Thursday, 2 April 2020

শিরোনামহীন প্রলাপগুলো, রোদ্দুর রায়ের শব্দচয়নে বঙ্গ-সংস্কৃতির কুঁচকিতে চুলকানি প্রসঙ্গে কয়েকটি কথা

১৯১৪ সালের মার্চ মাসের ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় বাংলার প্রশ্নপত্রে একটা প্রশ্ন ছিল, প্রশ্নটা এইরকম, “Rewrite the following in chaste and elegant Bengali”, এবং ‘following’ –এ ছিল রবীন্দ্রনাথের ‘ছিন্নপত্র’র একটা অংশ ।  প্রশ্নপত্র সম্ভবত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ।  মাত্র ১০৬ বছরের গোড়াতেই ‘রোদ্দুর রায়’ নামধারি এক জনৈকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও পুলিশে এফ.আই.আর (‘হাংরি জেনারেসনের’ মানুষগুলো লজ্জায় সীতাপথ না নেয় !) এই মর্মে যে, জনৈক নাকি রবীন্দ্রনাথকে বিকৃত ও অপমান করেছেন । প্রশ্ন হচ্ছে, কেন ? ও কিভাবে ? যে বাঙালি একটা সময় এটা বিশ্বাস করত যে, রবীন্দ্রনাথ “chaste and elegant Bengali” লিখতেই পারে না, সেই বাঙালির ছানাপোনাদের এই অভিযোগের যোগ্যতাটা কি !

ছবিঃ ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত

যাই হোক, এই আলোচনার গোড়াতেই বলে রাখি ব্যক্তি ‘রোদ্দুর রায়’, আমার মামাতো ভাই নয় যে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ আমি খন্ডাতে বসব । তাই তাঁকে নিয়ে আমার আগ্রহ নেই । আমার আগ্রহ, তাঁর ব্যবহৃত ভাষার সম্বন্ধে কয়েকটি কথা বলাতে, অবশ্যই ব্যক্তিগত মতামত, কারো মানামানির পরোয়ানা ও পরোয়া কোনটাই নেই ।

আমার প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে আজকালকার বেশিরভাগ ছেলেছোকরারা, মেয়েরা কোন বাংলা ভাষা বুঝতে পারে ? চন্দ্রিল ভট্টাচার্য একটা অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, যে প্রজন্মের মধ্যে “কিউ কি” থেকে বাংলায় “কেন কি” চলে এসেছে, সে প্রজন্মের কাছে বাংলা ভাষার পিঠ সত্যিই দেওয়ালে ঠেকে গেছে । বাস্তবিক তো তাইই, না, বাংলা ভাষার পিঠ দেওয়ালে ঠেকেছে না ঠেকেনি সেটা বলতে পারব না কিন্তু একথা জানি যে, এই সময়ে নতুন প্রজন্ম অভিধানিক শব্দচয়নে লেখা টানা গদ্য পড়তে গেলে নমস্কার জানায়, গদ্যের মধ্যে রঙিন ছবি না থাকলে ইন্টারেস্ট হারিয়ে ফেলে, একটু গভীর ব্যাপারে লেখাপত্তর দেখলেই আঁতকে উঠে ল্যাজ গুটিয়ে পালায় । তার চেয়ে বরং যে লেখায়, ‘পিলিক’ আছে ‘বাওয়াল’ আছে সেখানেই ‘হেব্বি’ ‘মস্তি’ পায়, নাহলে সৃজিতীয় ভাষার ঘ্যাম ইউজে লেখকের ‘পুঁটকি’ ‘জ্যাম’ করে দেয় । বেশ করে । তা এই হাল ফ্যাশানের কেতাদুরস্ত হাল-হকিকতের ওপরেই তো নির্ভর করবে, নেহা ধুপিয়া থেকে স্যান্ডি সাহা অথবা ধিনচ্যাক পুজা থেকে রাণু মন্ডল কিম্বা রাজনৈতিক বিরোধিতার ভাষা থেকে চ্যানেলে চ্যানেলে তর্কের ভাষায় বাঙালির গন্তব্য । এখানে ‘রোদ্দুর রায়’ ব্যাটাচ্ছেলে বাঙালির ‘রবিন্দোনাথে’র (রবীন্দ্রনাথ) গান আর ‘আব্বৃতি’তে (আবৃত্তি) হাত দিয়েই এমন ফেঁসেছে যে ‘অসন্মানে’ (অসম্মান) টেঁসে না যায় ।
ছবি ঃ ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত


ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলি, ব্লগের আগের লেখাটির প্রতিক্রিয়াতে একজন পাঠিকা জানাল যে, গদ্যের ভাষা বড্ড সেকেলে আর কঠিন, এই দিয়ে নতুনদের কাছে বিখ্যাত(পড়ুন ভাইরাল) হওয়া যাবে না । অথচ এই অধম কি আর করে, ভাইরাল (করোনা ফিভারের মত নয়, ইনফ্লুয়েঞ্জা হলেই ধন্যি ধন্যি আর কি, দাদা !)  হবার অভিলাষ ‘দিমাগে’ নিয়ে একটা ‘কোশিশ’ করেই ফেলছে । তবে দুর্যোধনের জন্মলগ্নে সে যেমন গাধার মত ডেকে উঠে জাত চিনিয়েছিল, তেমনি যতই বসন্ত আসুক, এই বায়সও কি আর কুহু গাইতে পারবে ! তাই, চেষ্টা করি কিন্তু ‘আশার ছলনে ভুলি’লে হইবেক লাই বাপু । স্বধর্মে মৃত্যুই শ্রেয় কিনা !

সে নিজের কথা থাক গে ! ‘কম কষ্ট করে, তার থেকেও কম ত্যাগ স্বীকার করে – সব থেকে বেশি গ্ল্যামার ও লাভ’ পাওয়ার পেটিবুর্জোয়া মানসিকতায় যখন আমরা এই ‘মিনিমাম ইনভেস্টমেন্ট ম্যক্সিমাম প্রফিটের’ বুর্জোয়া অর্থনীতির রমরমা বাজারে দাঁড়িয়েই আছি তখন, যুগের যেমন দাবি তেমনটাই তো সাপ্লাই লাগবে নাকি । নাকি ফোর-জি’র বদলে নোকিয়া ১১০৮ দিলে হবে । রোদ্দুর রায় ঠিক সেটাই করেছে । একটা সবুজ মাল মাথায় চড়িয়ে হক্কলকে লাল মালের নেশায় মাত করে দিয়েছে । সমাজের বাবুরা চিল্লিয়েছে, গেল গেল আমাদের সমস্কৃতি স্ট্রাগল ট্র্যাডিশন সব গেল !

কিন্তু বাপু বুকে হাত রেখে বলেন দেখি, আপনি কি জানেন না, যে, ভাষা যুগে যুগে বদলেছে । অভিযোগ ও খিস্তি-খেউড়ও কম হয়নি তা নিয়ে । স্বয়ং বিদ্যাসাগর যখন সংস্কৃতগদ্যরীতি ছেড়েছিলেন, তখন তাঁর ব্যবহৃত বাংলাকে ‘বিদ্যাসাগরী বাংলা’ বলে অনেকেই তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতেন । করতেন কিনা বলেন ? তাই এ নিয়ে অকিঞ্চিৎকরদের দুক্কু পাবার কিছু নেই, আর রক্কে করো রগুবীর বলে মাথা কোটার প্রয়োজনও নেই । আমি এই ভাষা বিষয়ে কয়েকটি অভিযোগ ও পরবর্তীতে সেই অভিযোগের ফলাফল নিয়ে মূলত বুলি আওড়াবো ।

সাহিত্যের ইতিহাসের সিলেবাসে ছিল, ‘আলালের ঘরের দুলাল’ বাংলা চলতি ভাষায় প্রথম সামাজিক উপন্যাস, মনে আছে নিশ্চয়, না মনে থাকলে আর কি, বগল বাজাও ! তা সেই উপন্যাস নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বঙ্কিমবাবু লিখেছিলেন,

“দুইটি গুরুতর বিপদ হইতে প্যারিচাঁদই বাংলা সাহিত্যকে উদ্ধার করেন । প্রথমটি, সংস্কৃত ও সংস্কৃতানুকারী বাংলা ভাষার নিগড়, দ্বিতীয়টি, বাংলা সাহিত্যের উপর সংস্কৃত উপাখ্যান ও কাব্যের বিষয়বস্তুর প্রভাব ।”

অর্থাৎ ভাষার বদল ঘটানো দরকার হল । ট্যাঁরট্যেঁরে ইয়া লম্বা লম্বা প্যানপ্যানানি গালগল্প আর চলবেনি । কেন এমন, কেননা, বঙ্কিমবাবুই কৈফিয়ত দিয়েছেন, সে যুগের,

“সাহিত্যের ভাষাও যেমন সঙ্কীর্ণ পথে চলিতেছিল, সাহিত্যের বিষয় ততোধিক সঙ্কীর্ণ পথে চলিতেছিল । ... বাঙ্গালি লেখকেরা গতানুগতিকের বাহিরে হস্তসম্প্রসারন করিতেন না ।  জগতের অনন্ত ভান্ডার আপনাদের অধিকারে আনিবার চেষ্টা না করিয়া, সকলেই ইংরেজি ও সংস্কৃতের ভান্ডারে চুরির সন্ধানে বেড়াইতেন ।”

এ কথা কি বলা তবে অন্যায় হবে যে, ‘তৎকালীন বঙ্গসমাজ’ একদিকে যেমন প্যারিচাঁদকে রক্ষাকর্তা ঠাউরেছে অন্যদিকে বিদ্যাসাগরকে (লোকটা চেষ্টা তো করেছিল!) যথেষ্ট ঠুকেছেও । যদি ব্যাটা বঙ্কিম চাটুজ্জ্যেকেই পাকড়াও করি তবে জেনারেশন ২০২০ এর কোন পালোয়ান, ‘আননন্দমঠ’-এর শুরুতেই লেখা,

“গৃহারণ্যমধ্যে শৈলশিখরবৎ শোভা পাইতেছিল । শোভাই বা কি, তাহার দ্বার রুদ্ধ, গৃহ মনুষ্যসমাগমশূন্য, শব্দহীন, বায়ু প্রবেশের পক্ষেও বিঘ্নময় । তাহার অভ্যন্তরে ঘরের ভিতর মধ্যাহ্নে অন্ধকার, অন্ধকারে নিশীথফুল্লকুসুমযুগলবৎ এক দম্পতি বসিয়া ভাবিতেছে”।

পড়ে নিজে দুদন্ড ভাবতে বসবে না । এমনকি এও হতে পারে যে, ‘পাগলা’র পরে দু-অক্ষর প্রেম কি জুড়ে খিস্তি অব্দি দিতে পারল না, তার আগেই দাঁতগুলো খুলে পড়ে গেল । এতে অবাক হবার কিছু থাকবে না ! তাই আজও বাঙালিদাদুরা হস্তসম্প্রসারন কতটা করেছে জানি না, তবে কীর্তিমানদের পথানুগামি নাহলেই কেলিয়ে বেন্দাবন দেখিয়ে দেবার উপায়টা নিশ্চিত ভেবে রেখেছে ।

সুতরাং, বঙ্কিমের ভাষাও আমাদের আজ কাম্য নয় । তাহলে কি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথকেও বাঙালি নিতে পারছে আজ ? সিলেবাসের আর বসন্ত উৎসবের তেরঙ্গা আবিরি বাহারের ফেসবুকিও নিজস্বীর বাইরে,  ক’জন বলতে পারে,

“ওগো, প্রাসাদের শিখরে আজিকে কে দিয়েছে
কেশ এলায়ে, কবরী এলায়ে?
ওগো নবঘন-নীলবাসখানি
বুকের উপরে কে লয়েছে টানি ?”

এটা বাংলার বর্ষা প্রসঙ্গে লেখা না প্রেমিকার কল্পনা প্রসঙ্গে একটি কবিতা ? সন্দেহ হয় যথেষ্টই ।  অথচ বাংলা ভাষাকে এই দাড়িয়ালা লোকটা যে বিশিষ্টতার ভিত্তিপ্রস্তরে দাঁড় করিয়ে সাতমহলা গড়ে দিয়েছে সে বিশিষ্টতা শুধু ভাষার নতুনত্বের বিচারেই ষোলোআনা নয়, ব্যবহারে ও প্রয়োগের ব্যাপারেও খাঁটি আঠারোআনা । সব অতীতকে পেছনে ফেলে, লোকটা কর্ণকুন্তিসংবাদে, কর্ণের শেষ উক্তিতে যে ভাষা ব্যবহার করলেন,

“মাতঃ, করিয়ো না ভয়।
কহিলাম পান্ডবের হইবে বিজয় ।
প্রত্যক্ষ করিনু পাঠ নক্ষত্র-আলোকে
ঘোর যুদ্ধফল ।”

তা নতুনত্বের ও প্রয়োগের বিচারে ‘মহাভারত’কেই পিছনে ফেলল না, ‘ইলিয়ড’ অব্দি অতিক্রম করে গেল এবং পৌঁছল, 'শার্লেমনের সেনাপতি রোঁলা থেকে নেপোলিয়নের সেনাপতি মার্শাল নে পর্যন্ত' । বাঙালি বুঝতেই পারল না কিভাবে ভাষার বদল হল যুগের ধর্মে । এমনভাবেই পদ্য থেকে গদ্যে এসে আজ কবিতার শরীর ঢেকে গেছে কিছু অমৃতে কিছু গরলে ।
ছবিঃ ইন্টারনেটের দৌলতে প্রাপ্ত


যদিও, ভাষা ব্যবহারের দিক দিয়ে শরৎচন্দ্র আজও নবীন পাঠককে যে আকৃষ্ট করে তা বলতেই পারি, তবে তাও আজকের পক্ষে কিছু অতিশয়োক্তি হবে বলেও মনে করি । তাই সে দিক না মাড়িয়ে, একেবারে আধুনিক যুগে এসে যদি গোত্তা মারি তবে, অদ্বৈত মল্লবর্মনের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এ চাওয়া-পাওয়ার আবেগের মন্থনে লেখা,

“খালটা শুকনা ছিল । আজিকার ঢলে মাঠ-ময়দান ভাসিয়াছে, হালদেওয়া ক্ষেতগুলির ভাঙ্গা ভাঙ্গা মাটি ঢলে গুলিয়া গিয়া কাদা হইয়াছে । সেই কাদাগোলা জল আল উপচাইয়া পড়িয়াছে আসিয়া খালে । শত দিক হইতে শত বাহু বাড়াইয়া দিয়া ক্ষেতেরা কালের দৈন্যদশা প্রাচুর্যে পূর্ণ করিয়া দিয়াছে । খালে তখন উজানের ঠেলা । যে খাল আগে নদীর জল টানিয়া নিয়া কোনরকমে শুকনা গলা ভিজাইয়া রাখিত, আজ সে খাল উল্লোলিত, ক্ললোলিত, উথলিত হইয়া স্রোত বাঁকাইয়া ঢেউ খেলাইয়া বুক ফুলাইয়া তার ভরা বুকের উপচানো জল তিতাসের বুকে ঢালিয়া দিয়াছে ।”

এই অংশখানি পড়ার পরে যে পাঠকের চোখে দু-ফোঁটা নোনতা জলের রেখা টানবে না সে পাঠকের বিষয়ে করুণাই হয়, তবে কি মেনে নিই যুগধর্ম বলেই ।

সরকার বলেছে ‘লিটারেসি’ মানে যে কোনও একটি ভাষায় লিখতে পারা বুঝতে পারা ও পড়তে পারার দক্ষতাকে ধরা হবে । ক’পিস বাংলা মিডিয়ম লিটারেট আছেন বলেন দেখি যদি কমলকুমার ‘অন্তর্জলী যাত্রা’র থেকে তুলে দিই এই অংশ ও একথায় প্রকাশ করতে বলি, তাহলে সদর্প প্রত্যয়ে বুক চিতিয়ে দাঁড়াবেন,

“আলো ক্রমে আসিতেছে । এ নভোমণ্ডল মুক্তাফলের ছায়াবৎ হিম নীলাভ । আর অল্পকাল গত হইলে রক্তিমতা প্রভাব বিস্তার করিবে, পুনর্বার আমরা, প্রাকৃতজনেরা , পুষ্পের উষ্ণতা চিহ্নিত হইব । ক্রমে আলো আসিতেছে । ”

অন্যতম লেখক রামকুমার মুখোপাধ্যায়ের লেখা, যা ২০১৩ সালে আনন্দ পুরস্কার পায়, সে লেখার মর্ম নিশ্চয় বাঙালি তরুণ-তরুণীরা বুঝতে পারে, তারা কি জানে,

“প্রলয় সমাপ্তিতে বিষ্ণু অনন্তশয্যায় । নাভিপদ্মে অবস্থান করে ব্রহ্মা । নারায়নের কর্ণমল হতে মহামায়া দুটি শিশুর জন্ম দিল । প্রথম শিশুটি জন্মের পর মধু পান করতে চায় তাই দেবী তার নামকরণ করল মধু । অন্য শিশুটি কীটের ন্যায় দেবীহস্তে শুয়েছিল তাই কৈটভ । শিশু দুটি সপ্তসাগরে ক্রীড়ায় মগ্ন থাকে । ”

এই অংশ পুরাণের কোন ঘটনার দিকে লেখক ইঙ্গিত করেছেন । তারা কি জানে, পৃথিবীর সমার্থক শব্দ হিসেবে মেদিনী কেন এসেছিল ? আজ আর সে যুগ নাই । ইয়ো ইয়ো হানি সিং আর ‘গেন্দা ফুল’-এর মৌতাতে, বাঙালি উপন্যাসের ‘খোয়াবনামা’ ভুলেছে, সে ভুলেছে চরিত্রনির্মানের ব্যতিক্রমি ভাষা ব্যবহার,

“তা সে কি আজকের কথা ? সেই কোন আমলে বিকেলবেলা বেলা ডোবার আগে আগে মজনু শাহের হাজার হাজার বেশুমার ফকিরদের সঙ্গে করতোয়ার দিকে ছোটার সময় গোরাদের সর্দার টেলরের বন্দুকের গুলিতে মরে সে পড়ে গিয়েছিল সাদা ঘোড়া থেকে । সারা অঙ্গে তীর বেঁধা সেই ঘোড়া উড়ে গেল কোথায় কে জানে,  আর এখানে এই কাদায় পড়ে থাকতে থাকতে মুনসির লাশ জ্বলে উঠলো লাল আগুন, নীল আগুন, কালো আগুনের শিখায় । তিন দিন তার  জ্বলন্ত শরীর ছোঁয়ার সাহস কারো হল না, কাফন দাফন সবই বাকি রইলো দেখে মুনসি কী আর করে, গুলিতে ফাঁক-করা-গলা নিয়ে সোজা চড়ে বসলো পাকুড় গাছের মাথায় । সেই থেকে মুনসি আগুনের জীব । তার গোটা শরীর, তার লম্বা দাড়ি, তার কালো পাগড়ি, তার বুকের শেকল, তার হাতের পান্টি সবই এখন আগুনে জ্বলে ।  ”

ক’জন নাম শুনেছে সন্তোষকুমার ঘোষের, অথচ ‘গাল্লি বয়’ বক্স অফিসে ধামাকা করলেও,  ‘কিনু গোয়ালার গলি’র মূল্য থাকে না, আসলে,

“কিনু গোয়ালার গলির প্রাণ, সে কি আর চৌরঙ্গির মত রঙ্গরসে ভরা হবে । প্রাণ আছে, কিন্তু বাঘ-ভালুকের মত এমন তেজী নয়, ময়ূরীর মত নৃত্যপরা নয়, হরিণের মত চঞ্চল নয় । আছে কেঁচোর মত, কোনক্রমে আপন অস্তিত্ব নিয়ে
বিব্রত । বুকে হেঁটে চলে, এগোয় কি এগোয় না ।”

আমরা আজ শুধুই ছুটছি । উপভোগ করছি ছুটতে ছুটতেই । কোনও বিকেলে শান্ত নদীতীরে দাঁড়িয়ে শীতল বায়ুর দমক আর পশ্চিমপারের লাল আভা নয়, তার চেয়ে কানে হেডফোন লাগিয়ে ট্যুইশনের তাড়া হোক বা অফিসে বসের মুখ ঝামটার বিড়ম্বনা, সেই আমাদের প্রাত্যহিকতার রোজনামচা । এরই মধ্যে কখন জীবনের ‘টিকটক’ থেমে যাবে বুঝতেই পারব না ছুটতে ছুটতে, আসলে, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর কথায় বললে,

“শস্যহীন জনবহুল এ-অঞ্চলের বাসিন্দাদের বেরিয়ে পড়বার ব্যাকুলতা ধোঁয়াটে আকাশকে পর্যন্ত যেন সদাসন্ত্রস্ত করে রাখে । ঘরে কিছু নেই । ভাগাভাগি, লুটালুটি, আর স্থানবিশেষে খুনাখুনি করে সর্বপ্রচেষ্টার শেষ । দৃষ্টি বাইরের পানে, মস্ত নদীটির ওপারে, জেলার বাইরে  - প্রদেশেরও; হয়তো-বা আরো দূরে । যারা নলি বানিয়ে ভেসে পড়ে তাদের দৃষ্টি দিগন্তে আটকায় না । জ্বালাময়ী আশা; ঘরে হা-শূন্য মুখথোবড়ানো নিরাশা বলে তাতে মাত্রাতিরিক্ত প্রখরতা । দূরে তাকিয়ে যাঁদের চোখে আশা জ্বলে তাদের আর তর সয় না, দিনমানক্ষণের সবুর ফাঁসির শামিল । তাই তারা ছোটে, ছোটে । ”

তাই কে ‘রোদ্দুর রায়’কে টেকাবে আর কে ‘শঙ্খ ঘোষ’কে, সে বিচার সময়ই না হয় করুক । অযথা সংস্কৃতির নীতি কোটাল সেজে কিইবা হবে, কথায় বলে,

“রাখে হরি মারে কে”

সংস্কৃতি থাকার হলে এমনিই থাকবে, নইলে যাবেই । সময়ের দাবিতে বড় বড় সভ্যতা মাটির গর্তে সেঁদিয়ে গেল আর আমাদের বাংলার সংস্কৃতি রক্ষা ! নইলে শান্তির জন্য ভাবুন,

“পাগলে কি না বলে, ছাগলে কি না খায়”

খামোকা পাত্তা দিয়ে প্রেসার বাড়ানো আর কি, ধ্যুর মশাই ! তাই বলি কি,

রোদ্দুর রায় কি খায় আর কি যে বানায়
                                 আপনি ভাবুন, হিন্দি-চিনই কবে হল ভাই-ভাই?

বিঃদ্রঃ - লেখাটা নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করলাম না আর, যা বলার মোটের ওপর যথেষ্ট হয়েছে । পরে কেউ তুকতাক করলে রামায়ন-মহাভারত--জয়দেব-মুকুন্দরাম-বৃন্দাবন দাসের চৈতন্যভাগবত ঘুরে এসে সবুজপত্র-কল্লোলযুগ-জীবনানন্দে চক্কর লাগিয়ে লীলা-মহাশ্বেতা-শিবনারায়ন-সুধীন্দ্রনাথ-বিষ্ণু-সমরেশ-তসলিমা-সুনীল-জয় ও শেষে নবারুণ ভচ্চাজ-এ এসে চরণামৃত খাওয়া যাবে না হয় তখন । 

No comments:

Post a Comment

I am waiting for your valuable comment. Please comment. Thank you..