Thursday, 24 December 2015

আইনস্টাইনের জেনারেল রিলেটিভিটির ১০০ তম বছর ২০১৫ ও কিছু অভিজ্ঞতা




বিরাট মাপের ফেস্টুন, তাতে লেখা “ডোকরা’র কর্মশালা”, দেখে ভেতরে গিয়ে দেখি কিছু লোকজন অল্প আঁচে কেমন একটা খয়েরি রঙের ক্যাডবেরির মত দেখতে জিনিস গরম করছে আর সেটাকে টিপেটাপে সুন্দর সুন্দর আকৃতি তৈরি করছে । আমি দু একজনের পাশে বসে দেখতে জুটে গেলাম কিভাবে কি হচ্ছে । তাদেরই একজন চারহাতওয়ালা ধ্যানরত এক দেবমূর্তি বানাচ্ছিলেন । কিন্তু সেটা আসছিল না ঠিকঠাক । অনেক চেষ্টার শেষে লোকটি রেগে গিয়ে ওটাকে আবার গরম করে দিল দুমড়ে মুচড়ে । ফলে যা হল তা প্রত্যাশিত নয় । ভাঙতে গিয়ে গড়ে গেল জিনিসটা। খুব সুন্দর একটা মনুষ্য অবয়ব এল । এরপর আবার ভাবনা শুরু, কি করা যায় এটাকে নিয়ে । এত সুন্দর হয়েছে যে মন আর ভাঙার অনুমতি দেবে না । সুতরাং, তিনি আমাকেও বললেন, তুমিও কর তো দেখি বাপু কিছু একটা, বসে থেকো না খামোকা ! ব্যস ফেঁসে গেলাম । কোন সাহসে যে হাত লাগালাম তা জানি না, জীবনে যেখানে কিছুই এসব করিনি, তবুও লাগিয়ে ফেললাম । আর ঐ লোকটির সঙ্গে আড্ডা শুরু হল । ভদ্রলোক ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের লোক । নানা কথার মাঝে তিনি আমাকে রামায়ন, মহাভারত, থেকে শুরু করে সুকুমার রায়, রামপ্রসাদ সেন হয়ে জীবনানন্দে এসে থামালেন । মধ্যিখানে চৈতন্য ভাগবত আর সঙ্গে প্যারাডাইস লস্ট, প্যারাডাইস রিগেইনড ও ইত্যাদি কিছু টুকরো টাকরা রইল । এত আলোচনার শেষে হাতের কাজটা প্রায় কিছুই হল না, তবে তিনি আমাকে বললেন তোমাকে এই এই এই এই গুলো অবশ্যই পড়তে হবে । তুমি তো সাহিত্য ইতিহাস পড়াশুনা করেছ দেখছি, তা অমুক অমুক তমুক তমুক লেখক বাদ দিয়ে গেলে কি করে ? পড়ে ফেল নইলে পরেরবার দেখা হলে তো আর কথা বলার আলোচনা করবার কিছু থাকবে না । শিক্ষিত হতে হবে । আমি বললাম নিশ্চয় । বেশ ভাল লোক, অনেক অনেক পড়াশুনা । 

আমি বললাম, জানেন কাকু, এবছরটা আইনস্টাইনের রিলেটিভিটির জেনারেল থিওরির ১০০ বছর । উনি বললেন তাই নাকি ! জানতাম না তো । আমি বললাম হ্যাঁ । এছাড়া অঙ্কের ক্ষেত্রে এমি নয়েদার কনভারসন সূত্র ও ডিফারেন্সিয়াল সিমেট্রির থিওরি প্রমাণ করেন, প্লুটোর প্রথম ছবি তোলা হয়, প্রোক্সিমা সেন্তাওরি যেটা কিনা সূর্যের পরেই পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র সেটা আবিষ্কার করা হয়, ন্যাশনাল অ্যাডভাইসরি কমিটি অফ এরোনটিক্স, যা নাসা এর পূর্বপুরুষ সেটা প্রতিষ্ঠিত হয় । উনি চুপচাপ শুনলেন । 

আমি বললাম, আপনি কি রিলেটিভিটি সম্বন্ধে কিছু জানেন, এটাই তো পৃথিবী পাল্টে দিয়েছিল । উনি হাঁ করে চেয়ে থাকলেন । আমি বললাম জানেন না, সেকি । ১৯০৫ সালের থিওরিতে আইনস্টাইন স্পেস আর সময়ের যে পরম ও স্বাধীন ধর্মের ধারনা প্রচলিত ছিল, প্রথম সেটাকে ভেঙ্গে দেন । আলোর বেগকে ধ্রুবক ধরে নিয়ে তিনি তাঁর সূত্রটি তৈরি করেন । তিনি প্রথম বলেন যে ম্যাটার চার ডাইমেসনে অবস্থান করে, যার তিনটি হল স্পেস সন্ততি আর একটি হল সময় । এখানে তিনি গতিকে ইউনিফর্ম ধরেছিলেন কন্সট্যান্ট বেগের ক্ষেত্রে । কিন্তু আদপে সেটা প্রকৃতিবিরুদ্ধ ধারনা ছিল। কেননা সেখানে ত্বরণের একটা ব্যাপার থাকে । ফলে তাঁর কাছে এখন অনুসন্ধানের বিষয় হয়, সেই সম্পর্ক যেখানে কীরকম হবে স্পেস-টাইম যখন গ্রাভিটি কিম্বা ত্বরণের প্রভাব পড়বে । এবং ১০ বছর পরে তিনি ১৯১৫ সালে জেনারেল রিলেটিভিটি থিওরির কথা বললেন যাতে তিনি দেখালেন যে, গ্রাভিটি হল স্পেস-টাইমের কারভেচার বা জ্যামিতি । মানে এই যে পৃথিবী সূর্যের চাদ্দিকে ঘোরে তার কারন হল সূর্যের ভর স্পেস-টাইম সন্ততিকে কুঁচকে দেয় বা কার্ভ করে । এটা তখন শুনতে অদ্ভুত লাগলেও বহু পরীক্ষায় প্রমাণিত সত্য বলে মানা হয় । এই মতবাদ অনুযায়ী আলো যখন সূর্যের মত কোনও বিশাল অবজেক্টকে অতিক্রম করে তখন এটা সুর্যের চারপাশে থাকা স্পেস-টাইম সন্ততি অনুযায়ী নিজেকে বাঁকিয়ে নেয় । আর এই থিওরির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রমাণ হল আজকের জিপিএস সিস্টেম যা দিয়ে আমাদের এইসব স্মার্ট ফোন চলছে । 
Source : Internet


এসব শোনার পরে দেখি উনি আর কথা বলছেন না । আমি ওনাকে কাপড়ের ওপরে  হাঁড়ি রেখে নিচের দিকের স্পেস-টাইম সন্ততি দেখিয়ে ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিয়েছিলাম । তাঁকে বললাম আপনি কি এই এই এই লেখকের অঙ্কের ফিজিক্সের অমুক অমুক অমুক বইগুলি পড়েছেন । পড়ে ফেলুন জলদি, নইলে পরেরবার দেখা হলে কথা বলা বা আলোচনা করার কিছু থাকবে না । দেখুন আমি তো সাহিত্য ইতিহাসের স কিম্বা ই টুকু হলেও জানি, আপনি তো বিজ্ঞানের অক্ষরের সঙ্গে পরিচয়ই করেননি । আজকের দিনে ওটা না জানলে চলবে কি ! শিক্ষিত হতেই হবে । 

আমার জানা নেই কেন আজকের সাহিত্যের লোকজন বিজ্ঞানকে বোঝেন না, অথচ আমাদের দেশের শ্রেষ্টতম সাহিত্যিকরা যেমন শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ ব্যাপকভাবে বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশুনা করতেন ও বুঝতেন তার অসংখ্য প্রমাণ তাঁদের লেখায় আছে । এটা আমাকে আজ আরও একবার ব্যাথা দিল আজকে ।

No comments:

Post a Comment

I am waiting for your valuable comment. Please comment. Thank you..