Friday, 18 March 2022

আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে , তবুও অবগুণ্ঠিত কুণ্ঠিত জীবন

ছবির তথ্য নিচে দিয়েছি

 

সকাল-সকাল মানবেন্দ্রবাবুর অসম্ভব সুন্দর একটি লেখা আর পুরানো বন্ধুদের পাঠানো একটা ছবি মোবাইল খুলতেই নোটিফিকেশনের টুং আওয়াজে ঢুকে পড়ল মনের ভেতরে। প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই আজ থেকে পাঁচ-ছয় বছর আগের এক স্মৃতিযাপনের দরজায় গিয়ে আমি টোকা মারলুম। অ্যালবামের পাতার সঙ্গেই দৌড়তে থাকল নানান অনুভূতির টগবগে ঘোড়াগুলি।

তখন আমি মুম্বই শহরে থাকি। রেসিডেন্সিয়াল ইন্সটিটিউটে আমার প্রথাগত ছাত্রজীবনের শেষতম অংশটি কাটাচ্ছি। আর মাত্র কয়েকটা দিন পরেই আমরা সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাব এদিক-ওদিক – কেউ কেউ ভারতেরই নানান অংশে আবার কেউ কেউ চলে যাবে বিদেশে। আমি পড়াশুনোর ডিস্ট্রিক্ট লেভেল, স্টেট লেভেল ও ন্যাশনাল লেভেল খেলে, ব্যাক টু স্টেট লেভেলে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছি। আসলে ইন্টারন্যাশলান লেভেলে খেলার কথা ভাবিনি, ভাবি না। আমি আদতে ঘরকুনো মানুষ। তাই ঘরেই ফিরব মনোস্থির করেছি। তাই অ্যাপ্লাই না করেও যেটা পেয়েছিলাম, সেটাকেও অ্যাকসেপ্ট করিনি। সে যাই হোক, আমার কথা থাক। বরং আমাদের কথা বলি।

‘আমাদের কথা’ – আহা শব্দবন্ধটার উচ্চারণ শুনতে বড্ড ভালো লাগে। এই ‘আমাদের’ শব্দটার অভ্যন্তরে একদিকে আছে এক বিশাল ঔদার্য আবার একইসঙ্গে আছে মামুলি সংকীর্ণতাও। কিন্তু আমার ব্যবহৃত ‘আমাদের’ শব্দটা বাংলার আমরা-ওরার সংস্কৃতি মতো কিংবা শুধুমাত্র বাঙালি জাতির ঘেরাটোপে আবদ্ধ নয়। আমার কাছে ‘আমাদের’ কথাটার কোনো সীমা নেই। অসীম বিশ্বের সমগ্র রূপকল্পের ছিটেফোঁটাও এই ‘আমাদের’ই অন্তর্ভুক্ত। আমরা যারা মুম্বইতে পড়াশুনো করতে গিয়েছিলাম, সেখানে ‘আমাদের’ কথাটি উচ্চারিত হত ভারতের প্রত্যেকটি রাজ্যের কোনায়-কোনায় অবস্থিত সবকটি ধর্ম-জাতি-বর্ণ-সংস্কৃতি-চেতনা-বোধের মিশেলে। একটা ছোট্ট ‘গণতান্ত্রিক ভারত’ সেখানে নির্মিত হয়েছিল। আমরা তখন আর কেউই উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, গুজরাট, আসাম, মনিপুর, নাগাল্যান্ড, পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, জম্মু, কেরালা, অন্ধ্রপ্রদেশ, গোয়া, কর্ণাটক কিচ্ছুটি নই, ভারতের অখণ্ডতার প্রতিভূ হয়েই আমরা প্রত্যেকেই ‘আমাদের’ সকলের বন্ধু হয়ে গিয়েছিলাম, আজও তাইই আছি।

প্রত্যেকের হাসি-কান্না, ক্ষোভ-সুখ, প্রত্যাশা-প্রাপ্তি, দাবিদাওয়ার ন্যায্যতা-অন্যায্যতা ইত্যাদি সবই তখন ব্যক্তিগত স্তর পেরিয়ে যৌথতার শরীরে লীন হয়ে গিয়েছে। ‘আমাদের’ যেমন আমিষ ছিল তেমনই ছিল নিরামিষ, যেমন ছিল দুর্গাপুজো, তেমনই ছিল ঈদ, ওনাম কিংবা ক্রিস্টমাস, যেমন ছিল বামপন্থা তেমনই ছিল শিবসেনা, বজরং দল, কংগ্রেস – ‘আমাদের’ একমাত্র যা ছিল না তা হল ভেদাভেদ। আমরা পাশাপাশি অথবা একই থালায় হিন্দু-মুসলমান আমিষ-নিরামিষ দিব্য আড্ডা দিতে দিতে খেতে পেরেছি। এমনকি আমাদের লিঙ্গবৈষম্যও ছিল না। ছেলে-মেয়েদের হস্টেলও ছিল একইসঙ্গে, একই বিল্ডিং-এ। একের অন্যের ঘরে যেতে কোনোদিন বাধো-বাধোও ঠেকেনি। কেউই কোনোদিন ভাবেনি এটা ‘আমাদের’ ঘর নয়। রুম নম্বর ৪৪১-এ তো এমন একটা দিনও যায়নি যেদিন তিনজনের ঘরে কেবল তিনজনই থাকতে পেরেছে। রোজই অন্তত সাত থেকে দশজন এসে পড়ে থেকেছে ব্রেকফাস্ট থেকে পরেরদিনের ব্রেকফাস্ট অব্দি – ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে। পড়াশুনো করেছে, আড্ডা দিয়েছে, হাহাহিহি করেছে নাচানাচি করেছে – কোনোদিন কেউই ভাবেনি, এবার যাই, ওরা কী মনে করবে! কেনইবা ভাববে, এই সবই তো আমাদেরই, এখানে ওরা বলে যে কেউই নেই, ছিলও না।

এখন রঙের উৎসব। বসন্তের রঙে চারিদিক রেঙে উঠেছে। অথচ আমারই বহু বাঙালি বন্ধুজনেদের পোস্টে-স্টেটাসে দেখছি হোলি ও দোলের কিংবা হিন্দুস্তানি ও বাঙালির সম্পর্কে রগচটা হিংস্র মনোভাব। এগুলি মনকে পীড়া কি দেয় না? অবশ্যই দেয়। একইসঙ্গে অনেক বন্ধু আমাকে দোষারোপ করেছে, অভিযোগ জানিয়েছে যে, আমি কেন কোনোদিন বাঙালির পক্ষে কিছু লিখি না! কী করে লিখি বন্ধু, আমি যে অন্য সংস্কৃতি যাপন করেছি, সেখানে যে কেবলই সৌভ্রাতৃত্ব শিখেছি – কী করে পারি এখন পক্ষ-বিপক্ষের খেলা খেলতে? তারা সকলেই যে আমারই, আমিও যে তাদেরই। তোমরা হোলি/দোলের কথা বলছ – তাহলে আমি একটা গল্প শোনায় তোমাদের।

সেবার আগেরদিন রাত্রি থেকে হস্টেলে উত্তেজনার গুঞ্জন চলছে। রাত্রে কেউই প্রায় ঘুমাচ্ছে না। পুরানো জামাকাপড় বের করে রাখছে। কাল যে রঙের উৎসব হবে – আর সেখানে সেগুলিকে ছিঁড়েও ফেলা হবে – সেটারই তোড়জোর। শুধু কী তাই? পেস্তা, কাজু, কিসমিস, আখরোট, বাদাম আনা হয়ে গিয়েছে ভুরিভুরি। কাল সকালে আসবে দুধ। কম করে ৪০০ জনের খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন সেরে রেখেছে মেস-কমিটি। স্পেশাল লাঞ্চ – স্পেশাল ডিনার, আর তার আগে প্যাকেটে করে এসেছে মহাদেবের আশীর্বাদ। দুধ বাদাম পেস্তা সবকিছু মিলিয়ে মিশিয়ে তৈরি হবে মহা-প্রসাদ। হস্টেলের ওয়ার্ডেন জলের নলগুলিকে পাইপগুলিকে দেখে রেখেছেন, যাতে কোনোকিছুরই অভাব না হয়। অভাব হলে শিক্ষক-শিক্ষিকারা ব্যাঁকা চোখে তাকিয়ে যাবে যে – ওঁরাও তো একই ক্যাম্পাসে থাকেন – কালকে আমাদের সঙ্গে জয়েনও করবেন। ঢোলের সঙ্গে থালা-বাসনও রেডি। নগর-সংকীর্তন নয়, ইন্সটিটিউট-সংকীর্তনের দল বেরুবে – গানা হবে, বাজনা হবে, রঙ হবে, ভাঙ হবে, নাচ হবে, আলিঙ্গন হবে।

সকাল বেলায় আমি হস্টেলের ঘর থেকে স্পিকারে ফুল ভলুমে জোরে জোরে রবীন্দ্রসঙ্গীত চালিয়ে দিলাম। চারপাশ থেকে দরজায় টোকা পড়তে শুরু হল – ‘বাহার আও জি, কিতনা দের করোগে ভাইয়্যা’। সবাই মিলে নিচে যাওয়ার পালা। ছয়তলায় থাকি আমরা। নিচে ততক্ষণে দু-তলা তিনতলা চলে গিয়েছে। শুভম আর পীয়ূষ রেডি হল। রবীন্দ্রসঙ্গীত বন্ধ করলাম। উত্তরপ্রদেশ আর বিহার শুরু করল তাদের লোকসঙ্গীত বাজানো। সিনিয়র এসে বলল, ‘মিউজিক বন্ধ করো, গানা হাম গায়েঙ্গে, বাজা তুম বাজাও, জলদি নিচে চলো’। আমি বললাম, আমি নেই। আমার সব সহ্য হয় – ভাঙ ব্যাপারটা আমি নিতে পারি না। কিন্তু কে কার কথা শোনে তখন, একটাই কথা, ‘নিচে চলো’। তারপরে যা-যা হল আর যেভাবে হল তার কথা না বলাই ভাল। বরং তার অন্তিম দৃশ্যের একটি ছবি দেওয়া যাক। তাহলেই বোঝানো যথেষ্ট হবে যে কী হয়েছিল। তাতেই শেষ নয়, পীয়ূষ ঘরে ফিরে দু-ঘন্টা বাথরুমে সাওয়ার চালিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল কিন্তু জল গায়ে লাগাল না। জেমস, আধাঘন্টা ধরে দুটো সিঁড়ি উঠছে তো উঠছেই। শ্রেয়া লটকেছে। শুভম হাসছে তো হাসছেই। আমি থাবড়া মারছি, বিদিতা লাপাতা। এইসব যে কতক্ষণ চলেছিল আর কেউ না জানুক আমি জানি। আর সেদিন বুঝেছিলাম, নেশুড়েদের দলে ভিড়ে আসল কাজটি না করলে যত জ্বালা সব তাকেই সইতে হয়। কিন্তু আমাদের অভিযোগের কিছু ছিল না। যা ছিল তা সবই বিনোদনের।

সেসব দিন কেটে গিয়েছে। আজও ইচ্ছা হয় সেখানে ফিরে যেতে। এখানে, চৈত্র মাস সবে শুরু হয়েছে। আর তাতেই গরমের দাপটে প্রাণ ক্রমশ শুকিয়ে যাওয়ার জোগাড়। চীন-আমেরিকায় নাকি আবার লকডাউনের তোড়জোর আরম্ভ হয়েছে বলে খবর। জলবায়ু পাল্টে যেতে-যেতে এখন যে মানবসভ্যতাকেই গিলে খেতে আসছে সে-দিকে হুঁশ এখনও ফেরেনি বেশিরভাগের। অন্যদিকে ইউক্রেন-রাশিয়া সংঘাতে রক্তাক্ত লাশগুলি, পুড়ে খাক হয়ে যাওয়া বাড়ি-ঘরগুলির ছবি মনকে ভারাক্রান্ত করে দিচ্ছে রোজ। সম্প্রতি ‘দ্য কাশ্মীর ফাইলস’ চলচ্চিত্রের প্রভাবে দেশের অভ্যন্তরেও খানিক ধর্মীয় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া আছে দলীয় রাজনীতির শিকারে খুন-ধর্ষণের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনার শিরোনামগুলিও। বাঙালি বন্ধুরা এরই মধ্যে হোলি বনাম দোল তর্জা শুরু করেছে। সব মিলিয়ে অসংখ্য বিভেদের জালে আমরা জড়িয়ে পড়ছি, পড়েছি। কিন্তু আমি যে কী করি বুঝতে পারছি না। কী করে নিই পক্ষ-বিপক্ষের অবস্থান – তাও জানি না। তার চেয়ে বরং, সেই অমোঘ বাণীটিকেই স্মরণ করি, “আজি  বসন্ত জাগ্রত দ্বারে / তব অবগুণ্ঠিত কুণ্ঠিত জীবনে / কোরো না বিড়ম্বিত তারে / আজি খুলিয়ো হৃদয়দল খুলিয়ো /  আজি ভুলিয়ো আপনপর ভুলিয়ো”। 


ছবিতে দাঁড়িয়ে বাঁ-দিক থেকে -

সোফিয়া (আসাম), শালিনী (পশ্চিমবঙ্গ), কৌস্তভ (পশ্চিমবঙ্গ), মোগ (ত্রিপুরা), অজয় (উত্তরপ্রদেশ), সুমিত (বিহার), প্রিয়াঙ্কা (উত্তরপ্রদেশ), শ্রেয়া (উত্তরপ্রদেশ), বিদিতা (পশ্চিমবঙ্গ)

ছবিতে বসে বাঁ-দিক থেকে -

দেবেন্দ্র (মধ্যপ্রদেশ), পীয়ূষ (উত্তরপ্রদেশ), শেখর (উত্তরপ্রদেশ), শুভম (উত্তরপ্রদেশ)

পুনশ্চঃ আরও ছবি আছে, কিন্তু সেগুলি দেওয়া যাবে না।

No comments:

Post a Comment

I am waiting for your valuable comment. Please comment. Thank you..