মেঘনাদ ভট্টাচার্যের
পরিচালিত নাটক ‘আত্মজন’ দেখে খুবই হতাশ হলাম। কিছুটা বিরক্তও। বর্তমান, প্রতিদিন ইত্যাদি
নানান কাগজে চমৎকার রিভিউ পড়েছিলাম। প্রত্যাশা ছিল ভীষণ। কিন্তু হায়!
‘মূল্যবোধের সঙ্গে
বাস্তবের সংঘাত’ – শুনতে মন্দ লাগে না কিন্তু প্রশ্ন জাগে কোন্ মূল্যবোধের সঙ্গে বাস্তবের
সংঘাতের কথা বলা হচ্ছে? নাটকে মূলত দুটি কাহিনি আছে। একটি মধ্যবিত্তের আরেকটি দরিদ্র
পরিবারের। মধ্যবিত্তের বাড়ির মূল চরিত্র বসন্ত যে অতীব পিতৃভক্তির কারণে বউয়ের কাছে
ডিভোর্সের কেস খেয়েছে। আর দরিদ্র পরিবারের সরমা যে স্বনির্ভর হওয়ার পরেও মদ্যপ স্বামীর
নানান অত্যাচার সহ্য করেও সংসারে থেকে যেতে চায়। বসন্তের অসুস্থ পিতা অবসরপ্রাপ্ত প্রধান
শিক্ষক শরৎ মুখার্জি বারেবারে উচ্চারণ করে একটি বিশেষ ডায়ালগ – স্কুলে কুড়িজন মাস্টার,
সবার মত আলাদা তাঁদের নিয়ে যদি আমি চলতে পারি, আমার বাবা কলোনির সবার সঙ্গে যদি মিলেমিশে
থাকতে পারে তোমরা পারো না কেন? এই ডায়ালগের দ্বারা তিনি যৌথতার কথা বলতে চান এবং তারই
উচ্চকিত আর্তনাদ শোনা যায় নাটকের শেষে এই বলে যে, ফিরিয়ে দাও সেসব দিন, ফিরিয়ে দাও
সেসব মানুষ।
আর এইখানেই খটকাটা
এসে লাগে। তবে কি শরৎ মাস্টার কোনোভাবে স্বনির্ভর সরমার দিনের-পর-দিন মার খেয়ে স্বামীর
মদের পয়সা জুগিয়ে হলেও সংসারে থেকে যাওয়ার বিষয়টিকে জাস্টিফাই করছেন নাকি আবারও স্বনির্ভর
রিনা (বসন্তের স্ত্রী) যে তাঁর স্বামীর বদমেজাজ, অসুস্থ পিতার প্রতি কর্তব্যপালনে পিটপিটানি
রকমের অতিসচেতনতা ও আত্মকেন্দ্রিকতাকে ত্যাগ করে নিজের জীবন নিজের শর্তে কাটানোর অভিলাষ
রাখছে সেটাকে কটাক্ষ করছেন – আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয়। যদি তিনি তাইই করে থাকেন এবং
সেটাকে মূল্যবোধ ও নৈতিক যৌথতা বলে দাবি করেন তবে আমার ব্যাপারটা গ্রহণে আপত্তি আছে।
সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে
মূল্যবোধও বদলে যায়। সমাজপ্রগতির সেটাই শর্ত। সেটাই হল কনজারভেটিভ ও লিবারালের দ্বন্দ্ব।
এখনও যদি কেউ ‘সংসার সুখের হয় রমনীর গুণে, রমণী সুন্দর হয় সতীত্ব রক্ষণে’, ‘লজ্জা নারীর
ভূষণ, ‘বুক ফাটবে কিন্তু মুখ ফুটতে নেই’ কিংবা ‘পুরুষ রাগলে হয় বাদশা, নারী রাগলে হয়
বেশ্যা’ ইত্যাদি কথাগুলিকে মূল্যবোধ বলে চালাতে চান তবে সেটা নিশ্চয় সমাজের পক্ষে শুভ
নয়। অথবা, এখনও যদি কেউ বিয়ে করতে যাওয়ার আগে ‘দাসী আনতে যাচ্ছি’ উচ্চারণ করে তবে সেটাও
কি শোভনীয়? মনে হয় না। কেননা সে-সব দিনের এ-সব মূল্যবোধ আজকে আর চলে না। আর এই কারণেই
‘আত্মজন’ যখন অ্যাডজাস্ট করে হলেও একসঙ্গে থাকার প্রতি পক্ষপাতিত্ব দেখায় তখন তা আমাদের
চোখে লাগে।
ডিভোর্স নিয়ে সমাজের
একটা অংশের অত্যন্ত এঁদো ধারণা বদ্ধমূল আছে। তারা মনে করে যে ডিভোর্সের প্রবণতা সমাজকে
অনৈতিক, দায়িত্বজ্ঞানহীন ও মূল্যবোধহীন করে তুলবে। এটা অত্যন্ত্র গোঁড়া মত। একথা সত্য
যে অন্যান্য দেশের তুলনায় ভারতে ডিভোর্স রেট কম। কিন্তু সময়ানুক্রমিক বিচার করা হলে
দেখা যায় যে, ১৯৮৮ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে এ-দেশে ডিভোর্স রেট অনেক বেড়েছে, ডবলের ডবল।
কেবলমাত্র ২০১১ সালের সেনসাসের তথ্যকেই যদি সামনে রাখা যায় তবে অবস্থাটা স্পষ্টতর হয়।
মহারাষ্ট্র, গুজরাট, পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরপ্রদেশ ও অন্ধ্রপ্রদেশ হল প্রথম পাঁচ রাজ্য যেখানে
ডিভোর্স অত্যন্ত বেশি। কিন্তু এটা যতটা না নেগেটিভ খবর তার থেকে অনেক বেশি হল পজিটিভ
খবর। কেন, একে একে বলা যাক।
তথ্যকে বিশ্লেষণ
করলে দেখা যায়,
- ·
অল্প বয়সে যারা
বিয়ে করে তাদের মধ্যে ডিভোর্স হয় সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে মহিলারা যারা অল্প বয়সেই বিয়ে
করেছেন তারা পুরুষের থেকে বেশি ডিভোর্স-প্রবণ।
- ·
কর্মরত ও স্বনির্ভর
মহিলারা ডিভোর্স-প্রবণ।
- ·
মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত
পরিবারগুলিতে যেখানে আর্থ-সামাজিক অবস্থানে মেয়েরা এগিয়ে যেতে পেরেছে সেখানে ডিভোর্সের
প্রবণতা বেড়েছে। বিশেষ করে নগর, মহানগরগুলিতে বসবাসকারী মহিলাদের ক্ষেত্রে এটা বিশেষ
দ্রষ্টব্য।
- ·
শিক্ষা অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ প্যারামিটার। দেখা যাচ্ছে যে, অন্তত যারা কলেজ-শিক্ষায় শিক্ষিত তাদের
মধ্যে ডিভোর্সের পরিমাণ বেশি। এখানেও উঠে আসে মহিলাদের কথাই। শিক্ষিত মহিলারা এই ব্যাপারে
উদ্যোগী হয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে।
ডিভোর্সের কারণ হিসাবে
পাওয়া যায়,
- · গৃহবিবাদ ও সহিংসতা
- ·
পুরুষতান্ত্রিক
নিষ্ঠুরতা
- ·
স্বামীর মদ্যপান
- ·
সামঞ্জস্যের সমস্যা
(বিশেষ করে যৌথ পরিবারে)
- ·
ক্রমবর্ধমান ব্যক্তিবাদ
- ·
বিবাহ বহির্ভূত
সম্পর্ক
- ·
পণ
উপরের কথাগুলি বলা
হল অনিশ থাদাথিল ও সুজাতা শ্রীরামের একটি গবেষণাপত্রকে ভিত্তি করে। সুতরাং, তথ্য ও
তত্ত্বের দিক থেকে ত্রুটি কিছু নেই। এখন প্রশ্ন, পুরানো মূল্যবোধ ও নৈতিকতাকে রক্ষা
করে যৌথতাকে টিকিয়ে রাখতে নারীদের তবে কী করা উচিত – তারা কি,
- ·
অল্প বয়সের ভুল
বুঝতে পেরেও পুরোজীবনটাকে উৎসর্গ করবে সংসারের পায়ে নাকি
- ·
কাজকর্ম ও রোজগার
করা ছেড়ে দিয়ে স্বামীর ও স্বামীর পরিবারের পদসেবা করবে নাকি
- ·
গরীবের মতো গ্রামে
পড়ে থাকবে নাকি
- ·
শিক্ষার অধিকার
জলাঞ্জলি দিয়ে মূর্খ সেজে থাকবে নাকি
- ·
গৃহবিবাদ ও সহিংসতা,
পুরুষতান্ত্রিক নিষ্ঠুরতা, স্বামীর মদ্যপান, সামঞ্জস্যের সমস্যা (বিশেষ করে যৌথ পরিবারে),
ক্রমবর্ধমান ব্যক্তিবাদ, বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক ও পণ ইত্যাদিকে অবস্থাকে মেনে নেবে
?
একটু লক্ষ্য করলেই
বোঝা যায় যে, বর্ধিত ডিভোর্স যা সাধারণত মেয়েদের তরফ থেকে আসছে তা আদতে মেয়েদের সক্ষমতা
অর্থাৎ উইমেন এমপাওয়ারমেন্টের ধারণাকে মজবুত করছে। মেয়েরা আর নিজেদের কারও দাসী হিসাবে
রাখতে চাইছে না। স্বামীর পরিবারের সেবা করার জন্য মেয়ের জন্ম হয়নি (স্বামীটি কি মেয়ের
বাড়ির লোককে একইভাবে সেবা করবে, চাকরি ছাড়বে সন্তান মানুষ করার জন্য ইত্যাদি প্রশ্ন
তো থাকেই) । তাই বলে সেবা-শুশ্রূষাকে অবহেলার কথা কে কইচে? ব্যক্তিজীবন, দাম্পত্য ও
পরিবারের প্রতি কর্তব্য এই ত্রয়ীকে যারা সমভাবে সমসুরে বন্টন করতে পারে না সেখানে ডিভোর্স
অনৈতিক ও মূল্যবোধহীন হতে পারে না। আর যদি ‘আত্মজন’ এটাকে অনুধাবন করতে না পারে তবে
এই নাটক ক্লিশে, মেলোড্রামাটিক ও অনগ্রসরমন্যতার প্রতীক হয়ে থেকে যায়। পরিচালকের দক্ষতা
অনবদ্য হলেও বক্তব্যের আবেদন বাস্তবের অবস্থার সঙ্গে এক অসেতুসাধ্য দূরত্বে পৌঁছে নতুন
প্রজন্মের সঙ্গে সংঘাতে জড়ায় বৈকি। এটা অন্তত ‘সায়ক’-এর মত দলের কাছে অনভিপ্রেত। নাটকটি
যেন একুশ শতকের চেহারার বিপরীতে যাত্রা করে এক অনড়ত্বের অবস্থানকেই স্পষ্ট করে – এটা
আমাদের শুধু ভাবায় না, বেদনাহতও করে। এইখানেই মনে পড়ে বিভাস চক্রবর্তীর নাটক ‘ছোট ছোট
বাড়ি’-র কথা। সেই অনবদ্য অনুভূতির কথা অন্যত্র আলোচনা করা যাবে। আজ থাক্।
Follow me: Ardhendu Banerjee Official


