Wednesday, 25 March 2020

শিরোনামহীন প্রলাপগুলো, লকডাউন দিনরাত...

। ১।

“মধ্যরাতের কথাগুচ্ছ কি শুধুই কথা হতে পারে!
গতকাল তো আমি ছিঁড়ে ফেলতে চেয়েছিলাম
মাংসকে চিরে মরা মৃগের ঘন হওয়া রক্ত সেটাও
গাছের পাতার ওপর মাখিয়ে উন্মত্ত এক হরিণ
বেশি কি কিছু বলার ছিল কিংবা আছে ?”

শতানীক রায় লিখেছেন । প্রকৃতপ্রস্তাবে তো তাইই, বলার মত করে বলতে গেলে বল্গাহীন ঘোড়াদল ছুটে আসবেই । শীতরাত্রে একটু উষ্ণতা যেমন তোমার স্পর্শকে ধরে রাখে রোমকূপে তেমন করেই ‘না বলা কথা সব’ জড়িয়ে জাপটে রাখে জীবনের ইতিবৃত্ত । সকাল সকাল কি যে হল আজ – ফিরে পাওয়া শহরে এ আমার প্রথম ঝড় বোধহয় – তাকে নতুন করে পাব বলে আবার হারিয়ে ফেললাম । সত্যি বলতে কি, দুটো ফিঙে পাখি আর দূরাকাশের ঝলমলে রোদ্দুর এলোমেলো করে দিল সবটা ।

এখন একলা থাকার পালা ।  প্রলাপ বলতে যা বোঝায়, হয়তো তাই । তবু কাব্যি করে বলা হত, আচমকা যদি চারপাশ থেমে যায়/ চলাচল থাকে শুধু বাতাসের/ পাহাড়ের ধার ঘেঁষে পাখিদল/ পুষ্পের গান গায় আকাশে । আজকের বরং এটাই সত্যি । জানতে পারলুম, ইংরেজির ১৩৪৮ সালে নাকি ভেনিস শহরে প্লেগের মোকাবিলায় প্রথম কোয়ারেন্টাইন ঘোষণা হয় । অর্থাৎ ‘কোয়ারেন্টা’ বা চল্লিশ দিনের একাকিত্ব থেকেই আজকের কোয়ারেন্টাইন । ২০২০ সালে আমাদের দেশে আপাতত একুশ দিন । একে বিচ্ছিন্নতা বলা যায় নাকি নিজের সাথে গভীরতার সুযোগ । বলা ভাল, এখানে আমি কোনভাবেই দেশের ও দশের অর্থনৈতিক-সামাজিক-জীবনযাপনের সংকট নিয়ে কিছু বলতে চাইছি না । সেসব অন্যত্র । এখন আমার একলা থাকার কথা শুধু ।  

“একই ঘাটে আসা যাওয়া
একই পাটনি দিচ্ছে খেওয়া
কেউ খায় না কারো ছোঁয়া
ভিন্ন জল কে কোথা পান”
- লালন ফকির

জলই আমাদের এখনকার সমস্ত যোগাযোগ । জলের মতই ঢেউ ফিরে আসে এই নদীতীরে, যেখানে রেখে গেছিলাম অন্তিম পদচিহ্ন । তাকে খুঁজে ফেরার কাজ আমার এখন । তাকে ধরেই চলে যাওয়ার পথসন্ধান । ধুলোমাখা ঘর ঝুলের আলিঙ্গনে অস্থির । চিলেকোঠা নয়, তবুও চিলেকোঠার মতই । একটা সময় এখানেই ক্যপ্টেন স্পার্করা যুদ্ধ করেছে কত !  সে নজির আজও দেওয়ালগাত্রে স্পষ্ট । আমাদের গোটা বাড়ি রঙ হয়েছে নতুন করে । আমি শুধু এই ঘর করতে দিইনি । ঢুকতে দিইনি কাওকে । আমার জীবনজুড়ে যারা, তারাও জানে না দশদুয়ারি সিংদরজার ওপারে যে দেশ আছে সে দেশ আঁকা হয়েছে মোমরঙে । আজ তালা ভাঙার পালা । এমন করে গা-জুয়াড়ি তালা যে এ জীবন কোনোদিন লাগিয়ে দেবে, তা কি তখন বুঝেছিলাম, নাকি এখন বুঝছি, সে তালা ভাঙার দিনও আসবে এভাবে, অতর্কিতে ।

এখন বড্ড কিন্তু কিন্তু ভাব । বহুদিন আগে আমার এক প্রেমিকা ছিল । তাকে বড্ড ভালবাসতুম । বহুবছর  হল তার সাথে দেখা নেই, কথা নেই । এখন যদি হুট করে সামনে চলে আসে কোন একদিন গোলপার্ক ক্রসিং-এর মুখে, জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করবে খুব, কিন্তু পারব কি আর, নাকি মুখ দেখাদেখি আর ভদ্রতার কয়েকটি শব্দই হবে মূল তদ্বির । অথচ কত কান্না জমে আছে তার আঁচলে মোছার । কত বুককাঁপা আছে অন্তরের শ্বাসাঘাতে । কত সুখ আছে স্পর্শের আগের নিস্তব্ধতায় । হয়তো কিছুই হবে না । একটা পঁয়তাল্লিশ নম্বর বাস হর্ণ হেঁকে চলে যাবে মাঝখানে । আমি দরজার বাইরেই দাঁড়িয়ে থেকে যাব, নিজের ঘরে ঢোকার ইতস্তত ভাব কাটিয়ে উঠতে কতক্ষণ আর, জানি না ।

২০১২ সাল । নোনাডাঙা বস্তি উচ্ছেদ-পর্ব । একটা নতুন সরকার এ রাজ্যে । একটা আন্দোলন ফিরতি পথে, কয়েকজন বন্ধুর গ্রেফতার হবার খবর এল । ফিরে গেলাম । ফিরে এলাম কদিন পরে । লিখেছিলাম,

আমি তোর নামে পাগল হয়ে সংজ্ঞা হারানোর আগে-
শুনতে পাই, তুই বলছিস,
এখন এর সময় নয়,
অপেক্ষা কর !
তোর অবিনশ্বর ঘ্রাণের শাসন
আমায় সত্যি থেকে স্বপ্নে নিয়ে যায়
আমি ক্লান্ত হই তোর শিকল-বন্ধ চোখের ব্লেডে
অথচ নির্বিকার চিত্তে তুই আমার মুন্ডু টাঙাস ‘বিক্রি আছে’ লিখে ।।


এসব আর কিছুই নয়, সিগারেটের খরচা তোলার নিমিত্তমাত্র । 
আমার প্রথম বই , ৫ টাকার বিনিময়ে বন্ধুদের দিতাম, ফ্লেক তখন আড়াই টাকা  

No comments:

Post a Comment

I am waiting for your valuable comment. Please comment. Thank you..