Thursday, 19 February 2015

ও লৈঙ্গিকভাবে ছেলে হয়েও অনেক মেয়ের চাইতে অনেক বেশী নারী, আর মানসিকভাবে নারী হয়েও অনেক ছেলের চাইতে প্রবলভাবে পুরুষ ...



সায়ন্তন মাইতির “তৃতীয় বলে সত্যি কিছু নেই” পড়লাম, এককমাত্রায় সাহিত্যে সমকামিতা নিয়ে লেখাটিও পড়লাম ।  সমকামিতা নিয়ে আমার যে ধারনা একটা ছিল তা এখন বদলেছে । আর এই লেখাগুলির যুক্তি এমনভাবে আসছে যে এখন আমি Confused, Utterly Confused । সায়ন্তনের সে লেখা সম্বন্ধে কিছু বলার আগে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলি, এটাকে আত্মস্বীকারক্তিও বলা যায় । আমি তখন ক্লাস ফাইভ কি সিক্সে পড়ি – অর্থাৎ যখন আমাদের নারী-পুরুষ যৌনতা সম্পর্ক সম্বন্ধে কোনও ধারণা ছিল না- আমাদের বয়েজ স্কুলে একটি ছেলের কথাবার্তা চালচলন মেয়েলি ছিল । ফলে কয়েকজন তাকে খুব খ্যাপাত আর সে কিছুই বলত না । আমরা একসঙ্গে খেলতাম, টিফিন ভাগ করতাম, পোকেমন নিয়ে মারপিট করতাম । ওর সঙ্গ আমার ভীষণ ভাল লাগত । কেননা ওর থেকে আমি যে ভালবাসা, মমত্ব পেয়েছিলাম তা আজ অব্দি আমার অন্য কোনও বন্ধুর থেকে কখনও পাইনি । উচু ক্লাসের ছেলে এসে আমাকে মেরে আমার বল কেড়ে নিয়ে গেলে ও যেমনভাবে আমার পক্ষ নিয়ে ঝগড়া করত, যেমনভাবে পরদিন আমার জন্য বল কিনে নিয়ে আসত, নিজের পোকেমন লুকিয়ে রেখে হেরে যাবার বাহানা করত তেমনভাবে আর কেউ কোনদিন করেনি । ওর সঙ্গে থাকলে আমার মনে হত যেন বাড়িতে মা দিদিদের সঙ্গে আছি । এই মাতৃসুলভ মমত্ব আমি যেমন ঐ অল্পবেলায় ওর মধ্যে দেখেছি তেমনই দেখেছি নিজের মেয়েলি স্বভাবকে গোপন করতে না পারার যন্ত্রনায় আগ্রাসী হয়ে একাকিত্বে লড়ে যেতে । এই ছেলেটি ছিল বি সেকশনে আর আমি এ সেকশনে । আমাদের পাকাপাকি বন্ধুত্ব যখন হয় তখন আমরা ক্লাস এইট এ পড়ি । কেননা দুজনেই হিন্দি ভাষাকে বিষয় হিসেবে নেওয়ায় সেকশন এক হয়ে যায় । এসময় আমি মোটামুটি বুঝতে শুরু করেছি যৌনতা ব্যাপারটা কি । এসময় দেখেছি অন্যান্য ছেলেদের আচরন কিভাবে খ্যাপানোর স্তর থেকে হিংস্রতায় পরিবর্তিত হচ্ছিল । ক্লাস নাইনের হাফ ইয়ার্লির পর একদিন বাথরুমে কিছু ছেলে যখন হস্তমৈথুন করছিল ও সেসময় সেখানে যেতে ওরা ওকে নিয়ে যে নোংরামি করেছিল তাকে এখন আমি বলৎকার বলি । এরপর থেকে ওর মধ্যে অদ্ভুত পরিবর্তন আসে । যে ভয়ে ওর সাথে হওয়া আচরনের কথা ও আর কাওকে বলেনি, একমাত্র আমায় বলেছিল, হায় তেমনভাবে বিশ্বাস করে ওর এই হঠাৎ পরিবর্তনের কথা বলেনি । এসময় থেকে এই পাকাপাকি বন্ধুত্বের মধ্যেও একটা দুরত্ব তৈরি হয় । ও জানত যে আমার সাথে সর্বক্ষন ওর এই ঘুরে বেরানোর ফলে আমাকে আমার অন্যান্য বন্ধুদের কাছ থেকে যে সব উক্তি শুনতে হয় তা আমার প্রাপ্য নয় । ফলে ও নিজে থেকে একটা দুরত্ব রেখে তবেই মিশত । আমি জোর করলে ঝগড়া করতে শুরু করত অকারনে । আমার মনে আছে, বিজ্ঞান মঞ্চের একটা অনুষ্ঠানে ওকে শেষ বেঞ্চ থেকে হাত ধরে জোর করে সামনের সারিতে আমার পাশে আনতে গেছিলাম বলে এক ঘুষিতে আমার ঠোঁট ফাটিয়ে দিয়েছিল । কিন্তু আমি জানি, আমার প্রতি ওর ভালবাসার কোনও কমতি হয়নি । আমি জানি, কোনও ছেলে কেন, কোনও মেয়েও ওর মত ভাবে আমায় ভালবাসতে পারবে না । ও লৈঙ্গিকভাবে ছেলে হয়েও অনেক মেয়ের চাইতে অনেক বেশী নারী, আর মানসিকভাবে নারী হয়েও অনেক ছেলের চাইতে প্রবলভাবে পুরুষ । ক্লাস ইলেভেনের পর আমার সাথে ওর এই বন্ধুত্ব বা যোগাযোগ আর থাকেনি । ও নিজে একদম আলাদা হয়ে গিয়ে নিজের মত থাকত । আর ও যেসব বন্ধুর সাথে মিশত হয় তারা প্রত্যেকেই আচরনে ওর মতোই নয়তো প্রত্যেকেই মেয়ে । স্কুল ছাড়ার আগে ওর সাথে যেদিন আমার শেষ দেখা সেদিন ও আমার গলা জড়িয়ে ধরে গালে চুমু খেয়ে বলেছিল, “পোকেমনের লড়াইটা ভাল করে শিখে নিস” । ব্যস, ও চলে গেল তারপর ।

Source : Internet


আমি জানি আসলে ও কোন লড়াইটা শিখে নিয়েছিল পোকেমন লড়তে লড়তে । আমি সমকামিতা স্বাভাবিক না বিকৃতি বুঝি না । আমি বুঝি না তৃতীয় বলে সত্যি কিছু আছে কি না । আমি বুঝি না ভালবাসার মধ্যে লৈঙ্গিক যৌনতার দাবিদাওয়ার তত্ত্ব । আমি শুধু বুঝি কিছু একটা আছে যেটা আমাকে আমার বন্ধুর অকৃত্রিম ভালবাসার সম্পদ থেকে আজীবনের জন্য বঞ্চিত করেছে, সেই গলা জড়িয়ে ধরে চুমু থেকে আমায় সরিয়ে রেখেছে । আর সেটা যাই হোক না কেন, ঠিক মোটেই নয় । আজ যখন ওর সাথে রাস্তায় মাঝে মধ্যে দেখা হয়, ও সামান্য হেসে ভাল আছিস বলে চলে যায় – সেখানে যখন জড়িয়ে ধরে ভালবাসার জায়গা না থাকে, ছেলেবেলার স্মৃতিগুলোকে নিয়ে হাসাহাসি করার সময় না থাকে তখন যে কষ্ট আমার মধ্যে লুক্কায়িক থেকে যায় এর দায় যার তার টিকে থাকার দরকার নেই বলেই আমি মানি । 

সায়ন্তন, যেভাবে ‘তৃতীয় বলে সত্যি কিছু নেই’ প্রবন্ধে যেভাবে দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের সপক্ষে যুক্তি দিয়েছে তা যতই সঠিক ও সুচারু মানবিকতার পক্ষে হোক না কেন, তাতে আমি জানি এখন এ সমাজের কিচ্ছু পরিবর্তন হবে না, কেননা লোকমত বিপরীত হলে তত্ত্ব ও তথ্যে কিছু হয় না । যৌনতা বিষয়ে পশুদের থেকে মানুষের পার্থক্য এই যে, মানুষের যৌনতাবোধ তার চেতনার সঙ্গে জুড়ে আছে আর পশুদের তা নেই । দৈনন্দিন সাধারণ কার্যের মত যৌনতার ধারণা তার কাছে যতদিন না সাংস্কৃতিক ঔদার্য পাবে ততদিন কোনও বৈজ্ঞানিক মত এর পরিবর্তনে কৃতকার্য হবে না । তবু সায়ন্তন যে চেষ্টা করেছে ও অন্যান্যরা যা যা করছেন সেটা প্রশংসার দাবি যেমন করে তেমন প্রলম্বিত বিস্তারও দাবি করে । কেননা, সমাজের মানসিকতা বদলায় খুব ধীরে ধীরে । ইতিহাস থেকে আমরা জানি, সতিদাহ প্রথা বদলাবার চেষ্টা শুরু হবার বহু প্রজন্ম পরেই কিন্তু তা সমাজের মানসিকতা থেকে লুপ্ত হয়েছে । বিধবাবিবাহ প্রচলন কিম্বা বাল্যবিবাহ বন্ধের লড়াই বিদ্যাসাগর শুরু করেছিলেন । তখন বঙ্কিমচন্দ্রের মত ব্যক্তিত্বও রোহিণীর মুখে বলিয়েছিলেন, বিধবার বিবাহ দেয় যে সে যদি পন্ডিত হয় তবে মূর্খ কে ? শরৎবাবুকে ‘পল্লীসমাজ’ লিখতে হয়েছে ।  তবু আজও কি আমরা সেই আন্দোলনের সফলতা চরম অর্থে দাবি করতে পারি । পারি না । তাছাড়া এ সমাজে এখনও স্বীকৃত লিঙ্গ নারী দ্বিতীয়তা থেকে নিজেকে সাম্যতা ও মুক্তি দেবার লড়াই লড়ছে । এ লড়াই এর ইতিহাসও তো কম দিনের নয় । সেই মেরি ওলস্টোনক্রাফটের থেকে ব্যোঁভয়া, লেনিন হয়ে তসলিমা নাসরিন আজও লড়ছেন । তবুও সফলতা আসেনি, তবে কিছু পরিবর্তন নিশ্চয় হয়েছে । সেখানে আরও সংখ্যালঘিষ্ট তত্ত্ব ও জনসমষ্ঠি সমকামি, এর লড়াই এত সহজ হবে না । এ লড়াই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে চালাতে হবে । থেমে যাবার বা দোষারোপের মধ্যে দিয়ে সুরক্ষিত পথের জায়গা নিলে হবে না । সায়ন্তন ও অন্যান্যদের আজকের এই চেষ্টা একদিন নিশ্চয় এমন প্রজন্মের জন্ম দেবে যেখানে LGBT কিম্বা সমকামিতা নিয়ে আলাদা করে ভাবনাচিন্তার প্রয়োজন থাকবে না । ওটা স্বাভাবিক বলে আর প্রচার করতে হবে না, এমনিতেই সাধারণ হয়ে যাবে । আর সেদিন শুধুমাত্র আমার ঐ বন্ধু মুক্তি পাবে না, আমিও পাব, আরও অনেক বন্ধুত্ব পাবে । আমরা থাকি আর না থাকি সেদিনের ভালবাসার জন্য সায়ন্তনদের এ লড়াই ইতিহাসের গোপন খসড়ায় রয়ে যাবেই ।

No comments:

Post a Comment

I am waiting for your valuable comment. Please comment. Thank you..