১৯৩০ সালে ২৫ শে
অক্টোবর একটি চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ জানান ,
“আমার মৃত্যুর পর দেশের লোক আমার স্মৃতি নিয়ে যেন শোকসভা সৃষ্টির বিড়ম্বনা না
করে । বেঁচে থাকতে আমি যার কাছে যা পেয়েছি তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ । একেবারে কিছু
পাইনি একথা বলা অন্যায় । কিন্তু যারা দেবার মত জিনিস দিয়েছে তারা ডেকে সভা করবে না
। যারা কিছুই করেনি তারা সভা করবে । যারা গাল দিয়েছে তারা হাততালি দেবে । এটা
কোনোমতে যাতে না হয় , এই আমার একান্ত কামনা । আমার শ্রাদ্ধ যেন ছাতিম গাছের তলায়
বিনা আড়ম্বরে বিনা জনতায় হয় ।”
সত্যিই এখন তাঁর
শ্রাদ্ধই হচ্ছে বটে । ২৫ শে বৈশাখের প্রাকমূহূর্তে কিছু কথা না লিখে থাকতে
পারছিলাম না বলেই এই ব্যর্থ প্রচেষ্টা । কাল আবার সকাল থেকেই বাড়ির চারদিকে
ভন্ডামীর পরিবেশ আরও গাঢ় হয়ে উঠবে । যদিও বাঙ্গালীর চরিত্র এই , যার গুনের মহত্ত
বুঝতে পারবে না তাকে নিন্দের দ্বারা কন্টকাকীর্ণ করবে কিন্তু পরমূহূর্তে সে যদি
কোনও পুরস্কার লাভ করে (যার প্রতি এই বঙ্গসমাজ চিরকালের হ্যাংলা ) সেইমূহূর্ত
থেকেই তাঁর ব্যক্তিগত কৃতিত্বকে আপনার সমগ্র জাতির বলে এমন ঢোল ও খোল নিয়ে বেরবে
যে কান ঝালাপালা হয়ে যাবে । এখানে আমি রবীন্দ্রনাথ যে কারনে আজ আমাদের দেশে রবীন্দ্রনাথ
বলে সম্মান পেয়েছেন সেই বিষয়ের ওপর স্বয়ং তাঁর কিরূপ প্রতিক্রিয়া ছিল সেই নিয়েই
আলোচনা করব অর্থাৎ নোবেল পুরস্কার পাওয়া
নিয়ে ।
১৯১৩ সালের ২৩শে
নভেম্বর বিকেল তিনটেই যখন প্রায় চারশো মানুষ বোলপুর স্টেশনে ‘রবীন্দ্রনাথের জয়’ ও
‘বন্দেমাতরম’ বলে চেঁচাতে চেঁচাতে আশ্রমে এসেছিল তখন রথীন্দ্রনাথ , ক্ষিতিমোহন সেন
প্রমুখ তাদের আমতলায় অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন । সেখানে ছিল বৈদিক যজ্ঞভূমির মত বিচিত্র
নক্সা কাটা একটি চতুষ্কোণ এবং সেখানে ধূপ জ্বলছিল । একে একে যখন জগদীশচন্দ্র
হীরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রশস্তি পাঠ দ্বারা রবীন্দ্রনাথকে ভরিয়ে দিলেন তারপর স্বয়ং
রবীন্দ্রনাথ বললেন ,
“আজ আমাকে সমস্ত দেশের নামে আপনারা যে সম্মান দিতে এখানে উপস্থিত হয়েছেন তা
অসঙ্কোচে সম্পূর্ণভাবে গ্রহন করি এমন সাধ্য আমার নেই । কবি বিশেষের কাব্যে কেউ বা
আনন্দ পান , কেউ বা উদাসীন থাকেন কারও বা তাতে আঘাত লাগে এবং তাঁরা আঘাত দেন ।
আমার কাব্য সম্বন্ধেও নিয়মের কোনও ব্যতিক্রম হয়নি , একথা আমার এবং আপনাদের জানা
আছে । দেশের লোকের হাত থেকে যে অপযশ ও অপমান আমার ভাগ্যে পৌঁছেছে তার পরিমান
নিতান্ত অল্প হয়নি এবং এতকাল আমি তা নিঃশব্দে বহন করে এসেছি । এমন সময় কি জন্য যে
বিদেশ হতে আমি সম্মানলাভ করলুম তা এখনও পর্যন্ত আমি নিজেই ভাল করে উপলব্ধি করতে
পারিনি । যাই হোক যে কারনেই হোক আজ ইয়োরোপ আমাকে সম্মানের বরমাল্য দান করেছেন ।
তার যদি কোনও মূল্য থাকে তবে সে কেবল সেখানকার গুনীজনের রসবোধের মধ্যেই আছে ।
আমাদের দেশের সঙ্গে তার কোনও আন্তরিক যোগাযোগ নেই । নোবেল প্রাইজ দ্বারা কোনও
রচনার গুন বা রস বৃদ্ধি করতে পারে না । ”
এই কাব্যিক
পরিবেশনায় যে কথা বললেন তার গোদা বাংলা করলে এই হয় , নোবেলের জুতো খেয়ে যে বাঙালী
বোলপুরে ছুটে এসেছিল তার কোনও মূল্য নেই । এর পরদিন ক্লাসে মোহিতবাবু প্রতিক্রিয়া
দিয়েছিলেন এই ভাবে ,
“ কাল বোলপুর গিয়েছিলাম । আমাদের শুধু জুতো মারতে বাকি রেখেছে । বললে কিনা , ‘
গ্রাম্য বালকেরা যেমন কুকুরের ল্যাজে টিন বেঁধে হাততালি দিয়ে তাড়া করে বেরায় ,
আপনারা তাই করতে এসেছেন ।’ ”
কিন্তু দেখার
বিষয় এই যে ১৩ তারিখে নোবেলের সংবাদ পাওয়ার পাঁচদিন পরে ১৮ই নভেম্বর রোটেন্সটাইন কে লিখিত চিঠিতে এই এক কথা
জানাচ্ছেন ,
“ It is almost as bad as tying a tin can at a dog’s tail .
I am being smothered with telegrams and letters for the last few days and the
people who never had any friendly feelings towards me nor ever read a line of
my works are loudest in their protestation of joy . ”
অর্থাৎ ২৩শে নভেম্বর যা ঘটল তা আকস্মিক ছিল না , তিনি
দেশবাসীকে পরিহাস করবেন বলেই মনস্থির করেছিলেন , সেজন্যই তিনি আশ্রমে প্রবেশ করতে
আটকান নি । তিনি আজীবন অনুষ্ঠান ও আড়ম্বরের চেয়ে তার বৈদ্ধিক প্রত্যয়কে দেশবাশীর
কাছে আপনার করাতেই আনন্দ লাভ করতেন ,
১৯১৪ সালের ১লা
ফেব্রুয়ারির একটি সভায় তাঁর ভাষ্যে পাওয়া যাচ্ছে ,
“ কবি যখন আপনার
হৃদয়ের আনন্দে গান গেয়ে ওঠেন , তখন তার সবচেয়ে বড় দুঃখ হয় যদি সে তার দেশের তার
ঘরের ভায়েদের সহানুভুতি না পায় এবং তার সবচেয়ে বড় সুখ , সবচেয়ে বড় পুরস্কার সে পায়
তাদের স্বত:উচ্ছসিত প্রীতিতে । একথা বললে মিথ্যে
বলা হবে যে কবে কোন সূদূর ভবিষ্যতে তার আদর হবে এই আশায় কবি নিশ্চিন্ত থাকে না ,
এরকম উপবাস করে থাকা যায় না ।”
কিন্তু সে আনন্দ তার ভাগ্যে যেমন তখন জোটেনি আজও
তা জুটবে সে ব্যাপারে প্রত্যাশা করলে বলতে হয় বাঙ্গালীর চরিত্র সম্পর্কে সে
ব্যক্তি নিতান্তই মূর্খ । আজ যে কারনে এত উত্তেজনা ও আয়োজন সংগঠিত হচ্ছে তার ফল
আরও ভয়ংকর কেননা বাঙালী তখনও যতটা হীন ছিল এখন আরও হীন হয়েছে । এর পরিচয় বর্তমানের
নানা রাজনৈতিক দলের নেতা নেত্রীর প্রচারের পোস্টারের ছবিতে ও ট্রাফিক সিগন্যালে
পাওয়া যাচ্ছে । একথা যে শুধু রবি ঠাকুরের বেলাতেই ঘটেছে তা নয় । আমাদের দেশে
জীবনানন্দ থেকে শুরু করে ঋত্বিক ঘটক , সলিল চৌধুরী থেকে শুরু করে কবীর সুমন সকলের
ক্ষেত্রেই ঘটেছে এবং ভবিষ্যতে যারা আসছেন তাদের বেলাতেও ঘটবে । সেজন্যই কিনা জানি
না আজকের দিনে কবি শিল্পী লেখক সঙ্গীতকার পরিচালক ঐতিহাসিক সকলেই নিজের পছন্দের ও
ভাললাগার জায়গাটিকে আঁকড়ে ধরার আগে উপার্জন তথা প্রচারের দিকটায় সচেতন থেকেই কাজে
নামেন । কিন্তু কিছু পাগল আজও জন্মাচ্ছে যারা কোনও যশলাভ অর্থোপার্জন বা অন্যান্য
মোহে মাথা নত করেনা , ওরা শুধু মাথা নত করেছে শিল্প সাহিত্য ও মানবিকতার সামনে ।
তারা হারিয়ে গেছেন বা যাচ্ছেন “সুনীল গাঙ্গুলির দিস্তে দিস্তে লেখা”র চাপে ।
সেজন্যই আজ কমলকুমারের মজুমদারের লেখা , সন্তোষ ঘোষের লেখা কিংবা মায় রামকুমার মুখোপাধ্যায়ের
‘ধনপতির সিঙ্ঘলযাত্রা’ ও ইত্যাদি সেই সব বাঙ্গালীই উদ্ধার করতে পারেন যারা সুনীল
গঙ্গোপাধ্যায় , সুবোধ সরকার এর লেখা পড়তে অভ্যস্ত নন , আর তাদের সংখ্যা আমাদের
সকলেরই জানা । সে সব যাই হোক , এখানে ইতিহাসকে উদ্ধৃত করেই আমি দেখাতে চেয়েছি যারা
২৫ শে বৈশাখ নিজেদের সংস্কৃতির ঢাক তেরেকেটে তাক তাক বাজাতে বেরোন তারা কিভাবে রবি
ঠাকুর কে অপমানে জর্জরিত করেন এবং তাদের জন্য রবীন্দ্রনাথের কী প্রতিক্রিয়া ।
পুনশ্চ ঃ কালকে আবার এক প্রহসনের পালা চলবে এবং কালকে
আবার উচ্চারিত হবে ‘রবীন্দ্রনাথের জয়’ ও ‘বন্দেমাতরম’ । কিন্তু এ বন্দেমাতরমের উচ্চারণ
ভিন্ন । তাই এখন যদি তিনি থাকতেন তবে হয়তো আত্মহত্যা করতেন এবং সুমনবাবু গাইতেন ,
“গীতবিতানের শুকনো পাতায় বর্ষার গান , রবীন্দ্রনাথ একলা ভেজেন আমাকে ভেজেন” কিংবা
“বছরে ত্রিশ বার চিত্রাঙ্গদা আর শ্যামা শাপমোচনের অশ্রুমোচন আমাদের জন্য ......” ।
No comments:
Post a Comment
I am waiting for your valuable comment. Please comment. Thank you..