![]() |
| ছবিটা সম্ভবত ২০১৪ সালে তোলা |
বাঙালি ছেলেমেয়ের কাছে কবিতাই হল প্রথম প্রেম। একইসঙ্গে
এও ঠিক যে, প্রথম প্রেমে লেংগি না খেলে কোনো বাঙালিই প্রাপ্তবয়স্ক হয় না। অর্থাৎ, একদল
আজীবন অপ্রাপ্তবয়স্ক হয়ে মুখের মধ্যে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ চুষেই কাটিয়ে দেয়, আরেকদল লেংগি
খেয়ে একেবারে দেবদাস টাইপ হয়ে আমৃত্যু ক-ক-ক-ক-ক-কবিতা কবিতা বলে অতৃপ্ত আত্মার মত
ঘুরতে থাকে এবং এই ধারাতে আরও একটি দল বাকি থাকে, যারা একেবারে দিলখোলা মজনু হয়ে যায়।
মানে, প্রথম প্রেমের প্রতি মাঝেসাঝে নস্টালজিক হওয়া ছাড়া বাদবাকি কোনো রেশই আর তাদের
থাকে না, সমস্ত দুনিয়াটাকেই যেন প্রেমভাবে জড়িয়ে ধরে, অর্থাৎ চৈতন্যোদয় হয়।
তবে আমার কেসটা একটু অন্য। আজ অর্পনদা ব্যাপারটাকে মনে
করিয়ে দিল। প্রথমে অর্পনদার কথা কিছু বলি। কবি আমি কম দেখিনি, এমন কবিই বেশি দেখেছি
যারা স্টেজে উঠে বলেছে, 'আমি আমার স্বরচিত একটি কবিতা আপনাদের শোনাব'। কিন্তু অর্পনদা
সে-সব ভণ্ডদের দলে নয়। কদাচিৎ যে ক'জন সত্যিকারের সৎ কবিতাপ্রেমিক আমি দেখেছি - তাঁদের
মধ্যে কেউ কেউ কবি, কেউ কেউ নন - অর্পনদা তাঁদের অন্যতম। কোন ছেলেবেলা থেকে যে অর্পনদা
এই আবেগটিকে সযত্নে লালনপালন করেছে তা বলাইবাহুল্য। ফলে ওই কলেজে উঠে
সঙ্গদোষে আচমকা কবি হয়ে যাওয়ার শৈথিল্য আর যার থাকুক,
অর্পনদার অন্তত নেই। কতটা কবিতা অর্পনদা লিখতে পেরেছে, কতটা পারবে - তা মহাকাল নিশ্চয়
বলবে। কিন্তু তাঁর সততা ও সারল্যের গুণকীর্তনটুকু আর কেউ না করুক আমি করবই। তাঁকে ঠকিয়ে,
তাঁর অকৃত্রিম আবেগকে প্রবঞ্চনা করে বহুজন তাঁকে প্রাপ্য সম্মানটুকুও দেয়নি বলে শুনেছি,
দেখেছিও কয়েকবার। কিন্তু অর্পন কর্মকার নামের মানুষটি তবুও মুখ খোলেনি, কাউকে নিজের
যন্ত্রণা বুঝতে দেয়নি। কুর্ণিস তোমায়...
ক'জন জানে আমি জানি না, কিন্তু এই বিবক্ষিত পত্রিকার
প্রথম দিন থেকে অর্পনদা আমাদের সঙ্গে একেবারে অভিভাবকের মত ছিল - সে-কথা বিবক্ষিতর
পাঁচবছরের মাথায় প্রকাশিত সংখ্যায় উল্লেখ করেছি, আবারও করছি, বারবার করব। অর্পনদাই
আমাকে কবি, লেখক, অনুবাদক সাগরদার(মুখোপাধ্যায়) সঙ্গে আলাপ করিয়েছিল, নইলে অত ভালো
ভালো লেখা বিবক্ষিত পেত না। ফলে অর্পনদার ডেডিকেশনের কথা আর কেউ না জানুক, আমি জানি।
আজ অর্পনদা কতখানি যে নস্টালজিক করে দিল, আহা! সত্যিই,
একসময় আমারও প্রথম প্রেম ছিল কবিতার সঙ্গেই। অল্পবয়সে কবিতা লিখেছি, কবিতা ছাপাও হয়েছে,
কবিতা উৎসবে কবিতা পড়েছি ইত্যাদি কত কিছুই। আহা খুবই মধুর দিন ছিল। বাল্যপ্রেমটা হয়তো
টিকেও যেত, কৈশোর অব্দি এসেওছিল ঠিকঠাক, কিন্তু যৌবনে কবিতা এতই সুন্দর হয়ে গেল যে
তার চাহনেওয়ালার ইয়ত্তা থাকল না। যুগ তো বদলেছে, ফলে প্রেমের মধ্যে ত্যাগের ভাবও বদলে
গিয়ে অ্যাসিড বাল্ব এসেছে, বহুকোনী প্রেমে ছুড়ি-রিভলবার-বোমা-কার্তুজ এসেছে। দিন যত
এগিয়ে গেল, দেখলাম কবিতার সুন্দর শরীরে ক্ষত ক্রমশ বাড়তে লাগল। মুখ থেকে মাংস খুবলে
নিল, চোখ উপড়ে নিল, চুল ছিঁড়ে নিয়ে গেল, বাঁশপেটা করে গায়ে হাতে কালসিটে ফেলে দিল,
ব্লেড দিয়ে চিঁড়ে দিল যৌনাঙ্গ, মদ খেয়ে কাপড় খুলে নিল, গায়ে বমিও করল কেউ কেউ - একদিকে
এই দৃশ্য। আর অন্যদিকে, ত্রিকোন, চতুষ্কোন ও বহুকোন প্রেমের এলাকা দখলের দরুন পেটো
মারা, খুন করা, অপহরণও ঘটতে থাকল অনবরত। ফলে প্রথমত কবিতার এই অবস্থা দেখে কষ্টে-কান্নায়-ক্রোধে
দগ্ধ হয়েছিলাম, তারপরে রক্ষা করার পণ নিয়ে দেখলাম যে-লেভেলের মাচো হিরোইজম থাকলে ফাইট
ব্যাক করে নায়িকাকে উদ্ধার করা যায় সে তো আমার নেই। তাছাড়া এরকম প্রেমে ক্রিমিনাল হয়ে
যাওয়া টাইপ মানুষজনের নৃশংসতার সামনে আমি তো নেহাতই শিশুসুলভ কাপুরুষ। তখন কবিতা নিজেই
বললে, আমার দিব্যি তুমি এই মহল্লা ছেড়ে চলে যাও, প্লিজ আর এসো না। অউর কিয়া, হাম ভি
কর চলে আলভিদা...
প্রেমটা টিকল না আর... চন্দ্রিল ভট্টাচার্য একবার বলেছিলেন
যে, সংসারে যে থাকে সেই জানে সংসার কী রকম, বাংলা ভাষায় লিখি বলেই জানি বাংলা ভাষার
পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে। আমারও বক্তব্য তাইই, সত্যিকারের প্রেমটা ছিল বলেই জানি সেটা
কী রকম, কী তার ভবিতব্য।
যাই হোক, কবিতার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করলাম। তবে যারা
কবিতার এই দশা করেছে, তাদের ক্ষমা করিনি। তবে ঘৃণাও করিনি। কেননা জানি, সময়ের এটাই
ধর্ম। বরং ভালোবেসেছি তাঁদের যাঁরা কবিতার চিকিৎসা করেছেন। অযুত-সহস্র আক্রমণের মাঝখানে
কয়েকজন ডাক্তার ঠিকই নিরলস চিকিৎসা করে চলেছেন, যাতে, আরও কিছুদিন অন্তত কবিতার শরীরে
প্রাণটাকে আটকে রাখা যায়। তাঁরা জানেন, হয়তো বেশিদিন তা হবে না । আর সেই জন্যেই তাঁরা
কবিতার আত্মার পবিত্রতার কথা প্রচারের জন্য প্রস্তুত করেছেন নানান রাসায়নিক মিশ্রণ
অমূল্য রচনা - এটাই সমুদ্রমন্থনে প্রাপ্ত অমৃত। যেমন, ধরা যাক শ্যামলকান্তি দাশের কথা।
একসময় যখন কাব্যিপাড়ায় যাতায়াত করতুম তখন এই বিখ্যাত চিকিৎসকের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ হয়েছিল।
আলাপ হয়েছিল। ৪নম্বর প্ল্যাটফর্মের একটি প্রবন্ধে সেই আলাপের কথা বলেছিলাম,
"‘কবিসম্মেলন’ পত্রিকার দপ্তরে শ্যামলকান্তি দাশ আমার পদবি ‘ব্যানার্জি’ লেখা
আছে দেখে বলেছিলেন— ‘বাংলা ভাষায় লেখালেখি করতে এসে ‘ব্যানার্জি’ আবার
কী, ‘বন্দ্যোপাধ্যায়’ লিখবে।’ কবিতা লেখার ভূত কবেই নেমে গেছে কিন্তু ‘বন্দ্যোপাধ্যায়’ লেখার
ধমকখানি আজও কার্যকরী।"
এই সব মানুষের সঙ্গ পেয়েছি বলেই হয়তো কিছুটা মনের জোর
আজও থেকে গেছে ভেতরে ভেতরে। নইলে কবেই সে-সব ফুটে যেত। অর্পনদা তুমি যে কত কী মনে করিয়ে
দিলে, ভালোবাসা নিও ...
কবিতার জন্য কোনও মায়াকান্না নেই ঠিকই, বুড়ো হলে সবাইকেই চলে যেতে হয়। কিন্তু যারা কবিতার শরীরে করোনা ভাইরাস হয়ে ঢুকেছে তাদের স্যানিটাইজারের মৃদু স্পর্শ মাঝে মধ্যে দেওয়াই যায়। তাই না !!!

No comments:
Post a Comment
I am waiting for your valuable comment. Please comment. Thank you..