Friday, 25 December 2015

আজ ২৫শে ডিসেম্বর স্যার আইজ্যাক নিউটনের জন্মদিন



২৫শে ডিসেম্বর – মেরি খ্রীষ্টমাস জানাই সবাইকে – তবে সঙ্গে জানাই আজ স্যার আইজ্যাক নিউটনের জন্মদিন, আজ মারকভনিকভের জন্মদিন, আজ আর্নস্ট রুস্কারেরও জন্মদিন । 

আমাদের বেশিরভাগ মানুষের কাছে নিউটন মানে আপেল পড়ার ঘটনামাত্র । কিন্তু বাস্তবে তো সেরকম কোনও কিছুই ঘটেনি । এছাড়া আমাদের সঙ্গে আছে বহুপ্রচলিত কিছু ঘটনার গল্প যা প্রমাণ করে দেয় যে নিউটন সমস্ত কিছুই যেন ঐ আপেল পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আবিষ্কার করেছেন, ওটা না হলে যেন কিছুই হত না । আসলে, আমাদের জানা নেই যে, নিউটন যখন ১৬৬১ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসেন তখন তিনি তৎকালীন যত বিখ্যাত বিজ্ঞান ও দর্শনের বই ছিল সমস্ত খুব গূঢ়ভাবে পড়াশুনা করেছিলেন, যা তাঁর চিন্তাভাবনার আঙ্গিক বদলে দিয়েছিল । সেসমস্ত বইয়ের মধ্যে ছিল, অ্যারিস্টটলের “অরগ্যানন” ও “এথিকস”, ইউক্লিডের “এলিমেন্টস”, গ্যালিলিওর “দায়ালগো”, ডেকার্তের “জিওমেট্রিয়া” এবং “প্রিন্সিপিয়া ফিলোজফিয়া” ইত্যাদি । এদের মধ্যে ডেকার্তের প্রভাবেই তাঁর নিজস্ব চিন্তাপদ্ধতি সবচেয়ে আন্দোলিত হয়েছিল । এই একাকীত্বেভরা মানুষটা নিজের ২২ থেকে ২৪ বছর বয়সের মধ্যে সবচেয়ে বেশি করে গড়ে নিয়েছিলেন নিজের সৃজনশক্তিকে যা মানুষের চিন্তাভাবনা পাল্টে দিয়েছিল ।  তিনি আবিষ্কার করেন, নেগেটিভ ও ফ্রাক্সনাল এক্সপোনেন্টের বাইনোমিয়াল শ্রেণি, ডিফারেন্সিয়াল ও ইন্টিগ্রাল ক্যালকুলাস, সৌরজগতের ভিত্তিস্তম্ভ হিসেবে আনেন গ্রাভিটির ধারনা, প্রিজমের মধ্যে দিয়ে সূর্যের আলোর বিচ্ছুরণ, ইন্টারপোলেশন পদ্ধতি ইত্যাদি ইত্যাদি । তবে এসব কিন্তু তিনি কিছুতেই প্রকাশ করতে চাননি । তিনি তাঁর ধারণাকে বহু পরীক্ষায় সফল না হলে প্রকাশ করার পক্ষপাতী ছিলেন না । ১৬৮৪ সালে হ্যালি প্রথম ধারনা করেছিলেন যে, গ্রহগুলির গতির পেছনে নিশ্চয় কোনও কেন্দ্রিয় ফোর্স কাজ করছে, কিন্তু এটিকে প্রমাণ করার মত কিছু তিনি আবিষ্কার করেন নি । সেই মিটিং এ উপস্থিত নিউটন নিজের মতবাদের কথা তখন প্রথম বলেন আর বলেন যে আমি এগুলি অঙ্ক কষে প্রমাণ করে দেখেছি । হ্যালি স্তম্ভিত হয়ে বলেন, আপনি কি মানুষ মশাই ! আমরা যখন সবাই একই প্রশ্নের পিছনে ধাওয়া করছি আর আপনি সেইসবের উত্তর জেনে ফেলে এখনও অপ্রকাশিত করে রেখেছেন কি করে ? এরপর নিউটন সেই বিখ্যাত বই লেখা শুরু করেন দিনরাত জেগে । ১৬৮৭ সালে নিউটন প্রকাশ করেন তাঁর বিখ্যাত বই “ফিলোজফিয়া ন্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম্যাথেমেটিকা” ।  বইটি তিনটি ভলিউমে বিভক্ত । বইয়ের ভাষা অ্যাবস্ট্রাক্ট গণিতের। কেননা নিউটন বুদ্ধিমত্তার অধিকারী ছাড়া কারও কাছে সহজভাবে নিজের আবিষ্কার প্রকাশ করতে রাজি ছিলেন না, তিনি মনে করতেন সবাই তাঁর আবিস্কারের গুরুত্ব বুঝতে পারবে না ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করবে । তবে তিনি কিন্তু এ বইকে দূর্বোধ্যও করেননি নিজের আবিস্কৃত ক্যালকুলাস পদ্ধতি ব্যবহার করে, কেননা তখনও এই পদ্ধতি মানুষ আয়ত্ত করতে পারেনি । তিনি সেসময়ের লোকজন যে ভাষা বুঝতেন সেই জ্যামিতির ভাষাতেই সে বই লিখেছিলেন যাতে কেউ কেউ সেটা বুঝতে পারে । এই বইয়ের প্রথমভাগে তিনি তাঁর ব্যবহৃত সমস্ত টার্মসের বর্ণনা করেছেন ও ল’জ অফ মোশনের ধারনা দিয়েছিলেন যেটা এই বইয়ের ভিত্তি । দ্বিতীয়ভাগে তিনি এগুলির ব্যবহার করে বিভিন্ন মেকানিকাল সমস্যার সমাধানগুলি দিয়েছিলেন । এবং তৃতীয়ভাগে, তিনি বইয়ের মোদ্দা কথাগুলি লিখেছেন, অর্থাৎ “সিস্টেম অফ দ্য ওয়ার্ল্ড” । তিনি এখানে কেপলারের সুত্রগুলির সমাধান করেন এবং গ্রহগুলির গতির সমগ্র ধারণা দেন । এসব জানার পড়ে কেবল মূর্খই বিশ্বাস করবে যে আপেল পড়ল আর নিঊটন সব ভেবে ফেললেন । এ আমাদের অযোগ্যতা যে তাঁর বইয়ের ধারণা করতে না পেরে আমরা এসব গালগল্প ফাঁদি । এই বিশাল মানুষটার জন্মদিন আমরা মনে রাখিনি, এও আমাদের দূর্ভাগ্য । আজ তাঁকে জানাই আমার হৃদয়ের সমস্ত শ্রদ্ধা । ইনিই বিপ্লবের জন্মদাতা । 
Source : Internet

 বাকি দুইজনের কথা সামান্য বলে শেষ করব । মারকভনিকভ হলেন সেই নাম যিনি অরগ্যানিক রসায়নের যোগের সূত্র আবিষ্কার করেন ১৮৬৯ সালে যা অনুমান দেয় হ্যালোজেন হ্যালাইডের অ্যালকিনের দ্বৈতবন্ধনীর সঙ্গে বিক্রিয়ার ফলাফলের । তাঁর এই আবিস্কারের পঞ্চাশ বছরের মধ্যে পাঊলিং তাঁর রেজোন্যান্সের থিওরির জন্ম দেন । তিনি কার্বনের চারটে রিং, সাতটা রিং এরও আবিষ্কর্তা । এছাড়া তিনি আইসোবিউটারিক ও বিউটারিক অ্যাসিডগুলি যে আইসোমার সেকথাও বলেন । 

অবশেষে, আর্নস্ট রুস্কার । ইনি ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের আবিষ্কর্তা । ইনি ১৯৮৬ সালে নোবেল পান । 

সুতরাং, যীশু থাকুন, নিশ্চিন্তে থাকুন । তাই বলে এঁরাই বা বাদ যাবেন কোন অপরাধে ?

Thursday, 24 December 2015

আইনস্টাইনের জেনারেল রিলেটিভিটির ১০০ তম বছর ২০১৫ ও কিছু অভিজ্ঞতা




বিরাট মাপের ফেস্টুন, তাতে লেখা “ডোকরা’র কর্মশালা”, দেখে ভেতরে গিয়ে দেখি কিছু লোকজন অল্প আঁচে কেমন একটা খয়েরি রঙের ক্যাডবেরির মত দেখতে জিনিস গরম করছে আর সেটাকে টিপেটাপে সুন্দর সুন্দর আকৃতি তৈরি করছে । আমি দু একজনের পাশে বসে দেখতে জুটে গেলাম কিভাবে কি হচ্ছে । তাদেরই একজন চারহাতওয়ালা ধ্যানরত এক দেবমূর্তি বানাচ্ছিলেন । কিন্তু সেটা আসছিল না ঠিকঠাক । অনেক চেষ্টার শেষে লোকটি রেগে গিয়ে ওটাকে আবার গরম করে দিল দুমড়ে মুচড়ে । ফলে যা হল তা প্রত্যাশিত নয় । ভাঙতে গিয়ে গড়ে গেল জিনিসটা। খুব সুন্দর একটা মনুষ্য অবয়ব এল । এরপর আবার ভাবনা শুরু, কি করা যায় এটাকে নিয়ে । এত সুন্দর হয়েছে যে মন আর ভাঙার অনুমতি দেবে না । সুতরাং, তিনি আমাকেও বললেন, তুমিও কর তো দেখি বাপু কিছু একটা, বসে থেকো না খামোকা ! ব্যস ফেঁসে গেলাম । কোন সাহসে যে হাত লাগালাম তা জানি না, জীবনে যেখানে কিছুই এসব করিনি, তবুও লাগিয়ে ফেললাম । আর ঐ লোকটির সঙ্গে আড্ডা শুরু হল । ভদ্রলোক ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের লোক । নানা কথার মাঝে তিনি আমাকে রামায়ন, মহাভারত, থেকে শুরু করে সুকুমার রায়, রামপ্রসাদ সেন হয়ে জীবনানন্দে এসে থামালেন । মধ্যিখানে চৈতন্য ভাগবত আর সঙ্গে প্যারাডাইস লস্ট, প্যারাডাইস রিগেইনড ও ইত্যাদি কিছু টুকরো টাকরা রইল । এত আলোচনার শেষে হাতের কাজটা প্রায় কিছুই হল না, তবে তিনি আমাকে বললেন তোমাকে এই এই এই এই গুলো অবশ্যই পড়তে হবে । তুমি তো সাহিত্য ইতিহাস পড়াশুনা করেছ দেখছি, তা অমুক অমুক তমুক তমুক লেখক বাদ দিয়ে গেলে কি করে ? পড়ে ফেল নইলে পরেরবার দেখা হলে তো আর কথা বলার আলোচনা করবার কিছু থাকবে না । শিক্ষিত হতে হবে । আমি বললাম নিশ্চয় । বেশ ভাল লোক, অনেক অনেক পড়াশুনা । 

আমি বললাম, জানেন কাকু, এবছরটা আইনস্টাইনের রিলেটিভিটির জেনারেল থিওরির ১০০ বছর । উনি বললেন তাই নাকি ! জানতাম না তো । আমি বললাম হ্যাঁ । এছাড়া অঙ্কের ক্ষেত্রে এমি নয়েদার কনভারসন সূত্র ও ডিফারেন্সিয়াল সিমেট্রির থিওরি প্রমাণ করেন, প্লুটোর প্রথম ছবি তোলা হয়, প্রোক্সিমা সেন্তাওরি যেটা কিনা সূর্যের পরেই পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র সেটা আবিষ্কার করা হয়, ন্যাশনাল অ্যাডভাইসরি কমিটি অফ এরোনটিক্স, যা নাসা এর পূর্বপুরুষ সেটা প্রতিষ্ঠিত হয় । উনি চুপচাপ শুনলেন । 

আমি বললাম, আপনি কি রিলেটিভিটি সম্বন্ধে কিছু জানেন, এটাই তো পৃথিবী পাল্টে দিয়েছিল । উনি হাঁ করে চেয়ে থাকলেন । আমি বললাম জানেন না, সেকি । ১৯০৫ সালের থিওরিতে আইনস্টাইন স্পেস আর সময়ের যে পরম ও স্বাধীন ধর্মের ধারনা প্রচলিত ছিল, প্রথম সেটাকে ভেঙ্গে দেন । আলোর বেগকে ধ্রুবক ধরে নিয়ে তিনি তাঁর সূত্রটি তৈরি করেন । তিনি প্রথম বলেন যে ম্যাটার চার ডাইমেসনে অবস্থান করে, যার তিনটি হল স্পেস সন্ততি আর একটি হল সময় । এখানে তিনি গতিকে ইউনিফর্ম ধরেছিলেন কন্সট্যান্ট বেগের ক্ষেত্রে । কিন্তু আদপে সেটা প্রকৃতিবিরুদ্ধ ধারনা ছিল। কেননা সেখানে ত্বরণের একটা ব্যাপার থাকে । ফলে তাঁর কাছে এখন অনুসন্ধানের বিষয় হয়, সেই সম্পর্ক যেখানে কীরকম হবে স্পেস-টাইম যখন গ্রাভিটি কিম্বা ত্বরণের প্রভাব পড়বে । এবং ১০ বছর পরে তিনি ১৯১৫ সালে জেনারেল রিলেটিভিটি থিওরির কথা বললেন যাতে তিনি দেখালেন যে, গ্রাভিটি হল স্পেস-টাইমের কারভেচার বা জ্যামিতি । মানে এই যে পৃথিবী সূর্যের চাদ্দিকে ঘোরে তার কারন হল সূর্যের ভর স্পেস-টাইম সন্ততিকে কুঁচকে দেয় বা কার্ভ করে । এটা তখন শুনতে অদ্ভুত লাগলেও বহু পরীক্ষায় প্রমাণিত সত্য বলে মানা হয় । এই মতবাদ অনুযায়ী আলো যখন সূর্যের মত কোনও বিশাল অবজেক্টকে অতিক্রম করে তখন এটা সুর্যের চারপাশে থাকা স্পেস-টাইম সন্ততি অনুযায়ী নিজেকে বাঁকিয়ে নেয় । আর এই থিওরির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রমাণ হল আজকের জিপিএস সিস্টেম যা দিয়ে আমাদের এইসব স্মার্ট ফোন চলছে । 
Source : Internet


এসব শোনার পরে দেখি উনি আর কথা বলছেন না । আমি ওনাকে কাপড়ের ওপরে  হাঁড়ি রেখে নিচের দিকের স্পেস-টাইম সন্ততি দেখিয়ে ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিয়েছিলাম । তাঁকে বললাম আপনি কি এই এই এই লেখকের অঙ্কের ফিজিক্সের অমুক অমুক অমুক বইগুলি পড়েছেন । পড়ে ফেলুন জলদি, নইলে পরেরবার দেখা হলে কথা বলা বা আলোচনা করার কিছু থাকবে না । দেখুন আমি তো সাহিত্য ইতিহাসের স কিম্বা ই টুকু হলেও জানি, আপনি তো বিজ্ঞানের অক্ষরের সঙ্গে পরিচয়ই করেননি । আজকের দিনে ওটা না জানলে চলবে কি ! শিক্ষিত হতেই হবে । 

আমার জানা নেই কেন আজকের সাহিত্যের লোকজন বিজ্ঞানকে বোঝেন না, অথচ আমাদের দেশের শ্রেষ্টতম সাহিত্যিকরা যেমন শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ ব্যাপকভাবে বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশুনা করতেন ও বুঝতেন তার অসংখ্য প্রমাণ তাঁদের লেখায় আছে । এটা আমাকে আজ আরও একবার ব্যাথা দিল আজকে ।

Saturday, 24 October 2015

বেকার সমস্যার সমাধান হলে তো এ রাষ্ট্রযন্ত্র ভেঙে যাবে



কদিন আগে “দৈনিক স্টেটসম্যানে” পড়েছিলাম, পশ্চিমবঙ্গে বেকারের সংখ্যা নাকি প্রায় ২৩ লক্ষ । অন্যদিকে সরকারি খালি পদের সংখ্যাও নেহাতই কম নয়, কেবলমাত্র কলেজেই তিনহাজার, স্কুলে ১৫-১৬ হাজার এবং অন্যান্য ক্ষেত্র তো আছেই যাতে সব মেলালে মোটামুটি বেকারসমস্যা এক আমলেই মেটানো যায় । তা এ নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে মুলত দুটো ঝোঁক দেখতে পেলাম । এক, ক্ষোভের, কীসের ক্ষোভ ? চাকরি না পাওয়ার ক্ষোভ যা পরিবর্তিত হয়েছে সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত অসহিষ্ণুতায় । অর্থাৎ, রিজারভেশনের বিরুদ্ধে । দুই, হতাশার । সরকারি চাকরির প্রতি মোহ এবং ব্যার্থতার ফলে উদ্ভুত হতাশা । ফল কম মাইনেতে হলেও বেসরকারি কোম্পানির প্রতি তীব্র ঝোঁক ও আনুগত্যের মনোভাব । 


একটাও অপ্রত্যাশিত ও অস্বাভাবিক নয় । তা এই দুই মনোভাবের কারণ কি ? প্রকৃতপক্ষে ধনপতি শ্রেণিগুলির (অর্থাৎ, রিলায়েন্স, টাটা, বিড়লা ও ইত্যাদি)সঙ্গে আঁতাতে থাকা রাষ্ট্রযন্ত্র(অর্থাৎ, বিজেপি, কংগ্রেস, সিপিএম ইত্যাদি পরিচালিত) একদিকে বেকারের সংখ্যা বাড়াচ্ছে যাতে বেসরকারি ক্ষেত্রে কম মাইনেতে বেশি শ্রম আদায় করার সম্ভবনা বৃদ্ধি হয় ও ধনপতিদের মুনাফা বেড়েই চলে । এখানে আমি বেকারশ্রেণিদের মার্ক্সবাদীদের শোষণ – শোষিত থিওরি বলছি না, কেননা জানি তা কেউ শুনতেই চাইবে না । এর কারণ এই যে, ক্ষুধা জিইয়ে রাখার বর্তমান ব্যবস্থায় মানুষ তারই দাস যে অন্তত একমুঠো ভাত তুলে দিচ্ছে, তাদের নয় যারা খালি পেটে আত্মত্যাগের কথা প্রচার করছে । কিন্তু, যদি কেউ কাওকে সরাসরি বলে যে তোমায় এই অ্যাত্তো টাকা দিলাম, নিজেকে আমার কাছে বেচে দাও । আজকের দিনে সে কথা কেউ মানবে না । ফলে এরকম ঘুরিয়ে নাক দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে একথা তো ঠিক । এতে কেউ বুঝতেই পারে না যে সে কবেই ধনপতিদের কাছে নিজেকে বেচে দিয়েছে । অন্যদিকে সরকার পক্ষ নিয়োগের এমন বন্দোবস্ত করেছে যাতে লোকে এসব নিয়ে ভাবার ও বোঝার সামান্য অবকাশও না পায়, আর পেলেও সে চিন্তা যেন ব্যর্থতায় পরিপূর্ণ হতাশাগ্রস্থ মানুষের সাম্প্রদায়িক দোষারোপের মধ্যেই নিয়োজিত থাকে কিম্বা চিকনি চামেলির ফও্যা তো আছেই । এ পদ্ধতির অবশ্যম্ভাবী ফল হল ভোটের রাজনীতিতে ধনপতি শ্রেণির মুনাফার জোর ও সমর্থনে একবার বিজেপি আর একবার কংগ্রেসের ক্ষমতায় আসা-যাওয়ার নিশ্চিতকরণ এবং অন্যদিকে ধনপতিদের নির্বিঘ্নে মুনাফাবৃদ্ধির হার বাড়ানো। আর জনগণ বাধ্য হনুমানের সামনে কলা ধরে রেখে তার আচরণ নিয়ন্ত্রনের ম্যাজিকস্টিকের বাধ্যতার মত । না আমাদের দেশে তো সে শিক্ষাও নেই যা মানুষকে চিন্তায় স্বাধীন ও চরিত্রে আপোষহীন করবে । আর স্বাভাবিক কারণে সে শিক্ষাও এ রাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রত্যাশাও করা যায় না । 

ফলে রাষ্ট্রযন্ত্র যেমন টিকে আছে ধনপতিদের মুনাফার ভিত্তিতে তেমনই ধনপতি শ্রেণি টিকে আছে রাষ্ট্রযন্ত্রের অস্তিত্বে । তাই বেকার সমস্যা মিটলে দুটোই বিপদে পড়ে যাবে । আর এখন কেইবা লাইফ ইনস্যুরেন্স, গাড়ি বাড়ি করে বছরে একবার আন্দামানে কিম্বা বিদেশে ঘুরতে যাবার বাসনা ত্যাগ করে খালিপেটে আন্দোলনে মার খেতে নামবে । তার চেয়ে বাবা যেখানে ৫০হাজারের খাটনিতে ১০হাজার পাওয়া যায় সেই ভাল, যেখানে ৫০হাজারের খাটনি খেটে পুলিশের ও গুন্ডাচক্রের লাথি-লাঠি-গুলি খেতে হবে । 


অথচ এও তো ঠিক আজকের সামান্য আত্মত্যাগের ভীতি আমাদের পৌঁছে দিচ্ছে আরও কঠিন দাসত্বের শৃঙ্খলে ।

Friday, 2 October 2015

তৃণমূলকে তো চেনা যায়, সিপিএম শূয়রের বাচ্চাদের তো চেনা যায় না ... সিপিএম বিদ্বেষেই আমি তৃণমূলের ভোটার



একটা অতিজনপ্রচলিত গল্প দিয়ে শুরু করি । একবার একটা পাঁঠার সুবৃহৎ অণ্ডকোষ(বাংলায় যারে বাল বলে) দেখিয়া এক শৃগাল স্বপ্ন দেখিয়াছিল যে উহার ভার সহ্য করিতে না পারিয়া দ্রুতই পাঁঠার শরীর জবাব দিবে । অর্থাৎ অন্ডোকোষ খসিয়া পড়িবে । আর সে যাইয়া আপনার উদরপূর্তি ঘটাইবে । কিন্তু প্রকৃতির নিয়ম সে নহে । সুতরাং, শৃগাল যতই পাঁঠার পিছু পিছু স্বপ্নভ্রমে ঘুরিয়া বেড়ায় ততই তাহা ব্যর্থ হইয়া যায় । ফলে একদিন সে প্রত্যাশা ত্যাগ করে । আমাদের রাজ্যেও এখনও এরকম একটি রাজনৈতিক ডাইনোসরের ভ্রম কাটেনি । তবে খুব দ্রুতই সে অবলুপ্তির পথে যাবে, নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে – এ নিশ্চিত । 

আমাদের এখানে অর্থাৎ বর্ধমান শহরে একটি নাট্যোৎসব চলছে । নাম, গঙ্গা-যমুনা নাট্যোৎসব । এটি বর্ধমানের একটি নাট্যদল কুশীলব ও কলকাতার অনীক মিলে আয়োজন করে । যে নাটকগুলি এই সময়ে আমরা দেখতে পাই তা সত্যিই ভাল । এই ধরণের একটা কাজের জন্য আমি এদের প্রশংসা করি । এই নাটকে যা ভিড় হয় তা অন্য কোনও নাট্যোৎসবে আমি দেখিনি । তাই হঠাৎ মনে হয়, বর্ধমানবাসী নাট্যপ্রেমী হয়েছে । আনন্দিত হই । কিন্তু আবার যখন দেখি অন্য কোনও দলের নাটক এলে তেমন লোক হয় না । তখন বুঝতে অসুবিধা হয় নাট্যপ্রেমী মানুষদের এই দ্বিচারিতা কেন ? অন্য নাটকের দল যখন প্রায় বিনা পয়সায় নাটকের ব্যবস্থা করেছে তখন লোক আসছে না আর এদের টিকিটের যথেষ্ট দাম হওয়া সত্ত্বেও আসছে কেন ? এ তো বাঙালিপ্রকৃতি বিরুদ্ধ । তবে এ রহস্য কাটে অল্পক্ষণের মধ্যেই ।
আসলে ব্যাপারটা হল এরকম যে, এই গঙ্গা-যমুনা নাট্যোৎসবে যে ভিড় চোখে পড়ে তা সাধারণ জনগণের তো বটেই তবে সেই জনগণের আরও একটা পরিচয় আছে । তা হল এরা সকলেই সিপিআইএম দলের ক্যাডার । এদের মধ্যে বেশিরভাগ স্কুল কলেজে চাকরি করে । স্বাভাবিক । ২০১১ এর আগে অব্দি তো এদের খাওয়া আর দেওয়ার খরচ চালানোর জন্য স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলির প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল । সে কথা ভুললে চলবে কেমন করে । ফলে দল যতই ক্ষমতার বাইরে থাকুক সাধারণ মানুষের লাথি খেয়ে সিটিয়ে থাকুক এদের তো একটা নৈতিক কর্তব্য আছে দলের প্রতি । তাই এই ভিড় । তবে এদের মধ্যে আমাদের মত কিছু লোকজন থাকে যারা কেবল নাটক দেখতে যায় । আমরা জানি যে এরা প্রোপাগান্ডা দেখাবে । তবুও যাই । কেননা সবই তো প্রোপাগান্ডা । এদের মধ্যে কিছু ভাল নাটক তো থাকতেও পারে, সেটার প্রত্যাশাতেই যাই । কালকে ও আজকে যেমন দেখলাম, দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়ের “স্পর্ধাবর্ণ” এবং আজকে বাংলাদেশের দল উদীচির “হাফ আখড়াই” । দুটি অসামান্য প্রযোজনা । আর প্রথমদিন কুশীলবের নাটক দেখেছিলাম “লালকমল নীলকমল” । তাতে দক্ষিণাবাবুর দাক্ষিণ্য প্রায় ছিল না ফলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হয়ে উঠেছিলেন সিপিএম এর তরুণ তুর্কী নেতা, লেখক, কবি ও সর্বোপরি অধ্যাপকের কলমে রাক্ষুসী । কি অভদ্র উপস্থাপনা । রাজনীতিতে আর কোনও ভদ্রতা আশাই করা যায় না । নাটকের শেষে আবার স্টেজে উঠে তাঁরা অর্থাৎ নাট্যকার ও পরিচালক গর্বের সঙ্গে জানালেন যে মাত্র তিনদিনে এই নাটক লেখা হয়েছিল আর মাত্র একমাস রিহার্সেলে এই উপস্থাপনা । ছিঃ ! নাটকের প্রতি কি সিরিয়াস ডেডিকেশন । এমন হাবভাব যেন নিজেদের শম্ভু মিত্তিরের চেয়েও দু কাঠি ওপরের ভাবে এরা । 

নাটকের মঞ্চে দাঁড়িয়ে ও মঞ্চের বাইরে জনগণের প্রতি এদের ব্যবহারের যা অভিজ্ঞতা হল এবার তা বলি ।  এদের মধ্যে এখনও যে দাদাগিরি, আমাদের লোক ওদের লোক ও ব্যবহারে যে ঔদ্ধত্য দেখলাম তাতে মনে হয় তৃণমূল অনেক সুখের । তৃণমূলকে চেনা যায়, এ শূয়রের বাচ্চাদের তো চেনা যায় না । জনগনের মধ্যে পাত্তা পাচ্ছে না তাই এবার বাঙালির আবেগের জায়গাগুলোকে নিয়ে সংগঠনের চেষ্টা চালাচ্ছে । কিন্তু হায় রে স্বপনভ্রম । রয়টার্স নবান্ন হয়ে গেছে । সে পরিবর্তন আর হবে না কমরেড । আমি এবার তৃণমূলকে ভোট দেব । আর এর কারণ এই যে আমি জানি ও এদের দেখে বুঝেছি এরপর যদি আবার সিপিএম আসে তবে তা আমাদের মত সাধারণ নাগরিকের পক্ষে ভয়ংকর হয়ে যাবে । 

গতকাল লালবাজার অভিযানে সিপিএম এর মাথা ফাটিয়েছে পুলিশ । বেশ করেছে । সিপিএম এর মত তো ক্যাডারদের পুলিশ সাজিয়ে মারতে নামায়নি তৃণমূল । আসল পুলিশিই মেরেছে । এদের প্রবঞ্চনা নেই । এরা মুখের ওপর নিজেদের পরিচয় দিয়ে কাজ করে । আর সিপিএম রাতের অন্ধকারে গাদা গাদা লাশ মাটির তলায় ভরে দেয় । মানুষ জাস্ট ভ্যানিস হয়ে যায় । আমরা কি জানি না সন্ত্রাসবাদীদের কীভাবে সিপিএম ডিওয়াইএফআই এর মেম্বার করেছিল । আমরা সকলে সে ইতিহাসের সাক্ষী । সিপিএম কীভাবে বরাহনগর ও মরিচঝাঁপি ঘটিয়েছিল, আমাদের সব মনে আছে, সব ।
হায় রে ! এই সব ক্যাডারদের দেখলে আজ করুণা হয় । সিপিএম এর ছাতা ফেটে যাওয়ায় এদের এখন আমার কেসি পালের ছাতার দরকার হল । একসময় যেমন আমাদের অনেকের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও ফেল করা লোক যাদবপুরের রেজিস্টার হয়েছিল মন্ত্রবলে, আজ আমার গরিবের একটা ছাতার জন্য এত হাহাকার । যাক গে, দিয়ে দিলাম । 

তবে বলি, এ শুধু আমার কথা নয় । হয়তো অনেকের । আর অনেকের মতই আমি একলা থাকলে পাঁঠার সঙ্গে থাকাটা নিরাপদ মনে করব শেয়ালের চাইতে ।  সিপিএম বিদ্বেষেই আমি তৃণমূলের ভোটার ।