Sunday, 1 August 2021

Delete করার বিড়ম্বনা & Memories

 

Source: Internet

ডিলিট করার বিড়ম্বনা সত্যিই কিছু কম নয়। বয়সের মত হার্ড-ডিস্ক প্রতিদিন বহরে বাড়তে থাকে, কিন্তু তার স্পেস ক্রমশ কমে যায়। জমা হয় অজস্র স্মৃতি। তারপর যে-দিন ঝাড়পোঁছ করে সাফসুতরো করতে যাওয়া হয় সেদিন দেখা যায় ফেলার চাইতে রাখার সামগ্রীই বেশি। এক একটা ফোল্ডার ওপেন হয় আর বেরিয়ে আসে অসংখ্য ছোটগল্প - যাদের রেশ শেষ হয়েও হইল না শেষ। কেটে যায় ঘন্টার পর ঘন্টা, কখনও একে-তাকে ফোন করি বহু-বহু দিন পরে, কখনও বউকে ডেকে দেখাই কোনো ছবি বা ভিডিও, কখনও গল্প বলতে বলতে চোখে জল আসে - মনে হয় ফিরে যাই আরেকবার, কখনওবা হেসে লুটোপুটিও খাই।

কত বছর কেটে গেল না! ভাবলেও কেমন লাগে... তখন আমি ভীষণই ছোট। ডিসেম্বরের এক বিকেলে স্যার এলেন। তবলা কিনে আনার পরেই ওর ওপরে ধাই-ধপার-ধাই করে অত্যাচার অনেকখানিই করে ফেলেছিলাম আমি। স্যার হাতুড়ি দিয়ে ব্যাটাকে অনেকক্ষণ ধরে ঠুকে-ঠুকে কী যেন করেছিলেন বুঝিনি - তিনি ডায়েরিতে প্রথমে সরস্বতী প্রণাম মন্ত্র লিখলেন, তারপর লিখলেন 'হস্ত সাধনার বোল', বললেন দেখো তবলা নিয়ে দুটো কাজ হয় - এক পেটানো আর দুই বাজানো। তুমি বরং পেটানো দিয়েই শুরু কর, দেখবে একদিন বাজাতে শিখে যাবে। ব্যস শুরু হল - রাত্তিরবেলায় একবাটি জল ছাদে রেখে দিয়ে আসতে হত। ভোরবেলায় সেই কনকনে ঠান্ডা জলে কিছুক্ষণ হাত ডুবিয়ে রেখে তারপরে তবলা পেটানো শুরু হত। স্যার বলেছিলেন, যতক্ষণ ইচ্ছে পেটাও তবে ঘন্টা তিন কম করে রোজ। দিনে দিনে ডায়েরিতে বোল বাড়লে সময়ও বাড়বে।

স্যার আসতেন দ্রুতলয়ে বাজিয়ে শোনাতেন 'রেলা', কিংবা 'টুকরা' ইত্যাদি। আর আমি বাজাতুম, 'ক । তে । টে । ক । তে । টে'। স্যারকে বলতাম আপনি এই যে যেটা বাজালেন সেটা বাজাব। স্যার বলতেন, দেব, অপেক্ষা কর। তবে বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি, মোটে আড়াই বছর। তারপরে একদিন হস্তসাধনার বোল শেষ হল, পেলাম, 'কায়দা'। সেটাও চলতে থাকল ধীরে ধীরে। মাঝে মধ্যে 'পেশকার', 'রেলা', 'টুকরা'ও পেতে লাগলাম। কেটে গেল পাঁচ - আট - দশ বছর। বাড়ির লোক জিজ্ঞেস করল, এখনও যে একটাও গানে ওর তবলা বাজানো শুনলাম না, শুধু যে ক্ল্যাসিকালই চলছে। স্যার বললেন, বেশ ক'দিন পরে দেব না'হয়। দিলেন আরও মাস ছয়েক পরে - প্রথম গান, 'আলো আমার আলো ওগো' আর 'জাগরণে যায় বিভাবরী'। গান নিজের মত বাজল, আমি নিজের মত বাজালাম। দুজন কেউ কাউকে চিনল না। স্যার হারমোনিয়াম ধরলে আমি তালে তালেই ঠেকা বাজালাম ঠিকই কিন্তু গানে যেমন শুনেছি তেমনটা হল না। স্যার বললেন, এখনও তুমি তবলা পেটাচ্ছই, বাজাচ্ছ না।

২০১৬ সালের ছবি: বিদিতা আর সৌম্য 

কেটে গেল আরও কিছুটা সময়। সাবর্ণ আর অর্ণবের সঙ্গে জমল বন্ধুত্ব। দুজনেই দীর্ঘদিন ধরে গানের চর্চা করেছে। একদিন বিকেলে সাবর্ণ হারমোনিয়ামে ধরেছিল, 'নয়ন ভরা জল গো তোমার' আর আমি তবলায় বেবাক হয়ে বসেছিলাম। আমাকে বলল, এতদিনেও কেন তুই গানের সঙ্গে বাজাতে কুন্ঠা বোধ করিস? আমি উত্তর দিতে পারিনি। কিন্তু জানি না একসপ্তাহের মধ্যে কী যে হল, আবার একদিন ওর বাড়িতে বসা হল গান-বাজনা নিয়ে। ও ধরল, 'আলগা করো গো খোপার বাঁধন দিল ওহি মেরা বস গয়ি'। এইবার আমি আচমকাই সম্পূর্ণ ঠিক বাজিয়ে ফেলেছিলাম, যেমনটা রফি সাহেবের গানে বাজানো ছিল। সাবর্ণ যতখানি অবাক হয়েছিল, আমি নিজে হয়েছিলাম ঢের বেশি। কিন্তু বুঝেছিলাম, ক্লাসিক্যাল শোনা কান আর বাজানো হাতে অজস্রবার অজস্র জেনেরাল গান না শুনলে তাকে সঙ্গত করা অসম্ভব। পণ্ডিতরা ঠিকই বলেছেন, গান-বাজানা শেখার চেয়ে শোনার রেওয়াজ করা বেশি দরকার। ব্যস, তারপরে কত যে গান কতবার করে যে শুনেছি তার ইয়ত্তা নেই। ধীরে ধীরে সঙ্গতেও উন্নতি হয়েছিল। তারপর থেকে বহু গানে বহু অনুষ্ঠানে বহু জনের সঙ্গে বাজিয়েছি । আর অসুবিধা সবিশেষ হয়নি। রাত জেগে জেগে শুনেছি বহু লাইভ ক্লাসিক্যাল গানের অনুষ্ঠান। এমন কত কি!! আর ততদিনে কেটে গেছে প্রায় ষোলটি বছর।

২০১১ সালের ছবি:  সাবর্ণ আর অর্ণব


পড়াশোনা ও নানা কাজের ফেরে তবলাতে হাতে দিই না অনেককাল। ২০১১সালের ছবিটি আমার প্রথম সর্বসমক্ষে গানের সঙ্গে সঙ্গতের অনুষ্ঠানের আর ২০১৬সালের ছবিটাই এখনও অব্দি সম্ভবত শেষ সর্বসমক্ষে বাজানো একটি অনুষ্ঠানের। অন্তর্বর্তী সময়ে থেকে গেছে অসংখ্য স্মৃতি, কিছু কিছু ছবি, কিছু ভিডিও। সম্প্রতি বৌ-বাজারে একজনের বাড়িতে গিয়েছিলাম একটি কাজে। ভদ্রলোক গানের খুব রসিক ভক্ত এবং নিজেও গান-বাজনা করেন। আমি তবলা বাজাতে জানি শুনেই তিনি দুদ্দার করে বসিয়ে দিলেন, বললেন বাজাও, বাজাও তো দেখি। বাজালাম তিন-চারটে গানে। কিন্তু কোথায় সেই হাতের বোলের কেরামতি, কোথায় তার আনন্দ - রেওয়াজে বসি না আজ প্রায় ছয়-সাত বছর। বহুবার সঙ্গত দেওয়া গানেও যখন হাত আর ঘুরে ফিরে আসে না সমে, কেবল ঠেকাটুকুর মধ্যেই নিজেকে আটকে রাখতে হয় - তখন মনে হয় আবার একটু রেওয়াজে বসি। কিন্তু আর সময় যে নেই - নানান কাজে নানান ব্যস্ততায় সবই স্মৃতির ঘরে বন্দী। আজকাল শুধু স্যারের কথাটা মনে পড়ে খুব, অনুভব করি, এই জীবনে তবলাটা শুধু পেটালামই, বাজানো আর হয়ে উঠল না। বাজানোর জন্য যে নিষ্ঠা আর ডেডিকেশন থাকা দরকার সেটাই তো নেই আমার মধ্যে - থাক, বরং এই আক্ষেপটাই থাক। এখন শুধু শুনি, কেবল শুনি। মাঝে মাঝে কষ্ট পাই খুব, পরক্ষণে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বাধ্য হই অন্য কাজে মন দিতে।

আজ কন্ট্রোল এ + ডেল টিপতে গিয়েও পারলাম না। কী যে করি! কাকে যে রাখি আর কাকে যে ডিলিট করি - সত্যিই বড় বিড়ম্বনা।

No comments:

Post a Comment

I am waiting for your valuable comment. Please comment. Thank you..