কদিন আগে “দৈনিক স্টেটসম্যানে” পড়েছিলাম,
পশ্চিমবঙ্গে বেকারের সংখ্যা নাকি প্রায় ২৩ লক্ষ । অন্যদিকে সরকারি খালি পদের
সংখ্যাও নেহাতই কম নয়, কেবলমাত্র কলেজেই তিনহাজার, স্কুলে ১৫-১৬ হাজার এবং
অন্যান্য ক্ষেত্র তো আছেই যাতে সব মেলালে মোটামুটি বেকারসমস্যা এক আমলেই মেটানো
যায় । তা এ নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে মুলত দুটো ঝোঁক দেখতে পেলাম ।
এক, ক্ষোভের, কীসের ক্ষোভ ? চাকরি না পাওয়ার ক্ষোভ যা পরিবর্তিত হয়েছে
সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত অসহিষ্ণুতায় । অর্থাৎ, রিজারভেশনের বিরুদ্ধে । দুই, হতাশার
। সরকারি চাকরির প্রতি মোহ এবং ব্যার্থতার ফলে উদ্ভুত হতাশা । ফল কম মাইনেতে হলেও
বেসরকারি কোম্পানির প্রতি তীব্র ঝোঁক ও আনুগত্যের মনোভাব ।
একটাও অপ্রত্যাশিত ও অস্বাভাবিক নয় । তা এই দুই
মনোভাবের কারণ কি ? প্রকৃতপক্ষে ধনপতি শ্রেণিগুলির (অর্থাৎ, রিলায়েন্স, টাটা,
বিড়লা ও ইত্যাদি)সঙ্গে আঁতাতে থাকা রাষ্ট্রযন্ত্র(অর্থাৎ, বিজেপি, কংগ্রেস, সিপিএম
ইত্যাদি পরিচালিত) একদিকে বেকারের সংখ্যা বাড়াচ্ছে যাতে বেসরকারি ক্ষেত্রে কম
মাইনেতে বেশি শ্রম আদায় করার সম্ভবনা বৃদ্ধি হয় ও ধনপতিদের মুনাফা বেড়েই চলে । এখানে
আমি বেকারশ্রেণিদের মার্ক্সবাদীদের শোষণ – শোষিত থিওরি বলছি না, কেননা জানি তা কেউ
শুনতেই চাইবে না । এর কারণ এই যে, ক্ষুধা জিইয়ে রাখার বর্তমান ব্যবস্থায় মানুষ
তারই দাস যে অন্তত একমুঠো ভাত তুলে দিচ্ছে, তাদের নয় যারা খালি পেটে আত্মত্যাগের
কথা প্রচার করছে । কিন্তু, যদি কেউ কাওকে সরাসরি বলে যে তোমায় এই অ্যাত্তো টাকা
দিলাম, নিজেকে আমার কাছে বেচে দাও । আজকের দিনে সে কথা কেউ মানবে না । ফলে এরকম
ঘুরিয়ে নাক দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে একথা তো ঠিক । এতে কেউ বুঝতেই পারে না যে
সে কবেই ধনপতিদের কাছে নিজেকে বেচে দিয়েছে । অন্যদিকে সরকার পক্ষ নিয়োগের এমন
বন্দোবস্ত করেছে যাতে লোকে এসব নিয়ে ভাবার ও বোঝার সামান্য অবকাশও না পায়, আর
পেলেও সে চিন্তা যেন ব্যর্থতায় পরিপূর্ণ হতাশাগ্রস্থ মানুষের সাম্প্রদায়িক
দোষারোপের মধ্যেই নিয়োজিত থাকে কিম্বা চিকনি চামেলির ফও্যা তো আছেই । এ পদ্ধতির
অবশ্যম্ভাবী ফল হল ভোটের রাজনীতিতে ধনপতি শ্রেণির মুনাফার জোর ও সমর্থনে একবার
বিজেপি আর একবার কংগ্রেসের ক্ষমতায় আসা-যাওয়ার নিশ্চিতকরণ এবং অন্যদিকে ধনপতিদের
নির্বিঘ্নে মুনাফাবৃদ্ধির হার বাড়ানো। আর জনগণ বাধ্য হনুমানের সামনে কলা ধরে রেখে
তার আচরণ নিয়ন্ত্রনের ম্যাজিকস্টিকের বাধ্যতার মত । না আমাদের দেশে তো সে শিক্ষাও
নেই যা মানুষকে চিন্তায় স্বাধীন ও চরিত্রে আপোষহীন করবে । আর স্বাভাবিক কারণে সে
শিক্ষাও এ রাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রত্যাশাও করা যায় না ।
ফলে রাষ্ট্রযন্ত্র যেমন টিকে আছে ধনপতিদের
মুনাফার ভিত্তিতে তেমনই ধনপতি শ্রেণি টিকে আছে রাষ্ট্রযন্ত্রের অস্তিত্বে । তাই
বেকার সমস্যা মিটলে দুটোই বিপদে পড়ে যাবে । আর এখন কেইবা লাইফ ইনস্যুরেন্স, গাড়ি
বাড়ি করে বছরে একবার আন্দামানে কিম্বা বিদেশে ঘুরতে যাবার বাসনা ত্যাগ করে খালিপেটে
আন্দোলনে মার খেতে নামবে । তার চেয়ে বাবা যেখানে ৫০হাজারের খাটনিতে ১০হাজার পাওয়া
যায় সেই ভাল, যেখানে ৫০হাজারের খাটনি খেটে পুলিশের ও গুন্ডাচক্রের লাথি-লাঠি-গুলি খেতে
হবে ।
অথচ এও তো ঠিক আজকের সামান্য আত্মত্যাগের ভীতি
আমাদের পৌঁছে দিচ্ছে আরও কঠিন দাসত্বের শৃঙ্খলে ।

No comments:
Post a Comment
I am waiting for your valuable comment. Please comment. Thank you..