Saturday, 25 June 2022

ডিভোর্স একটি পজিটিভ বিষয়কেও তুলে ধরে


 

মেঘনাদ ভট্টাচার্যের পরিচালিত নাটক ‘আত্মজন’ দেখে খুবই হতাশ হলাম। কিছুটা বিরক্তও। বর্তমান, প্রতিদিন ইত্যাদি নানান কাগজে চমৎকার রিভিউ পড়েছিলাম। প্রত্যাশা ছিল ভীষণ। কিন্তু হায়!

‘মূল্যবোধের সঙ্গে বাস্তবের সংঘাত’ – শুনতে মন্দ লাগে না কিন্তু প্রশ্ন জাগে কোন্‌ মূল্যবোধের সঙ্গে বাস্তবের সংঘাতের কথা বলা হচ্ছে? নাটকে মূলত দুটি কাহিনি আছে। একটি মধ্যবিত্তের আরেকটি দরিদ্র পরিবারের। মধ্যবিত্তের বাড়ির মূল চরিত্র বসন্ত যে অতীব পিতৃভক্তির কারণে বউয়ের কাছে ডিভোর্সের কেস খেয়েছে। আর দরিদ্র পরিবারের সরমা যে স্বনির্ভর হওয়ার পরেও মদ্যপ স্বামীর নানান অত্যাচার সহ্য করেও সংসারে থেকে যেতে চায়। বসন্তের অসুস্থ পিতা অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শরৎ মুখার্জি বারেবারে উচ্চারণ করে একটি বিশেষ ডায়ালগ – স্কুলে কুড়িজন মাস্টার, সবার মত আলাদা তাঁদের নিয়ে যদি আমি চলতে পারি, আমার বাবা কলোনির সবার সঙ্গে যদি মিলেমিশে থাকতে পারে তোমরা পারো না কেন? এই ডায়ালগের দ্বারা তিনি যৌথতার কথা বলতে চান এবং তারই উচ্চকিত আর্তনাদ শোনা যায় নাটকের শেষে এই বলে যে, ফিরিয়ে দাও সেসব দিন, ফিরিয়ে দাও সেসব মানুষ।

আর এইখানেই খটকাটা এসে লাগে। তবে কি শরৎ মাস্টার কোনোভাবে স্বনির্ভর সরমার দিনের-পর-দিন মার খেয়ে স্বামীর মদের পয়সা জুগিয়ে হলেও সংসারে থেকে যাওয়ার বিষয়টিকে জাস্টিফাই করছেন নাকি আবারও স্বনির্ভর রিনা (বসন্তের স্ত্রী) যে তাঁর স্বামীর বদমেজাজ, অসুস্থ পিতার প্রতি কর্তব্যপালনে পিটপিটানি রকমের অতিসচেতনতা ও আত্মকেন্দ্রিকতাকে ত্যাগ করে নিজের জীবন নিজের শর্তে কাটানোর অভিলাষ রাখছে সেটাকে কটাক্ষ করছেন – আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয়। যদি তিনি তাইই করে থাকেন এবং সেটাকে মূল্যবোধ ও নৈতিক যৌথতা বলে দাবি করেন তবে আমার ব্যাপারটা গ্রহণে আপত্তি আছে।

সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে মূল্যবোধও বদলে যায়। সমাজপ্রগতির সেটাই শর্ত। সেটাই হল কনজারভেটিভ ও লিবারালের দ্বন্দ্ব। এখনও যদি কেউ ‘সংসার সুখের হয় রমনীর গুণে, রমণী সুন্দর হয় সতীত্ব রক্ষণে’, ‘লজ্জা নারীর ভূষণ, ‘বুক ফাটবে কিন্তু মুখ ফুটতে নেই’ কিংবা ‘পুরুষ রাগলে হয় বাদশা, নারী রাগলে হয় বেশ্যা’ ইত্যাদি কথাগুলিকে মূল্যবোধ বলে চালাতে চান তবে সেটা নিশ্চয় সমাজের পক্ষে শুভ নয়। অথবা, এখনও যদি কেউ বিয়ে করতে যাওয়ার আগে ‘দাসী আনতে যাচ্ছি’ উচ্চারণ করে তবে সেটাও কি শোভনীয়? মনে হয় না। কেননা সে-সব দিনের এ-সব মূল্যবোধ আজকে আর চলে না। আর এই কারণেই ‘আত্মজন’ যখন অ্যাডজাস্ট করে হলেও একসঙ্গে থাকার প্রতি পক্ষপাতিত্ব দেখায় তখন তা আমাদের চোখে লাগে।

ডিভোর্স নিয়ে সমাজের একটা অংশের অত্যন্ত এঁদো ধারণা বদ্ধমূল আছে। তারা মনে করে যে ডিভোর্সের প্রবণতা সমাজকে অনৈতিক, দায়িত্বজ্ঞানহীন ও মূল্যবোধহীন করে তুলবে। এটা অত্যন্ত্র গোঁড়া মত। একথা সত্য যে অন্যান্য দেশের তুলনায় ভারতে ডিভোর্স রেট কম। কিন্তু সময়ানুক্রমিক বিচার করা হলে দেখা যায় যে, ১৯৮৮ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে এ-দেশে ডিভোর্স রেট অনেক বেড়েছে, ডবলের ডবল। কেবলমাত্র ২০১১ সালের সেনসাসের তথ্যকেই যদি সামনে রাখা যায় তবে অবস্থাটা স্পষ্টতর হয়। মহারাষ্ট্র, গুজরাট, পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরপ্রদেশ ও অন্ধ্রপ্রদেশ হল প্রথম পাঁচ রাজ্য যেখানে ডিভোর্স অত্যন্ত বেশি। কিন্তু এটা যতটা না নেগেটিভ খবর তার থেকে অনেক বেশি হল পজিটিভ খবর। কেন, একে একে বলা যাক।

তথ্যকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়,

  • ·         অল্প বয়সে যারা বিয়ে করে তাদের মধ্যে ডিভোর্স হয় সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে মহিলারা যারা অল্প বয়সেই বিয়ে করেছেন তারা পুরুষের থেকে বেশি ডিভোর্স-প্রবণ।
  • ·         কর্মরত ও স্বনির্ভর মহিলারা ডিভোর্স-প্রবণ।
  • ·         মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারগুলিতে যেখানে আর্থ-সামাজিক অবস্থানে মেয়েরা এগিয়ে যেতে পেরেছে সেখানে ডিভোর্সের প্রবণতা বেড়েছে। বিশেষ করে নগর, মহানগরগুলিতে বসবাসকারী মহিলাদের ক্ষেত্রে এটা বিশেষ দ্রষ্টব্য।
  • ·         শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্যারামিটার। দেখা যাচ্ছে যে, অন্তত যারা কলেজ-শিক্ষায় শিক্ষিত তাদের মধ্যে ডিভোর্সের পরিমাণ বেশি। এখানেও উঠে আসে মহিলাদের কথাই। শিক্ষিত মহিলারা এই ব্যাপারে উদ্যোগী হয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে।

ডিভোর্সের কারণ হিসাবে পাওয়া যায়,

  • ·       গৃহবিবাদ ও সহিংসতা
  • ·         পুরুষতান্ত্রিক নিষ্ঠুরতা
  • ·         স্বামীর মদ্যপান
  • ·         সামঞ্জস্যের সমস্যা (বিশেষ করে যৌথ পরিবারে)
  • ·         ক্রমবর্ধমান ব্যক্তিবাদ
  • ·         বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক
  • ·         পণ

উপরের কথাগুলি বলা হল অনিশ থাদাথিল ও সুজাতা শ্রীরামের একটি গবেষণাপত্রকে ভিত্তি করে। সুতরাং, তথ্য ও তত্ত্বের দিক থেকে ত্রুটি কিছু নেই। এখন প্রশ্ন, পুরানো মূল্যবোধ ও নৈতিকতাকে রক্ষা করে যৌথতাকে টিকিয়ে রাখতে নারীদের তবে কী করা উচিত – তারা কি,

  • ·         অল্প বয়সের ভুল বুঝতে পেরেও পুরোজীবনটাকে উৎসর্গ করবে সংসারের পায়ে নাকি
  • ·         কাজকর্ম ও রোজগার করা ছেড়ে দিয়ে স্বামীর ও স্বামীর পরিবারের পদসেবা করবে নাকি
  • ·         গরীবের মতো গ্রামে পড়ে থাকবে নাকি
  • ·         শিক্ষার অধিকার জলাঞ্জলি দিয়ে মূর্খ সেজে থাকবে নাকি
  • ·         গৃহবিবাদ ও সহিংসতা, পুরুষতান্ত্রিক নিষ্ঠুরতা, স্বামীর মদ্যপান, সামঞ্জস্যের সমস্যা (বিশেষ করে যৌথ পরিবারে), ক্রমবর্ধমান ব্যক্তিবাদ, বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক ও পণ ইত্যাদিকে অবস্থাকে মেনে নেবে ?

একটু লক্ষ্য করলেই বোঝা যায় যে, বর্ধিত ডিভোর্স যা সাধারণত মেয়েদের তরফ থেকে আসছে তা আদতে মেয়েদের সক্ষমতা অর্থাৎ উইমেন এমপাওয়ারমেন্টের ধারণাকে মজবুত করছে। মেয়েরা আর নিজেদের কারও দাসী হিসাবে রাখতে চাইছে না। স্বামীর পরিবারের সেবা করার জন্য মেয়ের জন্ম হয়নি (স্বামীটি কি মেয়ের বাড়ির লোককে একইভাবে সেবা করবে, চাকরি ছাড়বে সন্তান মানুষ করার জন্য ইত্যাদি প্রশ্ন তো থাকেই) । তাই বলে সেবা-শুশ্রূষাকে অবহেলার কথা কে কইচে? ব্যক্তিজীবন, দাম্পত্য ও পরিবারের প্রতি কর্তব্য এই ত্রয়ীকে যারা সমভাবে সমসুরে বন্টন করতে পারে না সেখানে ডিভোর্স অনৈতিক ও মূল্যবোধহীন হতে পারে না। আর যদি ‘আত্মজন’ এটাকে অনুধাবন করতে না পারে তবে এই নাটক ক্লিশে, মেলোড্রামাটিক ও অনগ্রসরমন্যতার প্রতীক হয়ে থেকে যায়। পরিচালকের দক্ষতা অনবদ্য হলেও বক্তব্যের আবেদন বাস্তবের অবস্থার সঙ্গে এক অসেতুসাধ্য দূরত্বে পৌঁছে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে সংঘাতে জড়ায় বৈকি। এটা অন্তত ‘সায়ক’-এর মত দলের কাছে অনভিপ্রেত। নাটকটি যেন একুশ শতকের চেহারার বিপরীতে যাত্রা করে এক অনড়ত্বের অবস্থানকেই স্পষ্ট করে – এটা আমাদের শুধু ভাবায় না, বেদনাহতও করে। এইখানেই মনে পড়ে বিভাস চক্রবর্তীর নাটক ‘ছোট ছোট বাড়ি’-র কথা। সেই অনবদ্য অনুভূতির কথা অন্যত্র আলোচনা করা যাবে। আজ থাক্‌।


Follow me: Ardhendu Banerjee Official


কবিতার ক্লাস ও কিছু স্মৃতি

 

তখন আমার কতইবা বয়স হবে – সতেরো বা আঠারো। ওই বয়সে বেশিরভাগ বাঙালি যুবক-যুবতীই দুটো জিনিসের খপ্পরে পড়ে – এক, বঙ্গীয় আগমার্কা কমিউনিজম আর দুই, কবিতা। এ-যেন শিবরাম চক্রবর্তীর ‘ঈশ্বর, পৃথিবী আর ভালোবাসা’-এর মতোই আরও দুই মারাত্মক ব্যাধি যা “তেমন করে ধরতে পারলে (..) কাউকে ছাড়ে না, রেহাই দেয় না সহজে, আজীবন ভোগায়, আপাদমস্তক গ্রাস করে বসে”। তাই, “কৈশোরেই কারো যদি এসবের টিকা নেয়া হয়ে যায় - খানিক খানিক স্বাদ পায় সেতো জন্মের মতই বেঁচে গেল বেচারা!” আর তা না-হলে, “জীবনের মতন ছাড়ান নেই”।

আমি সৌভাগ্যবান যে এই দুয়েরই হাত থেকে কোনো এক পুণ্যফলে রক্ষা পেয়েছি। মনে পড়ে সেবার এক কবিতা উৎসবে কবি দেখার জন্য গিয়েছিলাম। তার আগে কি কবি কি লেখক কাউকেই কোনোদিন সামনে থেকে দেখিনি। শুধুমাত্র বই-পত্রিকার পাতাতেই যতটুকু পরিচয় হবার তা হয়েছিল। তাছাড়া সে-বয়সে আমিও তো লুকিয়ে-চুরিয়ে কবিতার মতো সাজানো কিছু লাইন লিখতুম, মনে-মনে একটা ব্যাপারও যে হত না তা নয়। তাই একটা উচ্চ-ধারণা সঙ্গে নিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলুম যথাস্থানে যথাসময়ে। সকাল দশটা থেকে সে-অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল, শুনেছিলাম তা নাকি চলেছিল বিকাল ছ-টা অব্দি। কে জানত তখন যে এটাই আমার জীবনের মহাটিকাকরণের বিশেষ দিনে পরিণত হবে। বললে বিশ্বাস করবেন না, বাপরে-বাপ, কবি তো নয়, সে-এক কবির চিড়িয়াখানা দেখে এলুম। আড়াইশো কবির প্রায় সকলেই মাইক হাতে “আমি আমার স্বরচিত একখানি কবিতা পড়ছি” বলে যা শোনাল ভদ্রতার খাতিরে ছ-টা অব্দি বসে থাকলে কান থেকে রক্তপাত হয়ে শ্রবণশক্তিহীন হয়ে যাওয়া আর কেউ ঠেকাতে পারত না। পিকনিকের মাংসের অর্ডার এলে যেমন দোকানদার কসাইয়ের হাতে পরপর মুরগি সাপ্লাই করতে থাকে, আর মুরগিগুলো জবাই হয়ে যাওয়া পূর্ববর্তীদের অবস্থা দেখে ঝটাপটি লাগায়, কিন্তু কেউই পালিয়ে আসতে পারে না। আমার অবস্থাও অনুরূপ হয়েছিল। কোনোক্রমে দোকানদারের হাতে যাওয়ার আগেভাগেই তাই আমি দে-ছুট বলে বাপের নামখানি বাঁচিয়েছিলাম। আর সে-পথ মাড়াইনি। আজও না। খুব সযত্নে এড়িয়ে চলি সে-মহল।

তবে তখনও বঙ্গীয় আগমার্কা কমিউনিজমের হাত থেকে রক্ষা পাইনি। সেটা পেয়েছিলুম আরও কয়েকবছর পরে। অনেক ঘাটের জল খেয়ে তারপরে। সে-কথা এখানে বলার নয়। সুযোগ হলে পরে বলব। তবে যেটা বলতে পারি আমি স্বার্থপর ছিলুম না। নিজেই কেবল পালিয়ে বেঁচেছিলাম তা নয়। প্রথম প্রথম চেষ্টা করেছিলাম যারা এখন (মুরগির) ছানা দশায় আছে, তাদের রক্ষা করতে। দু-একজনকে বাঁচাতেও পেরেছিলাম। তারা এখনও গুরুদক্ষিণাবাবদ কখনও-সখনও দেখা হলেই রোস্ট করা চিকেন আর ঠাণ্ডা বিয়ার খাইয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। আর বেশিরভাগকেই যাদের প্রথমে মনে হয়েছিল বেঁচে গিয়েছে, পরে দেখেছি সম্পূর্ণ রক্ষা করা যায়নি। জবাই হতে না-পারার খেদ-ক্রন্দন এখনও তাদের বুকে হা-হা করে যেন। তা কী করেছিলাম আমি, এইবারে সেটা বলি।

পরিচিত তিনটি বড় দোকানের মালিকের থেকে বিজ্ঞাপণ তুলেছিলাম ৯০০ টাকা। সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিলাম নিজের জমানো কিছু। প্রথম সংখ্যা ‘বিবক্ষিত’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল। সালটা ২০১২। ট্যাবলয়েড, চারপাতা। ২০০ কপি। তখন আমার হাতে ছিল নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ‘কবিতার ক্লাস’ বইটি। এত সহজ বই আমি আর পড়িনি। মনে করি যারাই ‘কবিতা’ নামক রোগে গ্রস্ত, আরোগ্যের ইচ্ছাও সবিশেষ নেই কিন্তু মোটের ওপর জীবনের বেশিরভাগটাই একটা শান্ত-নিবিড় সুখের মধ্যেই কাটাতে চায়, অর্থাৎ বলি হলেও যেন অ্যানাসথেসিয়ার ডোজ নিয়ে হয় এমন প্রার্থনা করে, তাদের সকলেরই প্রাথমিকভাবে অন্তত এই বইটি পড়া দরকার। নইলে রক্তও বেরুবে, যন্ত্রণাও হবে। কেউ রক্ষা করতে পারবে না। সে-বয়সে নিজেকে মসিহা হিসাবে ধরে নিয়ে সটান ফোন করেছিলাম নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীকে। তিনি তখন ব্যস্ত তাঁর আত্মজীবনী লেখার কাজে। তাঁকে খোলসা করে উদ্দেশ্যটার কথা কইলুম। বললুম একটা লেখা যদি তিনি দিতে পারেন তবে খুব উপকার হয়। অব্যর্থ বটিকা পাওয়া যায়। তিনি প্রথমে খুব করে হাসলেন। বললেন, অনেকদিন পরে এইরকম ফোন তিনি পেলেন। তিনি ভারি খুশি হয়েছেন। বেশ কিছুক্ষণ কথা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, এমনিতে তাঁর যা বয়স ও সে-বয়সের নানান অত্যাচার তাঁকে সহ্য করতে হয়, সঙ্গে আবার আছে আত্মজীবনী লেখার কাজটাও, এই মুহূর্তে নতুন করে লেখা দেওয়ার ধকল সইতে পারবেন না। তবে তিনি একটা উপায় বলে দিলেন। তাঁর বই থেকে ও অন্যান্য নানান জায়গা থেকে কীভাবে সম্পাদনা করলে আমার কাঙ্ক্ষিত লেখাটি পাওয়া যাবে। আমি ভারি খুশি হয়েছিলাম এবং তাঁরই বাতলে দেওয়া রাস্তা অনুসরণ করেছিলাম। এইভাবে তিনটি সংখ্যায় তাঁর লেখা সম্পাদিত পুনর্মুদ্রণে ভাগে-ভাগে প্রকাশিত হয়েছিল। শেষবারের বেলা তাঁর সঙ্গে আরেকবার ফোনালাপ হয়েছিল। সেই শেষ। আর হয়নি।

সে-সময় আমাদের মফঃস্বলে চিন্তাশীল প্রবন্ধের কাগজ প্রকাশিত হত না। যা হত সবই প্রায় ‘পারস্পরিক পিঠ চাপড়ানি’ সমিতির সদস্য ও তল্পিবাহকদের দ্বারা প্রকাশিত ‘স্কুল ম্যাগাজিন’ গোত্রের কিছু কবিতার কাগজ। সেখানে কিছু গদ্য-প্রবন্ধ থাকত ঠিকই কিন্তু সে-সবের মান কহতব্য কিছু নয়। এখনও যদিও সেই ধারাই মূল। তবে কিছু পরিবর্তন অবশ্যই হয়েছে। এবং বলা ভালো তা পজিটিভ দিকেই। এখন কিছু অনবদ্য কাজের দেখা সহজেই মেলে। আগে গরু খোঁজার মতো করে খুঁজলেও যা মিলত না।

আজ বহুদিন পরে এখানে এসে পুরানো আলমারি-তাক ঝাড়াঝাড়িতে বইটা বেরিয়ে পড়ল। কিছু ধুলো ঝরে পড়ল, কিছু স্মৃতিও। কত কথাই না মনে এল, কত বন্ধুজন, কত শত্রুরাও। তবে আজও আমি কবিদের ধারপাশ মাড়াই না। আর কবিতা সেও পড়ি না। কেননা জঞ্জালের পাহাড় সরিয়ে পুষ্প উদ্ধারের জন্য বেহিসাবি সময় আর মহানুভব ইচ্ছা কোনোটাই আমার নেই। মনে পড়ে ‘বিবক্ষিত’ ২০১৭ সালের সংখ্যার জন্য কবিতা বিষয়ে একটি লেখা চেয়ে ফোন করেছিলাম অচিন রায়কে। তিনি সরাসরি অস্বীকার করে বলেছিলেন একই কথা যে, এ-বিষয়ে সময় নষ্ট তিনি করবেন না। তিনি অন্য বিষয়ে লেখা দিয়েছিলেন। কয়েকমাস আগেও কথা হল, তাঁর অভিমত আজও বদলায়নি। আমারও নয়। সুধীন্দ্রনাথ দত্তও ১৯৩০ সালে তাঁর ‘কাব্যের মুক্তি’ প্রবন্ধে একই কথা লিখেছিলেন। তাছাড়া আট বছর আগেই যখন ডানা জোইয়ার ‘ক্যান পোয়েট্রি ম্যাটার’ বক্তৃতাটির বাংলা অনুবাদ পেয়েছিলাম আর ‘কবিতা ও পাঠক : একটি মৃতপ্রায় মাধ্যমের আখ্যান’ নামক প্রবন্ধ লিখিয়েছিলাম সৈয়দ কওসর জামাল সাহেবকে দিয়ে – তখন থেকেই জানতাম যে কবিতা ইতিমধ্যেই একটি মৃত মাধ্যমে পরিণত হয়েছেতবে চারপাশে কবিতার নামে যে মহোৎসব চলছিল-চলছে-চলবে, তা তার শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের বিলাসিতা ছাড়া আর কিছুই নয়। সুনীলীয় যুগের ইলিউসনে কাতর বাঙালি নব্যকবিকূলের (দু-একজন ব্যতিক্রমকে উদাহরণের অন্তর্গত না করাই শ্রেয়) যে-আবেগ চারপাশে ঘন হয়ে দেখা যাচ্ছে তা শেষযাত্রায় হরিনামসংকীর্তনের আসরে থাকা চোখ-বন্ধ মাথা-দোলানো ভিড়ের ঘোরমাত্র। এর ভবিষ্যৎ কব্জি ডুবিয়ে খাওয়ার হাঘরেপনাতেই শেষ হবে। ভাস্কর চক্রবর্তীর অমোঘ লাইন তাই মনে পড়ে,

“এলো মাতব্বর, এলো মূর্তিমান ভণ্ড, মাথামোটা –

গোঁফে দুধ,

লিখে দিল দু-কলম : কাহাকে কবিতা বলে এবং বলে না –

মঞ্চজুড়ে দাপাদাপি, অন্ধজিভ-ভাষা নেই, ভালোবাসা নেই –

আছে এক সাধের আহ্লাদ, দাও

শেষ করে দাও –

-শেষ? আহা, মাথার জটিল রক্তস্রোত, শেষ হবে কবে?

শেষ হতে হতে তবু হাসি নিয়ে, হে সুন্দর, জেগে উঠি আমি –

পড়ো-কি পড়ো-না লেখা জানিনা, জেনেছি মাত্র এই

সকলেই কবি আজ – শুধু কেউ কেউ নয় কবি।”

 

কিন্তু আজও কি এই বই পড়ে কেউ বাঁচার চেষ্টা করবে – সত্যই জানি না।

 Follow me : Ardhendu Banerjee Official


আরও বইকথা

Source Internet

গতকাল "সোনার বই"-এর কথা লিখেছিলাম এই গ্রুপে। ইট্রুস্কান সভ্যতার অত্যাশ্চর্য সব রহস্যময়তা নিয়ে ছিল সেই কাহিনি। অনেক পাঠকের ভালো লেগেছে জেনে আনন্দিতও হয়েছি। তাই আজ আরেকরকম বইয়ের কথা জানাচ্ছি। খুব বিশদে আজ আলোচনা করছি না। পরে অবশ্যই লিখব। আজ শুধু খবরটুকু দিচ্ছি।

আসলে বই ছাড়া বয়ে যায় না সময় ও সভ্যতা। বইই ধরে রাখে স্মৃৃতি ও শ্রুতির আলেখ্যটিকে। যেভাবেই হোক সেটাকে পাঠ করতেই হবে। কথাতেই আছে, নান্য পন্থা বিদ্যতে অয়নায়। বাংলার সমাজে মাইকেলের হাত ধরে পাঠকের যে নতুন যাত্রা শুরু হয়েছিল, তাকেই বিবর্ধিত করেছিলেন বঙ্কিম। সেই ধারাই তো চলছে আজও।পাঠের বিবর্তনই তো গড়েছে/গড়বে সভ্যতার সৌধ। আর তাতে বাঙালির যোগদান ঠিক কতখানি - এটির অনুসন্ধানই ছিল আমার প্রথম বই "পাঠতন্ত্র"-এর উদ্দিষ্ট। যতটুকু পেরেছি করেছি। চেষ্টা থাকবে আরও গভীর অন্বেষণের।

আপাতত আজকে একটি অন্য রকমের বইয়ের ছবি দিই। এটিকে 1590 CE তে তৈরি করা হয়েছিল। এখন রাখা আছে জার্মানির ফোর্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে।

 

Follow me : Ardhendu Banerjee Official