। ১৩ ।

Picture Credit : Google Images
প্রথমে যে কথাখানি বলে নিতে হবে সেটা হল, একপ্রস্থ ক্ষমাপ্রার্থনার জবানি সেরে ফেলা। লকডাউনের কারণ এবং ফলাফল বহু মানুষের বহু ক্ষতি করেছে । তা নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট অব্দি রেগে অগ্নিশর্মা । সকল সহনাগরিকের প্রতি সহমর্মিতা জানানোর পরেও আমাকে একথা মেনে নিতেই হবে যে, লকডাউন আমাকে দিয়েছে একটি পুনর্জন্মের আশীর্বাদ । ভেতরের আসল মানুষটিকে হারিয়ে ফেলেছিলাম বহু বছর । তবে সে যে একেবারে হারানোর নয়, তা জানতুম । ভাগ্য মানিনে, কিন্তু বলতেই হচ্ছে পরম সৌভাগ্যের তদ্বিরেই হয়তো সে হারিয়ে যায়নি । ফিরে এসেছে, এক ডাকেই । সে কষ্ট পেয়েছিল, আমিও যে আনন্দে ছিলুম তাও তো নয় । সুতরাং, লকডাউনকে আন্তরিক ধন্যবাদ দিতেই হয় । গত মে মাস অব্দি ব্লগে লেখালেখি করেছিলাম । তারপরে ব্লগের জন্যে আর কিছু লেখা হয়নি । তার মানে এই নয় যে লেখাই হয়নি । হয়েছিল দৈনিক স্টেটসম্যান, আজকাল, প্রতিদিন, গুরুচন্ডালি, এককমাত্রা, এবং অধ্যায় ইত্যাদির জন্যে হয়েছিল । সেসব আজও হচ্ছে এবং হবেও । কিন্তু জুলাই মাস অব্দি সে সবের ইতস্তত বিক্ষিপ্ত ধুলোবালি ব্লগের রাজপ্রাসাদ ঢেকে রেখেছিল । আজ সমস্ত পরিষ্কার করার পালা সাঙ্গ হয়েছে । ব্লগের আন্তরিক আলিঙ্গনে বাড়িয়েছি হাত । জুন ও জুলাই – দু-মাসব্যাপী নিভৃত কথোপকথনে যে ছেদ পড়েছিল তার জন্যে বিনম্র ক্ষমা চাইতেই হবে । পাঠক বড় উদার, ভালোবাসাপ্রবন । তাঁদের কাছে হয়তো এসবের প্রয়োজনই ছিল না । কিন্তু নিজের কাছে অত্যন্ত জরুরি এটা । ঘরদোর পরিষ্কার করার পরে জমে থাকা আবর্জনার স্মৃতি যেমন একটা খোঁচা নিয়ে কিছুক্ষণ থেকে যায়, এটাও তেমনিই । রয়ে যাবে নইলে ।
আগেকার দিন হলে ব্লগের পরিবর্তে খোলা চিঠি কিংবা
হয়তো চিঠিই লিখতুম বন্ধুজনেদের । এখন তার প্রয়োজন নেই । সরাসরি কথা বলা যায় ।
মুঠোফোন আছে আমাদের প্রজন্মের কাছে । তবুও কি সব কথাগুলো বলে ফেলা যায় ? হয়তো যায়
। কিন্তু আমি পারিনে । যতটা পারি ততটা বলি, বাকি কিছু সুখদুঃখ লিখে রাখি । লিখে
রাখার জন্যি এখানে এত ভাবাভাবির একুশে আইন নেই । যা ইচ্ছে বলা যায়, কওয়া যায় । কেউ
নিষেধ করার নেই । এমন অনেকগুলি কথা থাকে যা শুধু লিখেই রাখা যায় । বলা যায় না ।
বললেও হয়তো ঠিক ততটা বলা হয়ে ওঠে না, যতটা বলতে পারলে বুকের ভেতর থেকে মোটা ঘড়ঘড়ে
জ্বালাতুনে শ্বাসবায়ু বেরিয়ে যেতে পারে । তারপরে শান্তি, দুদণ্ড ।
একবার শুরু করেছিলুম বটে । বন্ধুদের মধ্যে চিঠি
লেখালেখির পালা, টেকসই হয়নি । তারও আগে একটি মেয়ে জন্য লিখেছি । মেয়েটির হাতে
পৌঁছে দিতে পেরেছি, তা নয় । পরে বিলের জলে দিয়ে এসেছিলাম । কিন্তু লিখেছি বিস্তর ।
সে মেয়ে জানেও না, কতখানি ভালবাসা – কতখানি উথালপাথাল থাকলে এসব হয় । তবুও চিঠির
জন্যই যে সেসবের সার্থকতা সেটা ঠিক বলা যায় না । নিজের সঙ্গে কিছুক্ষণ নিভৃত
আলাপের তাগিদও বটে । এই ক’মাসে কয়েকজন স্রেফ পরিচিত আপনারজন হয়ে গেছে, সহপাঠী থেকে
বন্ধুত্বের শিরোপা পেয়েছে কয়েকজন, আবার কয়েকজন অপরিচিত কিংবা একেবারে গায়ে পড়ে
আলাপ করতে আসা ভিড়ের মুখ আত্মীয়জন হয়ে গেছে । এই হল লকডাউনে আমার দিবারাত্রির
কাব্য । কাকে জানাই এসব, মুঠোফোনে শুধু কথা হয়, আলোচনা হয়, সুখদুঃখও খানিক
ভাগাভাগি হয় ঠিকই, তবে এসব প্রাণের স্পন্দন সেখানে তরঙ্গ তোলে না । এর জন্য
চিঠিপত্তরের খুব দরকার । আমার কাছে, আগেও বলেছি যদিও, ব্লগই হল চিঠিপত্তরের বিকল্প
। এখানে আমি যেমন আমার সাময়িক প্রতিক্রিয়া দিতে পারি, তেমনই মনের বাগানবাড়িতে বসে
বিশ্রামের আমোদের উল্লাসে রাগের উদযাপনও করতে পারি নির্ভয়ে । এখানে এসেই পাঠকের
সঙ্গে গ্লাসের ঠুংঠাং আর চিয়ার্স ।
মনের মধ্যে কত রিক্ততা থাকে । মাঝে মধ্যে সেসব
থেকে নিজেকে উত্তোলিত করতে হয় । নইলে একদিন জগদ্দল পাহাড় হয়ে বুকের ওপরে চেপে বসে
। হাঁসফাঁস প্রাণ যায় যায় তখন আর কী ! আসলে যে মানুষটার ফিরে আসার কথা বলেছি, সে
মানুষটা একদিকে যেমন উন্মুক্তমনা অন্যদিকে বাউন্ডুলেও । কোথাও স্থির হয়ে বসে থাকতে
পারে নে । বলতে গেলে বলে, আমি যেদিন বসে যাব সেদিন তোমার মৃত্যু হবে । তোমায় আমি
হারিয়ে যেতে দিতে পারব নে । তাই আমার বাউন্ডুলেপনাকে থেকে তুমি বাধা দিও নে । এরপরে
আমি আর কী বলি ? যতদিন বেঁচেবর্তে থাকব ঐ ব্যাটাচ্ছেলের সঙ্গেই থাকতে চাই যে আমিও
। সুতরাং, তর্কে পরাজয় । যে কথাগুলো চিঠিতে লেখার ছিল, সেগুলো ব্লগেই লিখলাম,
মুঠোফোনে কাওকে বলতে পারলুম না যে,
লেখার
লোভ মিটবে বলেই আমি লিখি,বাড়বে বলে নয়। লেখক
হয়েছি বলেই দেখতে পেয়েছি খ্যাতি-গরিমা কিছুই নয়। ওর মধ্যে একমাত্র সত্য হচ্ছে লেখক
হওয়া। আমি লেখক হতে চাই। সেইজন্যেই তো আমি খ্যাতি-গরিমার লোভ করতে চাই না। কোনো সাময়িক
হৈহৈ-ই তো আজ পর্যন্ত টেঁকেনি -- যে হৈহৈ যতই
বড়োই হোক। কিন্তু একবারের মতো যে সত্যকার লেখক হতে পেরেছে চিরকালের মতো সে বেঁচে রইল।
তবে এও ঠিক পরকালের অমরত্বের আত্মঘাতী ফাঁদেও আমি পড়তে চাই না।
আর
থাকল একটি গান । এটা চিঠিপত্তরে সম্ভব ছিল না । তাই ব্লগই আমার চিঠিপত্র, ব্লগই আমার
খোলা হাওয়ার দুর্দমনীয় অধিকার ।
লেখার শুরুর দিকটায় একটু দেড়েল গন্ধ ছিল, ক্রমে সে কেমন ধীরে ধীরে জায়গা ছেড়ে দিয়েছে আসল লেখককে... হ্যাঁ, নিজের সঙ্গে নিভৃত যাপনই যদি না হলো, তো কী হবে কতকগুলো পরের মন ভোলানো কথায়? কেউ ভোলে না, কেবল নিজেকে ভোলা হয়...
ReplyDelete