এইসময়ে
“সাহিত্যে কলা সৃষ্টিতে লোকচিত্তের সম্মতি অতি ঘন ঘন বদল হয় , এটা দেখা যাচ্ছে । বেগ বেড়ে চলেছে মানুষের
যানে বাহনে , বেগ অবিশ্রাম ঠেলা দিচ্ছে মানুষের মনপ্রাণকে । যেখানে বৈষয়িক
প্রতিযোগিতা উগ্র সেখানে এই বেগের মূল্য বেশী । ভাগ্যের হরির লুঠ নিয়ে হাটের ভিড়ে
ধূলার’র পরে যেখানে সকলে মিলে কাড়াকাড়ি , সেখানে যে মানুষ বেগে জেতে মালেও তার জিত
। তৃপ্তিহীন লোভের বাহন বিরামহীন বেগ । বেগেরই লোভে আজ জলে স্থলে আকাশে
হিস্টিরিয়ার চীৎকার করতে করতে ছুটে
বেরোল । কিন্তু প্রানপদার্থ তো বাষ্পবিদ্যুতের – ভূতে – তাড়া করা লোহার এঞ্জিন নয়
। একদা আমাদের দেশে তীর্থযাত্রা বলে একটা সজীব পদার্থ ছিল ; ভ্রমনের স্বাদ নিয়ে সেটা
সম্পন্ন হত । কিন্তু কলের গাড়ির আমলে তীর্থ রইল , যাত্রা রইল না । ভ্রমন নেই
পৌঁছনো আছে – শিক্ষাটা বাদ দিয়ে পরীক্ষাটা পাশ করা যাকে বলে । মেঘদূতের শোকাবহ
পরিণামে শোক করবে না এমনতরো বলবান পুরুষ আজকাল দেখতে পাওয়া যাচ্ছে । মানুষের
প্রানটা চিরকাল ছন্দে বাঁধা , কিন্তু তার কালটা কলের তাড়ায় সম্প্রতি ছন্দ ভাঙা ।”
বর্তমান সময়ে
অন্য কারও দ্বারা গুনি মানুষের প্রশংসা করার অর্থ দাঁড়িয়েছে তেল দেওয়া আর
সমালোচনার অর্থ হয়েছে নিন্দে করা । ফলে নীতিহীন বাঙালী বর্তমানে শূন্যকুম্ভে পরিণত
হয়েছে । এরা কথা বলতে জানে – অনর্গল বলে যায় কিন্তু চিন্তা করার ক্ষমতা ক্রমাগত
প্রচারের অভিসন্ধিমূলক চরিত্রের সামনে হারিয়ে গেছে । অথচ যারা সত্যি করে চিন্তার
ধারাটাকে আজও ধরে রয়েছেন তাদের আমরা খুঁজলেও পাচ্ছিনা । বলা যেতেই পারে উদার
অর্থনীতির কথা , বলা যেতেই পারে কর্পোরেট শাসিত একচেটিয়া পুঁজিবাদের কথা । সাম্প্রতিককালে
অনিন্দ্য ভট্টাচার্য একটি প্রবন্ধে বলেছেন , “তথ্য ও বিষয়ের বিনোদন বিস্ফোরণ
গণমাধ্যমে পরিবেশন ও উপভোগের যে বিপুল যোগান তৈরি করেছে তা কার্যত অফুরন্ত এবং ‘কোনটা
ফেলি কোনটা খাই’ এর দশায় পড়ে লালসা জারিত ‘সবই চাখি আর ফেলি’ অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে।”
ফলে যারা আমাদের সমাজ অর্থনীতি ও রাজনীতির সঠিক বিশ্লেষণ করছে তারাও হারিয়ে যাচ্ছে
সময়ের অবহেলায় । অথচ এগুলিই তৈরি করে আমাদের চেতনা মনন ও বৌদ্ধিক পরিসরের
ব্যাপ্তির প্রত্যয় । এখন মানুষ শুধুমাত্র পেট আর হাত নিয়ে জন্মায় । কিন্তু তা তো সত্য নয় কারণ তার আছে ধরের ওপর রাখা একটা যন্ত্র , কলজের মধ্যে
ঠাসা একটা হৃদয় । কতদিন সেটাকে ভুলিয়ে রাখা যাবে রঙ বেরঙের তরল ও আলোর নেশায় । আমি
বিশ্বাস করি একদিন তা জাগবেই । এবং সে জাগার পথে ফিরে আসবে সেই সব অপ্রকাশিত
প্রচারহীন নাম যা এখন নিঃসঙ্গে সঙ্গোপনে লড়ে যাচ্ছে এই মূল্যবোধ কে হাতিয়ার করে ,
“সৃষ্টি যদি সত্য হয়ে থাকে সেই সত্যের গৌরব সেই সৃষ্টির নিজেরই মধ্যে , দশজনের
সম্মতির মধ্যে নয় । দশজনে স্বীকার করেনি এমন প্রায়ই ঘটে থাকে । তাতে বাজারদরের
ক্ষতি হয় কিন্তু সত্য মূল্যের কমতি হয় না । ”
একদিন সময় আসবে
নিশ্চয় আসবে সেদিন আপনাদের চিনবে মানুষ । খোঁজ পড়বে প্রকৃত সাহিত্যের সামাজিক বিপ্লবাত্মক
ধারার লেখক কবি প্রাবন্ধিক ও সাহিত্যিক দের । নাম উঠে আসবে গোপালচন্দ্র দাসের ,
মৃণালকান্তি ভদ্র’র আরও কত কত নাম । কুকুরের মত কুঁই কুঁই করা প্রেমের কবিতা আর
জলো উচ্চবিত্ত যৌন সুড়সুড়িমূলক আমোদের গল্প কিংবা বক্তব্যহীন অ্যাবস্ট্যাক্ট
প্রবন্ধের নামসংকীর্তনের সৃষ্টিশক্তিহীন দালালেরা কবরস্থ হবে । সেদিন ভোরে সূর্যের
রঙ লাল হবে প্রকৃতির রঙ হবে সবুজ , মানুষ জেগে উঠবে আবিস্কারের অঙ্গীকারে ...
No comments:
Post a Comment
I am waiting for your valuable comment. Please comment. Thank you..