![]() |
| Source: Internet |
সায়েন্স আর আর্টস নিয়ে হেব্বি মারামারি। আমাদের দুর্ভাগা
দেশে সায়েন্স মানে ম্যাথ, ফিজিক্স ইত্যাদি সাবজেক্ট আর আর্টস মানে বাংলা, ইতিহাস ইত্যাদি
সাবজেক্ট। কোনোটাই চিন্তকের দর্শন হয়ে উঠতে পারেনি। বরং দর্শনকেও আমরা গুঁতা মেরে আর্টসে
ঢুকিয়ে দিয়েছি। ফলে নিউটন-সক্রেটিস, রবীন্দ্রনাথ-আইনস্টাইন কাঁটাতারে আলাদা হয়ে গেছেন।
মজার কথা এটাই যে, দেশের বিজ্ঞ বিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রীরাও আজকাল প্রযুক্তিকে বিজ্ঞান
ভাবতে শুরু করেছে।
যাই হোক, গণতন্ত্রে সে স্বাধীনতা তো থাকেই। তবে একটা কথা আমার প্রায়ই মনে হত। জানি না সঠিক কিনা! অজ্ঞজনে কেহ আলো নিশ্চয় সেক্ষেত্রে দেবেন বলেই বিশ্বাস। একসময় G.H. Hardy বলেছিলেন “…there is no permanent place in this world for ugly mathematics.” কুৎসিত কেন? তার মানে কি সুন্দর বলে কিছু আছে? যদি থাকে, তাহলে যিনি সেই চরমতম সৌন্দর্যমার্গকে ছুঁতে পারেন তিনি কে? তিনিই তো প্রকৃৃত শিল্পী। তাহলে কি বলা যায় না যে, গণিত হল উৎকৃৃষ্টতম শিল্পের অন্যতম। আর যদি তাইই হয়, তবে যেহেতু গণিতকে বিজ্ঞানের জননী আখ্যায়িত করা হয়, সেই হিসাবে বিজ্ঞানও তো তাহলে শিল্পেরই অন্য নাম।
কেউ বলে সরলরেখা, কেউ বা Straight Line, আর কেউ কেউ y = mx +c, আবার কেউ কেউ পেন্সিল দিয়ে সাদা ক্যানভাসে খচাৎ করে একটা সোজা দাগ কেটে দেয় কিংবা 'সা' ধরে সোজা উঠে যায় আকাশে- এই তো ফারাক। তাই না! মারপিট করে মরতেই পারে লোকজন, তবে তাতে একমাত্র তাদেরই ক্ষতি, বিজ্ঞান বা আর্টসের কিস্যু যায় আসে না।
ভাষাচার্য সুকুমার সেনের কথা কারও অজানা নয়। তাঁর জন্ম ১৯০০সালের জানুয়ারিতে। তিনি বর্ধমানের মানুষ। এখানকারই বিখ্যাত রাজ কলেজ থেকে তিনি সংস্কৃৃত, বাংলা ও গণিতে লেটার পেয়েছিলেন। এরকম অনেকের কথাই বলা যায়। ফলে একথা স্বীকার করাই যায় যে, একটা সময় অব্দি সায়েন্স ও আর্টস ভারত-পাকিস্তানের মত ছিল না। তাহলে কোন র্যাডক্লিফ রেখা এমন কান্ডটি ঘটিয়েছিল?
বিদ্যালয়ের মাধ্যমে সর্বস্তরে শিক্ষার শুরুয়াৎ হয়েছিল
শিল্পবিপ্লব পরবর্তীকালে কলকারখানার জন্য ডিসিপ্লিনপালনকারী শ্রমিক সাপ্লাইয়ের খাতিরে।
সেজন্যেই গতে বাঁধা ১০-৪টের স্কুলটাইম, একটা শিফটের পরে পরের শিফটে অন্য বিষয়ের ক্লাস
কিংবা নিয়মমাফিক আধাঘন্টার টিফিন বিরতি ইত্যাদিতে অভ্যস্ত করার রীতি লাগু হয়েছিল। ঠিক
যেমন করে এককালে যুব কম্পিউটার, আইটি কলেজ ইত্যাদির মাধ্যমে তৎকালে সদ্য আগত কম্পিউটার
যুগের শ্রমিক তৈরি করা হয়েছিল দিকে দিকে কিংবা এখন যেমন ৬ বছরের বাচ্চাকে কোডিং শেখান
বলে বিজ্ঞাপন চালু করা হচ্ছে ভবিষ্যতের শ্রমিক সাপ্লাইয়ের পাকা বন্দোবস্তের উদ্দেশ্যে,
তেমনই এই পুঁজিবাদি আর্থনীতিক ব্যবস্থাই মানসিক শ্রমদানের জন্য তথাকথিত বুদ্ধিমান ছাত্রদের
একদিকে ও কায়িক শ্রমদানের জন্য আর্টসের ছাত্রদের অন্যদিকে রেখে প্রথম থেকেই ঝাড়াই-বাছাই
পর্ব সমাধা করে ফেলার জন্য সায়েন্স ও আর্টসের মধ্যে বিভেদরেখা তুলেছে। এবং ফলও অত্যধিক
প্রত্যাশিতই হয়েছে।
এখন সায়েন্সের ছেলেমেয়েরা সাহিত্য-ইতিহাসের পরোয়া করে
না আর আর্টসের মানুষজন অঙ্ক শুনলেই ওরে বাবা বলে আঁৎকে ওঠে। একদল নিজেদের সুপিরিয়র
ভাবে, একদল ইনফিরিয়র। এভাবেই তৈরি করা হয়েছে তাদের।
অথচ হরিচরণ বাঁড়ুজ্যে ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’-এ 'শিক্ষা বলতে
বলেছিলেন: বিদ্যাগ্রহণ, শিক্ষণ, শেখা। পক্ষান্তরে, অভ্যাস বা উপদেশের কথাও বলা হয়েছে
কিংবা শাস্ত্র বা বিজ্ঞান অর্থেও ধরা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ একমাত্র মানুষ যিনি শিল্পবিপ্লবের
সাইড এফেক্টে উদ্ভাবিত শিক্ষাব্যবস্থার বিরোধীতা করে এদেশে বিশ্বভারতীকে দাঁড় করিয়েছিলেন।
কিন্তু সাধারণ বাঙালি কি সেই চেতনাকে ধারণ করতে পেরেছে? পারেনি।
ফলে আজকে তারা প্রকৃৃত শিক্ষার থেকে বহু দূরে সরে গেছে
এবং যাচ্ছেও। সায়েন্স আর আর্টসের মধ্যে অকারণেই সার্জিকাল স্ট্রাইক চালাচ্ছে। লাগাতার
ঘৃৃণা করতে শিখছে একে অপরকে। শরীরের প্রাণ নয় এখানে রোজ শবদেহ জমা হয় মননের ও মনস্বীতার
আত্মার। সাদা থানে আবৃৃত হতে থাকে জীবনের সংস্কৃৃতিমনস্কতা ও চর্চাপদের আখ্যানগুলি।
কিন্তু আমরা নির্বিকার।
নীরদচন্দ্র চৌধুরী বলেছিলেন, "আজ বাঙ্গালিজীবনে
যে জিনিসটা প্রকৃতপক্ষে ভয়াবহ সেটা এই : মৃত্যুযন্ত্রণারও অনুভূতি নাই; আছে হয় পাষান
হইয়া মুখ বুজে সহ্য করা, অথবা সংজ্ঞাহীন হইয়া প্রাণ মাত্র রাখা; আরেকটা ব্যাপারও
আছে - জাতির মৃত্যুশয্যার চারিদিকে ধনগর্বে উল্লসিত বাঙ্গালী প্রেত ও প্রেতিনীর নৃৃত্য।"
এই আমাদের ভবিতব্য।

No comments:
Post a Comment
I am waiting for your valuable comment. Please comment. Thank you..