Tuesday, 31 March 2020

শিরোনামহীন প্রলাপগুলো, উপহাসের কি সত্যিই কিছু কারণ ছিল ?

। ৩ ।

“উত্তমে উত্তম মিলে অধম অধমে ।
কোথায় মিলন হয় অধম উত্তমে ।।
আমি যদি কথা কহি একে হবে আর ।
পড়িলে ভেড়ার শৃঙ্গে ভাঙ্গে হীরা ধার ।।”


অবসরযাপনে যে শুধুই মধুর স্মৃতির পুষ্পরাজি আনন্দমালিকা রচনা করবে এমন নয় । মাঝে মাঝে কিঞ্চিৎ বেদনার ঘনঘটাও আকাশকে ফ্যাকাশে করে বৈকি । প্রসঙ্গক্রমে আজ সে সম্বন্ধেই দু-চার কথা লিখতে ইচ্ছে হয় । বহুদিন কেটে গেছে যদিও, তবুও এতদিন পরে এ বিষয় উত্থাপনের মধ্যে কিছু সার্থকতা না থাকলেও, প্রয়োজন নিশ্চিত আছে । বহু কিশোর-কিশোরি, এমনকি যুবক-যুবতীদের (মূলত আমার ছাত্রছাত্রীরা) কাছ থেকে এখনও যখন একই অভিজ্ঞতার কথা শুনি এবং অন্তরের অতীতের সঙ্গে যা মিলে যায় সহজেই, তখন টের পাই, প্রয়োজন নিশ্চিত আছেই ।  

আজকাল দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর আন্তরিক প্রচেষ্টায় উপরে উদ্ধৃত লাইনগুলোর (বাংলা অনার্স পড়েছে এমন শিক্ষিত বাঙালিও ক’জন বলতে পারবে, এই ছত্রের লেখক কে, কে জানে, বাকিদের তো ছেড়েই দিলাম !) প্রথম দুটি যে আমাদের জগতে একেবারে অকেজো, সে কথা স্বচ্ছ কাচের মতই পরিষ্কার । এখন কি বাঘ কি গরু সকলেই একই ঘাটের মোসাহেব, জাত হিসেবে হিংস্র হোক বা অহিংস, সকলেই বুঝেছে যে তদ্বিরের ধাক্কা পিছনে না থাকলে জল তো দূরের কথা ঘাটের ছবি অব্দি দৃষ্টিগোচর হবে না । কিন্তু পরের দুটি লাইনের তাৎপর্য এখনও নিজবলে বলিয়ান । সুতরাং, প্রথমেই স্বীকার করে নিই যে, যদিও ভুল বোঝার যথেষ্ট উপাদান সরবরাহে কোনও কসুর করব না, তদাপি যেন নিজগুণে মার্জনাশীলতা বজায় রেখে এই মক্কেলের বংশ-উদ্ধারের খেলায় মাতবেন না ।

এসব ঘটনার শুরু মোটামুটি ২০০৯ থেকে । তা চরম প্রতাপশালী হয়ে ওঠে ২০১১ থেকে ২০১৩ অব্দি । তারপরের থেকে তা ক্রমাগত ক্ষমতাহ্রাসের গতি বজায় রেখে আজ আর মাথা তোলে না সবিশেষ । তুলতে চেষ্টা করলেই অভিজ্ঞ সর্পহন্তারকের মত তার মাথা থেঁতলে দিয়ে তবেই আরাম পাই । বই-পড়া আর মাঠে গিয়ে খেলা ছাড়া যখন আমাদের আর কোনও আমোদের উপকরণ ছিল না তখন আমি দুটোই করেছি সমান উত্তেজনায় । সিলেবাসের বই-পড়া বিষয়ে আগ্রহ না থাকলেও আমার বড় দাদুর (যিনি একাধারে অকৃতদার ও রসিক পাঠক) সৌজন্যে রূপকথা থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্কদের পাঠ্য সমস্ত প্রকারেরই গল্প-উপন্যাসের পোকা হয়ে উঠি । ক্লাস থ্রি থেকে নাইন অব্দি আমাকে এ বিষয়ে বেগ পেতে হয়নি । কেননা দাদুর ভাঁড়ার ফুরোলেও প্রথমে স্কুলের লাইব্রেরিয়ান রামকৃষ্ণবাবুর দৌলতে ও পরে আমার সহপাঠি ও সমঝদার পাঠক প্রিন্স ইঞ্জামামুল হকের অকৃত্রিম উদারতায় ওঁর এবং বর্ধমানের জেলা লাইব্রেরি ও রামকৃষ্ণ মিশন লাইব্রেরির বদান্যতায় বহু বইয়ের রসাস্বাদন করেছি ।  কিন্তু তারপর থেকে একটা দূরত্ব তৈরি হয় প্রিন্সের সাথে, সময়ের কারণেই বোধহয়, ব্যক্তিগত ঝামেলা তো আজও কিছু নেই । তাই বিভিন্ন বই পাঠের আনন্দ ভাগ করে নেবার আর কোনও মানুষ আমার রইল না । দাদুও ততদিনে পরলোকে । তবে আমি যে বন্ধুহীন ছিলাম এমনটা নয় ।


ছবি ঃ শিশির ভট্টাচার্যের কার্টুন (সোর্স ঃ https://www.cartoonpattor.in/)


কিন্তু বই-পড়া যে কেবলই ভবিষ্যতের বৈষয়িক লাভের প্রয়োজনে নয়, এমন কথায় বিশ্বাসি কেউ ছিল না । যে সব বন্ধুরা বিভিন্ন পরীক্ষায় অসাধারণ মেধার পরিচয় রেখেছে, তারাও কোনোদিন সিলেবাসের বাইরে একটাও কাব্য বা উপন্যাসপাঠে আগ্রহী হয়েছে, এমন দৃষ্টান্ত বিরল । তবে একথা ঠিক যে, ওরা আজ আমার থেকে আর্থিক বিষয়ে অনেক উচ্চতায় । আবার সাধারণ মানের ছাত্ররা যারা আমার বন্ধুবৃত্তের প্রকৃত এলিমেন্ট, তাদেরও গ্রন্থপাঠের কোনও আকাঙ্খা ছিল না । তারা তো আজ বৈষয়িক ব্যাপারেও চরম পরাস্ত । তবে বাঙালি জীবনে যে প্রকৃত জ্ঞানপিপাসুর দোর্দন্ডপ্রতাপের আজও কিছু কদর আছে তা বেশ বুঝতে পারি । তা কয়েকজন অবোধ ছাগলের কবি-লেখক হবার উচ্চাশাজনিত ম্যাঁহ ম্যাঁহ ডাক শুনেই হোক কিংবা নেতা-মন্ত্রী থেকে বিভিন্ন অর্থবানের ডিগ্রীর প্রতি ঝোঁক ও নানা কৌশলে জব্দ করে দলে ভিড়ানোর নজির দেখে ।

অথচ সে বয়সে অন্তরের একাকিত্বের যন্ত্রণা মেটাতে যখনই বন্ধুমহলে কোনও বই প্রসঙ্গে কথা তুলেছি, দেখেছি একটা অদ্ভুত উপহাসের ঝোঁক ধেয়ে এসেছে । আঁতেল বলে গালিও শুনেছি, শুনছি । উপহাসের দুটি কারণ থাকে, প্রথমত ঈর্ষা ও হিংসা, দ্বিতীয়ত, বৌদ্ধিক অহংকার । কিন্তু এ এক অদ্ভুত ব্যাপার । কেননা বন্ধুদের মধ্যে যে “ও এই বইটা আমার আগে পড়ে ফেলল কি করে”- এমন ঈর্ষা ছিল, তাও না, আবার “ও আমার থেকে বেশি জানে”- এমন হিংসা ছিল, তাও নয় । অন্যদিকে, “আসলে ও কিস্যু বোঝে না, গর্দভ একটা”- এমন যোগ্যতাসম্পন্ন জ্ঞানগর্ভ অহংকার ছিল এমনটাও নয় । এ যেন তিন পেনি মুদ্রার (পড়ুন পথকুকুরের) জলসাঘরের প্রতি অবহেলার মত । একবার বর্ধমানের এক ডাক্তারবাবুর নিজ উদ্যোগে বানানো মহল্লাপাঠাগারের ভবিষ্যত রক্ষায় অস্থির হয়ে উঠলে, আমি বন্ধুদের প্রস্তাব দিই, যে আমরা কি ওঁকে সাহায্য করতে পারি, তাতে আমাদেরও লাভ হবে আর পাড়ার গরিব ছেলেমেয়েগুলোর একটা পড়ার উপায় হবে ।  এরপরে বিদ্রূপের যে অট্টহাস্য আমার সম্মুখে ও পশ্চাতে নির্বিচারে শুরু হয় তা সত্যিই বড় যন্ত্রনার ছিল, সে বয়সের পক্ষে । এমনকি আমার এক ঘনিষ্ট বান্ধবী যখন এক অপরিচিতার সাথে আমার আলাপ করায় সে অব্দি আমার নাম শুনে তাজ্জব হয়ে তাকিয়ে থাকে এবং কানাঘুষোতে(বর্তমান মিম) আমার ব্যাপারে যা যা বিদ্রূপ শুনেছিল সবই বলে ।  সে পীড়া আজও বিস্মৃত হইনি ।

এ তো গেল বইপড়া বিষয়ে কথা, বই-কেনা নিয়েও কম কিছু হয়নি । সত্যি বলতে কি, সামর্থ অর্জনের উপায় হবার পর থেকে আমি বই কিনেই পড়ি । কিছু সময় তা সামর্থের বেড়া ডিঙিয়ে ক্ষুধার রাজ্যে নিয়ে গেলেও কিনি । আমার ভ্রাতৃসম বন্ধু অর্ণব এ বিষয়ে বিস্তারিত জানে, কেননা এমনও হয়েছে দিনের পর দিন রাত্রে আমূলের গুড়ো দুধ আর মুড়ি খেয়ে কাটিয়ে দিলে, কলেজ স্ট্রিটে গিয়ে সে আমার ঘাড় ধরে রাস্তার দিকে মুখ ঘুরিয়ে দিত, কেননা তা না হলে অভুক্ত থাকা ছাড়া উপায় থাকত না আর । এ নিয়ে বহু বন্ধু ও পরিবারের থেকেও বিস্তর গালি খেয়েছি ও পরামর্শ পেয়েছি । কিন্তু নিজেকে বদলাবার কথা মাথায় আসেনি, আসে না । বলা ভাল, আমার পত্নীটি এ ব্যাপারে কিছুটা অন্যরকম । সে মাল্টিপার্পাস স্কুলের র‍্যাঙ্ক করা ও আশুতোষ কলেজ থেকে ফার্স্ট ডিভিসন পাশ করা ছাত্রী হয়ে ও বই-পড়া বিষয়ে অনাগ্রহী হয়েও আমার বই-কেনা বিষয়ে আপত্তি করেনি । সে মুখ ব্যাজার করেছে ঠিকই, কিন্তু বইমেলায় গিয়ে আমার প্রিয়তম একটি মহার্ঘ বই কিনতে পিছপাও হয়নি । আজ আমার বন্ধুদের ও আত্মীয়দের বলতে পারি যে, দুনিয়াতে বই পড়ার আরাম, আনন্দ ও শখের শিক্ষার সৌখিনতাতে কিছু মানুষ বুঁদ হয়ে থাকতে চায়, তারা সকলেই বই কিনেই পড়ে । কেননা চেয়ে পড়া বই ফেরত চলে গেলে, পুনর্পাঠের মৌতাতে মগ্ন হওয়া যায় না ।  সে যন্ত্রনার প্রকার কয়েকটি আহাম্মকই বোঝে, বৈষয়িকবোধে অবরুদ্ধ পন্ডিতরা নয় ।  

কিন্তু ফল কি হল ?  আমার সম্বন্ধে এই যে এত বিদ্রূপ, তার ফল কি হল ! আজও সেই সব বন্ধুরা রকের চায়ের দোকানে বসে পপুলার পর্ণস্টারের দেহভঙ্গি থেকে শুরু করে ক্রিকেটারের দাড়ি ও বলিউডি সিক্সপ্যাকের আওতার বাইরে বেরতে পারল না ।  কয়েকজন তো আঠাশ বছর বয়সেও বাঙালি মধ্যবিত্তের অতিপ্রিয় একটা চাকরি (সরকারি বা বেসরকারি) অব্দি জোটাতে পারেনি যে কোনও কন্যার পিতা নিশ্চিন্ত হতে পারে । বাপের পয়সায় দামি বাইক বাগানো ছাড়া আর দুবেলা বাপের হোটেলে খেয়ে গতরে পেশির বহর দেখানো ছাড়া আর কি করেছে তারা । এখন বলতেই পারে, “তাতে তোর কি, তোর কাছে তো চাইতে যাইনি”, তাদের জন্য বলি সেদিনও আমি বই কারো বাপের পয়সায় কিনিনি, কারো বাপের খেয়ে পড়িনি, তখন যদি খোঁচার প্যাঁকাটি পশ্চাতে ছুঁড়েছিলে, এখন বংশ-কঞ্চিকা তো সইতেই হবে ।

শ্রেষ্ঠতম কবির, “পড়িলে ভেড়ার শৃঙ্গে ভাঙ্গে হীরা ধার” বচন সম্বন্ধে বলি, হীরা ভাঙে সত্যই কিন্তু সেসব টুকরো কুড়োনোর লোকের অভাব হয় না যেমন, তেমনই ভেড়ার যে কিরূপ সদগতি হয় সেও বয়স্যজনের অজানা নয় ।

No comments:

Post a Comment

I am waiting for your valuable comment. Please comment. Thank you..