Friday, 15 May 2020

শিরোনামহীন প্রলাপগুলো, আমি কেন মার্কসিস্ট নই, মার্কসিয়ান ?


১২


প্রত্যাশা একটি ভেক্টর রাশি এর মান এবং দিক দুই-ই আছে । ব্যক্তিগত পরকাষ্ঠায় এর মানের অদল-বদল যেমন হয়, দিকও নির্ধারিত হয় সেই মানের ওপর ভিত্তি করেই অর্থাৎ দিকও দুমুখো – হয় তা প্রাপ্তির দিকে যায় নয়তো প্রত্যাখ্যানের দিকে । আমাদের বাঙালির জনজীবনে প্রত্যাশাই মূল স্রোত, আমরা এখনও নিহিলিস্ট হয়ে যাইনি । প্রত্যাশাই আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে – তা ঈশ্বরের প্রতিই হোক কিংবা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রতি। সমস্যা হল এই দুই ক্ষেত্রেই এখন জগত-প্রকৃতি প্রত্যাখ্যানের দিকেই ধাবমান, প্রাপ্তির ভাঁড়ার তথৈবচ । এখন আমি যে ঈশ্বর নামক পরম কল্যাণময়-ন্যায়পরায়ণ-ক্ষমাশীল একটা বিষয়ে আস্থাশীল নই, সেটা জানার পরই স্বভাবধর্মে বহু বাঙালি (অনেকক্ষেত্রে আমার অনেক অবাঙালি বয়স্যও) আমাকে মার্কসিস্ট ঠাওরেছে এবং দাগিয়েও দিয়েছে । মার্কসিস্ট শব্দের সঙ্গে সকলে সর্বাগ্রে পরিচিত, কিন্তু মার্কসিয়ানে কিঞ্চিৎ হোঁচট খেতে হয় । তাই আমার ব্যক্তিগত অবস্থান কিছুটা স্পষ্ট করার তাগিদ আজ আছে বৈকি । এই গোঁতার কারণ অবশ্য ১৩ই মে দৈনিক স্টেটসম্যানে প্রকাশিত আমার উত্তর-সম্পাদকীয় প্রবন্ধটি সম্বন্ধে কিছুজনের মতামত ।

অন্যের মতামত সম্বন্ধে বহু মানুষ বহু কিছু বিশ্বাস করেছেন - অনেকে সম্মান দিয়েছেন, অনেকে অসম্মান, আবার অনেকে পাত্তাই দেননি । এখন আমি কী বিশ্বাস করি সেটাই বলি । আমি মহাভারতের কথা ধরে আমার কথা বলব,

‘বেদাঃ বিভিনাঃ, শ্রুতয়ঃ বিভিন্নাঃ
নাসৌ মুনির্যস্য মতং ন ভিন্নম
ধর্মস্য তত্ত্বং নিহিতম গুহায়াম
মহাজনো যেন গতঃ স পন্থাঃ ।’

অর্থাৎ, বেদ সকল ভিন্ন ভিন্ন, স্মৃতি সকল ভিন্ন ভিন্ন । এমন মুনি (জ্ঞানী) নেই যাঁর মত অন্য মতের সঙ্গে ভিন্ন হয়নি । কিন্তু ধর্মের প্রকৃত তত্ত্ব গুহাতে নিহিত আছে, তা প্রাপ্ত হওয়া কঠিন, তবে মহাজনগণ সে পথেই গেছেন । এখানে মহাজন বলতে যাঁকে বা যাঁদের স্বীকার করা যায়, তাঁরা কোনও হিসেবেই এক জাতির ও এক ধৰ্ম্মাবলম্বী শ্রেণিভুক্ত হতে পারেন না । ভিন্ন মতের ভিন্ন পথের মধ্যে দিয়ে সকলেই সত্যপন্থী (আপাত)। তাই এই ভিন্নমতের স্বভাবজ ধর্ম যুগে যুগে থাকবেই, আমাদের শুধু সন্ধানরত থাকতে হবে সেই পথে যেখানে প্রকৃতিগত বিচার আছে, ঐতিহাসিক ভিত্তি আছে, বৈজ্ঞানিক সমন্বয় আছে এবং প্রোথিত সংশয় আছে ।

অনেকে আমার লেখাটি থেকে চিনপ্রীতি পেয়েছেন, অনেকে মার্কিনপ্রীতিও । কিন্তু বলে রাখা দরকার, এই দুই দেশের (যে কোনও দেশের বিষয়েই বলা যায় যদিও) কোনটার প্রতিই আমার আদেখলামো যেমন নেই তেমন বিরোধিতাও নেই – কেননা, আমি সেই কমিউনিস্ট নই যে প্রথম বিদেশযাত্রার সুযোগে চিন নয় আমেরিকায় যায়, আমি সেই কংগ্রেসিও নই যে পরিবারতান্ত্রিক রাজত্ব বজায় রাখার জন্য কি সাপ কি ব্যাং কারও গালই বাদ দেয় না, আবার আমি সেই বিজেপিও নই যে ক্ষমতার প্রতি নতমস্তক থেকে ১০০ কোটি খরচা করাকে এটিকেট বলবে  । বাকি রইল বাঙালির একটাই অস্ত্র । কিন্তু আমি প্রাদেশিকও নই । মুম্বইতে (পশ্চিম ভারত) থাকাকালীন আমার চারশো সহপাঠীর মধ্যে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা সকলেই উত্তরাপথের, বাঙালি কেবল দুজনমাত্র, দক্ষিণের একজন, নর্থ-ইস্টের দুজন । সুতরাং প্রাদেশিকতা আর গণতন্ত্রের উভয়ের পাঠ আমার যথেষ্ট আছে, সেটার অহংকারই করি । তাই আমাকে যে কোনও বিষয়ে দাগিয়ে দেবার আগে ভ্রূ কুঁচকে, মাথা চুলকে, বগলের ঘাম মুছে খানিক হাওয়া খেতে খেতে ভেবে নিতে অনুরোধ করব ।  

ছবিটা বেশ মজাদার, গুগলে সার্চ করতে গিয়ে পেলাম, নিয়ে নিলাম পটাস !


এখন আমি মার্কসিস্ট নই কেন আর কেনই বা মার্কসিয়ান সে কথা বলব । সভ্যতার শুরুর দিন থেকে যে ইতিহাস আমি পড়েছি, তাতে সর্বত্রই যে ব্যাপারটা স্পষ্ট তা হল, মানুষের দ্বারা মানুষের শাসন । তা রাজার শাসনই হোক বা রানীর কিংবা সংসদীয় গণতন্ত্রই হোক বা প্রলেতারিয়েত সোশ্যালিজম । প্রথমেই বলব, মানুষের দ্বারা মানুষের এই শাসনের প্রতি আমি চরম অবিশ্বাসী । ফলে, গভর্নমেন্ট যে প্রকারেরই হোক, আমি তার ন্যায়সঙ্গত ও নিরপেক্ষ অস্তিত্বের প্রতি সংশয়ী । কোনও মানুষের অধিকার নেই অন্য মানুষকে শাসন করার । তা যেকোনো অজুহাত বা কারণেই হোক না কেন ! কিন্তু লোকে বলবে এ আবার কিরকম কথা, এ তো বিশৃঙ্খলার জন্ম দেবে । ফলে ব্যক্তি নয় সরকারের শাসন থাকতেই হবে । পশুর শাসন তো আর মানা যায় না । ঠিক । তাই আমাদের প্রশ্নটা হল, মানুষের দ্বারা যদি মানুষকে শাসন করার ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতেই হয়, তবে যে ব্যাপারটা নিশ্চিত করতে হবে তা হল স্বাধীনতা-খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা-স্বাস্থ্য-মত প্রকাশের প্রতি সহনশীলতা-আন্দোলনের অধিকার ও বিভিন্নতাকে (ভাষা, জাতি, জনগোষ্ঠী ইত্যাদি যা কিছু সব) রক্ষা করার নৈতিক দায়বদ্ধতা । ফলে, কোন উপায়ে কোন শাসনব্যবস্থায় এটা সবথেকে সুনিশ্চিত করা যাবে, সেটাই বিচার করার বিষয় ।

এখন সেই বিচারের ঐতিহাসিক সাক্ষ্যে আমরা রাজতন্ত্র থেকে বনিকতন্ত্রে, বনিকতন্ত্র থেকে কতিপয়তন্ত্রে, কতিপয়তন্ত্র থেকে গনতন্ত্রে এসেছি এবং এখন গনতন্ত্র থেকে সমাজতন্ত্রের পথে যাবার পক্ষে সওয়াল করা হচ্ছে । এই সমাজতন্ত্রের এবং সমাজতন্ত্রের পরের পথ সাম্যবাদে পৌঁছনোর উপায় বাতলেছেন যাঁরা, তাঁদের একজন মার্কস-এঙ্গেলস আর অন্যজন লেনিন । বাকি স্টালিন, মাও ও ইত্যাদিজনেরা সে উপায়কে প্রায়োগিক পথে নিয়ে গেছেন এবং আমাদের সেই নতুন জগত সম্পর্কে অবহিত করিয়েছেন । এই নতুন জগত কী প্রকারের তা আমরা জানি, নানা উপন্যাস থেকে, নানা ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে, নানা স্ট্যাটিস্টিক্সের বিশ্লেষণ থেকে ও তদুপরি ৩৪ বছরের সম্যক অভিজ্ঞতা থেকে। ফলে একই সঙ্গে উন্মাদনা এবং ভয় দুই-ই হয় ।

কোনও একটি মতের শিষ্যত্ব গ্রহণ করলে সর্বপ্রথম যেটি হয় সেটাকে বলে নৈতিক অধঃপতন । ফলে বহুবার বিবাহ করে সুখী হবার ব্যর্থ চেষ্টা না করে তাই অকৃতদারত্বই শ্রেয় – আমি কৌমার্যরক্ষার কথা বলিনি কিন্তু । তাই সব ঘাটের জল খাও কিন্তু মালিক বা পাহারাদার হতে গেলেই বিপদ । "মার্কসিস্ট" মার্কসের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং দার্শনিক ধারণাগুলিকে একসাথে বোঝায়, যেখানে "মার্কসিয়ান" তার রাজনৈতিক ধারণাগুলিতে না গিয়ে বিশেষত তার অর্থনীতিকে বোঝায়। সুতরাং মার্কসিস্ট না হয়েও মার্কসীয় অর্থনীতির বিশাল অংশগুলিতে বিশ্বাস করা সম্ভব। ফলে মার্কসীয় অর্থনীতি এবং মার্কসের পুঁজিবাদের সমালোচনার প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধা রাখি, কিন্তু কী পন্থায় তা অর্জন করা সম্ভব তা নিয়ে সম্পূর্ণরূপে একমত নই- বোঝানো গেল আশা করি। ব্যকরণগত দিকও থেকে দেখলে “মার্কসিস্ট” বিশেষ্য এবং বিশেষণ উভয় হিসেবেই ব্যবহৃত হয়, কিন্তু "মার্কসিয়ান" মূলত বিশেষণ হিসাবে ব্যবহৃত হয়, তবে ব্যতিক্রমভাবে কিছুক্ষেত্রে বিশেষ্য হিসাবেও ব্যবহৃত হয় । ইয়ান-এ শেষ হওয়া বিশেষ্যগুলি এমন কোনও ব্যক্তিকে বোঝায় যা শব্দের মূল অংশে যা প্রকাশিত হয় তার সাথে প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত। যেমন একজন ঐতিহাসিকের, ইতিহাসের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে (সে সম্পর্কে পড়াশোনা করে এবং লেখেন) কিংবা যাদুকরের সাথে যাদুর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে (তিনি তা সম্পাদন করেন) ইত্যাদি। ইস্ট-এ বিশেষ্য অনুসারে শেষ হওয়া, সাধারণত এমন কোনও ব্যক্তির সাথে কথা বলে যিনি শব্দের মূল অংশ দ্বারা চিহ্নিত কোনও কিছুর প্রতি অনুগত, সমর্থন করেন, অনুসরণ করেন বা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হন। যেমন একজন মার্কসিস্ট এমন একজন যিনি মার্ক্সবাদের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ; একজন চৌভিনিস্ট চৌভিনিজমের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ইত্যাদি। ইস্ট-এর যেখানে বিশেষণ থাকে তা বিশেষ্যগুলি থেকে উদ্ভূত হয়, যেমন একটি মার্কসবাদী তত্ত্ব, একটি মার্কসবাদী যুক্তি, একটি মার্কসবাদী সংগঠন ইত্যাদি ।

ফলে তত্ত্বে (বস্তুবাদী দর্শন, রাজনৈতিক অর্থনীতির সমালোচনা এবং সমাজতান্ত্রিক রাজনীতি) আছি কিন্তু পন্থায় নেই - এমন মতানৈক্যের কারণেই আমি মার্কসিস্ট নই, মার্কসিয়ান । আমরা জানি ১৯৮৭ সালের মধ্যেই যেখানে বিশ্বের ২৬ টি দেশে মার্কসবাদি সরকার প্রতিষ্ঠিত হয় তার মধ্যে এখনই ২১টিতে তার পতন হয়ে গেছে । হারাধনের পাঁচটি ছেলের মধ্যে প্রধান হল, চিন, ভিয়েতনাম ও কিউবা । তাদের অবস্থা কিরকম সেকথা বলাইবাহুল্য । না জানলে, ১৯৮৪ কিংবা ব্রেভ নিউ ওয়ার্ল্ড কিংবা ব্ল্যাক মিরর দেখে নেওয়া যেতে পারে । সেজন্যই বোধহয় মার্কস সাহেব নিজেই বলেছিলেন, “All I know is that I am not a Marxist.”। তা রসিকতাই হোক বা গম্ভীরভাবে বলা – তিনি নিজেই যে এই ব্যাপারে সংশয়ের ওপরে নিজেকে রাখেননি সে কথা স্পষ্ট । আসলে সত্য কথাটা হল গিয়ে, মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কোনও কিছুই টিকে থাকে না, মানুষ নিজে যেটাকে অর্জন করে তাই থেকে যায় । আবার মানুষ একদিন সেটাকেও ভেঙে দিয়ে নতুন কিছুকে অর্জন করে ফেলে । এইভাবেই চলে । তাই গনতন্ত্র নিজের শরীরেই একটা বিপ্লব, আর রাশিয়া ও চিন দেখিয়ে দিয়েছে মানুষ এখনই বামপার্টিসর্বস্ব দার-অল-ইসলাম বা দার-অল-হরব –এর মত নিজের আত্মসমর্পনে প্রস্তুত নয় । তাই এখন, বিসর্জন এসেই না হয় প্রতিষ্ঠাকে ধরুক, খামোকা ছড়িয়ে ফেলে লাভ কী !

1 comment:

  1. অসাধারণ বললেও কম বলা হবে।👌🏻👌🏻

    ReplyDelete

I am waiting for your valuable comment. Please comment. Thank you..