Saturday, 25 June 2022

বইয়ের অন্য দাস্তাঁ

 

Source Internet

বই নয়, আজ একটি বইয়ের ‘কভার’ নিয়ে দু-চার কথা লিখব। আসলে মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কারের আগে বেশিরভাগ বইই ছিল হস্তনির্মিত। তাই আজকের দিনে ‘কভার’ বা প্রচ্ছদ বলতে যা বোঝায় তার থেকে অনেকখানি আলাদা ছিল তখনকার ব্যাপারটা। শিল্পসমৃদ্ধতার দিক থেকেও সেগুলির ছিল বিশেষ আকর্ষণ। মধ্যযুগের কথাকেই যদি বিচার করা হয় তাহলেই আমরা দেখতে পাই এক অন্য দাস্তাঁ। পার্চমেন্টের জন্য পশুচর্মের ব্যবহার ছিল এর প্রধানতম দিক। এছাড়া বহু পরিশ্রমে সৃষ্টি করা চিত্র, খোদাই, অলংকারের ব্যবহার ইত্যাদি একে মানবসভ্যতার পাঠের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করেছে।  

বিশেষ করে বাইজানটাইন আইভরির বা হস্তিদন্তের কারুকার্যগুলি মনকে যেন এক অদ্ভুত উত্তেজনায় টেনে নিয়ে যায়। এরকমই একটা ‘কভারের’ সন্ধান মেলে ১৯১৭ সাল নাগাদ। তখন তার বয়স প্রায় সহস্র বছর। নিচে তার কয়েকটা ছবি দিলাম। ছবিতে ক্রুশবিদ্ধকরণের দৃশ্যের খোদাই করা কাজ দেখা যাচ্ছে। ভার্জিন ও জনের (জন দ্য ইভাঞ্জেলিস্ট) চিত্রও দু-পাশে খোদিত হয়েছে যাঁরা জিশুর আত্মত্যাগের স্বীকৃতির কথা ঘোষণা করছেন। জিশু তখন মুদ্রিত নেত্র, অর্থাৎ মৃত। তাঁর মাথার দু-পাশে দুই দেবদূতের আবক্ষ মূর্তিও দেখতে পাওয়া যাচ্ছে যারা চন্দ্র ও সূর্যের কিরণের প্রতীক হিসাবে বিদ্যমান।

Source Internet


এটি নির্মিত হয়েছিল কনস্ট্যানটিনোপলে। উচ্চতা ২৬ সেন্টিমিটার, আর আইভরি মূর্তির দৈর্ঘ্য ১৩ সেন্টিমিটারের কিছু বেশি। কাঠের ভিত্তিভূমিতে রূপোর গিল্টি করা, হাতির দাঁতের মূর্তি ও চারপাশে নীলকান্তমণি, কাচ এবং স্ফটিকের উজ্জ্বল উপস্থিতি এই গসপেলের এই কভারটিকে অনন্যতা দান করেছিল। পরবর্তীকালে যদিও এটাকে সান্তা ক্রুজ়ের বেনেডিক্টাইন মঠে নিয়ে আসা হয়েছিল। এই মঠ সম্বন্ধে কথিত আছে যে, এটা নাকি রানি ফেলিসিয়ার দ্বারা নির্মিত। কে এই রানি? আরাগন ও নাভাররের রাজা পঞ্চম সাঞ্চোর পত্নী। তখনই সম্ভবত এটিকে বইয়ের কভার হিসাবে ব্যবহার করার জন্য আরেকটি ভিত্তির ওপরে দাঁড় করানো হয়েছিল।

একটি ‘কভার’ যে কতকিছুর ইতিহাসকে বয়ে নিয়ে যায় তার ইয়ত্তা নেই। মনে পড়ে, আমার প্রথম বই ‘পাঠতন্ত্র’-এর কভার করেছিলেন বিখ্যাত শিল্পী সনাতন দিন্দা। তাঁকে ছাড়া বইটি কিছুতেই সম্পূর্ণ হতে পারত না। তাঁর প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই। বইয়ের বিষয়বস্তু শুনে তিনি আমার এক কথাতেই রাজি হয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু এই প্রচ্ছদ আঁকা তাঁর পক্ষে সহজ হয়নি। কেননা সে-সময়ে তাঁর জীবন খুব টালমাটাল হয়েছিল। আমরা চারিদিকে কত কথাই তো শুনি, বেশিরভাগকেই পাত্তা দিই না। কিন্তু শিল্পীর জীবনের ঘটনাগুলিকে এভাবে হারিয়ে যেতে দেওয়া হয়তো ঠিক নয়। আপনাদের মনে থাকবে, গতবছরের মাঝামাঝি, ওই পুজোর আগে-আগে, সনাতন দিন্দার একটি ছবি নিয়ে খুব রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক বিতর্ক হয়েছিল। সে-মাত্রা এতটাই ছাড়িয়েছিল যে জীবনের হুমকি পাওয়া থেকে শুরু করে অকথ্য গালিগালাজ সহ নানান অত্যাচার তাঁর উপরে নেমে এসেছিল। সে এক তীব্র মানসিক চাপ ও যন্ত্রণায় তিনি সে-সব দিন কাটিয়েছেন। খুবই কম শিল্পীই তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করেছিলেন সে-দিন। এটা আমাদের শুধু বিস্মিত করেছিল তাইই নয়, যন্ত্রণাবিদ্ধও কম করেনি। সেই সময়েও সনাতন দিন্দা আমার মতো অনামা অখ্যাত একজন শখের লেখকের বইয়ের প্রচ্ছদটি করে দিয়েছিলেন। ‘পাঠতন্ত্র’-এর প্রচ্ছদের ইতিহাসের সঙ্গে তাঁর জীবনের সেইসব দিনগুলিও জুড়ে গিয়েছে। আজও যখনই এই প্রচ্ছদ দেখি, মনে পড়ে আমাদের দেশের এই সময়ের সাম্প্রদায়িকতার ভয়াবহ কাহিনিটিও। সত্যই এ এক অদ্ভুত সময়। কিন্তু এইখানেই আরেকটি বিস্ময় লুকিয়ে আছে।

Source Internet


আসলে পাঠের ইতিহাসের রোমাঞ্চকর কাহিনি শুধু বইই নয় তার প্রচ্ছদও বহন করে। তাই শেষ করি আরেকটি দিক উদ্ভাসিত করে। নিচের ছবিটিকে আরও ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, জিশুর বাঁ-পাশে একটি নীলকান্তমণি জ্বলজ্বল করছে। আর ওই নীলকান্তমণিটির গাত্রে আল্লাহ্‌র নিরানব্বইটি নামের চারটি খোদিত আছে। কী অভুত বিস্ময়ের ব্যাপার, তাই না!


Follow me: Ardhendu Banerjee Official


No comments:

Post a Comment

I am waiting for your valuable comment. Please comment. Thank you..