ভারতবর্ষ এক
বিচিত্র দেশ । ভিন্নতার ঐতিহ্যের কথা মানা গেলেও তাদের একীভূত হবার প্রসঙ্গ
নিতান্তই আবেগপ্রসূত কাহিনী ব্যতীত কিছুই নয় । এদেশে হাজার রকমের রাজনীতি যেমন আছে
তেমন আছে ধর্মের চোরাগলিও । গলির আনাচে কানাচে যেমন গড়ে উঠেছে সহস্র দল উপদল তেমনী
আছে তাদের মধ্যে কোন্দল । ধর্মের ক্ষেত্রেও তেমনী আছে নানা শ্রেনী (শৈব , শাক্ত ,
সিয়া , সুন্নি ইত্যাদি) এবং তাদের মধ্যে আছে শ্রেনীসংঘাত । এক থেকে বহুতে গতিশীল
শক্তির অজস্র উদাহরণ পাওয়া গেলেও বহু থেকে একে আসার কোনও নজির খুঁজে পাওয়া
আয়াসসাধ্য নয় – হয়তো কোনও ইতিহাসেই নয় । এদেশে রাজনৈতিক খুনের মাত্রা বেড়ে গেলে
তাকে মতাদর্শগত লড়াই বলে চালানো যায় এবং তার সপক্ষে নানা যুক্তিও তোলা হয় কিন্তু ধর্মের
নামে কোনও লড়াইকে সহ্য করা হয় না সাম্প্রদায়িক আখ্যা দিয়ে । এদেশে গান্ধী লেনিন
নিয়ে মারামারি করা আইনসিদ্ধ সংস্কৃতি হলেও হিন্দু মুসলমান মারামারি বেআইনি সংস্কৃতি
বলেই মনে করা হয় ।
ইদানীং মোদী
সরকারে আসার আগে থেকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রতিভূ রূপে মোদীকে প্রতিষ্ঠা করে
দেওয়া হয়েছিল । এ আমাদের প্রচলিত রীতি , সাম্প্রদায়িক খুনের মধ্যে তৃতীয় শক্তিকে
দায়ী করার প্রবণতা । কিন্তু আমি এখানে দেখাতে চাই কোথা থেকে আসে এই তৃতীয় শক্তি ?
এখন হিন্দু বাঙালী মধ্যে একটা কথার প্রচলন হয়েছে , এই আমলে মুসলিমদের দাপট কিরকম
বেড়েছে দেখেছ , এত আর মানা যায় না । এটাকে ভোটের রাজনীতি বলা হয় কিন্তু আমি সেই
প্রসঙ্গে না গিয়ে দেখাব এই রাজনীতির মূল জন্মসূত্র ।
জাগতিক
নিয়মানুসারে স্বাতন্ত্রবোধ সকল ব্যক্তিমানুষের মধ্যেই থাকে । একারনেই আমরা
ছেলেবেলায় বাবা মা’র গন্ডির মধ্যে থাকলেও পরবর্তী জীবনে সে গন্ডি ছেড়ে আপন মতের
অন্য গন্ডিতে গিয়ে মিশি । এক আদর্শ থেকে অন্য আদর্শে গিয়ে আত্মসমর্পন করি । এভাবেই
ব্যক্তিস্বাধীনতায় কেউ হস্তক্ষেপ করতে এলে আমরা সরব হয়ে উঠি । একটা
চলতি উদাহরন দেওয়া যায় – এখন যেমন ভাই ভাই বড় হলে আলাদা হয়ে যায় । আমরা সাধারনত
বাড়ির বৌ কে এজন্য দায়ী করি কিন্তু ভাইদের নিজেদের মধ্যে যদি স্বাতন্ত্রভোগের
ইচ্ছে না থাকত তাহলে কি বাড়ির বৌদের পক্ষে একাজ সম্ভব হত ? ঠিক একই কথা
এক্ষেত্রেও প্রযোজ্য কিন্তু এ স্বাতন্ত্রবোধ কোনও ব্যক্তিমানুষের নয় – দুটি বৃহৎ সম্প্রদায়ের – হিন্দু ও মুসলমানের । আজকাল
চাকরিক্ষেত্রে ও অন্যান্য স্থানে মুসলিমদের সংরক্ষনের ব্যবস্থা হয়েছে । কিন্তু
প্রশ্নটা হল সংরক্ষন কাদের করা হয় ? সাধারনত লুপ্তপ্রায় প্রজাতির । কিন্তু
মুসলিমরা কি সত্যিই লুপ্তপ্রায় ? এ নিয়ে মুসলিমদের অভ্যন্তরে যারা যথাযোগ্য গুনী
এবং মেধার অধিকারী তাদের মধ্যে অপমানের বোধ কাজ করছে আর অন্যদিকে হিন্দুদের মধ্যে
যারা মেধার যথার্থ অধিকারী নয় (বেশীরভাগের কথা বলা হচ্ছে তবে অনেক ক্ষেত্রে এই
ব্যবস্থার ফলে যোগ্য লোকেরাও বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন) তাদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি
হচ্ছে । যদি রাজনৈতিকেরা হিন্দু মুসলমানে মিলনের জন্য সত্যিই আগ্রহী হন তবে কেন
স্কুল কলেজে রামায়ন মহাভারতের কাহিনীর সঙ্গে কোরানের কাহিনীও লিপিবদ্ধ হচ্ছে না
কিংবা সাধারন বৌদ্ধিক উদার শিল্পী মণ্ডলী যারা এ নিয়ে সরব তাঁরা কেন সিরিয়াল বা
সিনেমায় মুসলমানদিগের সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করছেন না । আসলে তৃতীয় শক্তি নয়
সাম্প্রদায়ীকতা আমাদের নিজেদের মধ্যেই আছে এবং তা আছে আমাদের ধর্মের নিয়মানুসারে ।
হিন্দু মুসলমানের শাস্ত্রীয় রীতিমতে আমরা একধারে যেমন নিজেদের জাতি সম্পর্কে
অতিবেশী সজ্ঞান তেমনী অপরের বেলায় অসহিষনু । আমরা কেউ গায়ে পড়ে একে অপরকে অপমান
করি না ঠিকই কিন্তু আমাদের ব্যবহার ও রীতি যা আছে তা অপরকে অপমান করার জন্য যথেষ্ট
। আমরা মুসলমানকে নোংরা ও বর্বর বলে ধারনা করে এমন এক ভন্ডামীপূর্ণ ভদ্রতা রক্ষা
করে চলি যে তা যেকোনো মানুষের পক্ষে উপলব্ধি করা কঠীন নয় । আর মুসলমানের সেই একই আক্রমন
ঘটায় অন্য ধর্মবিশ্বাসের প্রতি । আমাদের টা পরোক্ষ হলে ওদের টা প্রত্যক্ষ কিন্তু
বিরোধ যে আছে তাই আসল কথা । আসলে শাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী মুসলিমদের কাছে এ জগত
দুটি ভাগে বিভক্ত – এক , দার অল ইসলাম মানে ইসলামের দেশ আর দুই , দার অল হরব অর্থাৎ যুদ্ধের দেশ যেখানে যুদ্ধ করে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে
হবে । এবং যতদিন না দার অল হরব দার অল ইসলামে পরিণত হচ্ছে ততদিন যুদ্ধ চালাতে হবে
, এর নাম ওদের মতে জিহাদ । এ কিছুটা কমিউনিস্টদের
মত ব্যাপার – বুর্জোয়া আর প্রলেতারিয়েত এবং যুদ্ধের নাম শ্রেনীসংগ্রাম । সুতরাং
মুসলিমদের মধ্যে রয়েছে যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাতন্ত্র হবার দৃষ্টান্ত । ফলে তদের
অপরের প্রতি হামলা চালানোর কারনের কথা বোঝা যায় । কিন্তু বর্তমানে এদেশে সে কারনে
জাতিদাঙ্গা হয় না , হয় সেখান থেকে উদ্ভূত এক অন্য স্বতন্ত্রবোধের রক্ষার স্পৃহা
থেকে কেননা এদেশে হিন্দু বৃহত্তর গোষ্ঠী , ফলে মুসলিমদের দ্বিতীয় শ্রেনীর নাগরিক
করে রাখার মাধ্যমে তাদের স্বাতন্ত্রবোধে বাধা দেওয়া হয় । হিন্দুদের মধ্যে একই
আঙ্গিকে ক্ষমতা দখল না হলেও হিন্দুত্ব রক্ষা করার জন্য ও রামরাজত্ব প্রতিষ্ঠার
জন্য এই যুদ্ধে অবতীর্ন হতে দেখা যায় । এই লড়াই যার নাম আমরা দিয়েছি সাম্প্রদায়িক
দাঙ্গা তা শুরু হয়েছিল বহু আগে (ইতিহাসের বর্ণনা এখানে করা সম্ভব নয়) । ইংরেজ
আমলেও এ দৃষ্টান্ত আছে তখন আমরা ইংরেজদের দায়ী করেছিলাম । কিন্তু সেই সময় থেকে
আজকে তা অনেক কমে এসেছে । এর কারণ এই নয় যে আমরা উদার হয়েছি কিংবা আমরা বুঝতে শিখে
গেছি । আসলে সমাজ কিংবা ধর্মবিপ্লবের শুরুতে যে ধরনের উগ্রতা থাকে তা চিরকাল থাকে
না । যেমন কমিউনিস্ট সমাজতন্ত্রের বিপ্লব সংগঠিত করা নিয়ে সেই উৎসাহ আজ আর কারও
নেই , যাদের আছে তাঁরা হতাশা ছাড়া কিছুই পাচ্ছে না আর পাবেও না । তেমনী হিন্দু
মুসলিম দ্বন্দ্বের থেকে সৌহার্দ্য এখন বেশী দেখা যাচ্ছে । কিন্তু একইসঙ্গে এও ঠিক
যে বিরোধ যা ছিল তা আজও আছে কিন্তু তা প্রচ্ছন্ন হয়ে গেছে । কিন্তু এই বিরোধ
কিছুটা ছাই চাপা আগুনের মত । সামান্য ফু দিলেই জ্বলে ওঠে । আর সে কথা মোদী ও মমতা
দুজনেই জানেন । তাই কখন ফু দিতে হবে আর কখন ছাই আড়াল করতে হবে তা এরা বিচার করেই
ব্যবহার করে । তাই কি সাম্প্রদায়িকতার জন্য আমরা এদের দায়ী করতে পারি ? পারি না ।
আসলে সে বীজ রয়েছে আমাদের অভ্যন্তরে । সেটাকে উৎখাত না করে তৃতীয় শক্তি নিয়ে মাতামাতি করা বুদ্ধিমানের পরিচয়
নয় । ধর্ম যেখানে সাম্প্রদায়ীকতার মালিক সেখানে মালীর উৎখাতের চেয়ে জরুরি মালিকের উৎখাত । আমরা এখন ভিতর থেকে গান্ধী হয়েছি আর বাইরে থেকে লেনিন কিন্তু
ভারতীয় কেউ হইনি । আর জাতিবৈশিষ্ঠ্যের ইতিহাস বলছে হিন্দু মুসলিম ঐক্য যেমন সম্ভব
নয় তেমনী আমাদের পক্ষে ভারতীয় হওয়াও অসম্ভব কারণ ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবোধ আমাদের তা
হতে দেয় না আর একে অনুমোদন করানোর যুক্তি আমরা খুঁজি ভারতীয় সংস্কৃতি ঐতিহ্য ও
ধর্মের মধ্যে । ফলে লড়াই হচ্ছে এবং হবেও যতদিন না আমরা স্বাতন্ত্র রক্ষার জন্য ঐ
ভ্রান্ত যুক্তির আশ্রয় ত্যাগ করব আর সে সুযোগ যুগে যুগে নেবে মোদী কিংবা অন্য কেউ
।