Monday, 23 August 2021

Wasn't Hitler always a pillar of Indian democracy?

 

Source : Internet

According to a recent V-Dem report, India has deviated from the path of democracy. Even according to the EIU report, India's ranking has dropped. Accordingly, if we analyze this data from 2006 to 2020, it is understood that in 2014, India was at the highest place as a democracy. Since then, there has been only a decline. Today, therefore, there is a lot of discussion about the rise of fascism and dictatorship in the country. At the same time, there are various movements for the protection of democracy. But judging by the historical documents, can it be said that India was a democracy before, it is no more? Going back to the past, however, the history of occupation that began with the arrival of the Aryans in India and ended with the end of British rule, was India able to establish a democratic state immediately after that? No couldn't. And so the throne of seventeen years of India's first prime minister was with almost zero opposition. Even the attempt to suppress the voice of the opposition through emergency during the first twelve years of Indira Gandhi's reign cannot be termed as democracy. So, it must be admitted that even though electoral democracy has always been the mask of India's governance, its face is actually towards one-party politicization. Even today, the Congress, one of the country's main opposition parties, has not been able to assert its leadership outside the Gandhi family. But will the responsibility for this semi-democratic and semi-dictatorship rule rest solely with the political parties or will the people also have to share it?

In fact, in a real democracy, the people are the main commitment, not the leaders. Therefore, not only the leader, but also the masses have to achieve conscious discipline, fairness, perseverance, tolerance and honesty. Attitudes like ‘I don’t understand politics’, ‘I have no interest in politics’, ‘Politics is dirty mud’ etc. only support one type of escapism, and it does not establish great and large democracy. Yet the only grievance of the masses in post-independence India is that there is no great leader in our country who, as soon as he sits in the masnad, the price rise and corruption will be eradicated from the country, job opportunities and income will increase and above all women's freedom and freedom of speech will be established. But if that were the case, the shadow of happiness, prosperity and security would descend on social life even after the extreme lethargy of the people. Whatever it is, it is not democracy.

And this state of mind of the people, that is, the desire and longing for the emergence of a great leader, has nurtured the idea of ‘Ramarajatva’ today and at the same time has given birth to the first step of true dictatorship. Therefore, such a leader has emerged today according to the needs of the people, but he has not been able to separate himself from the character of the masses and become the founder of a truly democratic and welfare state. We also find support of this undemocratic attitude amidst the patriarchal familism in India. The importance of the views of fathers and grandfathers is still sufficient in a family today, because he is the guardian and protector of the family, he is also the place of dependence of the whole family. Equally in the case of the country too, the people expect such a patriarchal leader. As a result, it is not possible to establish real democracy in the country until the idea of patriarchal ‘Ramarajatva’ disappears from the minds of the people. And so, it is useless to lament that there is no democracy today, because democracy never existed in this country.

The meaning of democracy that is established in the hearts of the poorest classes and many rich people of India is the right to vote, that is the circle that must be crossed today. Because this is the only way to resist the national and nationalist capital that has been born in the country today and to stop its monopoly power. Otherwise an endless dictatorship will be created. Not the old historical wheel, people have to find new ways to defeat it. Today, therefore, people have to determine their position irrespective of language, caste, creed and religion. The world will wait and see where the sun rises in the destiny of India - dystopia, utopia or some new position in the middle.


Sunday, 1 August 2021

Yellow Pages & জীবনের চিরকুট

 

। ১।

হ্যাঁ কলেজে উঠে সিগারেটের খরচ তুলতেই কবিতা প্রথম ছাপিয়েছিলাম। প্রায় সাড়ে চার হাজার টাকাও তুলেছিলাম। গোটা সাত-আটেক কবিতা নিয়ে বাড়ির প্রিন্টারে ছাপানো চারপাতার(এ৪ পাতা চার ভাঁজ) ছোট্ট একটা বই। দাম রেখেছিলাম পাঁচ টাকা। যেখানেই যাই - ট্রেন,বাস,কলেজ,বাজার, চায়ের দোকান, মাঠেঘাটে - সঙ্গে থাকে। যারই সঙ্গে দেখা হত তাকেই গছাতাম। পাঁচ টাকা ছিল হাতের ময়লা, বাচ্চা ছেলেকে সবাই দিয়েও দিত। আর ফ্লেক তখন দেড় টাকা।

এমন লোভ হয়েছিল তাতে, ভেবেছিলাম এভাবেই তন্দুরি চিকেন অব্দি পৌঁছে যাব। কিন্তু দিনের পরে যে দিন গেল, তারপরে টের পেলাম ঐতিহাসিক ভুল হয়ে গেছে কবিতার সঙ্গে জোট করে। তৎক্ষণাৎ বিবৃৃতি দিয়ে 'আত্মসংশোধনের' রাস্তা ধরলাম। 

বই

কাব্য হল বিরাট হইহই-রইরই ব্যাপার। সেখানে কলকে পাওয়ার যোগ্যতা আমার নেই। এমনকি যাঁদের যোগ্যতা ছিল তাঁরাও বাজারি রাজার চাপে একসময় ঔপন্যাসিক হয়ে গিয়েছিলেন বলে কানাঘুষার প্রচলন আছে। আর তাছাড়া আমি কাব্যি বুঝিও না, শুঁকিও না। চারটি বই পড়ে মূর্খের মত প্রবন্ধ লেখার মসজিদ-দৌড়েই এই বান্দা খুশি। কবির বিরাটত্ব বা দর্শন আমার কাছে আম্বানীর সঙ্গে টি-পার্টির মত ব্যাপার - ফলে সযত্নে সেইসব স্বপ্ন সেন্সরড করা আছে।

সেই পাঁচ টাকার বইয়ের একপিস ছবি পাওয়া গেছে। বাপরে বাপ মহা পাপ!

পুনশ্চঃ বাঙালি এইস্যান কবিতা লিখতে লেগেছে যে ব্যাটা রবিবুড়োর প্রাবন্ধিক সত্তাটিকেও নিমতলা ঘাটে জ্বালিয়ে দিয়েছে।

। ২ ।

রমানাথ(রায়) কাকুর সঙ্গে শেষ দেখা নন্দনের এই মাঠেই - এই ছবি দেখলেই শুধু সেকথা মনে পড়ে। তিনি এই ফ্রেমে নেই, তবুও তিনি আছেন। ছবি তোলার জাস্ট আগের মুহূর্তেই তিনি বললেন, তোমরা আড্ডা দাও, আমার সিগারেটের প্যাকেট শেষ, আমিও যাই এবার। তিনি চলে গেলেন।

আমরা ছবি তুললাম, কিন্তু আমাদের আড্ডা আর দেওয়া হয়নি বেশিক্ষণ। স্বপন পাণ্ডা আর আমি বেরিয়ে গেলাম প্রায় একইসঙ্গে, দুজনেরই কিছু ব্যক্তিগত কাজ ছিল। পুষ্পলকাকু আর রামকুমারবাবু জমিয়ে আড্ডা দিয়েছিলেন, জানি।

 

ছবি : নন্দনের মাঠ (2021) 

এই যে এই লোকটা, পুষ্পল মুখোপাধ্যায়, ২০১১সাল থেকে আমার কাকু। রক্তের সম্পর্কের ভাইপোকেও কোনো কাকু এত ভালোবাসা দেয় কিনা আমি জানি না, যা এই লোকটা দিয়েছে। লেখক-সাহিত্যিকদের আসরে আমার দুজন মাত্রই কাকু - রমানাথ কাকু আর পুষ্পল কাকু। বাকি আর কাউকে আমি কাকু বা জ্যেঠু বলিনা। একজনকে বলি দাদা আর বাকি যাঁদের সঙ্গে আলাপ আছে সবাইকেই 'বাবু' কিংবা 'সাহেব' বলেই সম্বোধন করি।

তবুও একথা ঠিক যে, এই ছবির সবাই আমার আত্মীয়। পুষ্পল কাকুর কথা ছেড়ে দিলে, স্বপন পাণ্ডা আর রামকুমার মুখোপাধ্যায়ের মত ভালো মানুষ যাঁরা আচমকা এক আলাপের পরেই কীরকমভাবে আপন করে নিতে পারলেন আমাকে, আমি বুঝতে পারি না, আর এই শিল্পটাই আমি শিখতে চাইছি। আমার মত অর্বাচীন একজনকে এই পর্যায়ের গুণী মানুষরা কীভাবে সাবলীলভাবে, সহজভাবে ও অতুলনীয় স্নেহভরে প্রশ্রয় দিতে পারেন - এটা যেদিন শিখে ফেলতে পারব সেটাই হবে জীবনের সেরা শিক্ষা।

। ৩ ।

Yeh Jawani Hai Dewani - সিনেমার শুরুতে বলা হয় যে, স্মৃৃতির অ্যালবাম একবার খুললে সেখান থেকে বেরিয়ে আসে অসংখ্য কথকতা। কাল থেকে আমার সঙ্গে তাই-ই হচ্ছে। কত কী যে মনে পড়ছে, আনন্দ হচ্ছে আবার আর্দ্রতাও কিছু কম নেই সেখানে।

ছবি : কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা (2014)

। ৪ ।

সময়গুলো হা রে রে রে করে কেটে যায়... বুঝতেও পারি না... এই প্রথম এই ছবি আমার কয়েকজন খুব ঘনিষ্ঠজনের পরিধির বাইরে এল... জুলাই মাস - দিনটাও আসছে, তাই।

ছবি : বর্ধমান বইমেলা (2013)

। ৫ ।

আজকে ছিল ঘর ঝাড়ার পালা। বহু মাস পরে বর্ধমানে এসেছি। এখানেই আমার আসল স্টাডিরুম। এখানেই আমার সব বইপত্র। কলকাতার ফ্ল্যাটে হাতেগোনা কিছু, তাও সেগুলো নতুন করে কেনা, বর্ধমানে সেই বই নেই। তাই বর্ধমানের ঘরের বিশেষ যত্ন নিতেই হয়। আজ সেটাই চলছিল। বেরিয়ে এল কিছু ডাইনোসরের যুগের স্মৃৃতি।


নীল কালিতে আমার হাতের লেখাটি ২০০২ সালের, তখন আমি ক্লাস ফোর। আর পরেরটাতে সাল লেখাই আছে। সময় কেটেছে অনেক। এখন আমার লেখার কয়েকজন পাঠকও আছেন। তাঁদের কয়েকজন জিজ্ঞেস করেন মাঝেমধ্যে যে আমি কবে থেকে লিখি? আমি কিছুই বলতে পারি না, চুপ করে থাকি। আসল কথাখানি হল, লিখি না তো, লেখা রেওয়াজ করি। যা ছাপা হয় সেগুলো কয়েকটা পাড়াতুতো অনুষ্ঠানে স্টেজে ওঠা মাত্র। আসলে আমি প্রাকটিস করি, রোজ বদলাই, ভাঙি গড়ি, শিখি। এটাতেই আনন্দ পাই। বাকি আর কিচ্ছু চাই না। আমি আজীবন প্রাকটিস করে যেতেই চাই। ২০০২ সালের থেকে যেমন ২০২১সালে লেখার মানে কিছু উন্নতি হয়েছে, তেমনই একদিন ২০২১ সালকেও পেরিয়ে যাব - আর এটা হতেই থাকবে আজীবন, যতদিন বাঁচব। এটাই আনন্দ, এটাই সুখ। ফলে এই প্রশ্নের উত্তর আমি জানি না যে, কবে থেকে আমি লিখছি?

। ৬ ।

কত বছর আগের কথা, তবুও প্রয়াস-পত্রিকা এবং সেলিম মণ্ডল নিশ্চিত পেরেছে, জিতে গেছে, যাবেও। কেননা প্রত্যয়ই তাঁদের আশ্রয়। আসলে আমার সঙ্গে তো ৯৯.৯৯৯৯৯% লেখক-কবি-সম্পাদক-সাহিত্যিকের কিংবা তাদের গোষ্ঠীর পরিচয় নেই, যোগাযোগ তাই দূর অস্ত। (কিছু মানুষের সঙ্গে কথা বা আলাপ হয়েছে ঠিকই তবে তা বিবক্ষিত পত্রিকায় লেখা নেওয়ার সূত্রে। তাঁদের সঙ্গে অবশ্যই যোগাযোগ ও আত্মীয়তা আজও অটুট।) ফলে মূলত আমি নিজের দোষেই বিচ্ছিন্ন। এমনকি আমার ফেসবুকের বন্ধুসংখ্যাও খুবই কম, এতটাই যে প্রায় সবাইকেই আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি ও জানি। 



তাই আমার লেখালেখির গণ্ডি ভীষণ সীমিত, কেউ লেখা চায়ও না, আমিও পাঠাই না। ফলে লেখালেখির জীবনে হাতে গোনা কিছু স্মৃৃতিই আমার সম্বল, বাকিদের মত ভরপুর স্মৃৃতিঘর আমার নেই। এদিক সেদিক ঘাঁটতে গিয়ে দু-একটা বেরিয়ে যায় মাঝে মধ্যে। এটাও তেমনই। তাই রোজদিন শেয়ার করার সাধ্য নেই, একটা আধটা দিতে চাই কিন্তু তাতেও ভয় লাগে ফুরিয়ে যাওয়ার। তাই দেওয়াও হয় না। আজ একটা দিতে ভারি ইচ্ছে হল। যাই হোক, তবুও প্রয়াসের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকলেও তাঁদের জানাই ধন্যবাদ আর অনেক অনেক শুভেচ্ছা।

পুনশ্চঃ- তখন আমি আর্য নামে লিখতুম।

কবিতা, Love ও লেংগি @Triangle

 

ছবিটা সম্ভবত ২০১৪ সালে তোলা

বাঙালি ছেলেমেয়ের কাছে কবিতাই হল প্রথম প্রেম। একইসঙ্গে এও ঠিক যে, প্রথম প্রেমে লেংগি না খেলে কোনো বাঙালিই প্রাপ্তবয়স্ক হয় না। অর্থাৎ, একদল আজীবন অপ্রাপ্তবয়স্ক হয়ে মুখের মধ্যে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ চুষেই কাটিয়ে দেয়, আরেকদল লেংগি খেয়ে একেবারে দেবদাস টাইপ হয়ে আমৃত্যু ক-ক-ক-ক-ক-কবিতা কবিতা বলে অতৃপ্ত আত্মার মত ঘুরতে থাকে এবং এই ধারাতে আরও একটি দল বাকি থাকে, যারা একেবারে দিলখোলা মজনু হয়ে যায়। মানে, প্রথম প্রেমের প্রতি মাঝেসাঝে নস্টালজিক হওয়া ছাড়া বাদবাকি কোনো রেশই আর তাদের থাকে না, সমস্ত দুনিয়াটাকেই যেন প্রেমভাবে জড়িয়ে ধরে, অর্থাৎ চৈতন্যোদয় হয়।

তবে আমার কেসটা একটু অন্য। আজ অর্পনদা ব্যাপারটাকে মনে করিয়ে দিল। প্রথমে অর্পনদার কথা কিছু বলি। কবি আমি কম দেখিনি, এমন কবিই বেশি দেখেছি যারা স্টেজে উঠে বলেছে, 'আমি আমার স্বরচিত একটি কবিতা আপনাদের শোনাব'। কিন্তু অর্পনদা সে-সব ভণ্ডদের দলে নয়। কদাচিৎ যে ক'জন সত্যিকারের সৎ কবিতাপ্রেমিক আমি দেখেছি - তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ কবি, কেউ কেউ নন - অর্পনদা তাঁদের অন্যতম। কোন ছেলেবেলা থেকে যে অর্পনদা এই আবেগটিকে সযত্নে লালনপালন করেছে তা বলাইবাহুল্য। ফলে ওই কলেজে উঠে

সঙ্গদোষে আচমকা কবি হয়ে যাওয়ার শৈথিল্য আর যার থাকুক, অর্পনদার অন্তত নেই। কতটা কবিতা অর্পনদা লিখতে পেরেছে, কতটা পারবে - তা মহাকাল নিশ্চয় বলবে। কিন্তু তাঁর সততা ও সারল্যের গুণকীর্তনটুকু আর কেউ না করুক আমি করবই। তাঁকে ঠকিয়ে, তাঁর অকৃত্রিম আবেগকে প্রবঞ্চনা করে বহুজন তাঁকে প্রাপ্য সম্মানটুকুও দেয়নি বলে শুনেছি, দেখেছিও কয়েকবার। কিন্তু অর্পন কর্মকার নামের মানুষটি তবুও মুখ খোলেনি, কাউকে নিজের যন্ত্রণা বুঝতে দেয়নি। কুর্ণিস তোমায়...

ক'জন জানে আমি জানি না, কিন্তু এই বিবক্ষিত পত্রিকার প্রথম দিন থেকে অর্পনদা আমাদের সঙ্গে একেবারে অভিভাবকের মত ছিল - সে-কথা বিবক্ষিতর পাঁচবছরের মাথায় প্রকাশিত সংখ্যায় উল্লেখ করেছি, আবারও করছি, বারবার করব। অর্পনদাই আমাকে কবি, লেখক, অনুবাদক সাগরদার(মুখোপাধ্যায়) সঙ্গে আলাপ করিয়েছিল, নইলে অত ভালো ভালো লেখা বিবক্ষিত পেত না। ফলে অর্পনদার ডেডিকেশনের কথা আর কেউ না জানুক, আমি জানি।

আজ অর্পনদা কতখানি যে নস্টালজিক করে দিল, আহা! সত্যিই, একসময় আমারও প্রথম প্রেম ছিল কবিতার সঙ্গেই। অল্পবয়সে কবিতা লিখেছি, কবিতা ছাপাও হয়েছে, কবিতা উৎসবে কবিতা পড়েছি ইত্যাদি কত কিছুই। আহা খুবই মধুর দিন ছিল। বাল্যপ্রেমটা হয়তো টিকেও যেত, কৈশোর অব্দি এসেওছিল ঠিকঠাক, কিন্তু যৌবনে কবিতা এতই সুন্দর হয়ে গেল যে তার চাহনেওয়ালার ইয়ত্তা থাকল না। যুগ তো বদলেছে, ফলে প্রেমের মধ্যে ত্যাগের ভাবও বদলে গিয়ে অ্যাসিড বাল্ব এসেছে, বহুকোনী প্রেমে ছুড়ি-রিভলবার-বোমা-কার্তুজ এসেছে। দিন যত এগিয়ে গেল, দেখলাম কবিতার সুন্দর শরীরে ক্ষত ক্রমশ বাড়তে লাগল। মুখ থেকে মাংস খুবলে নিল, চোখ উপড়ে নিল, চুল ছিঁড়ে নিয়ে গেল, বাঁশপেটা করে গায়ে হাতে কালসিটে ফেলে দিল, ব্লেড দিয়ে চিঁড়ে দিল যৌনাঙ্গ, মদ খেয়ে কাপড় খুলে নিল, গায়ে বমিও করল কেউ কেউ - একদিকে এই দৃশ্য। আর অন্যদিকে, ত্রিকোন, চতুষ্কোন ও বহুকোন প্রেমের এলাকা দখলের দরুন পেটো মারা, খুন করা, অপহরণও ঘটতে থাকল অনবরত। ফলে প্রথমত কবিতার এই অবস্থা দেখে কষ্টে-কান্নায়-ক্রোধে দগ্ধ হয়েছিলাম, তারপরে রক্ষা করার পণ নিয়ে দেখলাম যে-লেভেলের মাচো হিরোইজম থাকলে ফাইট ব্যাক করে নায়িকাকে উদ্ধার করা যায় সে তো আমার নেই। তাছাড়া এরকম প্রেমে ক্রিমিনাল হয়ে যাওয়া টাইপ মানুষজনের নৃশংসতার সামনে আমি তো নেহাতই শিশুসুলভ কাপুরুষ। তখন কবিতা নিজেই বললে, আমার দিব্যি তুমি এই মহল্লা ছেড়ে চলে যাও, প্লিজ আর এসো না। অউর কিয়া, হাম ভি কর চলে আলভিদা...

প্রেমটা টিকল না আর... চন্দ্রিল ভট্টাচার্য একবার বলেছিলেন যে, সংসারে যে থাকে সেই জানে সংসার কী রকম, বাংলা ভাষায় লিখি বলেই জানি বাংলা ভাষার পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে। আমারও বক্তব্য তাইই, সত্যিকারের প্রেমটা ছিল বলেই জানি সেটা কী রকম, কী তার ভবিতব্য।

যাই হোক, কবিতার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করলাম। তবে যারা কবিতার এই দশা করেছে, তাদের ক্ষমা করিনি। তবে ঘৃণাও করিনি। কেননা জানি, সময়ের এটাই ধর্ম। বরং ভালোবেসেছি তাঁদের যাঁরা কবিতার চিকিৎসা করেছেন। অযুত-সহস্র আক্রমণের মাঝখানে কয়েকজন ডাক্তার ঠিকই নিরলস চিকিৎসা করে চলেছেন, যাতে, আরও কিছুদিন অন্তত কবিতার শরীরে প্রাণটাকে আটকে রাখা যায়। তাঁরা জানেন, হয়তো বেশিদিন তা হবে না । আর সেই জন্যেই তাঁরা কবিতার আত্মার পবিত্রতার কথা প্রচারের জন্য প্রস্তুত করেছেন নানান রাসায়নিক মিশ্রণ অমূল্য রচনা - এটাই সমুদ্রমন্থনে প্রাপ্ত অমৃত। যেমন, ধরা যাক শ্যামলকান্তি দাশের কথা। একসময় যখন কাব্যিপাড়ায় যাতায়াত করতুম তখন এই বিখ্যাত চিকিৎসকের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ হয়েছিল। আলাপ হয়েছিল। ৪নম্বর প্ল্যাটফর্মের একটি প্রবন্ধে সেই আলাপের কথা বলেছিলাম, "‘কবিসম্মেলন পত্রিকার দপ্তরে শ্যামলকান্তি দাশ আমার পদবি ‘ব্যানার্জি লেখা আছে দেখে বলেছিলেন ‘বাংলা ভাষায় লেখালেখি করতে এসে ‘ব্যানার্জি আবার কী, ‘বন্দ্যোপাধ্যায় লিখবে। কবিতা লেখার ভূত কবেই নেমে গেছে কিন্তু ‘বন্দ্যোপাধ্যায় লেখার ধমকখানি আজও কার্যকরী।"

এই সব মানুষের সঙ্গ পেয়েছি বলেই হয়তো কিছুটা মনের জোর আজও থেকে গেছে ভেতরে ভেতরে। নইলে কবেই সে-সব ফুটে যেত। অর্পনদা তুমি যে কত কী মনে করিয়ে দিলে, ভালোবাসা নিও ...

কবিতার জন্য কোনও মায়াকান্না নেই ঠিকই, বুড়ো হলে সবাইকেই চলে যেতে হয়। কিন্তু যারা কবিতার শরীরে করোনা ভাইরাস হয়ে ঢুকেছে তাদের স্যানিটাইজারের মৃদু স্পর্শ মাঝে মধ্যে দেওয়াই যায়। তাই না !!!

Naseeruddin Shah @আড্ডা

 

Personal Collection 2017, NCPA

নাসিরউদ্দিন শাহের সঙ্গে বসে একদিন জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছি - মুম্বই শহরে যাওয়াটা যখন পাকাপাকি হয়ে গেল, তখন এই স্বপ্নটা একবার এসেছিল ঠিকই, কিন্তু তা যে বেমালুম সত্যিও হতে পারে এমনটা ভাবিনি। ওহ! মুম্বই তুমি আমার বড় প্রিয় শহর।

ততদিনে আমাদের কোর্সের পরীক্ষা-টরীক্ষা সব চুকে-বুকে গেছে। অপেক্ষা শুধু কনভোকেশনের। সারাদিন এদিক সেদিক ঘুরতে যাই, এখানে ওখানে আড্ডা মারি - আর কোনও কাজ নেই। মেসে বসে ব্রেকফাস্টের পরে ল্যাদ খাচ্ছি সেদিন। আচমকা 'বুক মাই শো' খুলে নাটক সার্চ করতেই দেখাল এনসিপিএ থিয়েটারে নাসিরউদ্দিনের নাটক 'আইনস্টাইন'। কবে? না আজই। কখন? সন্ধ্যেবেলা। টিকিটের মিনিমাম দাম? ৬০০টাকা। কটা টিকিট বাকি? চারটে।

শালিনী বলে রেখেছিল, যদি 'মোটলে' গ্রুপের নাটকের সন্ধান পাই, ওকে যেন জানাই। আমাদের বয়েজ হস্টেল গার্লস হস্টেল ছিল না। একটা বিল্ডিংয়েই সবাই থাকত। লিফট খারাপ। ছুটলাম পড়িমরি। ব্যাটা ঘরে নেই। ফোন করলাম। সরাসরি প্রশ্ন, আজ সন্ধ্যেতে নাসিরউদ্দিনের নাটক দেখতে যাবি? সোজাসুজি উত্তর, হ্যাঁ। টিকিট বুক করে পেমেন্ট করতে যাব, দেবরূপাদি হেলতে-দুলতে এসে, বড় করে হেসে, কী রে এত ব্যস্ত হয়ে কী করছিস? নাসিরউদ্দিনের নাটকের টিকিট কাটছি। আমিও যাব, আমারটাও কাট। বোঝ কাণ্ড। একে তো চারটে টিকিট বাকি যেখানে বিগত নয় মাসে মুম্বইতে একটাও নাটক মঞ্চস্থ হয়নি 'মোটলে' র। আর এই মেয়ে এতক্ষণে এসে বলে আমিও যাব। আবার প্রথম থেকে সব করতে হবে। অশেষ সৌভাগ্য যে তিনটেই পাওয়া গেল।

NCPA(Outside)

মারিন ড্রাইভের ধারে এনসিপিএ থিয়েটার। একদিকে বাইরে সমুদ্র আর অন্যদিকে থিয়েটারের ভেতরে ঢুকলেই অসামান্য অনুভূতি ধেয়ে আসে। দেওয়ালে দেওয়ালে সাজানো শিল্পের অসামান্য নমুনাগুলিকে দেখে মুগ্ধ হয়ে যেতে হয়। মঞ্চটি গোলাকার। দর্শকদের বসার জায়গাও মঞ্চকে গোল করে ঘিরে তৈরি। গোটা হল দর্শকে গমগম করছে। আলো ক্রমে নিভল। আলো জ্বলল ক্রমে। কোঁকড়ানো সাদা চুল, মঞ্চে একা দাঁড়িয়ে আইনস্টাইন। অর্থাৎ, নাসিরউদ্দিন একাই এলেন, দেখলেন ও রুদ্ধশ্বাস জয় করলেন।

নাটক শেষ হল। আমি দেবরূপাদিকে বললাম, এই লোকটার সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছে ছিল গো, যাক গে দেখা হল এই ঢের। সিট ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না। গুঞ্জন কানে এল, নাসিরউদ্দিন ব্যাকস্টেজে গ্রীনরুমের সামনে কথা বলছেন। আমরা দৌড়লাম। অসংখ্য মানুষের ভিড়। নাসির হাল্কা নীল রঙের জামা পরে বেরিয়ে এলেন। বেশিরভাগ মানুষ অটোগ্রাফ নিচ্ছেন, ছবি তুলছেন, কেউ কেউ উপহারসামগ্রী দিচ্ছেন। আমি হাঁ করে তাকিয়ে দেখছি, নাসিরউদ্দিন শাহ আমার কাছ থেকে তিন হাত দূরে দাঁড়িয়ে আছেন। মুম্বইতে নাসিরউদ্দিন শাহ এরকম সবার সঙ্গে দাঁড়িয়ে আলাপ করছেন, এটা তো অভাবনীয়। তিনি বললেন, ছবি অটোগ্রাফ তো রোজ হয় আজ বরং কথা বলুন। ততক্ষণে শালিনী দেবরূপাদিকে নিয়ে একটা ছবি তুলতে পেরেছিল, আমি চুপচাপ দূরে দাঁড়িয়ে শুধু লোকটাকে দেখছি।

Oh!

শালিনী আমাকে ঠেলল, যা না তোর তো কত কথা যা বল! আমি বললাম, ধ্যুর না না। ও হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল, বলল, ও কিছু বলতে চায় আপনাকে। আমি চমকে গেলাম, মনে হল ক্যালাই মেয়েটাকে। আমার বুকে তখন হাজারটা শেল দুমাদুম পড়ছে। এই লাইনগুলো লেখার সময়েও সেটা টের পাচ্ছি যেন। নাসিরউদ্দিন আমার দিকে তাকিয়ে, ওহ দ্যাটস গুড, প্লিজ সে। আমি বিমূঢ়, কী বলব, কিচ্ছু না ভেবে বললাম, 'যে মানুষ সিন কনেরির সঙ্গে লিগ অফ এক্সট্রাঅর্ডিনারি জেন্টেলমেন করেছে সে কী করে সানি লিওনির সঙ্গে জ্যাকপট করতে রাজি হয়'! নাসিরউদ্দিন বললেন, ইউ স এক্সট্রাঅর্ডিনারি জেন্টেলমেন, দ্যাটস অ্যান এক্সট্রাঅর্ডিনারি থিংগ ফার্সটলি, প্লিজ কাম ইনসাইড। আমরা গ্রিনরুমের ভেতরে গেলাম। উনি সোফা দেখালেন। বললেন, আজ যে নাটকটা হাউসফুল হল, আপনি কি জানেন তাতেও কিছু টাকা আমাকে পকেট থেকে দিতে হবে, তাও এটাতে আমার একার অভিনয়। বাকি বহুচরিত্রের নাটকগুলোর কথা ভাবুন, ওই সিনেমাগুলি না করলে 'মোটলে' গ্রুপটিকে টিকিয়ে রাখব কীভাবে? তাছাড়া অভিনয় আমার কাজ, সেটা ছাড়া আর কিছুই ভাবার দরকার মনে করি না। কিন্তু আপনি যে ওই সিনেমা দেখেছেন আমি তাতে অবাকই হয়েছি। কত বয়স আপনার? আমি বললাম, নাসিরউদ্দিন সাহেব আমার ২৫বছর বয়স। নাসিরউদ্দিন বললেন, কল মি নাসির, আপনি আরও বলুন আর কী কী সিনেমা দেখেছেন? আমি বললাম, রিসেন্টলি ব্লুবেরি হান্ট দেখলাম। নাসির বললেন, আপনি তো অবাক করছেন আমাকে, কোথায় থাকেন আপনি? আমি বললাম ওয়েস্ট বেঙ্গলের বর্ধমান জেলায়, এখানে পড়তে এসেছি। তিনি বললেন, ওহ ইয়েস উই ক্যান নট এক্সপেক্ট দিস এক্সেপ্ট বেঙ্গল! ততক্ষণে ছবির ভিড় অটোগ্রাফের ভিড় পাতলা হয়ে গেছে। আমি, দেবরূপাদি, শালিনী আর হাতেগোনা দু-তিনজন। সবাই চুপ। শালিনী আমার দিকে একদৃৃষ্টিতে তাকিয়ে, আমি আর নাসিরউদ্দিন শাহ কথা বলে যাচ্ছি। অনেকক্ষণ কথা হয়েছিল। একে আড্ডা বলা যায় কি? জানি না।

NCPA(Inside)

উঠে আসার সময় শালিনী বলল, নাসির ইউ প্লিজ হাগ হিম, আদারওয়াইজ হি ক্যান নট স্লিপ টুনাইট। নাসিরউদ্দিন বললেন, ওহ সিওরলি। তিনি বুকে জড়িয়ে ধরলেন, বললেন, নাইস টকিং টু ইউ। আমি বললাম, লাইফটাইম এক্সপেরিয়েন্স স্যার। হুম হু, নাসির। আমরা হাত মেলালাম। নাসিরউদ্দিন আমাকে নাটকের একটা প্যামফ্লেট টাইপের ছোট্ট বইয়ে সই করে দিলেন। চলে এলাম। একটা গন্ধ আরেকটা স্পর্শ সঙ্গে নিয়ে মারিন ড্রাইভের চাতালে শুয়েছিলাম বহুক্ষণ, বসে বসে ভেবেছিলাম, এটা কী হল আমার সঙ্গে!

দেবরূপাদি বলল, চল এবার নইলে খেতে পাব না। মেস গুটিয়ে দেবে। শালিনী বলল, তুমি ট্যাক্সি ডাক একে আমি তুলছি। আমি বললাম, আরেকটু বসি না প্লিজ। ওরা বলল, আর না। আমি ট্যাক্সির সামনে। হাওয়া খাচ্ছি আর মনের মধ্যে দৃৃশ্যটাকে বারবার রিপিট ভিজুয়ালাইজ করছি। ড্রাইভার বললেন, নশা কিয়া হে কিয়া! শালিনী, হা কুচ উস তরহ কি হি সোচ লিজিয়ে। শালিনী আমাকে রুম নম্বর ৪৪১-এ ছেড়ে দিয়ে পিউষ আর শুভমকে বলল, তোদের মাল তোরা সামলা, নাসিরউদ্দিনকে হাগ করে পাগল হয়ে গেছে।

সত্যিই তো পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। ছবি, অটোগ্রাফ যেমন সবার কাছে থাকে আমারও আছে, কিন্তু ওই মুখোমুখি বসে কথা বলার অভিজ্ঞতা - সেটা আজও মনে করে নিজেকে বড়ই সৌভাগ্যবান মনে হয়। সেটা হয়েছিল একমাত্র শালিনীর ঠেলাটার জন্য। ওহ ডিয়ার, আই লাভ ইউ।

মুম্বইয়ের কাছে এই জীবনটা অনেকখানি ঋণী। আর সেই ঋণ পরিশোধযোগ্যও নয়। তাই শুধু কৃৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসা নিও তুমি, স্বপ্ননগরী।

Delete করার বিড়ম্বনা & Memories

 

Source: Internet

ডিলিট করার বিড়ম্বনা সত্যিই কিছু কম নয়। বয়সের মত হার্ড-ডিস্ক প্রতিদিন বহরে বাড়তে থাকে, কিন্তু তার স্পেস ক্রমশ কমে যায়। জমা হয় অজস্র স্মৃতি। তারপর যে-দিন ঝাড়পোঁছ করে সাফসুতরো করতে যাওয়া হয় সেদিন দেখা যায় ফেলার চাইতে রাখার সামগ্রীই বেশি। এক একটা ফোল্ডার ওপেন হয় আর বেরিয়ে আসে অসংখ্য ছোটগল্প - যাদের রেশ শেষ হয়েও হইল না শেষ। কেটে যায় ঘন্টার পর ঘন্টা, কখনও একে-তাকে ফোন করি বহু-বহু দিন পরে, কখনও বউকে ডেকে দেখাই কোনো ছবি বা ভিডিও, কখনও গল্প বলতে বলতে চোখে জল আসে - মনে হয় ফিরে যাই আরেকবার, কখনওবা হেসে লুটোপুটিও খাই।

কত বছর কেটে গেল না! ভাবলেও কেমন লাগে... তখন আমি ভীষণই ছোট। ডিসেম্বরের এক বিকেলে স্যার এলেন। তবলা কিনে আনার পরেই ওর ওপরে ধাই-ধপার-ধাই করে অত্যাচার অনেকখানিই করে ফেলেছিলাম আমি। স্যার হাতুড়ি দিয়ে ব্যাটাকে অনেকক্ষণ ধরে ঠুকে-ঠুকে কী যেন করেছিলেন বুঝিনি - তিনি ডায়েরিতে প্রথমে সরস্বতী প্রণাম মন্ত্র লিখলেন, তারপর লিখলেন 'হস্ত সাধনার বোল', বললেন দেখো তবলা নিয়ে দুটো কাজ হয় - এক পেটানো আর দুই বাজানো। তুমি বরং পেটানো দিয়েই শুরু কর, দেখবে একদিন বাজাতে শিখে যাবে। ব্যস শুরু হল - রাত্তিরবেলায় একবাটি জল ছাদে রেখে দিয়ে আসতে হত। ভোরবেলায় সেই কনকনে ঠান্ডা জলে কিছুক্ষণ হাত ডুবিয়ে রেখে তারপরে তবলা পেটানো শুরু হত। স্যার বলেছিলেন, যতক্ষণ ইচ্ছে পেটাও তবে ঘন্টা তিন কম করে রোজ। দিনে দিনে ডায়েরিতে বোল বাড়লে সময়ও বাড়বে।

স্যার আসতেন দ্রুতলয়ে বাজিয়ে শোনাতেন 'রেলা', কিংবা 'টুকরা' ইত্যাদি। আর আমি বাজাতুম, 'ক । তে । টে । ক । তে । টে'। স্যারকে বলতাম আপনি এই যে যেটা বাজালেন সেটা বাজাব। স্যার বলতেন, দেব, অপেক্ষা কর। তবে বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি, মোটে আড়াই বছর। তারপরে একদিন হস্তসাধনার বোল শেষ হল, পেলাম, 'কায়দা'। সেটাও চলতে থাকল ধীরে ধীরে। মাঝে মধ্যে 'পেশকার', 'রেলা', 'টুকরা'ও পেতে লাগলাম। কেটে গেল পাঁচ - আট - দশ বছর। বাড়ির লোক জিজ্ঞেস করল, এখনও যে একটাও গানে ওর তবলা বাজানো শুনলাম না, শুধু যে ক্ল্যাসিকালই চলছে। স্যার বললেন, বেশ ক'দিন পরে দেব না'হয়। দিলেন আরও মাস ছয়েক পরে - প্রথম গান, 'আলো আমার আলো ওগো' আর 'জাগরণে যায় বিভাবরী'। গান নিজের মত বাজল, আমি নিজের মত বাজালাম। দুজন কেউ কাউকে চিনল না। স্যার হারমোনিয়াম ধরলে আমি তালে তালেই ঠেকা বাজালাম ঠিকই কিন্তু গানে যেমন শুনেছি তেমনটা হল না। স্যার বললেন, এখনও তুমি তবলা পেটাচ্ছই, বাজাচ্ছ না।

২০১৬ সালের ছবি: বিদিতা আর সৌম্য 

কেটে গেল আরও কিছুটা সময়। সাবর্ণ আর অর্ণবের সঙ্গে জমল বন্ধুত্ব। দুজনেই দীর্ঘদিন ধরে গানের চর্চা করেছে। একদিন বিকেলে সাবর্ণ হারমোনিয়ামে ধরেছিল, 'নয়ন ভরা জল গো তোমার' আর আমি তবলায় বেবাক হয়ে বসেছিলাম। আমাকে বলল, এতদিনেও কেন তুই গানের সঙ্গে বাজাতে কুন্ঠা বোধ করিস? আমি উত্তর দিতে পারিনি। কিন্তু জানি না একসপ্তাহের মধ্যে কী যে হল, আবার একদিন ওর বাড়িতে বসা হল গান-বাজনা নিয়ে। ও ধরল, 'আলগা করো গো খোপার বাঁধন দিল ওহি মেরা বস গয়ি'। এইবার আমি আচমকাই সম্পূর্ণ ঠিক বাজিয়ে ফেলেছিলাম, যেমনটা রফি সাহেবের গানে বাজানো ছিল। সাবর্ণ যতখানি অবাক হয়েছিল, আমি নিজে হয়েছিলাম ঢের বেশি। কিন্তু বুঝেছিলাম, ক্লাসিক্যাল শোনা কান আর বাজানো হাতে অজস্রবার অজস্র জেনেরাল গান না শুনলে তাকে সঙ্গত করা অসম্ভব। পণ্ডিতরা ঠিকই বলেছেন, গান-বাজানা শেখার চেয়ে শোনার রেওয়াজ করা বেশি দরকার। ব্যস, তারপরে কত যে গান কতবার করে যে শুনেছি তার ইয়ত্তা নেই। ধীরে ধীরে সঙ্গতেও উন্নতি হয়েছিল। তারপর থেকে বহু গানে বহু অনুষ্ঠানে বহু জনের সঙ্গে বাজিয়েছি । আর অসুবিধা সবিশেষ হয়নি। রাত জেগে জেগে শুনেছি বহু লাইভ ক্লাসিক্যাল গানের অনুষ্ঠান। এমন কত কি!! আর ততদিনে কেটে গেছে প্রায় ষোলটি বছর।

২০১১ সালের ছবি:  সাবর্ণ আর অর্ণব


পড়াশোনা ও নানা কাজের ফেরে তবলাতে হাতে দিই না অনেককাল। ২০১১সালের ছবিটি আমার প্রথম সর্বসমক্ষে গানের সঙ্গে সঙ্গতের অনুষ্ঠানের আর ২০১৬সালের ছবিটাই এখনও অব্দি সম্ভবত শেষ সর্বসমক্ষে বাজানো একটি অনুষ্ঠানের। অন্তর্বর্তী সময়ে থেকে গেছে অসংখ্য স্মৃতি, কিছু কিছু ছবি, কিছু ভিডিও। সম্প্রতি বৌ-বাজারে একজনের বাড়িতে গিয়েছিলাম একটি কাজে। ভদ্রলোক গানের খুব রসিক ভক্ত এবং নিজেও গান-বাজনা করেন। আমি তবলা বাজাতে জানি শুনেই তিনি দুদ্দার করে বসিয়ে দিলেন, বললেন বাজাও, বাজাও তো দেখি। বাজালাম তিন-চারটে গানে। কিন্তু কোথায় সেই হাতের বোলের কেরামতি, কোথায় তার আনন্দ - রেওয়াজে বসি না আজ প্রায় ছয়-সাত বছর। বহুবার সঙ্গত দেওয়া গানেও যখন হাত আর ঘুরে ফিরে আসে না সমে, কেবল ঠেকাটুকুর মধ্যেই নিজেকে আটকে রাখতে হয় - তখন মনে হয় আবার একটু রেওয়াজে বসি। কিন্তু আর সময় যে নেই - নানান কাজে নানান ব্যস্ততায় সবই স্মৃতির ঘরে বন্দী। আজকাল শুধু স্যারের কথাটা মনে পড়ে খুব, অনুভব করি, এই জীবনে তবলাটা শুধু পেটালামই, বাজানো আর হয়ে উঠল না। বাজানোর জন্য যে নিষ্ঠা আর ডেডিকেশন থাকা দরকার সেটাই তো নেই আমার মধ্যে - থাক, বরং এই আক্ষেপটাই থাক। এখন শুধু শুনি, কেবল শুনি। মাঝে মাঝে কষ্ট পাই খুব, পরক্ষণে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বাধ্য হই অন্য কাজে মন দিতে।

আজ কন্ট্রোল এ + ডেল টিপতে গিয়েও পারলাম না। কী যে করি! কাকে যে রাখি আর কাকে যে ডিলিট করি - সত্যিই বড় বিড়ম্বনা।

সায়েন্স আর আর্টস নিয়ে হেব্বি মারামারি, Why?

 

Source: Internet

সায়েন্স আর আর্টস নিয়ে হেব্বি মারামারি। আমাদের দুর্ভাগা দেশে সায়েন্স মানে ম্যাথ, ফিজিক্স ইত্যাদি সাবজেক্ট আর আর্টস মানে বাংলা, ইতিহাস ইত্যাদি সাবজেক্ট। কোনোটাই চিন্তকের দর্শন হয়ে উঠতে পারেনি। বরং দর্শনকেও আমরা গুঁতা মেরে আর্টসে ঢুকিয়ে দিয়েছি। ফলে নিউটন-সক্রেটিস, রবীন্দ্রনাথ-আইনস্টাইন কাঁটাতারে আলাদা হয়ে গেছেন। মজার কথা এটাই যে, দেশের বিজ্ঞ বিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রীরাও আজকাল প্রযুক্তিকে বিজ্ঞান ভাবতে শুরু করেছে।

যাই হোক, গণতন্ত্রে সে স্বাধীনতা তো থাকেই। তবে একটা কথা আমার প্রায়ই মনে হত। জানি না সঠিক কিনা! অজ্ঞজনে কেহ আলো নিশ্চয় সেক্ষেত্রে দেবেন বলেই বিশ্বাস। একসময় G.H. Hardy বলেছিলেন “…there is no permanent place in this world for ugly mathematics.” কুৎসিত কেন? তার মানে কি সুন্দর বলে কিছু আছে? যদি থাকে, তাহলে যিনি সেই চরমতম সৌন্দর্যমার্গকে ছুঁতে পারেন তিনি কে? তিনিই তো প্রকৃৃত শিল্পী। তাহলে কি বলা যায় না যে, গণিত হল উৎকৃৃষ্টতম শিল্পের অন্যতম। আর যদি তাইই হয়, তবে যেহেতু গণিতকে বিজ্ঞানের জননী আখ্যায়িত করা হয়, সেই হিসাবে বিজ্ঞানও তো তাহলে শিল্পেরই অন্য নাম।

কেউ বলে সরলরেখা, কেউ বা Straight Line, আর কেউ কেউ y = mx +c, আবার কেউ কেউ পেন্সিল দিয়ে সাদা ক্যানভাসে খচাৎ করে একটা সোজা দাগ কেটে দেয় কিংবা 'সা' ধরে সোজা উঠে যায় আকাশে- এই তো ফারাক। তাই না! মারপিট করে মরতেই পারে লোকজন, তবে তাতে একমাত্র তাদেরই ক্ষতি, বিজ্ঞান বা আর্টসের কিস্যু যায় আসে না।

ভাষাচার্য সুকুমার সেনের কথা কারও অজানা নয়। তাঁর জন্ম ১৯০০সালের জানুয়ারিতে। তিনি বর্ধমানের মানুষ। এখানকারই বিখ্যাত রাজ কলেজ থেকে তিনি সংস্কৃৃত, বাংলা ও গণিতে লেটার পেয়েছিলেন। এরকম অনেকের কথাই বলা যায়। ফলে একথা স্বীকার করাই যায় যে, একটা সময় অব্দি সায়েন্স ও আর্টস ভারত-পাকিস্তানের মত ছিল না। তাহলে কোন র‍্যাডক্লিফ রেখা এমন কান্ডটি ঘটিয়েছিল?

বিদ্যালয়ের মাধ্যমে সর্বস্তরে শিক্ষার শুরুয়াৎ হয়েছিল শিল্পবিপ্লব পরবর্তীকালে কলকারখানার জন্য ডিসিপ্লিনপালনকারী শ্রমিক সাপ্লাইয়ের খাতিরে। সেজন্যেই গতে বাঁধা ১০-৪টের স্কুলটাইম, একটা শিফটের পরে পরের শিফটে অন্য বিষয়ের ক্লাস কিংবা নিয়মমাফিক আধাঘন্টার টিফিন বিরতি ইত্যাদিতে অভ্যস্ত করার রীতি লাগু হয়েছিল। ঠিক যেমন করে এককালে যুব কম্পিউটার, আইটি কলেজ ইত্যাদির মাধ্যমে তৎকালে সদ্য আগত কম্পিউটার যুগের শ্রমিক তৈরি করা হয়েছিল দিকে দিকে কিংবা এখন যেমন ৬ বছরের বাচ্চাকে কোডিং শেখান বলে বিজ্ঞাপন চালু করা হচ্ছে ভবিষ্যতের শ্রমিক সাপ্লাইয়ের পাকা বন্দোবস্তের উদ্দেশ্যে, তেমনই এই পুঁজিবাদি আর্থনীতিক ব্যবস্থাই মানসিক শ্রমদানের জন্য তথাকথিত বুদ্ধিমান ছাত্রদের একদিকে ও কায়িক শ্রমদানের জন্য আর্টসের ছাত্রদের অন্যদিকে রেখে প্রথম থেকেই ঝাড়াই-বাছাই পর্ব সমাধা করে ফেলার জন্য সায়েন্স ও আর্টসের মধ্যে বিভেদরেখা তুলেছে। এবং ফলও অত্যধিক প্রত্যাশিতই হয়েছে।

এখন সায়েন্সের ছেলেমেয়েরা সাহিত্য-ইতিহাসের পরোয়া করে না আর আর্টসের মানুষজন অঙ্ক শুনলেই ওরে বাবা বলে আঁৎকে ওঠে। একদল নিজেদের সুপিরিয়র ভাবে, একদল ইনফিরিয়র। এভাবেই তৈরি করা হয়েছে তাদের।

অথচ হরিচরণ বাঁড়ুজ্যে ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’-এ 'শিক্ষা বলতে বলেছিলেন: বিদ্যাগ্রহণ, শিক্ষণ, শেখা। পক্ষান্তরে, অভ্যাস বা উপদেশের কথাও বলা হয়েছে কিংবা শাস্ত্র বা বিজ্ঞান অর্থেও ধরা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ একমাত্র মানুষ যিনি শিল্পবিপ্লবের সাইড এফেক্টে উদ্ভাবিত শিক্ষাব্যবস্থার বিরোধীতা করে এদেশে বিশ্বভারতীকে দাঁড় করিয়েছিলেন। কিন্তু সাধারণ বাঙালি কি সেই চেতনাকে ধারণ করতে পেরেছে? পারেনি।

ফলে আজকে তারা প্রকৃৃত শিক্ষার থেকে বহু দূরে সরে গেছে এবং যাচ্ছেও। সায়েন্স আর আর্টসের মধ্যে অকারণেই সার্জিকাল স্ট্রাইক চালাচ্ছে। লাগাতার ঘৃৃণা করতে শিখছে একে অপরকে। শরীরের প্রাণ নয় এখানে রোজ শবদেহ জমা হয় মননের ও মনস্বীতার আত্মার। সাদা থানে আবৃৃত হতে থাকে জীবনের সংস্কৃৃতিমনস্কতা ও চর্চাপদের আখ্যানগুলি। কিন্তু আমরা নির্বিকার।

নীরদচন্দ্র চৌধুরী বলেছিলেন, "আজ বাঙ্গালিজীবনে যে জিনিসটা প্রকৃতপক্ষে ভয়াবহ সেটা এই : মৃত্যুযন্ত্রণারও অনুভূতি নাই; আছে হয় পাষান হইয়া মুখ বুজে সহ্য করা, অথবা সংজ্ঞাহীন হইয়া প্রাণ মাত্র রাখা; আরেকটা ব্যাপারও আছে - জাতির মৃত্যুশয্যার চারিদিকে ধনগর্বে উল্লসিত বাঙ্গালী প্রেত ও প্রেতিনীর নৃৃত্য।"

এই আমাদের ভবিতব্য।