Saturday, 31 May 2014

এদেশে গান্ধী লেনিন মারামারি আইনসিদ্ধ কিন্তু হিন্দু মুসলমান নয় ...



ভারতবর্ষ এক বিচিত্র দেশ । ভিন্নতার ঐতিহ্যের কথা মানা গেলেও তাদের একীভূত হবার প্রসঙ্গ নিতান্তই আবেগপ্রসূত কাহিনী ব্যতীত কিছুই নয় । এদেশে হাজার রকমের রাজনীতি যেমন আছে তেমন আছে ধর্মের চোরাগলিও । গলির আনাচে কানাচে যেমন গড়ে উঠেছে সহস্র দল উপদল তেমনী আছে তাদের মধ্যে কোন্দল । ধর্মের ক্ষেত্রেও তেমনী আছে নানা শ্রেনী (শৈব , শাক্ত , সিয়া , সুন্নি ইত্যাদি) এবং তাদের মধ্যে আছে শ্রেনীসংঘাত । এক থেকে বহুতে গতিশীল শক্তির অজস্র উদাহরণ পাওয়া গেলেও বহু থেকে একে আসার কোনও নজির খুঁজে পাওয়া আয়াসসাধ্য নয় – হয়তো কোনও ইতিহাসেই নয় । এদেশে রাজনৈতিক খুনের মাত্রা বেড়ে গেলে তাকে মতাদর্শগত লড়াই বলে চালানো যায় এবং তার সপক্ষে নানা যুক্তিও তোলা হয় কিন্তু ধর্মের নামে কোনও লড়াইকে সহ্য করা হয় না সাম্প্রদায়িক আখ্যা দিয়ে । এদেশে গান্ধী লেনিন নিয়ে মারামারি করা আইনসিদ্ধ সংস্কৃতি হলেও হিন্দু মুসলমান মারামারি বেআইনি সংস্কৃতি বলেই মনে করা হয় ।  
 
ইদানীং মোদী সরকারে আসার আগে থেকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রতিভূ রূপে মোদীকে প্রতিষ্ঠা করে দেওয়া হয়েছিল । এ আমাদের প্রচলিত রীতি , সাম্প্রদায়িক খুনের মধ্যে তৃতীয় শক্তিকে দায়ী করার প্রবণতা । কিন্তু আমি এখানে দেখাতে চাই কোথা থেকে আসে এই তৃতীয় শক্তি ? এখন হিন্দু বাঙালী মধ্যে একটা কথার প্রচলন হয়েছে , এই আমলে মুসলিমদের দাপট কিরকম বেড়েছে দেখেছ , এত আর মানা যায় না । এটাকে ভোটের রাজনীতি বলা হয় কিন্তু আমি সেই প্রসঙ্গে না গিয়ে দেখাব এই রাজনীতির মূল জন্মসূত্র । 

জাগতিক নিয়মানুসারে স্বাতন্ত্রবোধ সকল ব্যক্তিমানুষের মধ্যেই থাকে । একারনেই আমরা ছেলেবেলায় বাবা মা’র গন্ডির মধ্যে থাকলেও পরবর্তী জীবনে সে গন্ডি ছেড়ে আপন মতের অন্য গন্ডিতে গিয়ে মিশি । এক আদর্শ থেকে অন্য আদর্শে গিয়ে আত্মসমর্পন করি । এভাবেই ব্যক্তিস্বাধীনতায় কেউ হস্তক্ষেপ করতে এলে আমরা সরব হয়ে উঠি । একটা চলতি উদাহরন দেওয়া যায় – এখন যেমন ভাই ভাই বড় হলে আলাদা হয়ে যায় । আমরা সাধারনত বাড়ির বৌ কে এজন্য দায়ী করি কিন্তু ভাইদের নিজেদের মধ্যে যদি স্বাতন্ত্রভোগের ইচ্ছে না থাকত তাহলে কি বাড়ির বৌদের পক্ষে একাজ সম্ভব হত ? ঠিক একই কথা এক্ষেত্রেও প্রযোজ্য কিন্তু এ স্বাতন্ত্রবোধ কোনও ব্যক্তিমানুষের নয় – দুটি বৃহ সম্প্রদায়ের – হিন্দু ও মুসলমানের । আজকাল চাকরিক্ষেত্রে ও অন্যান্য স্থানে মুসলিমদের সংরক্ষনের ব্যবস্থা হয়েছে । কিন্তু প্রশ্নটা হল সংরক্ষন কাদের করা হয় ? সাধারনত লুপ্তপ্রায় প্রজাতির । কিন্তু মুসলিমরা কি সত্যিই লুপ্তপ্রায় ? এ নিয়ে মুসলিমদের অভ্যন্তরে যারা যথাযোগ্য গুনী এবং মেধার অধিকারী তাদের মধ্যে অপমানের বোধ কাজ করছে আর অন্যদিকে হিন্দুদের মধ্যে যারা মেধার যথার্থ অধিকারী নয় (বেশীরভাগের কথা বলা হচ্ছে তবে অনেক ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থার ফলে যোগ্য লোকেরাও বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন) তাদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হচ্ছে । যদি রাজনৈতিকেরা হিন্দু মুসলমানে মিলনের জন্য সত্যিই আগ্রহী হন তবে কেন স্কুল কলেজে রামায়ন মহাভারতের কাহিনীর সঙ্গে কোরানের কাহিনীও লিপিবদ্ধ হচ্ছে না কিংবা সাধারন বৌদ্ধিক উদার শিল্পী মণ্ডলী যারা এ নিয়ে সরব তাঁরা কেন সিরিয়াল বা সিনেমায় মুসলমানদিগের সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করছেন না । আসলে তৃতীয় শক্তি নয় সাম্প্রদায়ীকতা আমাদের নিজেদের মধ্যেই আছে এবং তা আছে আমাদের ধর্মের নিয়মানুসারে । হিন্দু মুসলমানের শাস্ত্রীয় রীতিমতে আমরা একধারে যেমন নিজেদের জাতি সম্পর্কে অতিবেশী সজ্ঞান তেমনী অপরের বেলায় অসহিষনু । আমরা কেউ গায়ে পড়ে একে অপরকে অপমান করি না ঠিকই কিন্তু আমাদের ব্যবহার ও রীতি যা আছে তা অপরকে অপমান করার জন্য যথেষ্ট । আমরা মুসলমানকে নোংরা ও বর্বর বলে ধারনা করে এমন এক ভন্ডামীপূর্ণ ভদ্রতা রক্ষা করে চলি যে তা যেকোনো মানুষের পক্ষে উপলব্ধি করা কঠীন নয় । আর মুসলমানের সেই একই আক্রমন ঘটায় অন্য ধর্মবিশ্বাসের প্রতি । আমাদের টা পরোক্ষ হলে ওদের টা প্রত্যক্ষ কিন্তু বিরোধ যে আছে তাই আসল কথা । আসলে শাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী মুসলিমদের কাছে এ জগত দুটি ভাগে বিভক্ত – এক , দার অল ইসলাম মানে ইসলামের দেশ আর দুই , দার অল হরব অর্থা যুদ্ধের দেশ যেখানে যুদ্ধ করে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে হবে । এবং যতদিন না দার অল হরব দার অল ইসলামে পরিণত হচ্ছে ততদিন যুদ্ধ চালাতে হবে , এর নাম ওদের মতে জিহাদ । এ কিছুটা কমিউনিস্টদের মত ব্যাপার – বুর্জোয়া আর প্রলেতারিয়েত এবং যুদ্ধের নাম শ্রেনীসংগ্রাম । সুতরাং মুসলিমদের মধ্যে রয়েছে যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাতন্ত্র হবার দৃষ্টান্ত । ফলে তদের অপরের প্রতি হামলা চালানোর কারনের কথা বোঝা যায় । কিন্তু বর্তমানে এদেশে সে কারনে জাতিদাঙ্গা হয় না , হয় সেখান থেকে উদ্ভূত এক অন্য স্বতন্ত্রবোধের রক্ষার স্পৃহা থেকে কেননা এদেশে হিন্দু বৃহত্তর গোষ্ঠী , ফলে মুসলিমদের দ্বিতীয় শ্রেনীর নাগরিক করে রাখার মাধ্যমে তাদের স্বাতন্ত্রবোধে বাধা দেওয়া হয় । হিন্দুদের মধ্যে একই আঙ্গিকে ক্ষমতা দখল না হলেও হিন্দুত্ব রক্ষা করার জন্য ও রামরাজত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য এই যুদ্ধে অবতীর্ন হতে দেখা যায় । এই লড়াই যার নাম আমরা দিয়েছি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা তা শুরু হয়েছিল বহু আগে (ইতিহাসের বর্ণনা এখানে করা সম্ভব নয়) । ইংরেজ আমলেও এ দৃষ্টান্ত আছে তখন আমরা ইংরেজদের দায়ী করেছিলাম । কিন্তু সেই সময় থেকে আজকে তা অনেক কমে এসেছে । এর কারণ এই নয় যে আমরা উদার হয়েছি কিংবা আমরা বুঝতে শিখে গেছি । আসলে সমাজ কিংবা ধর্মবিপ্লবের শুরুতে যে ধরনের উগ্রতা থাকে তা চিরকাল থাকে না । যেমন কমিউনিস্ট সমাজতন্ত্রের বিপ্লব সংগঠিত করা নিয়ে সেই উসাহ আজ আর কারও নেই , যাদের আছে তাঁরা হতাশা ছাড়া কিছুই পাচ্ছে না আর পাবেও না । তেমনী হিন্দু মুসলিম দ্বন্দ্বের থেকে সৌহার্দ্য এখন বেশী দেখা যাচ্ছে । কিন্তু একইসঙ্গে এও ঠিক যে বিরোধ যা ছিল তা আজও আছে কিন্তু তা প্রচ্ছন্ন হয়ে গেছে । কিন্তু এই বিরোধ কিছুটা ছাই চাপা আগুনের মত । সামান্য ফু দিলেই জ্বলে ওঠে । আর সে কথা মোদী ও মমতা দুজনেই জানেন । তাই কখন ফু দিতে হবে আর কখন ছাই আড়াল করতে হবে তা এরা বিচার করেই ব্যবহার করে । তাই কি সাম্প্রদায়িকতার জন্য আমরা এদের দায়ী করতে পারি ? পারি না । আসলে সে বীজ রয়েছে আমাদের অভ্যন্তরে । সেটাকে উখাত না করে তৃতীয় শক্তি নিয়ে মাতামাতি করা বুদ্ধিমানের পরিচয় নয় । ধর্ম যেখানে সাম্প্রদায়ীকতার মালিক সেখানে মালীর উখাতের চেয়ে জরুরি মালিকের উখাত । আমরা এখন ভিতর থেকে গান্ধী হয়েছি আর বাইরে থেকে লেনিন কিন্তু ভারতীয় কেউ হইনি । আর জাতিবৈশিষ্ঠ্যের ইতিহাস বলছে হিন্দু মুসলিম ঐক্য যেমন সম্ভব নয় তেমনী আমাদের পক্ষে ভারতীয় হওয়াও অসম্ভব কারণ ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবোধ আমাদের তা হতে দেয় না আর একে অনুমোদন করানোর যুক্তি আমরা খুঁজি ভারতীয় সংস্কৃতি ঐতিহ্য ও ধর্মের মধ্যে । ফলে লড়াই হচ্ছে এবং হবেও যতদিন না আমরা স্বাতন্ত্র রক্ষার জন্য ঐ ভ্রান্ত যুক্তির আশ্রয় ত্যাগ করব আর সে সুযোগ যুগে যুগে নেবে মোদী কিংবা অন্য কেউ ।

Sunday, 18 May 2014

A sort of spiritual masturbation ...




পৃথিবীর বাধা – এই দেহের ব্যাঘাতে
হৃদয়ে বেদনা জমে ; - স্বপনের হাতে
আমি তাই
আমারে তুলিয়া দিতে চাই !

গতবার ঘাটশিলা ঘুরতে গিয়ে বুরুদিহি থেকে ফেরার পথে এক আদিবাসী রমনীর সঙ্গে বেশ কিছুক্ষন সময় কাটিয়েছিলাম । ওরা রাস্তা তৈরির কাজ করে , আমাদের সভ্যতার রথ চলবার পথ । কিন্তু তারপর কেউ কি ওদের মনে রাখে , কেউ রেখেছে কোনোদিন । না ! রাখেনি , আর রাখবেও না । তাই আমি একটা ছবি তুলিয়েছিলাম রাজেন্দ্রকে দিয়ে । তারপর ঐ রমনীকে বলেছিলাম শহরে গেছো কখনও , একদিন এসে দেখে যাও আমাদের জায়গা । ও কেমন একটা মুখ করে বলেছিল , “ও তুদের শহর উখানে যাব লাই । উখানে আকাশ লাই মাটি লাই গাছ লাই কিবল পাথুর আছে , উখানে যাব লাই , উখানে গেলে বুকে বড় বিথা হয় ” । তোলা ছবিটা আমার গালে সপাট থাপ্পরের মত বেজেছিল । কয়েকমাস আগে এই ব্লগেই লিখেছিলাম বিচ্ছিন্নতার কথা অনেক বড় বড় বুকনির মিশেল দিয়ে অথচ সেই তত্বগত শর্তে না গিয়েও সত্যটা কত সহজে আমাকে জানিয়ে দিল ঐ মেয়ে । একটা ধাক্কা , সত্যিই তো কি আছে আমাদের শহরে ?

আছে আছে সব আছে । মোটর ট্র্যাক বাস আছে , ইট কাঠ পাথর কংক্রিটের দালান আছে , পলিস রাস্তাঘাট আছে , সিনেমাহল খেলার মাঠ রাস্তাঘাটে দূর্ঘটনা আছে , দাঙ্গা স্ট্রাইক মারামারি আছে , রেসের ময়দান আছে , মেলা বারোয়ারি পূজার হট্টগোল আছে , ক্লাব হোটেলে মদ আছে , বাজারে বাসে ট্রামে ভিড়ের সঙ্গে তর্কাতর্কি আছে , সব আছে । ‘দেবালয় থেকে বিদ্যালয় , বিদ্যালয় থেকে বিধানসভা  , বিধানসভা থেকে কর্পোরেশন , কর্পোরেশন থেকে স্থানীয় অ্যাসোসিয়েশন ও বিদ্বতসভা আছে’ , খবরের কাগজ আছে , বাস পোড়ানো  থেকে ময়নাতদন্তের দিস্তে দিস্তে কাগজ আছে , মন্ত্রীদের কারচুপি আছে , অভ্যস্ত রোম্যান্সের জন্য ভিক্টোরিয়া হোটেল মোটেল প্রিন্সেপের নৌকা আছে , গাদা গাদা লোকের শুয়ে থাকার ফুটপাথ আছে , পুলিশের ঘুষ আছে , মানুষের সঙ্গে কথা বলার ফোন আছে ফেসবুক আছে ইত্যাদি সব আছে । তাহলে ও মিথ্যেই বলেছিল ।

কিন্তু এখানে কেবল একটা জিনিস নেই । শুধু মাত্র মানুষ নেই , যারা আছে তারা প্লাস্টিকের চাবি দেওয়া যন্ত্র । সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে ব্যাগ হাতে ব্যাস্ততা দিয়ে শুরু করে আর তারপর তা শেষ হয় পরদিন ব্যাস্ততার জন্য রিচার্জের বিছানায় । মাঝখানে পড়ে থাকে অ্যাকসিডেন্টে আহত মানুষের দেহ অথচ তাকে দেখার সময় আমাদের নেই । আজ থেকে বহু বছর পর যখন আমরা মহেঞ্জদড়ো হয়ে যাব সেদিনের ঐতিহাসিক কি বলে ডাকবে আমাদের ? একটি একাকিত্বের সভ্যতার যুগের মানুষ । আসলে আমাদের মন নেই আর হৃদয় হয়েছে পরিত্যক্ত । আমরা সব কিছুই নিই কিন্তু গ্রহন করি না । আমরা মেনে নিতে শিখে গেছি । যা কিছু আমাদের পাবার কথা ছিল আজ সেইসব না পেয়েও মানিয়ে নিতে শিখে গেছি । না হলেও চলবে এমন একটা অবস্থা । ভাসিয়ে রেখেছি নিজেদের এক নোংরা বিলাসিতার ককটেলে । কোনোদিন হয়তো অক্সিজেন না হলেও চলে যাবে । অনুভূতি নেই , স্নায়ুগুলো ট্রাফিকের ধাক্কায় অচল হয়ে গেছে । নইলে আজকের খবরের ইস্যু নিয়ে তুমুল ঢেউ উঠলেও কিকরে তার সমাধান হবার আগেই আমরা তাকে কাল ভুলে যাই , আর এভাবে ভুলে যেতে যেতে অপরাধের পাহাড় জমে গেছে । নেশখোর যখন সব কিছুকেই সহ্য করতে শিখে ফেলে তখন তাকে সাপের বিষ নিতে হয় । আমাদের দশাও তাই । একটা আকাশ ছাড়া উদ্ভিদ ছাড়া বৃষ্টিতে অকারন মাঠের ওপর শুয়ে থাকা ছাড়া সখ্যতা ভালবাসা ছাড়া বন্ধুত্ব ছাড়া প্রেম ছাড়া আমরা বাঁচতে শিখে গেছি তাই আমরা আর বেঁচে নেই । তাই সন্ধ্যেবেলা অবকাশ হয়েছে মদ আর ক্লাবে মেয়েদের নাচানাচি কিংবা সিরিয়ালের বাসি কন্ডমে মুখ গুজে পড়ে থাকা । কোথাও নারী নেই পুরুষ নেই । সব্বাই ওয়েদারপ্রুফ , টাচপ্রুফ ও বিকর্ষক । স্টিম রোলারে পিষ্ট রক্তমাংসের ডেলা । আকাশ ঢেকে গেছে তারে , বাতাসে মিশেছে পেট্রলের ধোঁয়া , উদ্ভিদ হয়েছে টবে বদ্ধ । সকাল থেকে রাত অব্দি পায়ের তলায় আমরা মাটি ছোঁয়াই না , মুখ তুলে দেখিনা ভোরের সূর্য , প্রেমিকার হাত ধরে বলতে পারি না ভালবাসি , বন্ধুর বাড়িতে আচমকা চলে যাবার আগে ফোনে খবর দিতে হয় । তাহলে বলুন তো কিকরে উদার হব আমরা । কিকরে বেঁচে থাকব ? 

একটি অতিকায়ত্ব ও শক্তির ঔদ্ধত্য , স্থূলত্ব জড়পিন্ডত্ব নিয়েই আমাদের মুখ গুজে পড়ে থাকা । এই গনতন্ত্রে অপরাধীরা রেস্পেক্টিবল আর রেস্পেক্টিবলরাও অপরাধ করতে কুন্ঠিত নয় । অথচ কেউ কোনও কথা বলছি না । তাহলে কোন দলবদ্ধ অভ্যর্থনায় ঐ আদিবাসীনিকে আসতে বলি এখানে , তার চেয়ে বরং আমার ওখানে চলে যাওয়া ভাল । এই সভ্যতা আমার মাকে হত্যা করতে শেখায় এই সভ্যতা আমার বোনের ওপর হওয়া ধর্ষন কে ধামাচাপা দিতে শেখায় এই সভ্যতা উদব্যাস্ত করে বিশ্বব্যাপি পাগলাগারদকে মস্তিষ্কে ধারন করার জন্যে । আগেকার দিনেও সমাজে দৈত্য ছিল এখনও আছে কিন্তু তখন দৈত্যদেরও সমাজচেতনা আর একটা সামান্য হলেও মন ছিল কিন্তু এখন সব মানুষের কথা হল ‘সব ওলট পালট করে দাও , লুটে পুটে খাই।’ কিন্তু কজন আর লুটে পুটে খাচ্ছে , অথচ যে কজন খাচ্ছে তাদের দেখেই আমরা অস ধান্দাবাজ ভন্ড জোচ্চোর হচ্ছি এই আশায় যে আমরাও লুটে পুটে খেতে পারব আর সেই প্রভাবে গোটা সমাজ ব্যাধিগ্রস্ত । অবস্থার মানুষের দাস হবার কথা ছিল , সেজন্যই এত প্রযুক্তি , কিন্তু দেখো মানুষই অবস্থার দাস হয়ে গেছে । উফঃ আর তো পারা যাচ্ছে না । এর নাম যদি নাগরিক সভ্যতা হয় তাহলে অসভ্যতা কি ঐ আদিবাসী রমণীর খোলা বুকের মধ্যে রয়েছে ? 

এলিয়ট ঠিকই বলেছিলেন ,

Yet we have gone on living
Living and partly living .

Thursday, 8 May 2014

২৫ শে বৈশাখ সংস্কৃতির ঢাক তেরেকেটে তাক তাক দমাদম দমাদম কৃষ্টি ভীষণ ...






১৯৩০ সালে ২৫ শে অক্টোবর একটি চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ জানান ,

“আমার মৃত্যুর পর দেশের লোক আমার স্মৃতি নিয়ে যেন শোকসভা সৃষ্টির বিড়ম্বনা না করে । বেঁচে থাকতে আমি যার কাছে যা পেয়েছি তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ । একেবারে কিছু পাইনি একথা বলা অন্যায় । কিন্তু যারা দেবার মত জিনিস দিয়েছে তারা ডেকে সভা করবে না । যারা কিছুই করেনি তারা সভা করবে । যারা গাল দিয়েছে তারা হাততালি দেবে । এটা কোনোমতে যাতে না হয় , এই আমার একান্ত কামনা । আমার শ্রাদ্ধ যেন ছাতিম গাছের তলায় বিনা আড়ম্বরে বিনা জনতায় হয় ।”

সত্যিই এখন তাঁর শ্রাদ্ধই হচ্ছে বটে । ২৫ শে বৈশাখের প্রাকমূহূর্তে কিছু কথা না লিখে থাকতে পারছিলাম না বলেই এই ব্যর্থ প্রচেষ্টা । কাল আবার সকাল থেকেই বাড়ির চারদিকে ভন্ডামীর পরিবেশ আরও গাঢ় হয়ে উঠবে । যদিও বাঙ্গালীর চরিত্র এই , যার গুনের মহত্ত বুঝতে পারবে না তাকে নিন্দের দ্বারা কন্টকাকীর্ণ করবে কিন্তু পরমূহূর্তে সে যদি কোনও পুরস্কার লাভ করে (যার প্রতি এই বঙ্গসমাজ চিরকালের হ্যাংলা ) সেইমূহূর্ত থেকেই তাঁর ব্যক্তিগত কৃতিত্বকে আপনার সমগ্র জাতির বলে এমন ঢোল ও খোল নিয়ে বেরবে যে কান ঝালাপালা হয়ে যাবে । এখানে আমি রবীন্দ্রনাথ যে কারনে আজ আমাদের দেশে রবীন্দ্রনাথ বলে সম্মান পেয়েছেন সেই বিষয়ের ওপর স্বয়ং তাঁর কিরূপ প্রতিক্রিয়া ছিল সেই নিয়েই আলোচনা করব অর্থা নোবেল পুরস্কার পাওয়া নিয়ে ।

১৯১৩ সালের ২৩শে নভেম্বর বিকেল তিনটেই যখন প্রায় চারশো মানুষ বোলপুর স্টেশনে ‘রবীন্দ্রনাথের জয়’ ও ‘বন্দেমাতরম’ বলে চেঁচাতে চেঁচাতে আশ্রমে এসেছিল তখন রথীন্দ্রনাথ , ক্ষিতিমোহন সেন প্রমুখ তাদের আমতলায় অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন । সেখানে ছিল বৈদিক যজ্ঞভূমির মত বিচিত্র নক্সা কাটা একটি চতুষ্কোণ এবং সেখানে ধূপ জ্বলছিল । একে একে যখন জগদীশচন্দ্র হীরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রশস্তি পাঠ দ্বারা রবীন্দ্রনাথকে ভরিয়ে দিলেন তারপর স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ বললেন , 

“আজ আমাকে সমস্ত দেশের নামে আপনারা যে সম্মান দিতে এখানে উপস্থিত হয়েছেন তা অসঙ্কোচে সম্পূর্ণভাবে গ্রহন করি এমন সাধ্য আমার নেই । কবি বিশেষের কাব্যে কেউ বা আনন্দ পান , কেউ বা উদাসীন থাকেন কারও বা তাতে আঘাত লাগে এবং তাঁরা আঘাত দেন । আমার কাব্য সম্বন্ধেও নিয়মের কোনও ব্যতিক্রম হয়নি , একথা আমার এবং আপনাদের জানা আছে । দেশের লোকের হাত থেকে যে অপযশ ও অপমান আমার ভাগ্যে পৌঁছেছে তার পরিমান নিতান্ত অল্প হয়নি এবং এতকাল আমি তা নিঃশব্দে বহন করে এসেছি । এমন সময় কি জন্য যে বিদেশ হতে আমি সম্মানলাভ করলুম তা এখনও পর্যন্ত আমি নিজেই ভাল করে উপলব্ধি করতে পারিনি । যাই হোক যে কারনেই হোক আজ ইয়োরোপ আমাকে সম্মানের বরমাল্য দান করেছেন । তার যদি কোনও মূল্য থাকে তবে সে কেবল সেখানকার গুনীজনের রসবোধের মধ্যেই আছে । আমাদের দেশের সঙ্গে তার কোনও আন্তরিক যোগাযোগ নেই । নোবেল প্রাইজ দ্বারা কোনও রচনার গুন বা রস বৃদ্ধি করতে পারে না । ”

এই কাব্যিক পরিবেশনায় যে কথা বললেন তার গোদা বাংলা করলে এই হয় , নোবেলের জুতো খেয়ে যে বাঙালী বোলপুরে ছুটে এসেছিল তার কোনও মূল্য নেই । এর পরদিন ক্লাসে মোহিতবাবু প্রতিক্রিয়া দিয়েছিলেন এই ভাবে , 

“ কাল বোলপুর গিয়েছিলাম । আমাদের শুধু জুতো মারতে বাকি রেখেছে । বললে কিনা , ‘ গ্রাম্য বালকেরা যেমন কুকুরের ল্যাজে টিন বেঁধে হাততালি দিয়ে তাড়া করে বেরায় , আপনারা তাই করতে এসেছেন ।’ ”

কিন্তু দেখার বিষয় এই যে ১৩ তারিখে নোবেলের সংবাদ পাওয়ার পাঁচদিন পরে ১৮ই নভেম্বর  রোটেন্সটাইন কে লিখিত চিঠিতে এই এক কথা জানাচ্ছেন , 

It is almost as bad as tying a tin can at a dog’s tail . I am being smothered with telegrams and letters for the last few days and the people who never had any friendly feelings towards me nor ever read a line of my works are loudest in their protestation of joy .

অর্থা ২৩শে নভেম্বর যা ঘটল তা আকস্মিক ছিল না , তিনি দেশবাসীকে পরিহাস করবেন বলেই মনস্থির করেছিলেন , সেজন্যই তিনি আশ্রমে প্রবেশ করতে আটকান নি । তিনি আজীবন অনুষ্ঠান ও আড়ম্বরের চেয়ে তার বৈদ্ধিক প্রত্যয়কে দেশবাশীর কাছে আপনার করাতেই আনন্দ লাভ করতেন ,

১৯১৪ সালের ১লা ফেব্রুয়ারির একটি সভায় তাঁর ভাষ্যে পাওয়া যাচ্ছে ,

“ কবি যখন আপনার হৃদয়ের আনন্দে গান গেয়ে ওঠেন , তখন তার সবচেয়ে বড় দুঃখ হয় যদি সে তার দেশের তার ঘরের ভায়েদের সহানুভুতি না পায় এবং তার সবচেয়ে বড় সুখ , সবচেয়ে বড় পুরস্কার সে পায় তাদের স্বত:উচ্ছসিত প্রীতিতে । একথা বললে মিথ্যে বলা হবে যে কবে কোন সূদূর ভবিষ্যতে তার আদর হবে এই আশায় কবি নিশ্চিন্ত থাকে না , এরকম উপবাস করে থাকা যায় না ।”

 কিন্তু সে আনন্দ তার ভাগ্যে যেমন তখন জোটেনি আজও তা জুটবে সে ব্যাপারে প্রত্যাশা করলে বলতে হয় বাঙ্গালীর চরিত্র সম্পর্কে সে ব্যক্তি নিতান্তই মূর্খ । আজ যে কারনে এত উত্তেজনা ও আয়োজন সংগঠিত হচ্ছে তার ফল আরও ভয়ংকর কেননা বাঙালী তখনও যতটা হীন ছিল এখন আরও হীন হয়েছে । এর পরিচয় বর্তমানের নানা রাজনৈতিক দলের নেতা নেত্রীর প্রচারের পোস্টারের ছবিতে ও ট্রাফিক সিগন্যালে পাওয়া যাচ্ছে । একথা যে শুধু রবি ঠাকুরের বেলাতেই ঘটেছে তা নয় । আমাদের দেশে জীবনানন্দ থেকে শুরু করে ঋত্বিক ঘটক , সলিল চৌধুরী থেকে শুরু করে কবীর সুমন সকলের ক্ষেত্রেই ঘটেছে এবং ভবিষ্যতে যারা আসছেন তাদের বেলাতেও ঘটবে । সেজন্যই কিনা জানি না আজকের দিনে কবি শিল্পী লেখক সঙ্গীতকার পরিচালক ঐতিহাসিক সকলেই নিজের পছন্দের ও ভাললাগার জায়গাটিকে আঁকড়ে ধরার আগে উপার্জন তথা প্রচারের দিকটায় সচেতন থেকেই কাজে নামেন । কিন্তু কিছু পাগল আজও জন্মাচ্ছে যারা কোনও যশলাভ অর্থোপার্জন বা অন্যান্য মোহে মাথা নত করেনা , ওরা শুধু মাথা নত করেছে শিল্প সাহিত্য ও মানবিকতার সামনে । তারা হারিয়ে গেছেন বা যাচ্ছেন “সুনীল গাঙ্গুলির দিস্তে দিস্তে লেখা”র চাপে । সেজন্যই আজ কমলকুমারের মজুমদারের লেখা , সন্তোষ ঘোষের লেখা কিংবা মায় রামকুমার মুখোপাধ্যায়ের ‘ধনপতির সিঙ্ঘলযাত্রা’ ও ইত্যাদি সেই সব বাঙ্গালীই উদ্ধার করতে পারেন যারা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় , সুবোধ সরকার এর লেখা পড়তে অভ্যস্ত নন , আর তাদের সংখ্যা আমাদের সকলেরই জানা । সে সব যাই হোক , এখানে ইতিহাসকে উদ্ধৃত করেই আমি দেখাতে চেয়েছি যারা ২৫ শে বৈশাখ নিজেদের সংস্কৃতির ঢাক তেরেকেটে তাক তাক বাজাতে বেরোন তারা কিভাবে রবি ঠাকুর কে অপমানে জর্জরিত করেন এবং তাদের জন্য রবীন্দ্রনাথের কী প্রতিক্রিয়া । 

পুনশ্চ ঃ  কালকে আবার এক প্রহসনের পালা চলবে এবং কালকে আবার উচ্চারিত হবে ‘রবীন্দ্রনাথের জয়’ ও ‘বন্দেমাতরম’ । কিন্তু এ বন্দেমাতরমের উচ্চারণ ভিন্ন । তাই এখন যদি তিনি থাকতেন তবে হয়তো আত্মহত্যা করতেন এবং সুমনবাবু গাইতেন , “গীতবিতানের শুকনো পাতায় বর্ষার গান , রবীন্দ্রনাথ একলা ভেজেন আমাকে ভেজেন” কিংবা “বছরে ত্রিশ বার চিত্রাঙ্গদা আর শ্যামা শাপমোচনের অশ্রুমোচন আমাদের জন্য ......” ।