Sunday, 1 August 2021

Yellow Pages & জীবনের চিরকুট

 

। ১।

হ্যাঁ কলেজে উঠে সিগারেটের খরচ তুলতেই কবিতা প্রথম ছাপিয়েছিলাম। প্রায় সাড়ে চার হাজার টাকাও তুলেছিলাম। গোটা সাত-আটেক কবিতা নিয়ে বাড়ির প্রিন্টারে ছাপানো চারপাতার(এ৪ পাতা চার ভাঁজ) ছোট্ট একটা বই। দাম রেখেছিলাম পাঁচ টাকা। যেখানেই যাই - ট্রেন,বাস,কলেজ,বাজার, চায়ের দোকান, মাঠেঘাটে - সঙ্গে থাকে। যারই সঙ্গে দেখা হত তাকেই গছাতাম। পাঁচ টাকা ছিল হাতের ময়লা, বাচ্চা ছেলেকে সবাই দিয়েও দিত। আর ফ্লেক তখন দেড় টাকা।

এমন লোভ হয়েছিল তাতে, ভেবেছিলাম এভাবেই তন্দুরি চিকেন অব্দি পৌঁছে যাব। কিন্তু দিনের পরে যে দিন গেল, তারপরে টের পেলাম ঐতিহাসিক ভুল হয়ে গেছে কবিতার সঙ্গে জোট করে। তৎক্ষণাৎ বিবৃৃতি দিয়ে 'আত্মসংশোধনের' রাস্তা ধরলাম। 

বই

কাব্য হল বিরাট হইহই-রইরই ব্যাপার। সেখানে কলকে পাওয়ার যোগ্যতা আমার নেই। এমনকি যাঁদের যোগ্যতা ছিল তাঁরাও বাজারি রাজার চাপে একসময় ঔপন্যাসিক হয়ে গিয়েছিলেন বলে কানাঘুষার প্রচলন আছে। আর তাছাড়া আমি কাব্যি বুঝিও না, শুঁকিও না। চারটি বই পড়ে মূর্খের মত প্রবন্ধ লেখার মসজিদ-দৌড়েই এই বান্দা খুশি। কবির বিরাটত্ব বা দর্শন আমার কাছে আম্বানীর সঙ্গে টি-পার্টির মত ব্যাপার - ফলে সযত্নে সেইসব স্বপ্ন সেন্সরড করা আছে।

সেই পাঁচ টাকার বইয়ের একপিস ছবি পাওয়া গেছে। বাপরে বাপ মহা পাপ!

পুনশ্চঃ বাঙালি এইস্যান কবিতা লিখতে লেগেছে যে ব্যাটা রবিবুড়োর প্রাবন্ধিক সত্তাটিকেও নিমতলা ঘাটে জ্বালিয়ে দিয়েছে।

। ২ ।

রমানাথ(রায়) কাকুর সঙ্গে শেষ দেখা নন্দনের এই মাঠেই - এই ছবি দেখলেই শুধু সেকথা মনে পড়ে। তিনি এই ফ্রেমে নেই, তবুও তিনি আছেন। ছবি তোলার জাস্ট আগের মুহূর্তেই তিনি বললেন, তোমরা আড্ডা দাও, আমার সিগারেটের প্যাকেট শেষ, আমিও যাই এবার। তিনি চলে গেলেন।

আমরা ছবি তুললাম, কিন্তু আমাদের আড্ডা আর দেওয়া হয়নি বেশিক্ষণ। স্বপন পাণ্ডা আর আমি বেরিয়ে গেলাম প্রায় একইসঙ্গে, দুজনেরই কিছু ব্যক্তিগত কাজ ছিল। পুষ্পলকাকু আর রামকুমারবাবু জমিয়ে আড্ডা দিয়েছিলেন, জানি।

 

ছবি : নন্দনের মাঠ (2021) 

এই যে এই লোকটা, পুষ্পল মুখোপাধ্যায়, ২০১১সাল থেকে আমার কাকু। রক্তের সম্পর্কের ভাইপোকেও কোনো কাকু এত ভালোবাসা দেয় কিনা আমি জানি না, যা এই লোকটা দিয়েছে। লেখক-সাহিত্যিকদের আসরে আমার দুজন মাত্রই কাকু - রমানাথ কাকু আর পুষ্পল কাকু। বাকি আর কাউকে আমি কাকু বা জ্যেঠু বলিনা। একজনকে বলি দাদা আর বাকি যাঁদের সঙ্গে আলাপ আছে সবাইকেই 'বাবু' কিংবা 'সাহেব' বলেই সম্বোধন করি।

তবুও একথা ঠিক যে, এই ছবির সবাই আমার আত্মীয়। পুষ্পল কাকুর কথা ছেড়ে দিলে, স্বপন পাণ্ডা আর রামকুমার মুখোপাধ্যায়ের মত ভালো মানুষ যাঁরা আচমকা এক আলাপের পরেই কীরকমভাবে আপন করে নিতে পারলেন আমাকে, আমি বুঝতে পারি না, আর এই শিল্পটাই আমি শিখতে চাইছি। আমার মত অর্বাচীন একজনকে এই পর্যায়ের গুণী মানুষরা কীভাবে সাবলীলভাবে, সহজভাবে ও অতুলনীয় স্নেহভরে প্রশ্রয় দিতে পারেন - এটা যেদিন শিখে ফেলতে পারব সেটাই হবে জীবনের সেরা শিক্ষা।

। ৩ ।

Yeh Jawani Hai Dewani - সিনেমার শুরুতে বলা হয় যে, স্মৃৃতির অ্যালবাম একবার খুললে সেখান থেকে বেরিয়ে আসে অসংখ্য কথকতা। কাল থেকে আমার সঙ্গে তাই-ই হচ্ছে। কত কী যে মনে পড়ছে, আনন্দ হচ্ছে আবার আর্দ্রতাও কিছু কম নেই সেখানে।

ছবি : কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা (2014)

। ৪ ।

সময়গুলো হা রে রে রে করে কেটে যায়... বুঝতেও পারি না... এই প্রথম এই ছবি আমার কয়েকজন খুব ঘনিষ্ঠজনের পরিধির বাইরে এল... জুলাই মাস - দিনটাও আসছে, তাই।

ছবি : বর্ধমান বইমেলা (2013)

। ৫ ।

আজকে ছিল ঘর ঝাড়ার পালা। বহু মাস পরে বর্ধমানে এসেছি। এখানেই আমার আসল স্টাডিরুম। এখানেই আমার সব বইপত্র। কলকাতার ফ্ল্যাটে হাতেগোনা কিছু, তাও সেগুলো নতুন করে কেনা, বর্ধমানে সেই বই নেই। তাই বর্ধমানের ঘরের বিশেষ যত্ন নিতেই হয়। আজ সেটাই চলছিল। বেরিয়ে এল কিছু ডাইনোসরের যুগের স্মৃৃতি।


নীল কালিতে আমার হাতের লেখাটি ২০০২ সালের, তখন আমি ক্লাস ফোর। আর পরেরটাতে সাল লেখাই আছে। সময় কেটেছে অনেক। এখন আমার লেখার কয়েকজন পাঠকও আছেন। তাঁদের কয়েকজন জিজ্ঞেস করেন মাঝেমধ্যে যে আমি কবে থেকে লিখি? আমি কিছুই বলতে পারি না, চুপ করে থাকি। আসল কথাখানি হল, লিখি না তো, লেখা রেওয়াজ করি। যা ছাপা হয় সেগুলো কয়েকটা পাড়াতুতো অনুষ্ঠানে স্টেজে ওঠা মাত্র। আসলে আমি প্রাকটিস করি, রোজ বদলাই, ভাঙি গড়ি, শিখি। এটাতেই আনন্দ পাই। বাকি আর কিচ্ছু চাই না। আমি আজীবন প্রাকটিস করে যেতেই চাই। ২০০২ সালের থেকে যেমন ২০২১সালে লেখার মানে কিছু উন্নতি হয়েছে, তেমনই একদিন ২০২১ সালকেও পেরিয়ে যাব - আর এটা হতেই থাকবে আজীবন, যতদিন বাঁচব। এটাই আনন্দ, এটাই সুখ। ফলে এই প্রশ্নের উত্তর আমি জানি না যে, কবে থেকে আমি লিখছি?

। ৬ ।

কত বছর আগের কথা, তবুও প্রয়াস-পত্রিকা এবং সেলিম মণ্ডল নিশ্চিত পেরেছে, জিতে গেছে, যাবেও। কেননা প্রত্যয়ই তাঁদের আশ্রয়। আসলে আমার সঙ্গে তো ৯৯.৯৯৯৯৯% লেখক-কবি-সম্পাদক-সাহিত্যিকের কিংবা তাদের গোষ্ঠীর পরিচয় নেই, যোগাযোগ তাই দূর অস্ত। (কিছু মানুষের সঙ্গে কথা বা আলাপ হয়েছে ঠিকই তবে তা বিবক্ষিত পত্রিকায় লেখা নেওয়ার সূত্রে। তাঁদের সঙ্গে অবশ্যই যোগাযোগ ও আত্মীয়তা আজও অটুট।) ফলে মূলত আমি নিজের দোষেই বিচ্ছিন্ন। এমনকি আমার ফেসবুকের বন্ধুসংখ্যাও খুবই কম, এতটাই যে প্রায় সবাইকেই আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি ও জানি। 



তাই আমার লেখালেখির গণ্ডি ভীষণ সীমিত, কেউ লেখা চায়ও না, আমিও পাঠাই না। ফলে লেখালেখির জীবনে হাতে গোনা কিছু স্মৃৃতিই আমার সম্বল, বাকিদের মত ভরপুর স্মৃৃতিঘর আমার নেই। এদিক সেদিক ঘাঁটতে গিয়ে দু-একটা বেরিয়ে যায় মাঝে মধ্যে। এটাও তেমনই। তাই রোজদিন শেয়ার করার সাধ্য নেই, একটা আধটা দিতে চাই কিন্তু তাতেও ভয় লাগে ফুরিয়ে যাওয়ার। তাই দেওয়াও হয় না। আজ একটা দিতে ভারি ইচ্ছে হল। যাই হোক, তবুও প্রয়াসের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকলেও তাঁদের জানাই ধন্যবাদ আর অনেক অনেক শুভেচ্ছা।

পুনশ্চঃ- তখন আমি আর্য নামে লিখতুম।

No comments:

Post a Comment

I am waiting for your valuable comment. Please comment. Thank you..