![]() |
| ছবিঃ ইন্টারনেটের দৌলতে প্রাপ্ত |
‘বাঘের মতন বাঙালীর ও কী সংরক্ষণ প্রয়োজন?’ – শিরোনামের
একটি অনুষ্ঠানে চন্দ্রিল ভট্টাচার্য তথা বহু বিদগ্ধজনের বক্তব্য শুনলাম। মোটের
ওপরে ৭৭হাজার মানুষ ভিডিওটি দেখেছেন, ১৭৭জন মন্তব্য করেছেন ও ১৭০০জন লাইক করেছেন। অভীক
ও অনিন্দ্যদার সঙ্গে কথা হচ্ছিল ব্যাপারটা নিয়ে। প্রথমেই বলে রাখি, এত তীব্র
বৈদগ্ধ্যের মধ্যে নজর কাড়ল ‘বাঙালী’ ও ‘কী’ বানান দুটি এবং ‘বাঙালীর’ ও ‘ও’-এর
মধ্যস্থ স্পেসটি। যাই হোক, সে-ব্যাপারের আলোচনা ব্যতিরেকেও যে-কথাগুলি সবথেকে নাড়া
দিল তা হল, কোন বাঙালির সংরক্ষণের কথা এই আলোচনায় বলা হল, সেটি। একইসঙ্গে
কমেন্টে-লাইকে-ভিউতে এই যে হুল্লোড় সেটাইবা কোন বাঙালির? ১০কোটি বাঙালিকে নিশ্চয়
একই ব্রাকেটে ফেলে জেনেরালাইজেশনটি করা হয়নি। তাহলে?
ভারতীয় বাঙালি সমাজে আর্থনীতিক প্রেক্ষিতে মূলত তিনটে
শ্রেণি – তেড়ে বড়লোক, ছা-পোষা চাকুরিজীবী অথবা সিকি-ব্যবসায়ী ও কৃষক-দিনমজুর-শ্রমিক-গৃহপরিচারিকা-মুটেঝাঁকাঠেলাওয়ালা,
অর্থাৎ উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্ত। চিরকাল বেশিরভাগ উচ্চবিত্তই
সংস্কৃতিকে পণ্য হিসাবে আর নিম্নবিত্ত বিনোদন হিসাবে দেখেছেন। মধ্যবিত্ত মধ্যমপন্থায়
থেকেও এককালে অল্প মাইনের চাকুরি করে খানিক ভাবনা-চিন্তা করেছে ও নিজেকে কেউকেটা
ভেবে শান্তিবারি পেয়েছে কিন্তু এখন সে-দিকেও ভোঁভাঁ দশা। পক্ষান্তরে এখন রাজনীতির
ময়দানেও মধ্যবিত্তের স্থান-সংকুলান। ফলে আজ তার সরকারি চাকরির নিরাপত্তাও নেই, মননে-মনীষায়
রাজত্বও নেই আর সংস্কৃতির ফক্কিকাও নেই – একেবারে ‘করে তো করে কিয়া ভাই’ অবস্থা।
ফলে অস্তিত্ব যদি বিপন্নই হয় ও সংরক্ষণের যদি সত্যিই প্রয়োজন
হয়, তবে তা একমাত্র এই শ্রেণিটির – বাকি কারও নয়। এক দশক পুরানো একটি তথ্য অনুযায়ী
কলকাতাতে উচ্চবিত্ত ৩শতাংশ, মধ্যবিত্ত শ্রেণি মাত্র ১৬.৪শতাংশ ও নিম্নবিত্ত ও
গরীবতর শ্রেণি ৮০.৭ শতাংশ। আর সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী অর্থনীতিতে শেয়ার হিসাবে
আছে, কৃষিজীবী ও মৎসজীবী শ্রেণির ২১.১৪শতাংশ, উৎপাদন ও অন্যান্যের ২৫.৫৬শতাংশ ও
টার্শিয়ারি ক্ষেত্রের ৫৩.৩০শতাংশ। সেখানে এই বিতর্ক সভাটির টার্গেট অডিয়েন্স বা
উচ্চকিত ‘বাঙালী’ আসলে কারা? উত্তর হল, মোটের ওপর সমাজের এই ১৬শতাংস মধ্যবিত্ত
মানুষ (যদি সমগ্র রাজ্যের ওপরে অপরিবর্তিত গড় ও প্রোপোরশন ধরে নিই, তাতে যদিও
বেশিই নেওয়া হয়, তাও নিলাম), যাঁদের জীবনে আজ টিঁকে থাকার প্রশ্নটি সবচেয়ে জরুরি
হয়ে দেখা দিয়েছে। আর তাই চেঁচামেচি করে হল্লা বাঁধিয়ে মরাকান্না চলছে। আসলে তা হল
সমুদ্রের মধ্যে খড়কুটো আঁকড়ে ধরার প্রয়াস।
এই একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকে ইন্টারনেটের পরিসর ও গিগ
অর্থনীতি শহরঘেষা বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণিটির বিলুপ্তির ঘোষণা করেছে। বর্তমানে এই
শ্রেণিটি একটি পচা-গলা-দুর্গন্ধময় অবলুপ্তির পথে হাঁটা লাগিয়েছে। আগের দশক অব্দিও
যে-শ্রেণি নামিদামি স্কুল কলেজে পড়িয়ে সন্তানাদির চাকরির নিশ্চিত সংস্থানে
নিশ্চিন্ত ছিল, এখন সে-চোখে আর ঘুম নেই। নাচ-গান-খেলা সব কিছুতেই ভবিষ্যৎ দেখতে
অপারগ। বিগত কয়েক বছরের বাজেটের সামারি দেখলেও বোঝা যায় মধ্যবিত্তের ভাঁড়ার শূন্য।
তাইতো তাঁদের মিডিয়াগুলিও খালি অরণ্যরোদন করে বলে, ‘মধ্যবিত্তের কপালে কিছু জুটল
না’। আসলে এই শ্রেণি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির মতোই ধীরে ধীরে গরীব শ্রেণিতে
মার্জ করে যাচ্ছে। তাই চিন্তার করাল ছায়া ক্রমাগত প্রসারিত হচ্ছে। ফলে অভিযোগ,
নালিশ ও হতাশার অন্ত নেই।
এই অস্তিত্ব সংকটের পরিবেশ থেকে পরিত্রাণের রাস্তা বাতলাতে
পারে এমন কোনও নতুন চিন্তাও এই শ্রেণি উদ্ভাসিত করতে সক্ষম হচ্ছে না। ফলে
নিত্যনৈমিত্তিক এঁদো ও এঁটো কথা ফানুস ওড়ানো ছাড়া আর কোনও কাজই যেন অবশিষ্ট নেই। যাঁরা
ধনী তাঁরা কী এল আর কী গেল তা নিয়ে আগেও বিচলিত ছিল না এখনও নয়। কেননা সময় অনুযায়ী
নিজেদের অবস্থান বদলানোর মধ্যেই তাঁরা সর্বদা নিয়োজিত। অন্যদিকে গরীব শ্রেণির
মানুষজনের কাছে এই অনিশ্চয়তার দিনগুলিই চিরদিনের সম্বল ছিল, এখনও আছে। ফলে তাঁদেরও
নতুন করে কিছু যায় আসে না। সরকার কিছু দিলে তা বাড়তি পাওনা মনে করে খুশি হয়। আর
সেখানে মধ্যবিত্ত কিছু পেলেও মনে করে যথেষ্ট পাওয়া হল না, তাই ছিঁচকাঁদুনের মতো
ভ্যাভ্যা করে। পক্ষান্তরে মনে পড়ে যায় বেশ কিছু বছর আগে একটি চলচ্চিত্রে এক বাঙালি
নারীর নগ্ন হওয়াকে কেন্দ্র করে বিতর্কসভা, বলা ভালো জাস্টিফিকেশন সভা, বসিয়েছিল
একটি প্রথম সারির সংবাদমাধ্যম। সেখানেও সেই শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণিই ছিল টার্গেট –
কেননা উচ্চবিত্ত আর নিম্নবিত্তদের এসব ভ্যানতাড়ায় সময় অপব্যয় করার মত বিন্দুমাত্র
সময় নেই। মতাদর্শ বা আইডিওলজি মাড়ানো মধ্যবিত্ত শ্রেণিকেই সেদিন এই চ্যানেলে বসে
সবাই লাগাতার চাটন দিয়েছিল, আর সেই চাটন খেয়ে টিআরপি সাপ্লায়ার বাঙালি চুপসেও
গিয়েছিল, ভেবেছিল ঠিকই তো বলছে। অথচ এই শ্রেণিরই পেছন মেরে খাওয়া প্রভুদের
বিরুদ্ধে তেড়ে প্রতিবাদ করার দমটুকুও সেদিন সে জোটাতে পারেনি। সুতরাং, সত্যিই এঁদেরই
সংকট সমাগত। তাইতো ক্রোধ-উষ্মা এমনমাত্রায় পৌঁছেছে যে, বিতর্কসভায় তুই-তোকারি
পর্যন্ত স্তরে নির্দ্বিধায় নেমে যাওয়া যায় – আর মধ্যবিত্ত নিজবিষ্ঠা ঘেঁটে
সুগন্ধীর স্বাদ আয়েশ করে উপভোগ করে।
সম্প্রতি কানাঘুষো শোনা গেছে গিগ অর্থনীতির কারণে কিছু
উচ্চমানের বুদ্ধিজীবী সুবক্তাদের চাকরি চলে যাবার খবর, সত্যি মিথ্যে জানা নেই, আর
চাকরি চলে গেছে বলে খোঁটা দেবার অমানবিক মানসিকতাও নেই, আন্তরিকভাবে চাই খবরটি
মিথ্যে হোক। তবুও সত্যি বলেই প্রতিভাত হয় এইসব ফিসফাসগুলি, তা নাহলে কেন কিছু
কবি-গাইয়ে-অভিনেতা-পরিচালক-ইত্যাদি বন্ধু-বন্ধু হাত ধরাধরি করে আচমকা একটি
ওয়েবপত্রিকার(যাঁরা এতদিন লিটল ম্যাগাজিনকে নেড়ি বলে তাচ্ছিল্য করে বেড়াতেন) কাজে
নিজেদের ছুঁড়ে মারবেন? অবাক হতে হয় এত কিছুর পরেও জমিদারের বাতিল ঝাড়বাতি আর
গড়গড়ার মতো অহংকারে তাঁরা এখনও প্রচার করে বলেছেন যে, ‘দশগ্রাম সোনার দাম পঞ্চাশ
হাজার টাকা আর আমাদের পত্রিকার দাম পঞ্চাশ টাকা’ অর্থাৎ সেই শহুরে পচাগলা মধ্যবিত্তের
প্রতি উন্নাসিক মুখাপেক্ষিতা এখনও বন্ধ হয়নি। এত কিছু করে মধ্যবিত্ত বাঙালি কী কী
পাবে? না সেই নব্বই দশকের যৌবনের ফচকেমি, চটকদার কিছু ঝালমুড়ি, যেগুলি বর্তমানে
উপযোগিতাহীন পণ্য। আর তাতেই এমন একটা ভাব যেন সমগ্র বাঙালি সমাজকে পঞ্চাশ টাকায়
শিক্ষিত-সভ্য করে দিচ্ছেন আর ভারি উপকার করছেন সমাজের, আসলে তো এটা নিজেদের কোনরকমে
টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টা, তাই না। আর তাই-ই, বাঘা বাঘা মানুষজনের বিধিতেও জুটছে
কোনোদিন ৫০লাইক কোনোদিন ১৫০, ব্যতিক্রম আছে, তবে তা বিরল, তাই উদাহরণ নয়। সাসটেনেবেল
নতুন চিন্তা ছাড়া রক্ষা পাওয়ার কোনও উপায় নেই – এটাই বুঝতে পারছে না। সবাই কি আর
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আর নির্মাল্য আচার্য হতে পারেন!!!
মনে রাখতে হবে রাস্তাঘাটে, বাজারে সর্বত্র যে বাঙালিকে ঝুড়ি
নিয়ে কিংবা দোকান খুলে বসতে দেখা যায় তাঁরা সকলেই কিন্তু উদ্যোগপতি এবং যে-বাঙালি
এখন উবের-জোমাটো করছেন তাঁরাই গিগ অর্থনীতির প্রধান মুখ। তাঁরাই টিঁকে যাবেন শেষে।
ব্যবসায়ী মানেই যে তাঁকে বিশাল শিল্পপতি হতে হবে, নইলে হবে না, তা নয়। আর যাঁরা তা
পারবেন না সকলেই ফালতু এরকম উন্নাসিক ধারণা থেকে আয়োজিত এইসব বিতর্কসভাগুলি এককথায়
দেউলেপনার বিশিষ্ট উদাহরণ। কেননা এগুলি জুটশ্রমিক, পানপাতা চাষী, রিক্সাচালক,
গৃহপরিচারিকা থেকে বিরাট পুঁজিপতি ইত্যাদি সমস্ত বাঙালিকে একঘাটেই জল খাইয়ে সংরক্ষনের
কথা বলে নিজেদের গুরুত্ব বাড়াতে চায়। ব্যর্থ অবশ্যই হয়। তাইতো ‘বঙ্গাই’ কিংবা ‘হঠাৎ
যদি উঠল কথা’ অথবা ‘রান্নাবান্না’-এর মতো সাধারণ মানুষের চ্যানেলের থেকেও এগুলো কম
জনপ্রিয় হয়। আসলে সমাজের মূলধারার মানুষের অন্তর থেকেই এগুলি বিচ্ছিন্ন। তাই আজ পশ্চিমবঙ্গের
নিম্নবিত্তের ৮০ শতাংশ ও উচ্চবিত্তের ৩শতাংশ ব্যতিরেকে এইসব তার্কিক, নৈয়ায়িক ও
বিশেষরূপে বৌদ্ধিক শ্রেণির সংরক্ষণের আশু-প্রয়োজন। কেননা তাঁরা তো আর ভিক্ষার ঝুলি
হাতে নিয়ে দাঁড়াতে পারেন না কিংবা সাধারণভাবে ব্যবসাও করতে পারেন না, ফলে তাঁরা
বিতর্কসভার আয়োজন করেন ও শেষে দাবি করেন একটি বৌদ্ধিক চাকচিক্যময় নিশ্চিন্ত চাকুরি।
বলতে চান তাঁরাই আসল বাঙালি, তাঁরা অর্থাৎ কলকাত্তাইয়া বাঙালিই হল বাঘ, বাকিরা
পিঁপড়ে। তবুও তো এটাই ঠিক যে, বাঘেরই সংরক্ষণ দরকার হয়, পিঁপড়ে সভ্যতার আদিকাল
থেকে নিজেই টিকে আছে, যতই তাকে পিষে মারার চেষ্টা হোক।

No comments:
Post a Comment
I am waiting for your valuable comment. Please comment. Thank you..