই তা বুকে ঝর্ণার স্পন্দন তুলবে,

সারঙ্গ, যদি ঝর্না ফোটাই তুমি আসবে কি তুমি আসবে কি
সন্তর্পণ পল্লব দোলে এত অজস্র বন্ধু হাওয়া
গাছের শিরায় ফেটেছে নূপুর অমন নৃপুর জলে ভাসবে কি।
পাহাড়খণ্ড পাহাড়খণ্ড ওর নৃত্যের দোষ নিয়ে না হে।

অলস-অলস ভালোবাসা তুমি নদীপথ আঁকো নখে-নখে, তীরে
দাড়িয়ে পড়েছে শাদা গাছগুলি, উপঢৌকন সবুজ জড়োয়া
দেখছো না কেন দুলছো না কেন তবু যে পুলিন জল মেশে ধীরে
কোথায় মেশে না? পাহাড়খণ্ড ওর কোনদিন দোষ নিয়ে না হে!

তৃষ্ণা জড়ায় পাকে-পাকে আহা সারঙ্গ এস ঝর্নাপ্রান্তে
মাইল-মাইল ধূলাবালি ওড়ে অচ্ছায় ধত গাছের পাহারা
মুছে যাবে তার নৃপুরে, নৃত্যে, শুধু জল টানে পিপাসু ভ্রান্তে
ও ঝর্না ওগো ঝর্না তাহাকে ভালোবাসবে কি ভালোবাসবে কি।
-       শক্তি চট্টোপাধ্যায়

সুতরাং, আমার বিরোধ না বিজ্ঞানের প্রতি না কবিতার প্রতি । আমার বিরোধ পৃথকীকরণের এই তামাম প্রচেষ্টার প্রতি। আমি তো, কবিতা ও বিজ্ঞান মিলে এই রহস্যময়ের যে রহস্য-উদযাপন করে, সেখানে থাকতে চাই । জিরোতে চাই দুদন্ড । কেননা দুটোই যে একই মায়ের সন্তান । এতে স্বাতন্ত্রলাভের ইচ্ছের দরুণ আলাদা হেঁসেল হবার জো আছে, কিন্তু রক্তের টান উপেক্ষা করার নয় ।  যে মানুষের অন্তরে যে ধ্বনি তোলপাড় করবে সেই তার প্রাণের ঠাকুর – বিজ্ঞান অথবা কবিতা ।  

লোকে বলে, কবিতার প্রাচুর্য ব্যাপক । কবিদেরও । বেশিরভাগই খারাপ । কিন্তু সে বিচারের দায় আমার নয় । কারও নয় । কে ঠিক করবে কোনটা খারাপ কোনটা ভাল । বিজ্ঞানেও তো তাই । কত রিসার্চার, কত পেপার তাঁদের । সবই কি তুখোড় আবিষ্কার, দুনিয়া বদলে দেয় ? সেখানে, কে ঠিক করবে, এয়ার-কন্ডিশনার ভাল না সিএফসি, এরোপ্লেন ভালো না কার্বন এমিশন, পরমাণু বিভাজন ভাল নাকি এ কে ৪৭ !  তার চেয়ে সত্য-সুন্দরের তপস্যায় মগ্ন হওয়াই শ্রেয় । জি এইচ হার্ডি, তাঁর ‘আ ম্যাথেমেটিসিয়ানস অ্যাপোলজিতে’ লিখেছিলেন,

Beauty is the first test: there is no permanent place in the world for ugly mathematics.

কবিতাও তাই । অসুন্দর কবিতা হারিয়ে যাবেই একদিন । আমরা বরং সারস্বত-শাস্বতীকেই আঁকড়ে ধরব,

একদা এমনই বাদলশেষের রাতে
মনে হয় যেন শত জনমের আগে-
সে এসে, সহসা হাত রেখেছিল হাতে,
চেয়েছিল মুখে সহজিয়া অনুরাগে।
সে-দিনও এমনই ফসলবিলাসী হাওয়া
মেতেছিল তার চিকুরের পাকা ধানে;
অনাদি যুগের যত চাওয়া, যত পাওয়া
খুঁজেছিল তার আনত দিঠির মানে।
একটি কথার দ্বিধাথরথর চূড়ে
ভর করেছিল সাতটি অমরাবতী;
একটি নিমেষ দাঁড়াল সরণী জুড়ে,
থামিল কালের চিরচঞ্চল গতি;
একটি পণের অমিত প্রগল্ভতা
মর্ত্যে আনিল ধ্রুবতারকারে ধ’রে;
একটি স্মৃতির মানুষী দুর্বলতা
প্রলয়েরে পথ ছেড়ে দিল অকাতরে।।
-       সুধীন্দ্রনাথ দত্ত
তা কবিতার হাত ধরে হোক, বা বিজ্ঞানের,

Newton unlocking Truth's close-fasten'd Chest,
Newton dear to the Muse, in whose pure Breast
Phoebus is present, and whose Mind inspires
With all of his divine, prophetic Fires.
Sing him, ye Muses, for Right can approve,
No Mortal nearer touch the Gods above.
-       Edmund Halley

পুনশ্চঃ - আমি বাংলা সাহিত্যের একাডেমিও মানুষ নই, আর সাহিত্যের ইতিহাস রচনা করতেও বসিনি । শুধু যেভাবে বিজ্ঞান ও কবিতা আমার কাছে ধরা দিয়েছে, সে কথাটুকুই বলার চেষ্টা করেছি । সুতরাং, ভুল-ত্রুটি হলে হয়েছে । আস্তে-ধীরে একদিন ঠিক হবে, নয়তো ভুল নিয়েই মরে যাব । আর কি ! তবে সমালোচনা বদলে যদি ক্রোধের ইঁট ধেয়ে আসে, তবে পাটকেলের সন্ধানও আমার জানা । ছেলেবেলায় ‘মারকুটে ছেলে’ বলতে কম লোক বাড়িতে আসেনি ।

(এই ব্লগে সমস্ত লেখাগুলির মতামত লেখকের ব্যক্তিগত, চিত্রশিল্পীদের এ ব্যাপারে কোনও দায় নেই ।)

1 comment:

  1. A very very controversial blog, indeed. But I must admit Sir, that you have made a remarkably critical analysis of the issue. And like most readers, I too, agree with you on some points while diverging a bit on others.

    In today's society where showcasing one's poetic or storytelling abilities is only a matter of few easy clicks, thanks to technology, its certainly important to draw this line between thoughtful or, rather, sustainable literary creations and those driven by the sheer lust of instant fame! While many would unanimously accept the fact that science plays an indispensable role in the progress of human civilization, we should not remain oblivious to the finer human and social sentiments that literature (or, poetry for that matter) satiates. Yes, it is true that in such times of crisis, as an epidemic, we largely fall back upon science and technology. But what about other social crises, say, for example, segregation of a society on the lines of religious identity or the hardcore nationalist sentiment sweeping the global map? These adversities call for 'conscience', something which develops in a human being, gradually over the years. And in this regard, every possible disciple, be it science, be it literature, be it history, be it philosophy, has its own role to play, none of which can bepotentially undermined. Also I would beg to differ a bit with you on the inherent nature of poetry and science, celebration of nature by one and going against the it by the other. A poet's admiration of Nature's beauty has been revealed to the world, time and again through some evergreen masterpieces, no doubt, my personal favourite being the sonnet by John Keats, 'On the Grasshopper and the Cricket'. But, poetry also has a social responsibility to play, in the ever-changing socio-political structures, since time immemorial. They stand testament to and even inspire some of the greatest social upheavals that history witnesses, in any corner of the world. Though, all these require, as you have rightly pointed out, "tenacity", "perseverance" and "cultivation", which certainly is lacking among the masses (I've consciously avoided the term 'aspiring poets', because its scope is too large for me to remark on) in contemporary times.

    But, having said all these, I sincerely appreciate your initiative of exploring such a sensitive yet much debated topic, which can provoke young readers like me, to think hard over that much acknowledged but less familiar "inter-disciplinary" approach in higher studies. Thank you, Sir!

    ReplyDelete

I am waiting for your valuable comment. Please comment. Thank you..