Sunday, 1 August 2021

Naseeruddin Shah @আড্ডা

 

Personal Collection 2017, NCPA

নাসিরউদ্দিন শাহের সঙ্গে বসে একদিন জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছি - মুম্বই শহরে যাওয়াটা যখন পাকাপাকি হয়ে গেল, তখন এই স্বপ্নটা একবার এসেছিল ঠিকই, কিন্তু তা যে বেমালুম সত্যিও হতে পারে এমনটা ভাবিনি। ওহ! মুম্বই তুমি আমার বড় প্রিয় শহর।

ততদিনে আমাদের কোর্সের পরীক্ষা-টরীক্ষা সব চুকে-বুকে গেছে। অপেক্ষা শুধু কনভোকেশনের। সারাদিন এদিক সেদিক ঘুরতে যাই, এখানে ওখানে আড্ডা মারি - আর কোনও কাজ নেই। মেসে বসে ব্রেকফাস্টের পরে ল্যাদ খাচ্ছি সেদিন। আচমকা 'বুক মাই শো' খুলে নাটক সার্চ করতেই দেখাল এনসিপিএ থিয়েটারে নাসিরউদ্দিনের নাটক 'আইনস্টাইন'। কবে? না আজই। কখন? সন্ধ্যেবেলা। টিকিটের মিনিমাম দাম? ৬০০টাকা। কটা টিকিট বাকি? চারটে।

শালিনী বলে রেখেছিল, যদি 'মোটলে' গ্রুপের নাটকের সন্ধান পাই, ওকে যেন জানাই। আমাদের বয়েজ হস্টেল গার্লস হস্টেল ছিল না। একটা বিল্ডিংয়েই সবাই থাকত। লিফট খারাপ। ছুটলাম পড়িমরি। ব্যাটা ঘরে নেই। ফোন করলাম। সরাসরি প্রশ্ন, আজ সন্ধ্যেতে নাসিরউদ্দিনের নাটক দেখতে যাবি? সোজাসুজি উত্তর, হ্যাঁ। টিকিট বুক করে পেমেন্ট করতে যাব, দেবরূপাদি হেলতে-দুলতে এসে, বড় করে হেসে, কী রে এত ব্যস্ত হয়ে কী করছিস? নাসিরউদ্দিনের নাটকের টিকিট কাটছি। আমিও যাব, আমারটাও কাট। বোঝ কাণ্ড। একে তো চারটে টিকিট বাকি যেখানে বিগত নয় মাসে মুম্বইতে একটাও নাটক মঞ্চস্থ হয়নি 'মোটলে' র। আর এই মেয়ে এতক্ষণে এসে বলে আমিও যাব। আবার প্রথম থেকে সব করতে হবে। অশেষ সৌভাগ্য যে তিনটেই পাওয়া গেল।

NCPA(Outside)

মারিন ড্রাইভের ধারে এনসিপিএ থিয়েটার। একদিকে বাইরে সমুদ্র আর অন্যদিকে থিয়েটারের ভেতরে ঢুকলেই অসামান্য অনুভূতি ধেয়ে আসে। দেওয়ালে দেওয়ালে সাজানো শিল্পের অসামান্য নমুনাগুলিকে দেখে মুগ্ধ হয়ে যেতে হয়। মঞ্চটি গোলাকার। দর্শকদের বসার জায়গাও মঞ্চকে গোল করে ঘিরে তৈরি। গোটা হল দর্শকে গমগম করছে। আলো ক্রমে নিভল। আলো জ্বলল ক্রমে। কোঁকড়ানো সাদা চুল, মঞ্চে একা দাঁড়িয়ে আইনস্টাইন। অর্থাৎ, নাসিরউদ্দিন একাই এলেন, দেখলেন ও রুদ্ধশ্বাস জয় করলেন।

নাটক শেষ হল। আমি দেবরূপাদিকে বললাম, এই লোকটার সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছে ছিল গো, যাক গে দেখা হল এই ঢের। সিট ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না। গুঞ্জন কানে এল, নাসিরউদ্দিন ব্যাকস্টেজে গ্রীনরুমের সামনে কথা বলছেন। আমরা দৌড়লাম। অসংখ্য মানুষের ভিড়। নাসির হাল্কা নীল রঙের জামা পরে বেরিয়ে এলেন। বেশিরভাগ মানুষ অটোগ্রাফ নিচ্ছেন, ছবি তুলছেন, কেউ কেউ উপহারসামগ্রী দিচ্ছেন। আমি হাঁ করে তাকিয়ে দেখছি, নাসিরউদ্দিন শাহ আমার কাছ থেকে তিন হাত দূরে দাঁড়িয়ে আছেন। মুম্বইতে নাসিরউদ্দিন শাহ এরকম সবার সঙ্গে দাঁড়িয়ে আলাপ করছেন, এটা তো অভাবনীয়। তিনি বললেন, ছবি অটোগ্রাফ তো রোজ হয় আজ বরং কথা বলুন। ততক্ষণে শালিনী দেবরূপাদিকে নিয়ে একটা ছবি তুলতে পেরেছিল, আমি চুপচাপ দূরে দাঁড়িয়ে শুধু লোকটাকে দেখছি।

Oh!

শালিনী আমাকে ঠেলল, যা না তোর তো কত কথা যা বল! আমি বললাম, ধ্যুর না না। ও হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল, বলল, ও কিছু বলতে চায় আপনাকে। আমি চমকে গেলাম, মনে হল ক্যালাই মেয়েটাকে। আমার বুকে তখন হাজারটা শেল দুমাদুম পড়ছে। এই লাইনগুলো লেখার সময়েও সেটা টের পাচ্ছি যেন। নাসিরউদ্দিন আমার দিকে তাকিয়ে, ওহ দ্যাটস গুড, প্লিজ সে। আমি বিমূঢ়, কী বলব, কিচ্ছু না ভেবে বললাম, 'যে মানুষ সিন কনেরির সঙ্গে লিগ অফ এক্সট্রাঅর্ডিনারি জেন্টেলমেন করেছে সে কী করে সানি লিওনির সঙ্গে জ্যাকপট করতে রাজি হয়'! নাসিরউদ্দিন বললেন, ইউ স এক্সট্রাঅর্ডিনারি জেন্টেলমেন, দ্যাটস অ্যান এক্সট্রাঅর্ডিনারি থিংগ ফার্সটলি, প্লিজ কাম ইনসাইড। আমরা গ্রিনরুমের ভেতরে গেলাম। উনি সোফা দেখালেন। বললেন, আজ যে নাটকটা হাউসফুল হল, আপনি কি জানেন তাতেও কিছু টাকা আমাকে পকেট থেকে দিতে হবে, তাও এটাতে আমার একার অভিনয়। বাকি বহুচরিত্রের নাটকগুলোর কথা ভাবুন, ওই সিনেমাগুলি না করলে 'মোটলে' গ্রুপটিকে টিকিয়ে রাখব কীভাবে? তাছাড়া অভিনয় আমার কাজ, সেটা ছাড়া আর কিছুই ভাবার দরকার মনে করি না। কিন্তু আপনি যে ওই সিনেমা দেখেছেন আমি তাতে অবাকই হয়েছি। কত বয়স আপনার? আমি বললাম, নাসিরউদ্দিন সাহেব আমার ২৫বছর বয়স। নাসিরউদ্দিন বললেন, কল মি নাসির, আপনি আরও বলুন আর কী কী সিনেমা দেখেছেন? আমি বললাম, রিসেন্টলি ব্লুবেরি হান্ট দেখলাম। নাসির বললেন, আপনি তো অবাক করছেন আমাকে, কোথায় থাকেন আপনি? আমি বললাম ওয়েস্ট বেঙ্গলের বর্ধমান জেলায়, এখানে পড়তে এসেছি। তিনি বললেন, ওহ ইয়েস উই ক্যান নট এক্সপেক্ট দিস এক্সেপ্ট বেঙ্গল! ততক্ষণে ছবির ভিড় অটোগ্রাফের ভিড় পাতলা হয়ে গেছে। আমি, দেবরূপাদি, শালিনী আর হাতেগোনা দু-তিনজন। সবাই চুপ। শালিনী আমার দিকে একদৃৃষ্টিতে তাকিয়ে, আমি আর নাসিরউদ্দিন শাহ কথা বলে যাচ্ছি। অনেকক্ষণ কথা হয়েছিল। একে আড্ডা বলা যায় কি? জানি না।

NCPA(Inside)

উঠে আসার সময় শালিনী বলল, নাসির ইউ প্লিজ হাগ হিম, আদারওয়াইজ হি ক্যান নট স্লিপ টুনাইট। নাসিরউদ্দিন বললেন, ওহ সিওরলি। তিনি বুকে জড়িয়ে ধরলেন, বললেন, নাইস টকিং টু ইউ। আমি বললাম, লাইফটাইম এক্সপেরিয়েন্স স্যার। হুম হু, নাসির। আমরা হাত মেলালাম। নাসিরউদ্দিন আমাকে নাটকের একটা প্যামফ্লেট টাইপের ছোট্ট বইয়ে সই করে দিলেন। চলে এলাম। একটা গন্ধ আরেকটা স্পর্শ সঙ্গে নিয়ে মারিন ড্রাইভের চাতালে শুয়েছিলাম বহুক্ষণ, বসে বসে ভেবেছিলাম, এটা কী হল আমার সঙ্গে!

দেবরূপাদি বলল, চল এবার নইলে খেতে পাব না। মেস গুটিয়ে দেবে। শালিনী বলল, তুমি ট্যাক্সি ডাক একে আমি তুলছি। আমি বললাম, আরেকটু বসি না প্লিজ। ওরা বলল, আর না। আমি ট্যাক্সির সামনে। হাওয়া খাচ্ছি আর মনের মধ্যে দৃৃশ্যটাকে বারবার রিপিট ভিজুয়ালাইজ করছি। ড্রাইভার বললেন, নশা কিয়া হে কিয়া! শালিনী, হা কুচ উস তরহ কি হি সোচ লিজিয়ে। শালিনী আমাকে রুম নম্বর ৪৪১-এ ছেড়ে দিয়ে পিউষ আর শুভমকে বলল, তোদের মাল তোরা সামলা, নাসিরউদ্দিনকে হাগ করে পাগল হয়ে গেছে।

সত্যিই তো পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। ছবি, অটোগ্রাফ যেমন সবার কাছে থাকে আমারও আছে, কিন্তু ওই মুখোমুখি বসে কথা বলার অভিজ্ঞতা - সেটা আজও মনে করে নিজেকে বড়ই সৌভাগ্যবান মনে হয়। সেটা হয়েছিল একমাত্র শালিনীর ঠেলাটার জন্য। ওহ ডিয়ার, আই লাভ ইউ।

মুম্বইয়ের কাছে এই জীবনটা অনেকখানি ঋণী। আর সেই ঋণ পরিশোধযোগ্যও নয়। তাই শুধু কৃৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসা নিও তুমি, স্বপ্ননগরী।

No comments:

Post a Comment

I am waiting for your valuable comment. Please comment. Thank you..