তখন আমার কতইবা বয়স
হবে – সতেরো বা আঠারো। ওই বয়সে বেশিরভাগ বাঙালি যুবক-যুবতীই দুটো জিনিসের খপ্পরে পড়ে
– এক, বঙ্গীয় আগমার্কা কমিউনিজম আর দুই, কবিতা। এ-যেন শিবরাম চক্রবর্তীর ‘ঈশ্বর, পৃথিবী
আর ভালোবাসা’-এর মতোই আরও দুই মারাত্মক ব্যাধি যা “তেমন করে ধরতে পারলে (..) কাউকে
ছাড়ে না, রেহাই দেয় না সহজে, আজীবন ভোগায়, আপাদমস্তক গ্রাস করে বসে”। তাই, “কৈশোরেই
কারো যদি এসবের টিকা নেয়া হয়ে যায় - খানিক খানিক স্বাদ পায় সেতো জন্মের মতই বেঁচে
গেল বেচারা!” আর তা না-হলে, “জীবনের মতন ছাড়ান নেই”।
আমি সৌভাগ্যবান যে
এই দুয়েরই হাত থেকে কোনো এক পুণ্যফলে রক্ষা পেয়েছি। মনে পড়ে সেবার এক কবিতা উৎসবে কবি
দেখার জন্য গিয়েছিলাম। তার আগে কি কবি কি লেখক কাউকেই কোনোদিন সামনে থেকে দেখিনি। শুধুমাত্র
বই-পত্রিকার পাতাতেই যতটুকু পরিচয় হবার তা হয়েছিল। তাছাড়া সে-বয়সে আমিও তো লুকিয়ে-চুরিয়ে
কবিতার মতো সাজানো কিছু লাইন লিখতুম, মনে-মনে একটা ব্যাপারও যে হত না তা নয়। তাই একটা
উচ্চ-ধারণা সঙ্গে নিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলুম যথাস্থানে যথাসময়ে। সকাল দশটা থেকে সে-অনুষ্ঠান
শুরু হয়েছিল, শুনেছিলাম তা নাকি চলেছিল বিকাল ছ-টা অব্দি। কে জানত তখন যে এটাই আমার
জীবনের মহাটিকাকরণের বিশেষ দিনে পরিণত হবে। বললে বিশ্বাস করবেন না, বাপরে-বাপ, কবি
তো নয়, সে-এক কবির চিড়িয়াখানা দেখে এলুম। আড়াইশো কবির প্রায় সকলেই মাইক হাতে “আমি আমার
স্বরচিত একখানি কবিতা পড়ছি” বলে যা শোনাল ভদ্রতার খাতিরে ছ-টা অব্দি বসে থাকলে কান
থেকে রক্তপাত হয়ে শ্রবণশক্তিহীন হয়ে যাওয়া আর কেউ ঠেকাতে পারত না। পিকনিকের মাংসের
অর্ডার এলে যেমন দোকানদার কসাইয়ের হাতে পরপর মুরগি সাপ্লাই করতে থাকে, আর মুরগিগুলো
জবাই হয়ে যাওয়া পূর্ববর্তীদের অবস্থা দেখে ঝটাপটি লাগায়, কিন্তু কেউই পালিয়ে আসতে পারে
না। আমার অবস্থাও অনুরূপ হয়েছিল। কোনোক্রমে দোকানদারের হাতে যাওয়ার আগেভাগেই তাই আমি
দে-ছুট বলে বাপের নামখানি বাঁচিয়েছিলাম। আর সে-পথ মাড়াইনি। আজও না। খুব সযত্নে এড়িয়ে
চলি সে-মহল।
তবে তখনও বঙ্গীয়
আগমার্কা কমিউনিজমের হাত থেকে রক্ষা পাইনি। সেটা পেয়েছিলুম আরও কয়েকবছর পরে। অনেক ঘাটের
জল খেয়ে তারপরে। সে-কথা এখানে বলার নয়। সুযোগ হলে পরে বলব। তবে যেটা বলতে পারি আমি
স্বার্থপর ছিলুম না। নিজেই কেবল পালিয়ে বেঁচেছিলাম তা নয়। প্রথম প্রথম চেষ্টা করেছিলাম
যারা এখন (মুরগির) ছানা দশায় আছে, তাদের রক্ষা করতে। দু-একজনকে বাঁচাতেও পেরেছিলাম।
তারা এখনও গুরুদক্ষিণাবাবদ কখনও-সখনও দেখা হলেই রোস্ট করা চিকেন আর ঠাণ্ডা বিয়ার খাইয়ে
কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। আর বেশিরভাগকেই যাদের প্রথমে মনে হয়েছিল বেঁচে গিয়েছে, পরে দেখেছি
সম্পূর্ণ রক্ষা করা যায়নি। জবাই হতে না-পারার খেদ-ক্রন্দন এখনও তাদের বুকে হা-হা করে
যেন। তা কী করেছিলাম আমি, এইবারে সেটা বলি।
পরিচিত তিনটি বড়
দোকানের মালিকের থেকে বিজ্ঞাপণ তুলেছিলাম ৯০০ টাকা। সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিলাম নিজের জমানো
কিছু। প্রথম সংখ্যা ‘বিবক্ষিত’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল। সালটা ২০১২। ট্যাবলয়েড, চারপাতা।
২০০ কপি। তখন আমার হাতে ছিল নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ‘কবিতার ক্লাস’ বইটি। এত সহজ বই
আমি আর পড়িনি। মনে করি যারাই ‘কবিতা’ নামক রোগে গ্রস্ত, আরোগ্যের ইচ্ছাও সবিশেষ নেই
কিন্তু মোটের ওপর জীবনের বেশিরভাগটাই একটা শান্ত-নিবিড় সুখের মধ্যেই কাটাতে চায়, অর্থাৎ
বলি হলেও যেন অ্যানাসথেসিয়ার ডোজ নিয়ে হয় এমন প্রার্থনা করে, তাদের সকলেরই প্রাথমিকভাবে
অন্তত এই বইটি পড়া দরকার। নইলে রক্তও বেরুবে, যন্ত্রণাও হবে। কেউ রক্ষা করতে পারবে
না। সে-বয়সে নিজেকে মসিহা হিসাবে ধরে নিয়ে সটান ফোন করেছিলাম নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীকে।
তিনি তখন ব্যস্ত তাঁর আত্মজীবনী লেখার কাজে। তাঁকে খোলসা করে উদ্দেশ্যটার কথা কইলুম।
বললুম একটা লেখা যদি তিনি দিতে পারেন তবে খুব উপকার হয়। অব্যর্থ বটিকা পাওয়া যায়। তিনি
প্রথমে খুব করে হাসলেন। বললেন, অনেকদিন পরে এইরকম ফোন তিনি পেলেন। তিনি ভারি খুশি হয়েছেন।
বেশ কিছুক্ষণ কথা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, এমনিতে তাঁর যা বয়স ও সে-বয়সের নানান অত্যাচার
তাঁকে সহ্য করতে হয়, সঙ্গে আবার আছে আত্মজীবনী লেখার কাজটাও, এই মুহূর্তে নতুন করে
লেখা দেওয়ার ধকল সইতে পারবেন না। তবে তিনি একটা উপায় বলে দিলেন। তাঁর বই থেকে ও অন্যান্য
নানান জায়গা থেকে কীভাবে সম্পাদনা করলে আমার কাঙ্ক্ষিত লেখাটি পাওয়া যাবে। আমি ভারি
খুশি হয়েছিলাম এবং তাঁরই বাতলে দেওয়া রাস্তা অনুসরণ করেছিলাম। এইভাবে তিনটি সংখ্যায়
তাঁর লেখা সম্পাদিত পুনর্মুদ্রণে ভাগে-ভাগে প্রকাশিত হয়েছিল। শেষবারের বেলা তাঁর সঙ্গে
আরেকবার ফোনালাপ হয়েছিল। সেই শেষ। আর হয়নি।
সে-সময় আমাদের মফঃস্বলে
চিন্তাশীল প্রবন্ধের কাগজ প্রকাশিত হত না। যা হত সবই প্রায় ‘পারস্পরিক পিঠ চাপড়ানি’
সমিতির সদস্য ও তল্পিবাহকদের দ্বারা প্রকাশিত ‘স্কুল ম্যাগাজিন’ গোত্রের কিছু কবিতার
কাগজ। সেখানে কিছু গদ্য-প্রবন্ধ থাকত ঠিকই কিন্তু সে-সবের মান কহতব্য কিছু নয়। এখনও
যদিও সেই ধারাই মূল। তবে কিছু পরিবর্তন অবশ্যই হয়েছে। এবং বলা ভালো তা পজিটিভ দিকেই।
এখন কিছু অনবদ্য কাজের দেখা সহজেই মেলে। আগে গরু খোঁজার মতো করে খুঁজলেও যা মিলত না।
আজ বহুদিন পরে এখানে
এসে পুরানো আলমারি-তাক ঝাড়াঝাড়িতে বইটা বেরিয়ে পড়ল। কিছু ধুলো ঝরে পড়ল, কিছু স্মৃতিও।
কত কথাই না মনে এল, কত বন্ধুজন, কত শত্রুরাও। তবে আজও আমি কবিদের ধারপাশ মাড়াই না।
আর কবিতা সেও পড়ি না। কেননা জঞ্জালের পাহাড় সরিয়ে পুষ্প উদ্ধারের জন্য বেহিসাবি সময়
আর মহানুভব ইচ্ছা কোনোটাই আমার নেই। মনে পড়ে ‘বিবক্ষিত’ ২০১৭ সালের সংখ্যার জন্য কবিতা
বিষয়ে একটি লেখা চেয়ে ফোন করেছিলাম অচিন রায়কে। তিনি সরাসরি অস্বীকার করে বলেছিলেন
একই কথা যে, এ-বিষয়ে সময় নষ্ট তিনি করবেন না। তিনি অন্য বিষয়ে লেখা দিয়েছিলেন। কয়েকমাস
আগেও কথা হল, তাঁর অভিমত আজও বদলায়নি। আমারও নয়। সুধীন্দ্রনাথ দত্তও ১৯৩০ সালে তাঁর
‘কাব্যের মুক্তি’ প্রবন্ধে একই কথা লিখেছিলেন। তাছাড়া আট বছর আগেই যখন ডানা জোইয়ার
‘ক্যান পোয়েট্রি ম্যাটার’ বক্তৃতাটির বাংলা অনুবাদ পেয়েছিলাম আর ‘কবিতা ও পাঠক : একটি
মৃতপ্রায় মাধ্যমের আখ্যান’ নামক প্রবন্ধ লিখিয়েছিলাম সৈয়দ কওসর জামাল সাহেবকে দিয়ে
– তখন থেকেই জানতাম যে কবিতা ইতিমধ্যেই একটি মৃত মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। তবে চারপাশে কবিতার নামে যে
মহোৎসব চলছিল-চলছে-চলবে, তা তার শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের বিলাসিতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
সুনীলীয় যুগের ইলিউসনে কাতর বাঙালি নব্যকবিকূলের (দু-একজন ব্যতিক্রমকে উদাহরণের
অন্তর্গত না করাই শ্রেয়) যে-আবেগ চারপাশে ঘন হয়ে দেখা যাচ্ছে তা শেষযাত্রায়
হরিনামসংকীর্তনের আসরে থাকা চোখ-বন্ধ মাথা-দোলানো ভিড়ের ঘোরমাত্র। এর ভবিষ্যৎ
কব্জি ডুবিয়ে খাওয়ার হাঘরেপনাতেই শেষ হবে। ভাস্কর চক্রবর্তীর অমোঘ লাইন
তাই মনে পড়ে,
“এলো মাতব্বর, এলো
মূর্তিমান ভণ্ড, মাথামোটা –
গোঁফে দুধ,
লিখে দিল দু-কলম
: কাহাকে কবিতা বলে এবং বলে না –
মঞ্চজুড়ে দাপাদাপি,
অন্ধজিভ-ভাষা নেই, ভালোবাসা নেই –
আছে এক সাধের আহ্লাদ,
দাও
শেষ করে দাও –
-শেষ? আহা, মাথার
জটিল রক্তস্রোত, শেষ হবে কবে?
শেষ হতে হতে তবু
হাসি নিয়ে, হে সুন্দর, জেগে উঠি আমি –
পড়ো-কি পড়ো-না লেখা
জানিনা, জেনেছি মাত্র এই
সকলেই কবি আজ – শুধু
কেউ কেউ নয় কবি।”
কিন্তু আজও কি এই
বই পড়ে কেউ বাঁচার চেষ্টা করবে – সত্যই জানি না।

No comments:
Post a Comment
I am waiting for your valuable comment. Please comment. Thank you..